হোম > মতামত

সংস্কারের পূর্বাপর ও রাজনৈতিক বন্দোবস্ত

মাকসুদুর রহমান

৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে অধিক চর্চিত শব্দ হচ্ছে সংস্কার। পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিস্ট আদর্শে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী রাজনৈতিক দল ছাড়া প্রায় সবাই সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরছেন, যদিও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘সংস্কার’ শব্দটি দীর্ঘকাল ধরে রীতিমতো অচ্ছুত হিসেবে চিহ্নিত হতো। বিশেষ করে বিএনপির রাজনীতিতে সংস্কারপন্থি হিসেবে চিহ্নিত নেতৃত্বকে দীর্ঘদিন দলের সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে থাকতে হয়েছে। ১/১১-খ্যাত সামরিক বাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কালে ২০০৭ সালের ২৫ জুন রাজনৈতিক সংস্কারের নামে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া ১৫ দফা সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। কার্যত দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মাইনাস করার কথা বলা হয়েছিল এ প্রস্তাবে। আওয়ামী লীগের তৎকালীন প্রভাবশালী চার প্রেসিডিয়াম সদস্য রাজ্জাক, আমু, তোফায়েল ও সুরঞ্জিতের (ইংরেজি বানানের প্রথম অক্ষর নিয়ে সংক্ষেপে তাদের RATS নামে চিহ্নিত করা হতো) নেতৃত্বে একইভাবে শব্দগত কিছু এদিক-সেদিক থাকলেও প্রায় হুবহু একটি সংস্কার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। উভয় দলের সংস্কার প্রস্তাবকে কার্যত ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার অংশবিশেষ হিসেবে অভিহিত করা হতো। এর জন্য অবশ্য সেই সময়কার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বহুলাংশে দায়ী। নিঃসন্দেহে এর দায় এড়িয়ে যেতে পারেন না বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপনকারীরা। কারণ সময়ের বিচারে সেই সময় অলিখিত সেনাশাসনের মাঝে যখন বিএনপি ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের বেশিরভাগই হয় কারাবন্দি, নয়তো পলাতক কিংবা দেশছাড়া! এ রকম একটি দমবন্ধকর অবরুদ্ধ রাজনৈতিক পরিবেশে রাজনৈতিক সংস্কারের প্রস্তাব উত্থাপনের পেছনে কোনো ধরনের সৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে, তা বাস্তবিক অর্থেই কেউ বিশ্বাস করেননি। এর অনিবার্য পরিণতিতে ‘সংস্কার’ শব্দটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে রীতিমতো গালির সমার্থক শব্দ হিসেবে জায়গা করে নেয়।

সময়ের পরিক্রমায় দীর্ঘ দেড় দশক পরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও ‘সংস্কার’ শব্দটি ফিরে আসে। কখনো তা শব্দগতভাবে ‘সংস্কার’ হিসেবে, আবার কখনো তা এর প্রতিশব্দ ‘মেরামত’ রূপে। তবে এবারও সংস্কারের রাজনৈতিক পূর্ণতা আসে বিএনপির হাত ধরেই ২০২৩ সালের ১৩ জুলাই বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ‘রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের রূপরেখা ৩১ দফা’ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার মধ্য দিয়ে। ৩১ দফা রাজনৈতিকভাবে বিএনপির প্রস্তাব হিসেবে পরিচিতি পেলেও তাদের যুগপৎ আন্দোলনের মিত্র শরিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্যের ভিত্তিতে তা গৃহীত হয়। সেই বিবেচনায় বিএনপির ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবের একটি গভীর রাজনৈতিক বহুমাত্রিকতা রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে সংস্কার ইস্যুতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে গত তিন-তিনটি জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে রীতিমতো ক্ষমতার দানবে পরিণত হওয়া শেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে ভারত পলায়নের মধ্য দিয়ে। এ সময় ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর জামায়াতে ইসলামীও ৪১ দফা সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করে।

বিএনপির ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে—এক. সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনয়ন; দুই. পরপর দুই মেয়াদের বেশি কারো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে সীমারেখা টানা; তিন. বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি ‘উচ্চ-কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা’ (House of the Legislature) প্রবর্তন এবং চার. জাতীয় সংসদে আইন প্রণেতাদের স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করতে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন। অন্যদিকে রয়েছে—এক. জামায়াতের সংস্কার প্রস্তাবে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ‘ভারসাম্য’ আনা; দুই. জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থা চালু করা; তিন. সংবিধানে কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা স্থায়ীভাবে সন্নিবেশ করা এবং চার. রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের নিয়ম বাতিল করার প্রস্তাব। এ ছাড়া বিএনপির মতো জামায়াতও একই ব্যক্তির পরপর দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকার সুযোগ বন্ধ করার সুপারিশ করেছে।

৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে জুলাই ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতৃত্বের যেকোনো মতামত কিংবা প্রস্তাব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩ ডিসেম্বর জাতীয় নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে সংবিধান সংস্কার কমিশনের কাছে পেশকৃত ৬৯ দফা লিখিত প্রস্তাবগুলোও আলোচনার দাবি রাখে। ৬৯ দফার মৌলিক বিষয়ের মধ্যে রয়েছে—এক. সংবিধানে দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের ঘোষণা অন্তর্ভুক্ত; দুই. দুবারের বেশি কোনো ব্যক্তির রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী না হওয়া; তিন. সরকারের মেয়াদ চার বছর করা; চার. সাংবিধানিক পদে থাকা কাউকে অপসারণের ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে না রাখা; পাঁচ. সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কঠোরতা খর্ব করা; ছয়. গণভোটের বিধান এবং সাত. শুধু আইনসভার দুই-তৃতীয়াংশের জোরে সংবিধান সংশোধন না করা।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় গঠিত ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের আলোকে এ পর্যন্ত প্রায় ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। চারটি সংস্কার কমিটি গত ১৫ জানুয়ারি সংস্কার প্রস্তাবের সারসংক্ষেপ জমা দিয়েছে। আলী রীয়াজের নেতৃত্বাধীন সংবিধান সংস্কার কমিশনের সারসংক্ষেপ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বেশকিছু জায়গায় বিএনপি ও জামায়াতের সংস্কার প্রস্তাবে মিল আছে। যেমন তারা বিএনপির মতোই সুপারিশে একটি উচ্চকক্ষ আইনসভা গঠনের কথা বলেছে। উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation-PR) পদ্ধতি জামায়াতের প্রস্তাবের সঙ্গে আংশিক মিলে যায়, যদিও জামায়াত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দিয়েছে। সংবিধান সংস্কার কমিশন আইন ও নির্বাহী বিভাগ সম্পর্কে যেসব সংস্কার প্রস্তাব করেছে, সেগুলো মধ্যে উল্লেখযোগ্য—এক. দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা; দুই. প্রস্তাবিত আইনসভার উভয়কক্ষ-সহ রাষ্ট্রের সব সাংবিধানিক পদগুলোর মেয়াদ হবে চার বছর; তিন. নারী সদস্যসংখ্যা একশ জনে বৃদ্ধি করে সরাসরি নির্বাচনের প্রস্তাব করে নিম্নকক্ষের সদস্যসংখ্যা চারশ’তে উন্নীতকরণ; চার. একজন ব্যক্তির সর্বোচ্চ দুবার রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ; পাঁচ. সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ন্যূনতম বয়স ২১ বছর করা; ছয়. নির্বাচনকালীন সর্বোচ্চ ৯০ দিন মেয়াদের অন্তর্বর্তী সরকার গঠন; সাত. জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল গঠন; আট. কোনো ব্যক্তির একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী, দলীয় প্রধানের পদ ও সংসদ নেতা হিসেবে না থাকা; নয়. সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোট পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দশ. সংবিধানের বিতর্কিত ৭০ অনুচ্ছেদ পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে কমিশন প্রদত্ত পরামর্শ।

সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবে মৌলিক কিছু বিষয়ে পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশের সাংবিধানিক নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব। বাংলাদেশের সাংবিধানিক নাম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ শব্দগুলো বাদ দিয়ে সেখানে ‘নাগরিকতন্ত্র’ ও ‘জনগণতন্ত্রী বাংলাদেশ’ নাম ব্যবহার করার সুপারিশ করেছে কমিশন। এর সপক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে বিবিসি বাংলাকে এক সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করে কমিশনপ্রধান আলী রীয়াজ বলেন, “বাংলাদেশকে যেভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ বলা হয়, তার মধ্যে আসলে যে প্রজাতন্ত্রের কথা হয়, সেটায় আমরা দ্বিমত পোষণ করেছি। আমরা বলেছি, বাংলাদেশের পরিচিতি হওয়া উচিত ‘জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ হিসেবে। কমিশন ‘বাংলাদেশের জনগণকে জাতি হিসেবে বাঙালি’ বিধান বিলুপ্ত করে নাগরিকদের ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে পরিচয় দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। কমিশন প্রচলিত সাংবিধানিক রাষ্ট্রীয় মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা পরিবর্তন করে নতুন মূলনীতি হিসেবে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, বহুত্ববাদ ও গণতন্ত্র’-এর কথা সুপারিশ করেছে।”

সংবিধান সংস্কার কমিশন, বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় নাগরিক কমিটিসহ বাংলাদেশে এ মুহূর্তে ক্রিয়াশীল প্রায় সব রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী কিংবা নাগরিক সমাজের পক্ষের প্রায় সবাই একটা জাতীয় ইস্যুতে নীতিগতভাবে ঐকমত্যে উপনীত। সেটা হচ্ছে, প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কার। বিভিন্ন সময়ে তাদের উত্থাপিত প্রস্তাবনা বিশ্লেষণ করে একটা বিষয় সুস্পষ্ট যে, তাদের মধ্যে মৌলিক বিষয়ে খুব বেশি দ্বিমত নেই। তাদের প্রস্তাবনায় যেসব পার্থক্য প্রতিভাত হচ্ছে, সেসব পার্থক্য জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ন্যূনতম মাত্রায় নিয়ে আসা সম্ভব। আশাজাগানিয়া বিষয় হচ্ছে, প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার সংস্কারে ইচ্ছুক এসব রাজনৈতিক শক্তি দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে এক ভয়ংকর ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করেছে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি সাম্যের বাংলাদেশ গড়তে তাদের সবাইকেই জনগণের প্রত্যাশাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকতে হবে। তবে এর জন্য দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক বন্দোবস্ত গড়ে তোলা আবশ্যক। কারণ যেকোনো কার্যকরী সংস্কারের পূর্বশর্ত হচ্ছে, বৃহত্তর রাজনৈতিক বন্দোবস্ত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ ধরনের রাজনৈতিক বন্দোবস্ত করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে প্রথমেই অভ্যন্তরীণ সংস্কার আনা জরুরি। দলের অভ্যন্তরে সংস্কার না করে বৃহত্তর রাজনৈতিক সংস্কার সত্যিই দুরূহ। গণতন্ত্রপ্রিয় সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে অচিরেই সেই কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক বন্দোবস্ত অর্জিত হবে—সমগ্র জাতি অধীর আগ্রহভরে সেই প্রত্যাশায় অপেক্ষা করছে।

লেখক: রাজনীতি গবেষক

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা

চিন্তার স্বাধীনতা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

নৌবিদ্রোহ ও রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

শব্দের রাজনীতি, ক্ষমতার ভয়

নতুন প্রধানমন্ত্রীর শুরুটা কেমন হলো

কূটনীতিক, পণ্ডিত ও বাংলাদেশের বন্ধু

কৃষি পর্যটন : টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত