হোম > মতামত

বরিশালে জুলাই আন্দোলন

আযাদ আলাউদ্দীন

ছাত্রদের কোটাবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন। একপর্যায়ে এ আন্দোলন ফ্যাসিবাদী সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেবে, তা প্রথম দিকে অনুধাবন করা যায়নি। পহেলা জুলাই থেকে চলমান আন্দোলনের ঢেউ পর্যায়ক্রমে রাজধানী থেকে বরিশাল বিভাগেও আসতে থাকে।

যেহেতু এই আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সেহেতু ঢাবি থেকে ঘোষিত কর্মসূচি প্রথমেই ছড়িয়ে যায় দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরই ধারাবাহিকতায় ধীরে ধীরে জমে ওঠে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কোটাবিরোধী আন্দোলন। একই সঙ্গে এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয় দক্ষিণ বাংলার সবচেয়ে বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থীর প্রাণের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি বিএম কলেজ। পরে নগরীর অন্যান্য কলেজেও এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।

যতই দিন যায় আন্দোলনের গতি তত বাড়তে থাকে, আমরাও রুটিন ওয়ার্ক অনুযায়ী ছাত্রদের আন্দোলনের রিপোর্ট করতে থাকি। ক্যাম্পাসে কর্মরত সাংবাদিক ছাড়াও আমার অন্যতম নিউজ সোর্স হিসেবে কাজ করেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও বিএম কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন শিবিরের প্রকাশ্য কার্যক্রম ছিল না। অন্য গণমাধ্যমের অধিকাংশ সাংবাদিকদের শিবির খুব একটা আস্থায় রাখতে পারত না, কারণ বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে তথ্য দিয়ে বিপদে পড়েছিলেন শিবিরের কয়েকজন নেতাকর্মী। শিবিরের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে আওয়ামীপন্থি কয়েকজন সাংবাদিক শিবিরের ওই নেতাকর্মীদের পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। সেজন্য তারা প্রথমে আমাকে তথ্য ও ভিডিও ফুটেজ দিয়ে অন্যান্য মিডিয়ায় দিতে বলতেন।

চব্বিশের আন্দোলনে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিএম কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির নেপথ্যের শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। তখন নিজ দলীয় পরিচয়ে ফ্রন্টে এসে কাজ করার কোনো সুযোগই তাদের ছিল না, তাদের কোনো রকম পরিচয় পেলেই ছাত্রলীগ হামলা করে পুলিশে ধরিয়ে দিত। সেজন্য আন্দোলনের কৌশল হিসেবে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়কদের মধ্য থেকে সুজয় শুভকে মুখ্য সংগঠক হিসেবে ফ্রন্টে রাখা হয়। তিনি একদিকে যেমন বাম ছাত্র সংগঠনের নেতা, অন্যদিকে ছিলেন ভালো বক্তা ও সংগঠক। সব মিলিয়ে তাকে শিবির ট্যাগ দেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না ছাত্রলীগের। আওয়ামী জাহেলিয়াতের যুগে কেউ সত্য কথা বললেই তাকে ‘শিবির’ ট্যাগ দিয়ে অপদস্থ করে ‘মব’ তৈরি করা হতো। তবে সুজয় শুভ এই আন্দোলনের মুখপাত্র হিসেবে ফ্রন্টে ভূমিকা রাখলেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক রাকিবসহ অন্য সমন্বয়কদের মধ্যে কেউ কেউ ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও বামপন্থি ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন, যার অনেক কিছু হয়তো আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরাও জানতেন না।

রাজনৈতিক আদর্শের বিভাজন মাথায় না রেখে শিক্ষার্থীরা তখন ঐক্যবদ্ধভাবে রাস্তায় নেমে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বরিশালেও চলতে থাকে একের পর এক কর্মসূচি। দিনে বিক্ষোভ ও রাতে মশাল মিছিলে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় আন্দোলন অব্যাহত থাকে। ব্রজমোহন কলেজের শিক্ষার্থীরা নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ডে অবস্থান নিলে বরিশালের সঙ্গে সারা দেশই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অন্যদিকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কুয়াকাটা-বরিশাল সড়ক অবরোধ করলে পটুয়াখালী-কুয়াকাটা ও বরগুনার সব উপজেলার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

১৫ জুলাই স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলে গালি দিলে সারা দেশের মতো বরিশালের সবকটি ক্যাম্পাসে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন শিক্ষার্থীরা। এমন উত্তাল সময়ে ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদের শহীদ হওয়ার খবর ভিডিও গণমাধ্যমে আসার পর কেঁপে ওঠে বিশ্ববিবেক। রক্তে দ্রোহের আগুন জ্বলে শিক্ষার্থীদের। একই দিন চট্টগামের রাজপথে মিছিল চলাকালে ছাত্রলীগের গুলিতে শহীদ হন বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নের ফয়সাল আহমেদ শান্ত। বরিশাল জেলার মোট ৩০ শহীদের মধ্যে তিনিই ছিলেন প্রথম। শান্তর লাশ চট্টগ্রাম থেকে বরিশালে গ্রামের বাড়িতে আনতে গিয়েও পদে পদে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন শহীদের স্বজনরা। সেদিন রহমতপুরের মানিককাঠি বাজারে শহীদ ফয়সাল আহমেদ শান্তর জানাজায় কয়েক হাজার ছাত্র-জনতা অংশগ্রহণ করেন। তার জানাজায়ও নানারকম প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেন রহমতপুর ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আক্তারুজ্জামান মিলন। অবশেষে জনতার প্রতিরোধের মুখে পিছু হটেন মিলন ও তার সহযোগীরা।

