বাংলাদেশের চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে মার্কিন ইন্ধনের রেজিম চেঞ্জ বা কালার রেভোলিউশন বলে আবারও প্রোপাগান্ডা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে প্রমাণ হিসেবে বলা হচ্ছে, মার্কিন প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট আই আর আই ও ন্যাশনাল এনডাউমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি এনইডি কর্তৃক ইউএসএআইডি দিয়ে কিছু র্যাপ সংগীত, এলজিবিটিতে অর্থসহায়তা আর কিছু ইয়ুথ প্রোগ্রাম এবং কিছু সুশীল লোকদের দিয়ে আন্দোলন জমানোর অভিযোগ।
যারা এই গণঅভ্যুত্থানকে মার্কিন ইন্ধনে ঘটা রেজিম চেঞ্জ বলেন, তারা সাবেক মার্কিন কূটনীতিবিদ বেঞ্জ কর্তৃক প্রচারিত কিছু ডকুমেন্টকে প্রমাণ হিসেবে হাজির করেন, যেখানে ন্যাশনাল এনডাউমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বেঞ্জের মতে আমেরিকা দেশে দেশে সফট পাওয়ার টেকনিক, মিডিয়ার প্রভাব ও সিভিল সোসাইটির গ্রুপগুলোকে ফান্ড দিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করে। কিছু অ্যাক্টিভিস্ট ও মাইনোরিটি গ্রুপকে মবিলাইজ করে এবং কালচারাল আর এথনিক টেনশনকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের সমাজে একই রকম অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে বলে তিনি জানান (সূত্র : বাংলাদেশ ও ভারতে ইউএসএইডের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে হস্তক্ষেপ শীর্ষক এক প্রতিবেদন, দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫)। প্রথমত, ইউএসএআইডি’র প্রচুর অর্থ, কিন্তু কাউন্টার টেররিজমেই ব্যবহার করা হয়েছে, যেটা বাংলাদেশের পতিত রেজিমের রাষ্ট্রীয় বাহিনী বরং বিরোধী দলমতের লোকদের জঙ্গি ট্যাগ দিয়ে আন্দোলন দমনেই বেশি ব্যবহার করেছে।
আর এলজিবিটি ফান্ডের সঙ্গে গণঅভ্যুত্থানের কোনো লিংক নেই, এটা মার্কিন গ্লোবাল এজেন্ডা। দ্বিতীয়ত, এই পুরো প্রক্রিয়া (র্যাপ সংগীত, ইয়ুথ প্রোগ্রাম) আসলে গণঅভ্যুত্থানে তেমন গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখেনি। ইয়ুথ লিডারশিপের যে প্রভাব এই আন্দোলনে তা খুবই নগণ্য একটা ফ্যাক্টর এবং তার বাইরেও ছাত্র-জনতার সিংহভাগ কিন্তু এসব প্রোগ্রামের বাইরে থেকেই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন। আর একই রকম অনেক প্রোগ্রাম তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও অন্য দেশও (ভারত) এদেশে পরিচালিত করে। এসব প্রোগ্রামের ভূমিকা ছিল পেরিফেরাল লেভেলে এবং রুটিন ওয়ার্ক টাইপ।
দু-একটা র্যাপ সংগীত তৈরিতে আমেরিকার সহযোগিতা আছে, কিন্তু এর বাইরে স্বাধীন র্যাপার তৈরি হয়েছে প্রচুর। আর এদেশের পুরো কালচারাল ইন্ডাস্ট্রি দাঁড়িয়ে আছে কলকাতার উনিশ শতকের কালচারাল হেজেমনির ওপর, যার ভিত্তিতে ভারত এদেশের আরবান মিডল ক্লাস এবং এলিট ক্লাসের রুচি ও সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ করে বলে এখানে মার্কিন হেজেমনি প্রতিষ্ঠা করা খুবই কঠিন। এ কারণেই ২০২৩ সালে বিএনপির সরকারবিরোধী আন্দোলনে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র কিছুই করতে পারেনি, কারণ অল্প কিছু লোকজন ছাড়া সুশীল সমাজ, টিভি চ্যানেল, প্রায় সব পত্রিকা, এনজিও, বুদ্ধিজীবী, কবি-সাহিত্যিক—এরা কেউই পতিত ফ্যাসিবাদী রেজিমের বিরুদ্ধে কাজ করতে রাজি হয়নি। পিটার হাসকে আমরা দেখেছি খালি একটি পত্রিকার সঙ্গে ফটোসেশনে, যার কোনো হেজেমনি ঢাকার মিডল ক্লাস বা আপার ক্লাসে নেই।
