এক শিশুর জন্ম ও সুরের বীজ
শরতের আকাশে সাদা মেঘেরা খেলা করছে-এমন একদিনে জন্ম নিল যে কন্যাশিশু, তার কণ্ঠ একদিন মাতিয়ে তুলবে পুরো জাতিকে। চার কন্যার পর আরেক কন্যা জন্মে পরিবারে কারো অভিমান ছিল কি না, জানা নেই। তবে বড় বোনদের গান শুনে ছোট্ট শিশুটির ভেতরে অজান্তেই জেগে উঠেছিল সুরের অনুরণন। সে গুনগুন করে গাইত আর সহজেই আশপাশের সবার মন জয় করত। কে জানত, এই কণ্ঠ একদিন হয়ে উঠবে বাংলা গানের অন্যতম প্রধান সম্পদ-সাবিনা ইয়াসমীন।
রেডিও স্টুডিও থেকে কলেজ সংসদ
ষাটের দশকের মাঝামাঝি প্রথম দেখা আমার। ঢাকা রেডিওতে মা সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন কিশোরী সাবিনাকে। প্রথম দর্শনেই মনে হলো-এ মেয়েটির মধ্যে আলাদা কিছু আছে। প্রতিষ্ঠিত সুরকাররাও তার প্রতিভা চিনে নিলেন অচিরেই।
তারপর আমরা বকশীবাজার গভর্নমেন্ট ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজে সহপাঠী হলাম। আমি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী, সাবিনা প্রথম বর্ষে ভর্তি হলো। আমাকে দেখে উচ্ছ্বাসে ভরে উঠল সে। কলেজ সংসদ নির্বাচনের সময় আমি বললাম-
-‘তুমি সংস্কৃতি সম্পাদক হবে।’
সে ভয় পেয়ে উত্তর দিল-
-‘কি যে বলো মেনকা আপা! আমি করব নির্বাচন? অসম্ভব।’
আমি আশ্বস্ত করলাম-
-‘তোমার কিছুই করতে হবে না। শুধু একদিন গান গাইবে।
ফলাফল আমরা জানিই—সেদিন মঞ্চে দাঁড়িয়ে সাবিনা গান গেয়ে মাইক্রোফোনে আবেগে আবেদন—
আমি সাবিনা ইয়াসমীন সংস্কৃতি সম্পাদক পদে আপনাদের ভোটপ্রার্থী। কথা দিচ্ছি সবসময় আপনাদের পাশে থাকব। নতুন আগামীর প্রত্যাশা করছি। আর করতালিতে আকাশ কেঁপে উঠল। বিপুল ব্যবধানে জিতল আমাদের ছাত্র ইউনিয়নের পুরো প্যানেল আর সংস্কৃতি সম্পাদক হলো সাবিনা ইয়াসমীন। বিজয়ের আনন্দে আমরা দুজনা আনন্দে উদ্বেলিত এবং আত্মহারা।
বিশ্ববিদ্যালয় ও টেলিভিশনের দিনগুলো
এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে আমরা আবার সহপাঠী। আমি দ্বিতীয় বর্ষে আর সাবিনা প্রথম বর্ষে। ডিআইটি ভবনে টেলিভিশন ঢাকা কেন্দ্রে প্রফেসর রফিকুল ইসলামের উপস্থাপনায় গীতিনাট্যে অংশ নিল সে। স্পষ্ট হলো—এই কণ্ঠ একদিন সীমা ছাড়িয়ে যাবে।
পড়াশোনা শেষ করে আমি যোগ দিলাম বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রযোজক হিসেবে। তখনকার স্বপ্ন ছিল—সাবিনার একক অনুষ্ঠান করব। এক বিজয় দিবসে সুযোগ এলো। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল সুর করলেন, কেরামত মওলা সেট সাজালেন।
‘সুন্দর সুবর্ণ তারুণ্য লাবণ্য’,
‘সেই রেললাইনের ধারে মেঠোপথটার পাড়ে’,
‘মাগো আর তোমাকে ঘুমপাড়ানি মাসী হতে দেবো না’—
এমন সব গান নিয়ে তৈরি হলো এক ঐতিহাসিক অনুষ্ঠান।
পরে স্বাধীনতা দিবসে শামসুর রাহমানের লেখা ও আলাউদ্দিন আলীর সুরে সাবিনার কণ্ঠে ধারণ করেছিলাম গান—
‘এই যে আমার খুকির ঠোঁটে ফুটছে হাসি’।
সে তো তোমার জন্য স্বাধীনতা।’
‘স্বজন হারানোর বিয়োগ ব্যথায় আর কতকাল তুমি করবে শোক।’
আজও সেই গান শুনলে বুক ভরে ওঠে গর্বে।
শিল্পীসত্তা ও কালজয়ী কণ্ঠ
সাবিনার কণ্ঠে এক অনন্য স্বচ্ছতা—কখনো মায়াবী, কখনো দৃপ্ত। দেশাত্মবোধক গান হোক কিংবা চলচ্চিত্রের গান—তিনি প্রতিটি ক্ষেত্রে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছেন। গীতিকার রফিক উজ জামানের লেখা খন্দকার নূরুল আলমের সুরে ‘যদি মরণের পরে কেউ প্রশ্ন করে কি দেখেছি’ কিংবা
‘রান্নাঘরে মা রাঁধছে, বাবা এক পেয়ালা চা হাতে’—এসব গান চিরকালীন আবেগের দোলা দেয়।
প্রথম গানটি সুটিং করেছিলাম আনসার একাডেমিতে এবং পরের গানটি এফডিসির কোনো এক শুটিং ফ্লোরে। এ ব্যাপারে সহযোগিতা করেছিলেন নৃত্যপরিচালক আমির হোসেন বাবু। চমৎকার চিত্রায়ণে আনোয়ার হোসেন বুলু ভাইয়ের মুনশিয়ানায় অনুষ্ঠান অনেক উন্নতমানের হতো বলে আমার বিশ্বাস।
যেকোনো অনুষ্ঠানের শুটিং করতে অনেক ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হয়। লোকেশন পরিবর্তন মেকআপ ড্রেস পরিবর্তন এসবে সাবিনা কখনো বিরক্ত হতো না। ভীষণ সহযোগিতা করত। শুটিং করতে রাত হলেও হাসি মুখে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছে।
অসংখ্যবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পদকসহ অসংখ্য সম্মান দেশ-বিদেশে তার অর্জনের খতিয়ান সমৃদ্ধ করেছে। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে তার কণ্ঠই, যা মানুষকে সান্ত্বনা দেয়, আনন্দ দেয়, জাতির অন্তর্গত ব্যথাকে সুরে রূপ দেয়।
অসুস্থতার দিন ও জাতির মমতা
২০০৭ সালে হঠাৎ শুনলাম—সাবিনা ইয়াসমীন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। আমি তখন বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপমহাপরিচালক। ছুটে গেলাম হাসপাতালে। সে আমার হাত ধরে করুণ চোখে তাকাল। বুকের ভেতর ঝড় উঠল, চোখের জল আটকে রাখা গেল না।
বিটিভির পর্দায় ঘোষণা দিলাম—
—‘জাতির প্রিয় কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমীন অসুস্থ, তার জন্য দোয়া করুন।’
পুরো দেশ প্রার্থনায় মগ্ন হলো। বিদেশে চিকিৎসা হলো, মিলিয়া সাবেদের
সহযোগিতা অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা আল্লাহর রহমত এবং প্রচণ্ড মানসিক শক্তিতে তিনি সুস্থ হয়ে ফিরে এলেন। সেই ফিরে আসা ছিল যেন এক নতুন জীবন, নতুন আলো।
আমাদের অহংকার
সাবিনা ইয়াসমীন শুধু এক কণ্ঠশিল্পীর নাম নয়; তিনি আমাদের সাংস্কৃতিক সত্তার অংশ। রেডিও, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র—বাংলা গানের প্রতিটি অঙ্গন তার সুরে সমৃদ্ধ। তার কণ্ঠে আমরা খুঁজে পাই আনন্দের উল্লাস, দুঃখের সান্ত্বনা, স্বাধীনতার গৌরব। সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সংগীত পরিবেশন করে আমাদের গর্বিত করেছে। তুমি বাংলাদেশের অহংকার।
আজ তার জন্মদিনে আমার প্রার্থনা—
‘তুমি দীর্ঘজীবী হও, সুস্থ থেকো এবং তোমার সুরেলা কণ্ঠে বাংলা গান চিরকাল বেঁচে থাকুক।’
লেখক : সাবেক উপমহাপরিচালক
বাংলাদেশ টেলিভিশন