বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার সংকটময় সময়ে কিছু প্রতিষ্ঠান বারবার ইতিহাসের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। বাংলাদেশ বেতার তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান, যা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় পর্যন্ত জাতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগমাধ্যম ও প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে ভূমিকা রেখে চলেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তন, সামাজিক অস্থিরতা কিংবা রাষ্ট্রিক রূপান্তরের সময়ে বাংলাদেশ বেতারের ভূমিকা তাই নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। স্বাধীনতাযুদ্ধের রক্তাক্ত দিনগুলোয় যেমন এই বেতার কেন্দ্র ছিল মুক্তিকামী মানুষের প্রেরণার উৎস, তেমনি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অস্থির ও রূপান্তরমুখী সময়েও এটি একটি দায়িত্বশীল, স্থিতিশীল এবং বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যম হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ মহান বিজয় দিবসে বাংলাদেশ বেতার ৮৫ বছর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করবে। ১৯৩৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডে বাংলাদেশ বেতার সম্প্রচার শুরু করে।
স্বাধীনতাযুদ্ধে বাংলাদেশ বেতার : প্রচারমাধ্যম থেকে প্রতিরোধ কেন্দ্র
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সামরিক শাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন গণমাধ্যমগুলো ছিল দমনমূলক ও বিভ্রান্তিকর প্রচারের হাতিয়ার। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধের কণ্ঠস্বর হিসেবে। এটি ছিল শুধু একটি সম্প্রচার কেন্দ্র নয়; বরং এটি পরিণত হয় একটি আদর্শিক ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের প্রধান মাধ্যম হিসেবে।
চট্টগ্রামের কালুরঘাট থেকে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা এই বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধসংবাদ, শহীদদের আত্মত্যাগের গল্প এবং বিজয়ের প্রত্যয় জনগণের মনে সাহস ও আস্থা সঞ্চার করে। গ্রাম-বাংলার সাধারণ মানুষের জন্য, যাদের কাছে সংবাদপত্র বা অন্যান্য যোগাযোগের মাধ্যম পৌঁছানো সম্ভব ছিল না, বেতারই ছিল একমাত্র জানালাÑযেখান দিয়ে তারা স্বাধীনতার আলো দেখতে পেয়েছে।
সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ ও জাতীয় ঐক্য
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। দেশাত্মবোধক গান, কবিতা, নাটক ও কথিকা মুক্তিযুদ্ধকে শুধু সামরিক সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি সর্বজনীন জাতীয় আন্দোলনে রূপ দেয়। বিভিন্ন দেশাত্মবোধক গান ও স্লোগান মুক্তিযোদ্ধা এবং সাধারণ মানুষের মনোবল বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে।
এই সাংস্কৃতিক প্রচার পাকিস্তানি বাহিনীর অপপ্রচার ও ভীতি প্রদর্শনের বিপরীতে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ফলে বাংলাদেশ বেতার মুক্তিযুদ্ধের সময় জাতীয় ঐক্য গঠনে এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ভিত্তি নির্মাণে অনন্য ভূমিকা রাখে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বেতার ও জাতি গঠনের প্রক্রিয়া
স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশ বেতার রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে কাজ করে। সংবিধান, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো মৌলিক ধারণাগুলো জনগণের কাছে তুলে ধরতে বেতার একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে ওঠে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও সামাজিক উন্নয়নমূলক অনুষ্ঠান প্রচারের মাধ্যমে এটি জাতীয় উন্নয়ন কার্যক্রমে অবদান রাখে।
যদিও বিভিন্ন রাজনৈতিক সময় পর্বে বাংলাদেশ বেতারের স্বাধীনতা ও ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তবু সংকটকালে এটি বারবার একটি স্থিতিশীল এবং দায়িত্বশীল কণ্ঠস্বর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে—যার সর্বশেষ উদাহরণ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান : নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। রাষ্ট্রক্ষমতা, নাগরিক অধিকার, শাসনব্যবস্থা ও গণতন্ত্র নিয়ে নতুন করে জাতীয় আলোচনা শুরু হয়। এ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক গুজব, ভুয়া সংবাদ ও উসকানিমূলক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে।
এই অস্থির বাস্তবতায় বাংলাদেশ বেতার একটি যাচাইকৃত, দায়িত্বশীল ও তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ তথ্যসূত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তার পরিবর্তে সত্যতা ও রাষ্ট্রিক দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দিয়ে বেতার জনগণের কাছে পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করে।
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ বেতারের ভূমিকা
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ বেতার সংবিধানসম্মত ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাষ্ট্র সংস্কার উদ্যোগ সম্পর্কে জনগণকে নিয়মিত এবং যাচাইকৃত তথ্য সরবরাহ করে। এতে একদিকে জনগণের মধ্যে আতঙ্ক কমে, অন্যদিকে রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি ন্যূনতম আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়।
বিশেষ করে নাগরিক অধিকার, গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও অন্তর্বর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান সম্প্রচারের মাধ্যমে বাংলাদেশ বেতার একটি গণমুখী সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করে। বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, শিক্ষক, সাংবাদিক ও নাগরিক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে এসব আলোচনা জাতীয় সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশ বেতার
২০২৪ সালের অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুতগতিতে ভুল তথ্য ও উসকানিমূলক কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ বেতার একটি বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প তথ্যসূত্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার যোগাযোগ সেতু হিসেবে বেতার গুজব ও আতঙ্ক প্রশমনে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
বিশেষত গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য, যাদের ইন্টারনেট সুবিধা সীমিত, বাংলাদেশ বেতার এখনো একটি কার্যকর গণমাধ্যম। এই জনগোষ্ঠীর কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বেতারের ভূমিকা গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা ও গণমাধ্যমের দায়িত্ব
স্বাধীনতাযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত বাংলাদেশ বেতারের ভূমিকার মধ্যে একটি স্পষ্ট ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়। সংকটকালে উসকানি নয়, বরং সংলাপ; বিভ্রান্তি নয়, বরং সত্য; আতঙ্ক নয়, বরং স্থিতিশীলতা—এই নীতিই বাংলাদেশ বেতারের মূল শক্তি।
বাণিজ্যিক গণমাধ্যমের প্রতিযোগিতামূলক বাস্তবতায় যেখানে অনেক সময় সংবেদনশীলতা ও দায়িত্বশীলতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, সেখানে বাংলাদেশ বেতার রাষ্ট্রের গণমুখী চরিত্র ধারণ করে নাগরিকদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করতে সচেষ্ট থাকে।
বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ বেতার নিজেকে প্রমাণ করেছে একটি দায়িত্বশীল ও দেশপ্রেমিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধে এটি ছিল স্বাধীনতার সংগ্রামের কণ্ঠস্বর আর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এটি হয়ে ওঠে সত্য, সংলাপ ও স্থিতিশীলতার আশ্রয়স্থল।
এই দীর্ঘ ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা বাংলাদেশ বেতারকে শুধু একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচার মাধ্যম নয়, বরং জাতীয় ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে—যার কণ্ঠে প্রতিফলিত হয়েছে জনগণের সংগ্রাম, আশা এবং একটি গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের প্রত্যাশা।
লেখক : অতিরিক্ত মহাপরিচালক (বার্তা) (দৈঃ দাঃ), বাংলাদেশ বেতার