একটা দেশে কালার রেভোলিউশন করতে হয় যাদের দিয়ে, মানে বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ-মিডিয়া-এনজিও—এরা প্রায় সবাই যেখানে ফ্যাসিবাদী বয়ান উৎপাদন অথবা প্রচার করেছে বছরের পর বছর, সেখানে এদের দিয়ে যে রেজিম চেঞ্জ সম্ভব নয়, সেটা মার্কিনিরা ভালো করেই বোঝেন। উল্টো বিএনপির আশায় গুড়ে বালি দিয়ে ’২৩-এর আন্দোলনের পিক টাইমে ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশনের জন্য কোনো শক্তিশালী চাপ যে যুক্তরাষ্ট্র দেয়নি, তার কারণ ফাঁস করেছে গার্ডিয়ান পত্রিকা।
দিল্লির চাপে মার্কিন স্টেট সেক্রেটারি অ্যান্থনি ব্লিংকেন তৎকালীন মার্কিন কূটনীতিক ডোনাল্ড লু ও পিটার হাস-সহ আরো সব মার্কিন কূটনীতিবিদকে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে হাসিনা সরকারকে প্রেশার দেওয়া বন্ধ করতে নির্বাচনের আগে আগে যে নির্দেশ দিয়েছেন, তা গার্ডিয়ানের রিপোর্টেই আছে (দেখুন হান্না এলিস-পিটারসেনের কলাম, গার্ডিয়ান, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪)। ফলে দিল্লির চাপে ২০১৪ সালের মতো আবারও আমেরিকা-বাংলাদেশের জালিয়াতির নির্বাচন ঠেকাতে কার্যকর কিছুই করেনি। কেন করেনি? কারণ ২০০৭ সালের যেই এক এগারোর ক্যু হয়েছে, তা ছিল দিল্লি আর আমেরিকার ইন্ধনে ঘটা যৌথ ক্যু, ফলে ওই সময়েই দিল্লির চোখে বাংলাদেশ দেখার পলিসি নেয় আমেরিকা, যেটা আমেরিকার ব্যাপার তারা কী করবে না করবে। কিন্তু দিল্লি আর আমেরিকার এই মেলবন্ধন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণ থেকে জনতাকে ‘নাই’ করে দেয়।
ফলে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল এদেশের রাজনীতিতে জনগণের গণক্ষমতা প্রতিষ্ঠার নিজস্ব বিপ্লবী আন্দোলন, যাতে গত ১৫ বছরের ভয়াবহ ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনতার ক্ষোভের বিস্ফোরণ যেমন ছিল, তেমনি ছিল ১৬ জুলাই থেকে এদেশের শিশু-কিশোর, ছাত্র-যুবা, শ্রমিকসহ নাগরিকদের ওপর রাষ্ট্রীয় গুলি আর হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত গণবিপ্লবী প্রতিরোধ। ফলে এদেশের ছাত্র-জনতার এই অরগানিক স্বতঃস্ফূর্ত দেশজ বিপ্লবী গণঅভ্যুত্থানকে মার্কিন ইন্ধনের রেজিম চেঞ্জ বলা যায় না।
এদেশের তাবৎ মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী (অল্প কিছু ছাড়া), সিভিল সোসাইটি—এরা আন্দোলনের কারিগর ছিল না, যেটা কালার রেভোলিউশনে ঘটে। ফলে আমেরিকার পক্ষ থেকে রেজিম চেঞ্জ করার মতো এজেন্টই এখানে ছিল না। সব ছিল দিল্লির এজেন্ট অথবা ফ্যাসিবাদের এজেন্ট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেয়ার ইলেকশনের দাবিকে কীভাবে একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী ‘সাম্রাজ্যবাদী’ বলে গালি দিয়ে মাঠ গরম করত, তা তো আমরা দেখেছি।
ইদানীং অনেকেই এমনকি প্রভাবশালী কিছু বুদ্ধিজীবীও গণঅভ্যুত্থানে মার্কিন ফান্ডের ভূমিকা ছিল বলে আলাপ তোলেন, যারা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে মার্কিন প্রযোজিত বলে প্রোপাগান্ডা করেন, তার প্রমাণ হিসেবে ইদানীং ইউএসএআইডির অর্থায়নে ২৯ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প ‘স্ট্রেংদেনিং পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপ (এসপিএল) ইন বাংলাদেশ’কে প্রমাণ হিসেবে হাজির করেন। অথচ এই প্রকল্প বাংলাদেশ ও আমেরিকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তিতে নেওয়া এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে (হাসিনার আমলেই) এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ইউএসএআইডি যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালকে (ডিআই) নির্বাচিত করে।
এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক সহিংসতা হ্রাস করে শান্তি ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান তৈরি, দলগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রচর্চার উন্নয়ন এবং প্রতিনিধিত্বমূলক নেতৃত্বের বিকাশে উৎসাহ প্রদান। প্রথমত, এই প্রকল্প নেওয়াই হয়েছে বাংলাদেশে রেডিক্যাল রাজনীতিকে ঠেকানোর জন্য এবং বিদ্যমান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য ভায়োলেন্স বাদ দিয়ে কীভাবে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থা বজায় রাখা যায় সেজন্য।
এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও ফ্রেমওয়ার্ক কীভাবে গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে যায়, তা বোধগম্য নয়। এটা বরং চব্বিশের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিটের বিরুদ্ধেই কাজ করার কথা। দ্বিতীয়ত, ফান্ডই যদি সব করতে পারত, তাহলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৩ সালে বিএনপি/জামায়াতের গণতান্ত্রিক আন্দোলন সফল হলো না কেন? পরাশক্তি বা আঞ্চলিক শক্তি ভিন্ন দেশে ফান্ড দিয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে, এসব তো নতুন কিছু নয়। ভারত, রাশিয়া, চীন, ইউরোপ অনেকেই যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী এসব করে। এসবের কিছু ভূমিকা থাকে, কিন্তু গণঅভ্যুত্থানে এসবের প্রভাব ও ভূমিকা খুবই নগণ্য।
আর আমাদের সিভিল সোসাইটি ও নাগরিক সমাজ, মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীরা তো দিল্লির ডিপ স্টেটের নিয়ন্ত্রণে এবং বলয়ে থাকেন বলে আমেরিকা চাইলেও তাদের মবিলাইজ করতে পারবে না। ২০২৩ সালে কিন্তু মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস অনেক চেষ্টা করেছেন, কিন্তু এদেশের নাগরিক সমাজ, সিভিল সোসাইটি, মিডিয়া কেউ রাজি হয়নি, কারণ ভারতের বলয়ে তারা ফাংশন করে। পরে পিটার হাসকে রণে ভঙ্গ দিতে হয়েছে। ফলে বাংলাদেশে আমেরিকা চাইলেই এখানকার বুদ্ধিজীবী, মিডিয়া ও কালচারাল এলিটদের মবিলাইজ করতে পারবে না, কেননা তারা ফ্যাসিবাদ ও ভারতের বলয়ের সৈনিক—এই সহজ হিসাব না বুঝে যারা চব্বিশের গণবিপ্লবকে মার্কিন ফান্ড দিয়ে ঘটা কালার রেভোলিউশন বলেন তারা মিথ্যাচার করেন।
’২৩-এ মার্কিন ডিপ স্টেট এদেশে কালার রেভোলিউশন করতে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছে ’২৪-এ । ’২৩-এ কেন গণঅভ্যুত্থান হলো না, কিন্তু ’২৪-এ কেন সফল হলো—এই বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যাবে ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ছিল জনগণের অরগানিক স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান, যেখানে ১৫ বছরের ক্ষোভের বারুদে বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য দেয়াশলাইয়ের কাজ করেছে নির্বিচার গুলি এবং হত্যাযজ্ঞ।
বাংলাদেশের জনতার নিজস্ব গণতান্ত্রিক লড়াই এবং ফ্যাসিবাদী নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষাই ছিল প্রধান চালিকাশক্তি, বাইরের ইন্ধন/ফান্ড নয়। মোদ্দা কথা, কালার রেভোলিউশনে বাইরের শক্তির ইন্ধনে মিডিয়া, সিভিল সোসাইটি ও এনজিও কাজ করে আন্দোলন জমানোর ক্ষেত্রে, অথচ বাংলাদেশের ’২৪-এর প্রধান কারিগর ও চালিকাশক্তি ছিল ছাত্ররা। এ ধরনের ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রধান প্রবলেম হচ্ছে, এটা জনগণের সক্রিয় রাজনৈতিক কর্তাসত্তাকে ক্রেডিট দেয় না, অথবা তার অবদানকে হালকা করে তুলে ধরে।
বাংলাদেশে যদি রেজিম চেঞ্জ হয়, সেটা হয়েছে ২০০৭ সালের ১/১১, যেখানে মার্কিন ডিপ স্টেট ও ভারতের ডিপ স্টেট মিলে এদেশের মিডিয়া ও সিভিল সোসাইটিকে মবিলাইজ করে একটা আন্দোলন-ভিত্তিক ক্যু করতে সক্ষম হয়েছিল। তখন আমেরিকার কৌশল ছিল চীনের অব্যাহত প্রভাব প্রতিহত করার জন্য ভারতকে শক্তিশালী করা, তাই আমেরিকা ভারতের চোখে বাংলাদেশকে দেখার পলিসি নেয়।
এ কারণে তখন ভারত আর আমেরিকার ডিপ স্টেটের ভূমিকা ও লক্ষ্য একই হওয়ায় বাংলাদেশে সব এনজিও, বুদ্ধিজীবী, কবি-সাহিত্যিক, শিল্পীসহ সব সিভিল সোসাইটি ও গণমাধ্যম বিরাজনীতিকীকরণের জন্য জনমত তৈরি করে এবং ভারত, আমেরিকা আর সিভিল সোসাইটির যোগসাজশে আরবান মিডল ক্লাস ও কালচারাল এলিট ক্লাসকে মবিলাইজ করা পসিবল হয়। ১/১১ তাই সফল হয়। কিন্তু ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৩ সালের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিএনপি সফল না হওয়ার জন্য দায়ী হচ্ছে মিডল ক্লাস, আপার মিডল ক্লাস ও সিভিল সোসাইটি; কিন্তু বিএনপি-জামায়াতের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যোগ দেয়নি।
অর্থাৎ কিছু ব্যতিক্রম বাদে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী, কবি-সাহিত্যিক, কালচারাল এলিট এবং সিভিল সোসাইটি মূলত ফ্যাসিবাদের পক্ষে বয়ান তৈরি ও প্রসারে ভূমিকা রাখে এবং তা ভারতের ডিপ স্টেটের নিয়ন্ত্রণেই ছিল। যেহেতু ভারতের ডিপ স্টেটের নিয়ন্ত্রণে ছিল, ফলে ’২৩-এ এসে আমেরিকার ডিপ স্টেট কিন্তু দিল্লি-নিয়ন্ত্রিত বাংলাদেশের সিভিল সোসাইটিকে মবিলাইজ করতে পারেনি। ফলে ’২৪-এ মার্কিন ডিপ স্টেটের হাসিনা পতনে তেমন কোনো রোল প্লে করার মতো ফুরসতই ছিল না, কারণ এদেশের মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী ও সিভিল সমাজ অলরেডি দিল্লি অথবা হাসিনা সরকারের অনুগত।
যারা মনে করেন, হাজার হাজার গুম, খুন ও হত্যাযজ্ঞ, কয়েকটা ম্যাসাকার, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার চুরি, লুণ্ঠন-পাচার ও তিনটা ভুয়া জালিয়াতির নির্বাচন করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল, জুলাই-আগস্টজুড়ে বৃষ্টির মতো নির্বিচার গুলি করে হাজার হাজার নাগরিক হত্যা, হাজার হাজার মানুষকে পঙ্গু করে দেওয়ার পরও হাসিনা সরকারকে উৎখাতে জনগণের ন্যায্য গণবিক্ষোভ এবং গণঅভ্যুত্থান তাদের নিজস্ব নয়, এটা মার্কিন ষড়যন্ত্রে কিছু টাকা দিয়ে এলজিবিটি ইস্যু আর সুশীল কিছু লোককে মবিলাইজ করার মামলা—তারা আসলে বলতে চান হাসিনার বিরুদ্ধে গণআন্দোলন ঠিক হয়নি; কিন্তু সেটা বলতে পারেন না বলে দোষ মার্কিনিদের ওপর চাপিয়ে সান্ত্বনা পেতে চান, অথবা গণহত্যার বিরুদ্ধে নিজেদের চুপ থাকার লজ্জাকে ঢাকতে চান মার্কিন ইন্ধনের অভিযোগ এনে।
নির্বিচার গণহত্যাই যে হাসিনার বিরুদ্ধে গণবিপ্লবের জন্য যথেষ্ট, এটা কি তারা মনে করেন না? এরকম লুটপাট, গুম-খুন ও গণহত্যার সরকার পতনে গুলির মুখে জীবন দিয়ে দেওয়া জনতার গণপ্রতিরোধকে ক্রেডিট না দিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব যারা প্রচার করেন, তারা আসলে গণমানুষের রাজনৈতিক সক্রিয় কর্তাসত্তাকে অস্বীকার করেন।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়