হোম > মতামত

জুলাই ম্যাসাকার : জেনোসাইড নাকি মানবতাবিরোধী অপরাধ

তাহছিনা জামান

জেনোসাইড (গণহত্যা) ও মানবতাবিরোধী অপরাধ উভয়ই আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের আওতাধীন অপরাধ এবং বিশেষভাবে রোম চুক্তির অধীনে স্বীকৃত অপরাধ। এই দুটি অপরাধ দেখলে আপাতদৃষ্টিতে একই রকম মনে হতে পারে। জেনোসাইড ও মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রায়ই তাদের উপাদানগুলোর কারণে বিভ্রান্তিকর হয়। তবে আন্তর্জাতিক আইন যথাযথ সংজ্ঞা প্রদান করে, যাতে এই দুটি অপরাধের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করা যায়। আইনগত ব্যাখ্যাগুলোর বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই দুটি অপরাধের সংজ্ঞাগুলো পরিবর্তিত হয়েছে এবং এখন এগুলোর আলাদা আলাদা আইনি শর্তাদি রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার ওপর ঘটে যাওয়া নৃশংস হত্যার ঘটনাকে মোটাদাগে গণহত্যা বা জেনোসাইড বলা হচ্ছে। দেখা যাক, রোম চুক্তির অধীনে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের এই হত্যাযজ্ঞকে কোন অপরাধে সংজ্ঞায়িত করা যায়।

পোলিশ আইনজীবী রাফায়েল লেমকিন ১৯৪৪ সালে প্রথমবার ‘জেনোসাইড’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি চেয়েছিলেন, এই শব্দটি নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে জার্মান নাৎসিদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হোক। নুরেমবার্গ ট্রাইবুন্যালে ব্যবহার করা না হলেও লেমকিনের অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলে জেনোসাইড একটি স্বতন্ত্র আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। জেনোসাইড প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে সংজ্ঞায়িত হয় জেনোসাইড কনভেনশনে। এর ২নং অনুচ্ছেদে জেনোসাইডের মানক সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। এতে জেনোসাইডকে নিম্নলিখিত কার্যক্রমের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে—‘একটি গোষ্ঠীর সদস্যদের হত্যা করা, অথবা একটি গোষ্ঠীর সদস্যদের গুরুতর শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি করা, অথবা একটি গোষ্ঠীকে শারীরিকভাবে ধ্বংস করার মতো জীবনযাত্রার পরিস্থিতি পরিকল্পিতভাবে সৃষ্টি করা, অথবা একটি গোষ্ঠীর মধ্যে জন্মহার রোধ করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা, অথবা একটি গোষ্ঠীর শিশুদের জোরপূর্বক অন্য গোষ্ঠীতে স্থানান্তর করা।’

উল্লেখিত কার্যক্রমগুলোর লক্ষ্য অবশ্যই একটি জাতিগত (national), নৃতাত্ত্বিক (ethnical), বর্ণগত (racial) বা ধর্মীয় (religious) গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হতে হবে এবং তা ওই গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত হতে হবে। অতএব জেনোসাইড প্রমাণের জন্য দুটি মূল উপাদান অপরিহার্য—অপরাধটি অবশ্যই সুরক্ষিত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত হতে হবে এবং অপরাধীদের ওই গোষ্ঠীকে ধ্বংস করার সুস্পষ্ট অভিপ্রায় থাকতে হবে।

১৯৯৮ সালে রোম চুক্তিও একই সংজ্ঞা গ্রহণ করে। এর ৬নং অনুচ্ছেদে জেনোসাইডকে একটি মূল অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ একটি আইনি ধারণা হিসেবে প্রথম উল্লেখযোগ্যভাবে উঠে আসে ১৯১৫ সালে, যখন ফ্রান্স, গ্রেট ব্রিটেন ও রাশিয়া যৌথভাবে এক ঘোষণার মাধ্যমে এ শব্দটি ব্যবহার করে। পরে ১৯৪৫ সালে নুরেমবার্গ সনদের প্রণেতারা মানবতাবিরোধী অপরাধকে একটি স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন। রোম সংবিধির ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ বিশদভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এটি সংবিধির একটি মূল অপরাধ, যেখানে ১১ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের মৌলিক উপাদানগুলো হলো—ব্যাপক বা পদ্ধতিগত আক্রমণ (Widespread or Systematic Attack), বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক আক্রমণ (Targeting Civilian People) এবং অপরাধীর এই আক্রমণের ব্যাপারে জ্ঞাত থাকা (Knowledge of the Attack)। স্বতন্ত্র এই অপরাধের আওতায় বিভিন্ন ধরনের গুরুতর অপরাধ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে হত্যা, নির্মূলকরণ, দাসত্ব, বলপ্রয়োগে স্থানান্তর, কারাদণ্ড, ধর্ষণ, যৌন দাসত্ব ও অন্যান্য যৌন সহিংসতা, নিপীড়ন, জোরপূর্বক গুম ও বর্ণবৈষম্য।

অনুচ্ছেদ ৭ অনুযায়ী, ‘অন্যান্য অমানবিক কার্যক্রম, যা ইচ্ছাকৃতভাবে গুরুতর ভোগান্তি বা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুতর ক্ষতির কারণ হয়’—এ ধরনের অপরাধগুলোকেও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই বিধানের ফলে নতুন বা আগে স্বীকৃত না হওয়া ব্যাপক ও পদ্ধতিগত সহিংসতাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। এটি আইনি ফাঁকফোকর রোধ করে, যাতে অপরাধীরা বিচারের হাত থেকে রেহাই না পায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই নিষিদ্ধ অপরাধের তালিকা বিকশিত হয়েছে এবং পরিবর্তিত আইনি ও মানবাধিকার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে।

জেনোসাইড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো মানসিক উপাদান, যা গণহত্যাকে অন্য অপরাধগুলোর থেকে আলাদা করে। গণহত্যা সংঘটিত হতে হলে অপরাধীর অবশ্যই উদ্দেশ্য থাকতে হবে বিশেষ কোনো জাতি, নৃগোষ্ঠী, ধর্ম বা বর্ণের গোষ্ঠীকে ধ্বংস করা। অপরদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো গোষ্ঠীকে ধ্বংসের উদ্দেশ্য থাকে না অপরাধীর। মানবতাবিরোধী অপরাধ হবে যেকোনো বেসামরিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে এবং এক্ষেত্রে সেটি ব্যাপক বা পদ্ধতিগত আক্রমণ হবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার ওপর ঘটে যাওয়া নৃশংস হত্যাকাণ্ডটি জেনোসাইড নয়, বরং মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হবে। গণহত্যা হতে হলে অপরাধীর উদ্দেশ্য হতে হবে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে ধ্বংস করা, যেমন জাতি, বর্ণ, নৃগোষ্ঠী বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে লক্ষ করে আক্রমণ করা। কিন্তু জুলাই-আগস্টে যে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটেছে, তা ছিল সব ধর্ম, বর্ণ, পেশা ও বয়সের মানুষের বিরুদ্ধে, যেমন আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধ, হৃদয় তরুয়া, রুদ্র সেন, ছাত্র, রিকশাওয়ালা, সাংবাদিক, নারী ও শিশু—সবাই এর শিকার হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডগুলো ছিল ব্যাপক ও পদ্ধতিগত; দেশজুড়ে আক্রমণ চালানো হয়েছে, যেমন রংপুর থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম থেকে সিলেট পর্যন্ত। পদ্ধতির মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ ছিল গুলিতে হত্যা এবং কিছু ক্ষেত্রে জীবিত অথবা মৃত ব্যক্তিকে পুড়িয়ে দেওয়া। এভাবে হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে ধ্বংস করা ছিল না, বরং এটি ছিল বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত আক্রমণ, যা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

সাধারণত মানুষ মনে করে থাকে, অনেক মানুষকে হত্যা করা হলেই সেটি জেনোসাইড বা গণহত্যা হবে। কিন্তু এই ধারণা সঠিক নয়। আবার মানুষ এটিও মনে করে থাকে, মানবতাবিরোধী অপরাধের চেয়ে জেনোসাইড গুরুতর অপরাধ। প্রকৃতপক্ষে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিস্তৃতিই জেনোসাইডের চেয়ে বেশি। এজন্য সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সংবাদমাধ্যম এবং সমাজে সুপরিচিত মানুষেরাও জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডকে গণহত্যা বলে অভিহিত করে থাকে। অপরাধ প্রমাণ ও শাস্তি দেওয়ার জন্য কোন অপরাধটি ঘটেছে, তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধের গুরুত্ব ও ধরনের ওপর ভিত্তি করে শাস্তি ভিন্ন হতে পারে। যদি ভুল অপরাধ নির্ধারণ করা হয়, তবে এর ফলে আইনি জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে, এমনকি ন্যায়বিচারও ব্যাহত হতে পারে।

শিক্ষার্থী (স্নাতকোত্তর), আইন বিভাগ

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা

চিন্তার স্বাধীনতা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

নৌবিদ্রোহ ও রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

শব্দের রাজনীতি, ক্ষমতার ভয়

নতুন প্রধানমন্ত্রীর শুরুটা কেমন হলো

কূটনীতিক, পণ্ডিত ও বাংলাদেশের বন্ধু

কৃষি পর্যটন : টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত