হোম > মতামত

চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নয়া ফ্রন্ট মধ্য এশিয়া

জয়নব গিজেম ওজপিনা

ফাইল ছবি

রেয়ার আর্থ বা বিরল খনিজ উপাদানগুলো বর্তমানে সারা বিশ্বেই প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন শিল্পের একটি মৌলিক উপাদান হয়ে উঠেছে। সংগত কারণেই অতীব গুরুত্বপূর্ণ এই উপাদানগুলো এখন চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আর এই প্রতিযোগিতায় মধ্য এশিয়ার দেশগুলো হয়ে উঠেছে চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের লড়াইয়ের নয়া ফ্রন্ট। বিরল খনিজ সম্পদ নিয়ে দুই পরাশক্তির এই লড়াই কূটনীতিতেও একটি নতুন যুগের সূচনার ইঙ্গিত দেয়। এর ফলে মধ্য এশিয়া এখন আর শুধু একটি করিডোর হিসেবে নয়, বরং তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রূপান্তরিত হয়েছে। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য হচ্ছে, মধ্য এশিয়ার বিরল খনিজ সম্পদের সাহায্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাববলয় তৈরির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ-শৃঙ্খলে চীনের আধিপত্য ভেঙে ফেলা।

এই লক্ষ্য অর্জনে নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে হোয়াইট হাউসে মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশ নিয়ে একটি শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করে ট্রাম্প প্রশাসন। সি৫+১ নামের এই শীর্ষ সম্মেলন মধ্য এশিয়া নিয়ে মার্কিন কৌশলের নতুন দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দেয়। এই শীর্ষ সম্মেলনকে বিরল ও কৌশলগত খনিজ পদার্থের মাধ্যমে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক পুনর্গঠনে ওয়াশিংটনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভূ-অর্থনৈতিক পদক্ষেপ

হোয়াইট হাউসে আয়োজিত শীর্ষ সম্মেলনটি কেবল একটি কূটনৈতিক উদ্যোগ ছিল না, বরং এটি একটি নতুন কৌশলগত পদক্ষেপের একটি বাস্তব প্রকাশ ছিল, যা ‘বিরল খনিজ উপাদান কূটনীতি’ হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে। শীর্ষ সম্মেলনে স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলো প্রমাণ করে, মধ্য এশিয়ায় মার্কিন আগ্রহ এখন জ্বালানি পাইপলাইনের বাইরেও গভীর কৌশলগত বিরল খনিজ সম্পদভিত্তিক স্তরে চলে এসেছে। কাজাখস্তানের সঙ্গে দেশটির টাংস্টেন খনির অংশীদারিত্ব নিয়ে ১.১ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি এবং উজবেকিস্তানে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-অর্থনৈতিক পদক্ষেপের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপে একটি কৌশলগত লক্ষ্য জড়িত, যা কেবল অর্থনৈতিক লাভ বা বিনিয়োগ কূটনীতি দ্বারা ব্যাখ্যা করা যাবে না। ওয়াশিংটন বিশ্বব্যাপী বিরল খনিজ উপাদানগুলোর সরবরাহ-শৃঙ্খলে চীনের আধিপত্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। কারণ চীন বর্তমানে বিশ্বে বিরল খনিজ উৎপাদনের ৭০ শতাংশ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে।

ট্রাম্প প্রশাসনের ‘গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থের’ তালিকা সম্প্রসারণ করা ইঙ্গিত দেয় যে, এই সম্পদগুলোকে এখন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ এটি যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিশক্তির রূপান্তর, প্রতিরক্ষা শিল্প আধুনিকীকরণ এবং গ্রিন টেকনোলজি বা সবুজ প্রযুক্তিতে নিজেদের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা অর্জন করার লক্ষ্যের ভিত্তি তৈরি করবে।

কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের মতো দেশগুলোয় ইউরেনিয়াম, টাংস্টেন এবং বিরল খনিজ উপাদানের বিশাল মজুত থাকায় এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কেবল চীনের অর্থনৈতিক প্রভাবের ক্ষেত্রকেই হ্রাস করছে না, বরং ইউরেশিয়ান ভূ-রাজনীতিতে একটি ‘নতুন সম্পদকেন্দ্রিক প্রভাবের ক্ষেত্র’ও তৈরি করছে। এই প্রেক্ষাপটে বিরল খনিজ পদার্থগুলো একটি নতুন ‘শক্তির কৌশলগত হাতিয়ার’ হয়ে উঠছে, যা বর্তমান জ্বালানি কূটনীতিকেই বদলে দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য এশিয়া কূটনীতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ‘সবুজ জ্বালানির সরবরাহ-শৃঙ্খলের নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করা। ওয়াশিংটন ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় তার হাত শক্তিশালী করতে চাইছে কৌশলগত খনিজ সম্পদ সুরক্ষিত করে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে মধ্য এশিয়া কেবল একটি খনিজ দ্রব্যসমৃদ্ধ অঞ্চল নয়, যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলকে তার টেকসই জ্বালানি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একটি ‘ভূ-অর্থনৈতিক বীমা অঞ্চল’ হিসেবেও দেখছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশলটি কেবলই বিরল খনিজ ও জ্বালানি সম্পদে প্রবেশের বিষয় নয়। মধ্য এশিয়ায় খনিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলের দেশগুলোর রাজনৈতিক গতিপথ, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং কূটনৈতিক পছন্দগুলোকেও রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। ওয়াশিংটনের ‘সম্পদকেন্দ্রিক প্রভাব বিস্তারের নীতি’ বেইজিংয়ের বহুল আলোচিত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) পাল্টা একটি অর্থনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ট্রাম্প প্রশাসন মধ্য এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি কূটনীতিকে ‘খনির কূটনীতি’তে রূপান্তরিত করছে। এই পদক্ষেপ বিরল খনিজ উপাদানগুলোকে একটি কৌশলগত হাতিয়ারে রূপান্তরিত করছে, যা অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার বাইরেও বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে প্রভাবিত করবে। আগামী দিনে এই পরিস্থিতি মধ্য এশিয়ার ভবিষ্যৎকে আঞ্চলিক সীমার বাইরে নিয়ে গিয়ে বৈশ্বিক ভূ-অর্থনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রে রূপান্তরিত করতে যাচ্ছে।

মধ্য এশিয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ আপাতদৃষ্টিতে অর্থনৈতিক বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটি এই অঞ্চলে গভীর ভূ-কৌশলগত পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। ট্রাম্প প্রশাসন আধিপত্য বিস্তার নয়, ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ রক্ষার ধারণার ওপর ভিত্তি করে এই অঞ্চলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে।

চীনের বিআরআই এবং ইউরেশিয়া অঞ্চলে দেশটির অর্থনৈতিক করিডোরের পাশাপাশি ইউরেশিয়ান অর্থনৈতিক ইউনিয়নের মাধ্যমে রাশিয়ার রাজনৈতিক প্রভাব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশ্বব্যাপী বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসন তার প্রতিটি পদক্ষেপের মাধ্যমে মধ্য এশিয়াকে সম্পদসমৃদ্ধ পশ্চাদ্‌ভূমির পরিবর্তে বৃহৎ জ্বালানি প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে একটি কৌশলগত সংযোগস্থল হিসেবে বেছে নিয়েছে। মধ্য এশিয়ার নেতাদের হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প প্রশাসনের আমন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের সেই প্রচেষ্টারই অংশ।

প্রকৃতপক্ষে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে। এটি ইঙ্গিত দেয়, ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি এখন শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে ‘জ্বালানি স্থাপত্য’ তৈরির দিকে ঝুঁকছে। এই নতুন কৌশলের সবচেয়ে দৃশ্যমান কূটনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে সি৫+১ ফরম্যাট। যুক্তরাষ্ট্র এই প্রক্রিয়াকে কেবল অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখে না, বরং রাশিয়া ও চীনকে বাদ দিয়ে নতুন একটি আঞ্চলিক জোট গড়ে তোলার পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে দেখে।

সুতরাং, মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর কাছে একটি ‘তৃতীয় পন্থা’ প্রস্তাব করা হচ্ছে, যেটি মস্কোর নিরাপত্তাকেন্দ্রিক মডেল বা বেইজিংয়ের ঋণ কূটনীতিভিত্তিক মডেল থেকে আলাদা। ওয়াশিংটন টেকসই উন্নয়ন, ডিজিটাল অবকাঠামো, খনির প্রযুক্তি এবং সবুজ জ্বালানি সহযোগিতার মাধ্যমে এই পদ্ধতিকে সমর্থন করে ‘সফট পাওয়ার’-এর উপাদানগুলোকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করছে।

এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাবর্তনের অর্থ হলো জ্বালানি এবং সরবরাহ রুট পুনর্নির্ধারণ বা নতুন করে সংজ্ঞা নির্ধারণ করা। ক্যাস্পিয়ান সাগরের মধ্য দিয়ে যাওয়া পরিবহন করিডোরগুলোকে শক্তিশালী করার ফলে উত্তরাঞ্চলের রুটে রাশিয়ার একচেটিয়া কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত হবে মধ্য এশিয়া। একই সঙ্গে মধ্যাঞ্চলের করিডোরে সীমিত হবে চীনের প্রভাবও।

এসব বিষয় মাথায় রেখেই ওয়াশিংটন দক্ষিণ ককেশাস এবং ক্যাস্পিয়ান সাগরজুড়ে বিস্তৃত ট্রান্স-ক্যাস্পিয়ান রুটকে একটি কৌশলগত ‘পশ্চিমা সংযোগ’ হিসেবে সমর্থন করে। এভাবেই যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ারে পরিণত করছে। রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপগুলোকে মধ্য এশিয়ায় তার প্রভাববলয়ের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। অন্যদিকে চীন মধ্য এশিয়ায় খনি এবং অবকাঠামো প্রকল্পে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা নিয়ে উদ্বিগ্ন।

সাম্প্রতিক ঘটনাবলি কেবল মধ্য এশিয়ায় বৃহৎ শক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতাকেই তীব্র করেনি, বরং আঞ্চলিক বহুপাক্ষিকতা বৃদ্ধির দিকেও নিয়ে যাচ্ছে। মধ্য এশিয়ার দেশগুলো এখন একক কোনো পরাশক্তির ওপর নির্ভরশীল না হয়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তি এবং তুরস্কের মতো শক্তিশালী দেশের সঙ্গে সমান্তরাল সম্পর্ক বজায় রেখে তাদের কূটনৈতিক স্বায়ত্তশাসন সম্প্রসারিত করছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি এই অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। তবে একইসঙ্গে এটি বহুমেরু সহযোগিতার যুগের দ্বারও খুলে দিতে পারে।

পরিশেষে এ কথা বলা যায়, মধ্য এশিয়ায় মার্কিন পদক্ষেপকে ইউরেশিয়া অঞ্চলে একটি নতুন শক্তি কাঠামো গড়ে তোলার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে এই প্রচেষ্টা সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র তার অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতিগুলোকে কতটা টেকসই বিনিয়োগে পরিণত করতে পারে তার ওপর। একইসঙ্গে এই অঞ্চলের দেশগুলো এই ভারসাম্যমূলক পরিস্থিতিতে কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে, তার ওপরও অনেক কিছুই নির্ভর করবে।

ডেইলি সাবাহ থেকে ভাষান্তর : মোতালেব জামালী

কপ-৩০ সম্মেলন প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

বন্দর ব্যবস্থাপনা : ভারতের বয়ানে সমালোচনা

জুলাই বিপ্লবের উচ্ছ্বাস ও সামনের কঠিন বাস্তবতা

স্বাস্থ্য খাত সংস্কারে কিছু প্রস্তাব

চক্রের ফাঁদে পড়েছে চীন আর ভারত

আসল বাউল নকল বাউল

অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা শঙ্কা

মার্কিন রাজনীতিতে ইহুদি লবির প্রভাব

ভারত কেন শেখ হাসিনাকে রাখতে চায়?

বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু?