বহুমাত্রিক রুপ নিয়েছে রোহিঙ্গা সংকট। এটি বর্তমানে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জে রূপ নিয়েছে। মিয়ানমার জান্তা সরকার বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে। এখন প্রশ্ন হল এটা বাস্তবায়ন হবে কিভাবে। কোন পরিবেশে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরবে? রোহিঙ্গারা যে অঞ্চল থেকে বিতাড়িত হয়েছিল, সেসব জায়গা এখন কার নিয়ন্ত্রণে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে রোহিঙ্গা সমস্যার ভেতরে লুকিয়ে থাকা আরেকটি জটিল বাস্তবতা আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। সেটি হচ্ছে রাখাইন রাজ্যের বর্তমান নিয়ন্ত্রণ কাঠামো। আরাকানের অধিকাংশ এলাকা বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রনে। তারা স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র লড়াই করছে। মিয়ানমার জান্তা সরকারের জন্য এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ আরাকান আর্মিসহ মিয়ানমারের বিভিন্ন বিদ্রোহী বাহিনী। এ অবস্থায় আরাকান আর্মির সঙ্গে সমন্বয় না থাকলে এই প্রত্যাবাসন হবে অনিশ্চিত এক যাত্রা।
আরাকান আর্মির সঙ্গে আলোচনা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই কিছু জটিলতা রয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে এই সংগঠনটি এখনো কোনো বৈধ সংস্থার স্বীকৃতি পায়নি। এমন এক সংগঠনের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসা বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর। কিন্তু এটাও ঠিক যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রায়ই দেখা যায়, ‘ডি ফ্যাক্টো’ শক্তির সঙ্গেই শান্তি ও প্রত্যাবাসন বাস্তবায়নের পথ খোঁজা হয়। দক্ষিণ সুদান, আফগানিস্তান, কলম্বিয়া সবখানেই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়েই সংকট নিরসন হয়েছে।
আরাকান আর্মি তাদের অবস্থানও পাল্টাচ্ছে। আগে তারা রোহিঙ্গাদের প্রতি কঠোর মনোভাব পোষণ করলেও সাম্প্রতিক সময়ে তারা বলেছে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ‘ন্যায্য অধিকার’ তারা মেনে নিতে প্রস্তুত। যদিও তারা এখনো ‘রোহিঙ্গা’ শব্দের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি, তথাপি তারা এটাও বলেছে যে, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সহাবস্থানে তারা প্রস্তুত এবং মানবিক সহায়তার প্রবেশাধিকার তারা সুনির্দিষ্ট শর্তে বিবেচনা করতে পারে। এই অবস্থানকে ‘খোলা দরজা’ হিসেবে ধরা যেতে পারে। বাংলাদেশের উচিত এখনই এই দরজায় কৌশলী কূটনীতির মাধ্যমে ধাক্কা দেওয়া।
এখানে প্রত্যক্ষ আলোচনার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন ব্যাকচ্যানেল কূটনীতি, ট্র্যাক-টু ডিপ্লোমেসি এবং মধ্যস্থতাকারীর ব্যবস্থায় ‘শ্যাডো ডায়ালগ’ শুরু করা। থাইল্যান্ড, চীন বা ভারত—এই তিন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে কেউ একজন নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হতে পারে। কিংবা আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা, যেমন আন্তর্জাতিক রেডক্রস ক্রাইসিস গ্রুপের মাধ্যমে আলোচনার ভিত্তি গড়া সম্ভব। আলোচনার উদ্দেশ্য হবে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের বাস্তব ভিত্তি তৈরি করা। একইসঙ্গে আরাকান আর্মি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর অনুমতি নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি তৃতীয় পক্ষীয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার দাবি তোলা।
বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সংকট আজ শুধু একটি মানবিক দায় নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চাপের দীর্ঘমেয়াদি উৎস। কক্সবাজার ও ভাসানচর দুই জায়গাতেই রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী অবস্থান এরই মধ্যে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাত, চোরাচালান, মাদক ব্যবসা ও অস্ত্রবাজির প্রবণতা বাড়িয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে আন্তর্জাতিক সহায়তার ক্রমাগত হ্রাস এবং বৈশ্বিক আগ্রহের অবসান। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এখন কেবল মানবিক দায় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় স্বার্থেই প্রত্যাবাসন বাস্তবায়ন জরুরি হয়ে উঠেছে।
এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কূটনৈতিক কাঠামোতেও কিছু মৌলিক পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন। রোহিঙ্গা ইস্যু এতদিন মূলত মানবিক সংকট ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু সময়ের দাবি হলো, এই সংকটকে এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় টেকসই উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা। বিশেষ করে বিমসটেক, আসিয়ান ও চীন-ভারতসংশ্লিষ্ট উপ-আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মগুলোয় এই বিষয়টিকে উচ্চমাত্রায় কূটনৈতিকভাবে তোলা উচিত।
একইসঙ্গে বাংলাদেশের উচিত রোহিঙ্গা ইস্যুকে একটি সমষ্টিগত আঞ্চলিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে শুধু মিয়ানমার নয় বরং এ অঞ্চলের সব রাষ্ট্র বিশেষ করে ভারত, চীন, থাইল্যান্ড ও আসিয়ান সদস্যরা বিশেষ দায়িত্বশীল ভূমিকা নেবে। কারণ রোহিঙ্গা সংকট থেকে সৃষ্ট নিরাপত্তা হুমকি ও মানবপাচার, মাদকপ্রবাহ ও জঙ্গিবাদ প্রসারের ঝুঁকি এখন আর শুধু বাংলাদেশের সীমিত পরিসরের বিষয় নয়।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সহায়তা কাঠামোর দিকেও নজর ফেরাতে হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আন্তর্জাতিক অনুদান কমে আসায় বাংলাদেশ ক্রমাগত চাপের মুখে পড়ছে। তাই বিশ্বমঞ্চে নতুনভাবে চাপ তৈরি করে উন্নত দেশগুলোকে বাধ্য করতে হবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত তারা যেন এই সংকটে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দায়ভার বহন করে। প্রয়োজনে জি-২০ কিংবা ব্রিকস প্ল্যাটফর্মেও এ বিষয়টি তুলতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো সরাসরি সম্পৃক্ত হয়।
লেখক : সাংবাদিক, সংগঠক