জিওভান্নি সার্তোরি তার পার্টি অ্যান্ড পার্টি সিস্টেমস তত্ত্বে দেখিয়েছেন, নির্বাচনি পদ্ধতি দলীয় ব্যবস্থার প্রকারভেদ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট বা এফপিটিপি পদ্ধতি একটি সংখ্যাগরিষ্ঠতার সংস্কৃতি তৈরি করে, যেখানে বড় দলগুলো সুবিধা পায়, অপরদিকে পিআর পদ্ধতি বৈচিত্র্যপূর্ণ দলীয় অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশের মতো বহুবিভক্ত সমাজে পিআর পদ্ধতি একটি বৈচিত্র্যময় রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে পারে।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নির্বাচনি ব্যবস্থার সংস্কার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে উঠে এসেছে। বিদ্যমান এফপিটিপি ব্যবস্থার পরিবর্তে আনুপাতিক বা পিআর পদ্ধতির পক্ষে-বিপক্ষে মতবিনিময়ে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। আদতে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক কাঠামো এক দীর্ঘ রূপান্তরপ্রবাহের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত কার্যত দুই-দলীয় আধিপত্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ক্ষমতার চক্রবদ্ধ লড়াই গণতন্ত্রের বৈচিত্র্য ও গভীরতাকে সংকুচিত করেছে। ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট পদ্ধতির অধীনে নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় এমন এক চিত্র দেখা যায়, যেখানে প্রকৃত ভোটারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেয়েও একক দল সরকার গঠন করতে পারে। ফলে এমন একটি কাঠামো তৈরি হয়েছে, যেখানে ছোট রাজনৈতিক দল, মতাদর্শগত সংখ্যালঘু ও বিকল্প কণ্ঠগুলো কার্যত ক্ষমতার প্রান্তে পরিণত হয় এবং রাজনৈতিক বৈচিত্র্য সংকুচিত হয়েছে আর ক্ষমতার কেন্দ্রিকতা বেড়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে আনুপাতিক পদ্ধতি একটি বাস্তবসম্মত ও সম্ভাবনাময় বিকল্প হিসেবে সামনে এসেছে বলে মনে করছি।
সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় চলে আসবে—গত ১৫ বছর আওয়ামী বুদ্ধিজীবীদের বয়ান ছিল এ রকমই। সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব হলে ইসলামপন্থিরা বেশি আসন পেয়ে যাবে, যা নতুন তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের নতুন বয়ান। কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছেন কি? হ্যাঁ, মিল আছে। এটা হলো জবাবদিহিবিহীন নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার পুরোনো খায়েশ। আমাদের মূল আরগুমেন্ট হওয়া উচিত ছিল, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের আলোচনায় আমরা কোন বিষয়কে সামনে রাখব, কোন দল লাভবান হবে, আর কোন দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এটা; নাকি জবাবদিহি, বা কোনো দলই যাতে স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে—সেটা?