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বরিশাল বিএম কলেজ ক্যাম্পাস ছাত্রলীগমুক্ত করেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের তীব্রতায় ক্যাম্পাসের পেছনের গেট দিয়ে পালিয়ে যায় ছাত্রলীগ।

১৮ জুলাই বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ও সারা দেশের জন্য একটি মাইলফলক হয়ে রয়েছে। এদিন কেন্দ্র-নির্দেশিত দিনব্যাপী ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে সকালেই শিক্ষার্থীরা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের গ্রাউন্ড ফ্লোরে একত্র হতে থাকেন। ক্যাম্পাসের গেটগুলোর বাইরে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও এবিপিএন পাহারা বসায়। তারা শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসের বাইরে রাস্তায় নামতে দিচ্ছিল না। এই আন্দোলন যে সাধারণ মানুষের আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল, সেটি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্যক্ষ করা গেছে। মসজিদের মাইকে ছাত্ররা এলাকাবাসীর সহযোগিতা চাইলে আশপাশের এলাকাবাসীও রাস্তায় নেমে আসেন। এ কারণে শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর কাছে পরাজয় শিকার করে প্রশাসনিক সব বাহিনী হাত উঁচু করে আত্মসমর্পণ করে ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।

১ আগস্ট বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক সংহতি সমাবেশ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রবল বৃষ্টি ও বৈরী পরিবেশের কারণে অল্প শিক্ষার্থীর উপস্থিতির সুযোগ নিয়ে বন্দর থানার পুলিশ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১২ জনকে আটক করে নিয়ে যায়। পরে আন্দোলনের তীব্রতায় আটক ছাত্রদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় পুলিশ।

নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক সমাজের ব্যানারে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৫ শিক্ষক শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পক্ষে এবং সরকারের দমন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ৪ আগস্ট উপাচার্য সরকারের পক্ষে শিক্ষক ও সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে মানববন্ধন করার জন্য অনলাইন মিটিংয়ে চাপ প্রয়োগ করেন, ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। সে সময়কার শিক্ষক সমিতির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও প্রক্টর সবাই মিলে শিক্ষকদের হুমকি দিতে দ্বিধা করেননি।

৩, ৪ ও ৫ আগস্ট বরিশালের সর্বস্তরের বিক্ষুব্ধ হাজার হাজার জাত্র-জনতা বরিশাল নগরীর নথুল্লাবাদ থেকে চৌমাথা পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করে রাখেন। এসব এলাকায় পুলিশ-বিজিবি ও ছাত্রলীগ-যুবলীগ যৌথভাবে নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায়, শত শত শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হয়। নগরীর চৌমাথা এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতা টুটুল চৌধুরী নিজের পিস্তল দিয়ে ছাত্রদের ওপর গুলি চালান। একপর্যায়ে তার গুলি শেষ হয়ে গেলে গণপিটুনিতে মারা যান তিনি।

এই ঘটনার পর বটতলা থেকে চৌমাথা হয়ে নথুল্লাবাদ এলাকায় পুলিশ-বিজিবি ও ছাত্রলীগ-যুবলীগ যৌথভাবে এলোপাতাড়ি সশস্ত্র হামলা ও গুলি চালিয়ে ছাত্র-জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। কিন্তু ছাত্ররা গুলির মুখেও অনড় থাকেন, একজন গুলিবিদ্ধ হলে শতজন দাঁড়িয়ে যান। এভাবেই পরাজিত হয় জালেম স্বৈরাচার আর ফ্যাসিবাদীরা। ৫ আগস্ট দুপুরের পর শেখ হাসিনার পলায়নের খবর ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশের মতো বরিশালেও অগণিত মানুষ বাঁধভাঙা উল্লাসে রাস্তায়ও নেমে আসেন।

জুলাই আন্দোলনে বরিশালে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আহত হন। তাদের মধ্যে রয়েছেন যুগান্তরের ফটো সাংবাদিক শামীম আহমেদ, যমুনা টিভির ক্যামেরাপারসন হৃদয়, নিউনেশনের রাতুল ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় দৈনিক সংগ্রামের প্রতিনিধি আবু উবাইদা।

জুলাই আন্দোলনে বরিশাল বিভাগের দেড় শতাধিক ছাত্রজনতা শহীদ হন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শহীদের সংখ্যা ভোলা জেলায়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী ভোলা জেলায় শহীদের সংখ্যা ৪৮ জন; অন্যদিকে বেসরকারি তথ্যমতে, ভোলায় শহীদের সংখ্যা ৫১ জন। বরিশাল জেলার ৩০ শহীদসহ পুরো বরিশাল বিভাগে আহতের সংখ্যা দুই হাজারেরও বেশি।

লেখক : সভাপতি, বরিশাল জেলা সাংবাদিক ইউনিয়ন

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা

চিন্তার স্বাধীনতা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

নৌবিদ্রোহ ও রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

শব্দের রাজনীতি, ক্ষমতার ভয়

নতুন প্রধানমন্ত্রীর শুরুটা কেমন হলো

কূটনীতিক, পণ্ডিত ও বাংলাদেশের বন্ধু

কৃষি পর্যটন : টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত