ট্রোজান যুদ্ধের কাহিনিতে গ্রিকরা ১০ বছরেও ট্রয়ের দুর্গ ভেদ করতে পারেনি। শেষে তারা এক অভিনব কৌশল নেয়—এক বিশাল কাঠের ঘোড়া তৈরি করে সেটিকে উপহার হিসেবে রেখে যায়। ট্রোজানরা ভেবেছিল এটি বিজয়ের প্রতীক, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ঘোড়ার ভেতরে লুকিয়ে ছিল গ্রিক সেনারা। রাতের আঁধারে তারা ঘোড়া থেকে বের হয়ে শহরের দরজা খুলে দেয় এবং ট্রয়নগর ধ্বংস হয়। এ ঘটনা শুধু যুদ্ধজয়ের প্রতীক নয়, বরং গোপনীয়তা, কৌশল ও আড়ালের রাজনীতির সবচেয়ে বিখ্যাত দৃষ্টান্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যাকিয়াভেলি শিবির নেতৃত্বের পরিচয় গোপন রাখার ঘটনা অনেকটা এই ট্রোজান হর্সের মতোই। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিপক্ষ যখন ভেবেছে যে শিবিরের নেতৃত্ব কার্যত অনুপস্থিত বা দুর্বল, আদতে তখন প্রকৃত শক্তি আড়ালে থেকে সংগঠন চালিয়েছে। একদিকে এটি নিখুঁত কৌশল—কারণ দৃশ্যমান না থাকলেও কাঠামো টিকে গেছে এবং প্রতিপক্ষ বিভ্রান্ত হয়েছে।
অন্যদিকে, ট্রোজান হর্স যেমন ট্রয়নগরের জন্য এক ধরনের অভিশাপে পরিণত হয়েছিল, তেমনি অতিরিক্ত গোপনীয়তা শিবিরের জন্যও আস্থা-সংকট তৈরি করতে পারে, তাই যথাসময়ে সামনে এসেছে এবং উপস্থিতির জানান দিতে সক্ষম হয়েছে। আওয়ামরা যদি মনে করে নেতৃত্ব শুধু ছদ্মবেশে থাকে, তবে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের মাওকাটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই গল্প তাই শিক্ষা দেয়—কৌশলগত গোপনীয়তা কখনো কখনো শক্তি হিসেবে কাজ করে। যেমন : শিবিরের জন্য এটি প্রতিপক্ষের ব্যর্থতার ওপর এক ধরনের বিজয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিবির নেতৃত্বের পরিচয় ফাঁস এবং এর রাজনৈতিক অভিঘাতকে বোঝার জন্য বিষয়টিকে শুধু ঘটনামূলক নয়, বরং রাজনৈতিক দর্শন ও সংগঠনতত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করতে হয়। কারণ এখানে তিনটি স্তর একসঙ্গে জড়িয়ে আছে—গোপন সংগঠন রূপায়ণ, প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনের দুর্বলতা এবং সাধারণ কর্মীদের নীরবতার কৌশল। শিবির নেতাদের পরিচয় দীর্ঘদিন আড়ালে রাখা সম্ভব হওয়া নিছক কাকতালীয় নয়; বরং এটি আধুনিক রাজনৈতিক তত্ত্বের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্তের সঙ্গে মিল খুঁজে পায়। ম্যাকিয়াভেলির The Prince-এ যে স্ট্র্যাটেজিক্যাল রাজনীতির আলোচনা আছে, তার একটি রূপ আমরা শিবিরের গোপন কর্মকাণ্ডে দেখি। ম্যাকিয়াভেলি বলেছিলেন—ক্ষমতার লড়াইয়ে সফল হতে গেলে সরাসরি প্রকাশ নয়, বরং কৌশল, প্রতারণা ও সময়োপযোগী ছদ্মবেশকে কাজে লাগাতে হয়। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষাপটে শিবির নেতৃত্ব যেভাবে বছরের পর বছর অদৃশ্য থেকেও কার্যক্রম চালিয়েছে, তা আসলে ম্যাকিয়াভেলি বাস্তববাদী রাজনীতিরই একটি প্রতিফলন। সমালোচনার জায়গা হলো—এমন কৌশল জন-আস্থার সংকটও তৈরি করতে পারে, কারণ দীর্ঘদিন গোপন থাকা মানেই রাজনৈতিক জবাবদিহির ঘাটতি। তাছাড়া, মিশেল ফুকোর Power/Knowledge ধারণা এখানে সরাসরি প্রযোজ্য। ফুকো দেখিয়েছেন—ক্ষমতা শুধু দমনমূলক নয়, বরং জ্ঞানের উৎপাদনের ভেতর দিয়েই তা ছড়িয়ে পড়ে। শিবিরের গোপন রাজনীতি আসলে জ্ঞানের ওপর নিয়ন্ত্রণের কৌশল : সভাপতি-সেক্রেটারিসহ নেতাদের পরিচয় গোপন রেখে তারা শত্রু ও প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠন থেকে তথ্য-ক্ষমতা আড়াল করেছে। একই সঙ্গে কর্মীদের নীরবতা ছিল এক ধরনের জ্ঞানের আত্মসংযম, যা ক্ষমতার সম্পর্ককে দীর্ঘায়িত করেছে। তবে ক্রিটিক্যালি বলা যায়—ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো যেভাবে ক্ষমতা-জ্ঞান সম্পর্ককে অনন্ত ছলচাতুরীর খেলা হিসেবে দেখেছেন, তাতে প্রশ্ন আসে : জনগণ বা সাধারণ শিক্ষার্থীর কাছে এই ‘গোপন জ্ঞান’ কতটা গণতান্ত্রিক বা অন্তর্ভুক্তিমূলক? অধিকন্তু, মার্কসবাদী লেখক আন্তোনিও গ্রামশির Cultural Hegemony ধারণা দিয়েও বিষয়টি পড়া যায়। গ্রামশি বলেছিলেন, যে দল সাংস্কৃতিকভাবে ন্যারেটিভ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সেই দল টিকে থাকে। শিবিরকর্মীদের নীরব সম্মতি ও নেতৃত্ব আড়াল করার কৌশল আসলে এক ধরনের সাংস্কৃতিক হেজেমনি তৈরি করেছে—যেখানে নেতৃত্ব প্রকাশ না পেলেও কর্মীরা অভ্যন্তরীণ আনুগত্যে অটল থেকেছে। তবে বলা যায়, গ্রামশি যেমন : counter-hegemony-এর কথাও বলেছিলেন, তেমনি প্রশ্ন থাকে—এই নীরব সংস্কৃতি কি গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার স্বাভাবিক প্রবাহকে ব্যাহত করছে না? আর দার্শনিক হান্না আরেন্ট তার The Human Condition-এ বলেছিলেন—রাজনীতির প্রাণ হলো ‘public realm’ বা প্রকাশ্য ক্ষেত্র। যেখানে পরিচয় ও বক্তব্য দৃশ্যমান হয়, সেখানেই প্রকৃত রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ঘটে। শিবিরের গোপন নেতৃত্ব তাই আরেন্টীয় অর্থে ‘অ-পলিটিক্যাল’—কারণ তারা প্রকাশ্যে না এসে আড়ালে থেকেছে। তাদের কৌশল বাস্তববাদী হলেও, আরেন্টের মতে এটি রাজনৈতিক স্পেসকে সংকুচিত করে এবং প্রকাশ্য জবাবদিহিকে খর্ব করে। তবে সমর্থকদের দৃষ্টিতে এটি ছিল কৌশলগত নীরবতা—এক ধরনের অস্তিত্ব রক্ষা। কার্ল মার্কসের শ্রেণি-সংগ্রামের তত্ত্বের আলোকে শিবিরকর্মীদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ত্যাগ আসলে রাজনৈতিক আদর্শকে শ্রেণিসচেতনতার মতো করে ধারণ করা। মার্কস বলেছিলেন, বিপ্লবী শ্রেণি নিজেদের স্বার্থকে সমষ্টির স্বার্থ হিসেবে উপলব্ধি করে। শিবিরকর্মীরা সভাপতির পরিচয় জানলেও নীরব থেকেছে কারণ তারা নিজেদের ব্যক্তিগত কৌতূহলকে সংগঠনের বৃহত্তর স্বার্থের কাছে উৎসর্গ করেছে। তবে সমালোচনায় বলা যায়—মার্কসের পরিপ্রেক্ষিতে এমন আচরণ যদি ‘বিপ্লবী স্বার্থ’ না হয়ে শুধু দলীয় স্বার্থে সীমিত থাকে, তবে তা মুক্তিকামী নয় বরং নতুন ধরনের দমননীতির জন্ম দিতে পারে।
মোটাদাগে, গোপন রাজনীতির কিছু পজিটিভ দিকও আছে, ম্যাকিয়াভেলি গোপনে সংগঠন গড়ে তোলা কখনো কখনো সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার জন্য কাজে আসে, কিছু আন্দোলন গোপনে শুরু হয়ে পরে বৃহৎ রূপ নিয়েছে এবং সমাজের জন্য ইতিবাচক নতিজা বয়ে এনেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে যুদ্ধের সময়, গোপন রাজনীতি বা গোপন সংগঠনের মাধ্যমে সফলতা অর্জন করা হয়েছে।
যেমন : ফ্রান্সের রেজিস্ট্যান্স দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একটি চমৎকার উদাহরণ হতে পারে। ফ্রান্স যখন নাৎসি জার্মানির দখলে ছিল, তখন ফ্রান্সে বিভিন্ন গোপন প্রতিরোধ গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। এই গোষ্ঠীগুলো গোপনে মিটিং করত, গোপন বার্তা আদান-প্রদান করত এবং নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে অসংখ্য গুপ্ত আক্রমণ পরিচালনা করত।
এই প্রতিরোধ সংগ্রাম অনেকবারই অত্যন্ত খাতারনাক ছিল। তারা নাৎসিদের কাছ থেকে ধোঁকা দিয়ে তথ্য সংগ্রহ করত, গোপনভাবে অস্ত্র সরবরাহ করত এবং জার্মান বাহিনীর চলাচলের পথে বাধা সৃষ্টি করত। পরে, এই গোপন প্রতিরোধ আন্দোলন ফ্রান্সকে মুক্ত করতে সাহায্য করে এবং এটি ফ্রান্সের জনগণের মধ্যে স্বাধীনতার স্পৃহা জাগিয়ে তোলে। আর পোল্যান্ডের সলিডারিটি আন্দোলন ১৯৮০-এর দশকে পোল্যান্ডে গোপনভাবে ছাত্র ও শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলে। তাদের নেতৃত্ব দেন লেজ ভেলেসা এবং এটি পরে পোল্যান্ডের কমিউনিস্ট শাসনের পতন ঘটায়। একইভাবে বুরকিনা ফাসোর ছাত্র আন্দোলন ২০১৪ সালে বুরকিনা ফাসোতে গোপনে প্রতিবাদ করে, যা পরে প্রেসিডেন্ট ব্লাইজ কম্পাওরেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে।
অন্যদিকে, কিউবার বিপ্লবের কথা বললে, ফিদেল ক্যাস্ত্রো, চে গুয়েভারা এবং তাদের অনুসারীরা গোপনে দীর্ঘদিন সংগঠন গড়ে তোলার পর ১৯৫৯ সালে সফল বিপ্লব ঘটান। এমনকি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন, যেখানে গোপনভাবে বিভিন্ন সংগঠন ও বিপ্লবী গোষ্ঠী, যেমন সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে ভারতীয় আজাদি ফউজ (অরবিন্দ ঘোষের নেতৃত্বে) গোপনে কাজ করেছিল। এ ধরনের গোপন আন্দোলনের পেছনে এমন অনেক কাহিনি আছে, যেখানে সংগঠনগুলো কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখে, সঠিক কৌশল অবলম্বন করে, তাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিল।
যাই হোক, শিবিরের রাজনীতি নিয়ে ভাবলে দুরকম মিশ্র প্রতিচ্ছবি হাতে পাওয়া যায় : একদিকে দেখা যায় অনুগঠিত শৃঙ্খলা, কর্মীসম-নিবেদন আর দীর্ঘস্থায়ী পারস্পরিক আস্থায় গড়া একটি শক্তি, যা কম সময়ে ভালোভাবে সংগঠিত হয়ে ছাত্রমাঠে ধার তৈরি করতে সক্ষম; অন্যদিকে ঠিক সেই শক্তিই যদি আড়ালভিত্তিক, একগুঁয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাইনারি চিন্তাভাবনায় বদলে যায়, তা শুধু ক্যাম্পাসকে নয় পুরো রাজনৈতিক পরিবেশকেই বিষাক্ত করে দেয়। সমস্যা শুরু হয় যখন গোপনীয়তা ও গ্যাং-স্টাইলের শৃঙ্খলা গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিস্থাপন করে : নেতৃত্বের পরিচয় যাতে পরিমিতি ছাড়িয়ে ‘গোপনীয় বিজয়’-এর মাধ্যম হয়, তখন ছাত্ররাজনীতির মূল উদ্দেশ্য—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক দাবি, বৈচিত্র্যের সংলাপ ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন—অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এভাবে গোপন-রাজনীতি বজায় রাখার কৌশল রাষ্ট্রীয় দমনকে আহ্বান করে, সাধারণ শিক্ষার্থীকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয় এবং বিরোধী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষকে স্বাভাবিক করে তোলে। এ ছাড়া রাজনৈতিক-আইডিওলজিক্যাল একীকরণ যদি ছাত্রদের সামাজিক প্রশ্ন (বেতন, শিক্ষা সুবিধা ও ছাত্রসেবা) থেকে বিচ্যুত করে শুধু সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় বা পার্টিবিষয়ক এজেন্ডায় আবদ্ধ রাখে, তা তরুণদের সমসাময়িক উদ্বেগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে—এবং দীর্ঘ মেয়াদে তাদের সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা হ্রাস পায়। শিবির যদি প্রকটভাবে তাদের কর্মীদের শুধু আনুগত্যে প্রস্তুত করে, তাতে চিন্তার স্বাধীনতা, বিতর্ক ও আত্মসমালোচনার চর্চা নষ্ট হয়; এমন পরিবেশে ভুলকথা ও অপকৌশলও দ্রুত প্রবল হয়। ছাত্র সংগঠন হিসেবে প্রত্যেক সদস্যের নিরাপত্তা, আইনি সুরক্ষা ও শিক্ষাগত স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব আছে—কিন্তু গোপনীয় অপকর্ম বা সহিংসতা যখন ঘটে, তখন সংগঠনকে প্রথমেই দায় স্বীকার করে নজির সৃষ্টি করতে হবে, লুকোচুরি নয়। কৌশলগতভাবে বললে, প্রকাশ্যভাবে নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া খুলে দিয়ে শিবির দীর্ঘ মেয়াদে আরো গ্রহণযোগ্য হয়েছে—কারণ স্বচ্ছতা গণতান্ত্রিক বৈধতা আনে; অন্যথায় রাষ্ট্রীয় পিটিশন বা সমাজগত প্রতিক্রিয়া তাদের আন্দোলন ক্ষুণ্ণ করতে পারে। তদুপরি, ছাত্ররাজনীতির যে সামাজিক-ব্যবহারিক যোগ্যতাগুলো (নাগরিকতা, যুক্তিতর্ক, সুশাসন-চর্চা) শিক্ষার্থীদের মধ্যে গড়ে ওঠে, সেগুলো শিবিরের হাইয়ারারকিক্যাল কাঠামোতে প্ররোচিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি এবং আগামী প্রজন্মের রাজনৈতিক নয়া সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে।
তবে শিবিরের রাজনীতিকে বিশ্লেষণ করলে একটি ধ্রুব সত্য ধরা পড়ে। একদিকে তারা বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে অনন্য সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং নিবেদনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। যেখানে ছাত্রলীগ বা ছাত্রদল প্রায়ই ক্ষমতার ছত্রছায়ায় ভোগবাদী, সুবিধাবাদী এবং অরাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে, সেখানে শিবিরের কর্মীরা আদর্শ, নিয়মশৃঙ্খলা ও কঠোর সাংগঠনিক কাঠামোকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে। এর ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত ও প্রতিপক্ষবিরোধী ক্যাম্পাসেও তারা বহুদিন নেতৃত্ব আড়াল করে রাখতে পেরেছে। এ ঘটনা বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে তাদের সাংগঠনিক শক্তি ও আদর্শভিত্তিক রাজনীতির এক ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তারা আদর্শের প্রতি দৃঢ় থেকে নিজেদের কর্মীদের এমনভাবে একীভূত করেছে যে সামান্যতম ভাঙন তৈরি হয়নি।
বাংলাদেশি প্রেক্ষাপটে বললে—শিবিরের রাজনীতি প্রমাণ করে যে আদর্শিক শৃঙ্খলা ও কর্মীদের আত্মনিবেদন থাকলে যেকোনো প্রতিকূল অবস্থায়ও সংগঠন টিকে থাকতে পারে। এটি ছাত্ররাজনীতির জন্য একটি শিক্ষণীয় বিষয়। বিএনপি, ছাত্রদল বা এমনকি বামপন্থি সংগঠনগুলোও যদি শিবিরের মতো শৃঙ্খলা, কৌশলগত ধৈর্য এবং কর্মী নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারত, তবে বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির মান অনেক উচ্চপর্যায়ে পৌঁছাতে পারত।
অবশেষে, শিবিরের নৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যালান্স ঠিক রেখে যেভাবে তারা কাঠামোগত শক্তি বজায় রাখে, তাতে যদি স্বচ্ছতা, আইনি সচেতনতা ও নিরপেক্ষ শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসূচি যুক্ত করা হয়, তখনই তারা ছাত্ররাজনীতির জন্য সত্যিকারের ইতিবাচক শক্তিতে পরিণত হবে—অর্থাৎ শুধু সংগঠন নয়, একটি গণতান্ত্রিক, দায়িত্বশীল ও সমাজ সংহত প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। পুরো প্রেক্ষাপটকে আধুনিক গণতান্ত্রিক তত্ত্ব দিয়ে বিচার করলে শিবিরের এ গোপন রাজনীতি একদিকে কৌশলগত সফলতা—কারণ প্রতিপক্ষ ছাত্রলীগ সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে, অন্যদিকে এটি গণতান্ত্রিক আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক—কারণ নেতৃত্বের পরিচয় গোপন রাখার মানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থেকে সরে যাওয়া। এখানে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়—কৌশল বনাম নৈতিকতা, অস্তিত্ব রক্ষা বনাম গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা।
লেখক : সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক, ফ্রাই ইউনিভার্সিটি বার্লিন, জার্মানি
যোগাযোগ : sahidkamrul25@gmail.com