দেখা যাচ্ছে, অনেক তথাকথিত গৃহপালিত বুদ্ধিজীবী দলীয় অবস্থানের বাইরে চিন্তা করতে অক্ষম, কারণ তারা দলীয় স্বার্থ দেখতে গিয়ে চিন্তা-প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েছে। গ্রামসির হেজেমনি ধারণায় দেখা যায়, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী কেবল রাষ্ট্রীয় শক্তির মাধ্যমে নয়, বরং সাংস্কৃতিক আধিপত্যের মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে তথাকথিত ‘দলীয় বুদ্ধিজীবী’ ও মিডিয়া কাঠামো এই হেজেমনিক শক্তির অংশ হয়ে ওঠে, যারা পিআর পদ্ধতির প্রশ্নে জনস্বার্থ নয়, বরং পুরোনো ক্ষমতার স্থিতাবস্থা বজায় রাখার লক্ষ্যেই কাজ করে। তারা আনুপাতিক সংখ্যা পদ্ধতির সরকার গঠনের পজিটিভ ও নেগেটিভ দিকগুলো তুলে না ধরে শুধু নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরার কোশেশ করছেন জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য। কোন পদ্ধতি ভালো, সেই সিদ্ধান্ত মানুষ নেবে।
আরেকটা বিপজ্জনক অভিপ্রায় হলো হরহামেশা অবলীলায় সবাইকে আওয়ামী ফ্যাসিবাদ ও ভারতের দালাল বলে চিহ্নিত করা। এটা ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে পাকিস্তানের দালাল বলে অপরায়নের অপচর্চা বলে মনে করি। আওয়ামী বুদ্ধিজীবীদের আরেকটা কমন বয়ান ছিল, সরকার ও বিরোধী দলের উভয়কেই মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি হতে হবে। কে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আর কে বিপক্ষে, সেটাও তারাই নির্ধারণ করার দায়িত্ব নিয়েছিল। কিন্তু তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতায় আওয়ামী লীগই থাকবে, বিরোধী দলে বামপন্থি প্রগতিশীলরা থাকলে ভালো হয়। এখন কেউ যদি মনে করে, ক্ষমতায় বিএনপিই থাকবে এবং বিরোধী দলে ডানপন্থি কেউ থাকলে ভালো হয়, সেটাও পুরোনো বোতলে নতুন মদ বৈকি। আমার অনেক পরিচিতজন ও বন্ধুরা মনে করেন, আমি হয়তো বিএনপিবিরোধী হয়ে গেছি। আসলে বিষয়টা একেবারে ঠিক নয়—আমি নিজেও একজন বিএনপির শুভাকাঙ্ক্ষী, তবে আমি আমার লেখায় কথাগুলো বলি বাংলাদেশের রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সফলতা কামনা করে। কারণ আমরা আর কত রক্ত দেব? আর কত দিলে আমাদের রাষ্ট্রটা ঠিক হবে? কারণ আমরা তো পুরোনো পদ্ধতিতে দেখে আসছি, যারাই পাস করে ক্ষমতায় এসেছেন, তারাই স্বৈরাচার হওয়ার চেষ্টা করেছেন; কেউ কামিয়াবি লাভ করেছেন আর কেউ করতে পারেননি এবং অন্যায়ভাবে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার কোশেশ করেছেন।
যাহোক, এখন প্রশ্ন হলো সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে যে সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে, তা কীভাবে নিরসন করা সম্ভব? সরকারের স্থায়িত্ব, ক্ষমতার ভারসাম্য, ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসন ঠেকানো প্রভৃতি কীভাবে সম্ভব, তা নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা করা। কিন্তু এককথায় বাতিল করে দেওয়া কোনো ভালো উদ্দেশ্য হতে পারে না।
অনেকে ইতালি ও ইসরাইলের উদাহরণ টেনে আনার চেষ্টা করছেন। আসলে বর্তমান পৃথিবীর ৯১টি দেশে এ সিস্টেম চালু আছে। আমরা শুধু কেন ইসরাইল ও ইতালির উদাহরণ নিয়ে আসছি, অন্যান্য দেশগুলোয় এ পদ্ধতি সফলভাবে কাজ করছে।
মোটাদাগে, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ডিসকোর্সে আমাদের দলীয় অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে কথা বলতে পারতে হবে, নাহয় বাংলাদেশ আবার বেশ পিছিয়ে যাবে। আনুপাতিক পদ্ধতিতে কোন ফিক্সড পার্সেন্টেজকে সর্বনিম্ন করতে হবে, এমন কথা তো কেউ এখনো বলেনি। এদেশে নতুন বলে এটা নিয়ে আরো খোলামেলা আলোচনা হতে পারে। মূল উদ্দেশ্য তো জনগণের আরো বেশি প্রতিনিধিত্ব যেন নিশ্চিত করা যায়। এর জন্য সর্বনিম্ন পার্সেন্টেজটা বাংলাদেশের সাপেক্ষে আলোচনা করে কমানো যেতেই পারে। তবে সর্বনিম্ন কত শতাংশ ভোট পেলে ৩০০ আসনের একটা আসন পাওয়া যেতে পারে, তার ওপর ভিত্তি করে মিনিমাম পার্সেন্টেজ নির্ধারণ করা উচিত বলে মনে করি। ১২ কোটি ভোটার হলে এক আসনের জন্য মোট ভোটের শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ ভোট পেলে একটি আসন পাওয়া যাবে।
কিন্তু শুধু বিএনপি কীভাবে এই নির্বাচনে সুবিধা পাবে—এটাই যখন একমাত্র টার্গেট হবে, তখন জামায়াত, এনসিপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে হরেক রকমের সাসপেনশন পয়দা হওয়াটাই অস্বাভাবিক কিছু নয়। ফন্দিফিকির আঁটার সম্ভাবনা তো অলীক কোনো কল্পনাপ্রসূত বিষয় নয়।
গণতন্ত্র তখনই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ মত সাম্প্রদায়িকতা বা দমননীতির চেহারা নেয়। বাংলাদেশের বর্তমান ব্যবস্থায় এ ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠ আধিপত্য সহজেই একচ্ছত্র ক্ষমতা কায়েমে রূপ নেয়, যা সংবিধানিক ভারসাম্য বিনষ্ট করে। আনুপাতিক পদ্ধতি এই আধিপত্য ভেঙে ক্ষমতার ভারসাম্য ও সমবণ্টনের পথ খুলে দিতে পারে। যাহোক,পারফেক্ট কোনো কিছুই হয় না। কিন্তু বিএনপির ক্ষমতার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও একচ্ছত্র আধিপত্য নিশ্চিত না হওয়ার ভয়ে এটা নিয়ে সমালোচনা করছে। এই পদ্ধতিতে পুরোনো রাজনীতির অনেক খারাপ দিক বাদ পড়ে যাবে। যেমন এই পদ্ধতিতে স্থানীয় গুন্ডামি বন্ধ হবে। স্থানীয় গুন্ডা বাহিনী পোষানোর সংস্কৃতি, টাকা দিয়ে ভোট কেনাবেচা করা, ভোটকেন্দ্র দখল করা—এগুলো কমে আসবে। ভোটকেন্দ্র-কেন্দ্রিক গুন্ডামি ও কেন্দ্র দখল কমে এলে পরিচ্ছন্ন রাজনীতির নির্বাচনি প্রচারণা বাড়বে, বারবার সীমানা নির্ধারণের কোনো প্রয়োজন নেই, সারাদেশে তো একটি আসন। যেহেতু একটিই নির্বাচনি এলাকা, তাই সহজে অগ্রিম ভোটও গ্রহণ করা যেতে পারে, অগ্রিম ভোট হলে ভোটের দিনের ভোটারের অতিরিক্ত চাপও কমবে, আর প্রবাসীরাও সহজে ভোট দিতে পারবে। আনুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে এমপিদের স্থানীয়ভাবে কোনো কাজ থাকবে না, ফলে স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হবে; এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যানের দ্বন্দ্বও চুকে যাবে। তা ছাড়া এমপিদের কাজ তো আইন প্রণয়ন করা। তাদের এলাকার জনগণের চেনার দরকার আছে বলে মনে করি না। উন্নয়নমূলক কাজ করবে স্থানীয় প্রশাসন, যেমন জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা। আর এমপির কাজ যে শুধু জাতির স্বার্থে আইন বানানো, সেটাও কার্যকর হবে।
আনুপাতিক পদ্ধতিতে ৩০০ আসনে তিন লাখ ভোট চুরিতে একজন এমপির পরিবর্তন হতে পারে, আর চলমান এফপিটিপি পদ্ধতিতে মাত্র একটি ভোট চুরিতে একজন এমপি পরিবর্তন হতে পারে! তাই এই ভোট চোর/ডাকাতদের দেশে পিআর উপযুক্ত হতে পারে, এমনকি কোনো সংসদ সদস্য মৃত্যুবরণ করলে উপনির্বাচনের প্রয়োজন নেই, রাজনৈতিক দল থেকে সরবরাহকৃত তালিকার ধারাবাহিকতায় পরবর্তী ব্যক্তি সংসদ সদস্য হতে পারেন। সর্বোপরি অধিক সংখ্যক ভোটারের প্রতিনিধিত্ব প্রতিপালিত হয় বলে অধিক ডেমোক্রেসির পথে আনুপাতিক পদ্ধতি বেশ সহায়ক হতে পারে। প্রথম প্রথম বেখাপ্পা লাগলেও আস্তে আস্তে মানুষ মানিয়ে নিতে পারবে। বলা হয়ে থাকে, গণতন্ত্রে শক্তিশালী বিরোধী দল খুবই দরকার। তৃতীয় বিশ্বের দেশে সরকার অতিরিক্ত শক্তিশালী হলে স্বৈরাচারী হয়ে যায়। এটার কাউন্টার ব্যালেন্সে রাজনীতিতে নেগোসিয়েশন কালচার তৈরি হতে হলে দরকার হলো শক্তিশালী বিরোধী দল। পিআর সিস্টেমে যেহেতু এককভাবে সরকার গঠন কঠিন, সেহেতু বিরোধী দল শক্তিশালী থাকবে। এটা জবাবদিহিও নিশ্চিত করবে সরকারে।
যারা মনে করেন, আনুপাতিক পদ্ধতি আসা উচিত নয়, সেক্ষেত্রে যারা চাচ্ছেন তাদের কারণগুলো কীভাবে বর্তমান অবস্থায় সমাধান করা যায়, তার একটা উপায় বা সমাধান কি তাদের কাছে আছে? শুধু কথায় তো চিরা ভিজবে না, কারণ বর্তমান সিস্টেমে পরীক্ষিতভাবে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব। আর বর্তমানে বিএনপি ছাড়া ম্যাক্সিমাম ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দল এই সিস্টেমের কথা বলছে। আপনারা যদি পিআর-বিরোধী হয়ে থাকেন, তবে বিএনপি বাদে আরো যত ফ্যাসিবাদবিরোধী দল আছে তাদের যে স্বার্থ তা তাদের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে কীভাবে এই সিস্টেমে সমাধান করা যায়, সে প্রস্তাবনা দেওয়া জরুরি। সমাজে বিভক্তি থাকলে রাজনৈতিক সমঝোতা, ক্ষমতা ভাগাভাগি এবং পারস্পরিক সম্মাননির্ভর কাঠামোই স্থিতিশীলতা আনে। আনুপাতিক পদ্ধতি এ ধরনের সংহতিমূলক কাঠামো গঠনে কার্যকর। বাংলাদেশে মতাদর্শিক বিভাজন যেমন ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম ইসলামপন্থা, জাতিগত-আঞ্চলিক বৈচিত্র্য, গ্রামীণ-শহুরে ব্যবধান—এসব বিষয়ের আলোকে আনুপাতিক পদ্ধতি বাস্তবিকভাবে উপযোগী।
জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামি ও বামপন্থিসহ অন্যান্য প্রায় সব দলই পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন দাবি করছে। কিন্তু বিএনপির অ্যাক্টিভিস্টরা অন্যদের বাদ দিয়ে জামায়াতের ওপর খড়্গহস্ত কেন? আমার কাছে সাধারণভাবে যে কারণগুলো মনে হয়, সেগুলো হলো পিআর পদ্ধতির নির্বাচনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মতো দলগুলো স্থানীয় পেশিশক্তি প্রয়োগ, আসনকেন্দ্রিক ক্যাডার পোষা, ভোট দখল, ভয়ভীতি দেখানো প্রভৃতি কার্যক্রম তাৎপর্যপূর্ণ পরিমাণে কমে যাবে। এমনকি স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির পক্ষে ভোটের মাঠে কাজ করার স্পৃহাও কমবে। কোনো আসনের উপজেলার নেতাদের নাম যদি না থাকে তালিকায়, তাহলে স্থানীয় পর্যায়ের সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য টাকা ছিটানো ও প্রাণান্তকরভাবে কাজ করার কোনো নজিরই দেখা যাবে না। এমনকি সে আসনগুলোয় বিএনপির পক্ষে ভোট চাওয়ার কার্যক্রমও কমে যাবে। অপরদিকে প্রাথমিকভাবে জামায়াতে ইসলামীর কাজে কোনো ভাটা পড়বে না, বরং কাজে গতি আরো বাড়বে—যে কারণে বিএনপির বিপরীতে পিআর পদ্ধতিতে জামায়াতের লাভ খানিকটা বেশি। তবে যেভাবে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে ঝুঁকছে, সেক্ষেত্রে ভবিষ্যতে জামায়াতের পরিস্থিতিও এমন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তা ছাড়া জামায়াতের নির্দিষ্ট কিছু আসন থাকলেও সারা দেশেই তাদের ভোট আছে। বর্তমান পদ্ধতিতে এই ভোটের কোনো কার্যকারিতা নেই। ছোট ও মাঝারি মানের দলগুলো সারা দেশে কিছু কিছু ভোট পেলেও এগুলো কোনো কাজে আসে না। কিন্তু পিআর পদ্ধতিতে সব ভোটই সমান গুরুত্বপূর্ণ, পরাজিত আসনের ভোটও পিআর পদ্ধতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। অপরদিকে এফপিটিপি পদ্ধতিতে ৩০-৩৫ শতাংশ ভোট পেয়ে বিএনপি হয়তো ম্যাজিক ফিগার পেত। পিআর পদ্ধতিতে সেটি গিয়ে নামবে ৯০-১০৫টায়। জামায়াতে ইসলামি সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশের বেশি পাওয়ার সম্ভাবনা বলে অনেকেই অনুমান করছেন। জরিপগুলোয় সেরকম আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এফপিটিপি নির্বাচন পদ্ধতিতে এই পরিমাণ ভোট ৭০+ আসন এনে দেবে। পিআর পদ্ধতিতে ইসলামি দলগুলো, এনসিপি, এবি পার্টি ও গণ অধিকার পরিষদ একত্র হলে ভোটপ্রাপ্তির সংখ্যা অনেক বেশি বাড়তে পারে, এমনকি তাদের জোট ক্ষমতায় চলে এলেও অবাক হবো না, যা আমরা শ্রীলঙ্কার নির্বাচন থেকে মালুম করতে পারি। আওয়ামী লীগ যেহেতু নেই, জামায়াতে ইসলামীই বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী। বিএনপি আগে ক্ষমতায় থাকায় নেগেটিভ মনোভাব আছে। ছাত্রদের অনেকের মনোভাব ছাত্রদল ক্যাম্পাসে এলেই দখলদারত্ব কায়েম হবে, যদিও হাইকমান্ড এগুলো আটকানোর আন্তরিক প্রচেষ্টা করছে। কিন্তু বিএনপির রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও আদর্শকে প্রচার কিংবা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মী তৈরির পদ্ধতি নেই। বরং অর্থ, পেশিশক্তি, দখল প্রভৃতির মাধ্যমে কর্মী তৈরিই বিএনপি সংস্কৃতি। সে কারণে যারা দোদুল্যমান ভোটার তারা ‘এফপিটিপি পদ্ধতিতে বিএনপিই জিতবে’ এই মনোভাবের কারণে তাদের ভোট দেবে। কিন্তু পিআর পদ্ধতিতে এর বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। অন্যদিকে পিআর পদ্ধতিতে জামায়াত বা তাদের জোটের পক্ষে এই দোদুল্যমান ভোটারকে বিএনপির তুলনায় বেশি টানা সম্ভব বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে। আমরা যদি ধরেও নিই ভোটের সংখ্যায় কোনো পরিবর্তন হবে না, তাও এফপিটিপি থেকে পিআর পদ্ধতিতে শিফট করলে বিএনপির সংসদ সদস্য প্রাপ্তি একশ’র বেশি অনিবার্যভাবে কমে যাবে।
তা ছাড়া ভারতের সঙ্গে আঁতাত, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা—এগুলো ভোটের রাজনীতিতে সচেতন নাগরিকদের কাছে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে বলেই মনে হয়। আদতে আনুপাতিক পদ্ধতির বাস্তবায়ন কোনো জাদুর কাঠি নয়; কিন্তু এটি রাজনৈতিক বৈচিত্র্য, অংশগ্রহণমূলকতা ও ন্যায্য প্রতিনিধিত্বের ভিত্তি হিসেবে এক সম্ভাবনাময় পথ। প্রচলিত পদ্ধতির একচ্ছত্র ক্ষমতা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচার রোধে আনুপাতিক পদ্ধতি একটি কাঠামোগত সমাধান হতে পারে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে রক্ষা ও পুনর্গঠনের জন্য একটি অংশগ্রহণমূলক, প্রতিনিধিত্বমূলক ও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
লেখক : সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, লেখক ও গবেষক, ফ্রাই ইউনিভার্সিটি বার্লিন, জার্মানি
sahidsams7@gmail.com