বাংলাদেশে রাজনীতির বোলচালের আড়ালে যেসব কূটকৌশলী চাল চলে, তাতে জাতীয়তাবাদী দল— বিএনপি সাম্প্রতিককালে বেশ কয়েক দফা ধরাশায়ী হয়ে পিছিয়ে পড়েছিল অনেকটাই। পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের সময়সীমার প্রশ্নে রাজনীতির মাঠে বিএনপি প্রায় একা হয়ে গিয়েছিল। অনতিবিলম্বে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পথনকশা বা রোডম্যাপ ঘোষণার জন্য বিএনপি যে তাগিদ দিয়ে আসছিল, সেটা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও তরুণ বয়সিদের রঙ্গব্যঙ্গের বিষয় হয়ে উঠেছিল। নির্বাচনের দাবির কারণে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিএনপি এন্তার ট্রোলের শিকার হচ্ছিল।
এরই মধ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের লন্ডনের বাসায় জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং প্রভাবশালী নায়েবে আমির ডাক্তার সৈয়দ আব্দুল্লাহ্ মোহাম্মদ আবু তাহের গিয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে সেই সাক্ষাৎপর্বে তারেক রহমানও হাজির ছিলেন। এ নিয়ে যে খবর প্রচারিত হয়, তাতে ওই দেখা নিছক সৌজন্যমূলক, নাকি রাজনৈতিক, তা খোলাসা করা হয়নি। কিন্তু সাক্ষাতের পালা সেরে দেশে ফেরার পর আমিরে জামায়াত আসন্ন সংসদ নির্বাচন আগামী রোজার আগেই সেরে ফেলার কথা বলেন। পরবর্তী রমজান শুরু হবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝ নাগাদ। তার মানে জামায়াত নির্বাচন চাইছে এর আগেই। এই ডেটলাইনের মাধ্যমে জামায়াত আগামী সংসদ নির্বাচনের সময়সূচি প্রশ্নে বিএনপির খুব কাছাকাছি অবস্থানে চলে এলো। বিএনপি আগামী ডিসেম্বরকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ‘কাট-অফ টাইম’ বলে ঘোষণা দিয়েছে। জামায়াত মধ্য ফেব্রুয়ারির আগেই নির্বাচন চেয়ে বিএনপির দাবির প্রতিই প্রকারান্তরে সমর্থন দিয়েছে। এতে এই ইস্যুতে রাজনীতির মাঠে বিএনপির একাকিত্ব ঘুচল বলেই মনে হয়।
লন্ডনে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সঙ্গে জামায়াতের দুই শীর্ষনেতার মোলাকাতের ব্যবস্থা কোন পক্ষের উদ্যোগে বাস্তবায়িত হয়েছে জানি না। তবে এই সাক্ষাৎ যে নিষ্ফল হয়নি, তা জামায়াতের রোজার আগেই ভোট চাওয়াতেই প্রমাণিত হয়েছে। রাষ্ট্রক্ষমতা আওয়ামী ফ্যাসিবাদের কবজা থেকে মুক্ত হওয়ার পর রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থেকে আওয়ামী লীগ এখন অপসৃত রয়েছে। এ অবস্থায় বিএনপির পর জামায়াতই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সেই দলটি যদি নির্বাচনী শিডিউলের ব্যাপারে বিএনপির সঙ্গে একমত হয়ে যায়, তাহলে শুধু বিএনপিই লাভবান হয় না, অনেক সংকটের আশঙ্কাও কেটে যায়। কান টানলে যেমন মাথা আসে, তেমনি রাজনীতিতে দুই পক্ষের মধ্যে কোনো একটি বিষয়ে ঐকমত্য হলে বাকি অনেক বিষয়েই সমঝোতার পথ খুলে যায়।
বাংলাদেশে পরবর্তী সংসদ নির্বাচনে বিএনপির জয়লাভের সম্ভাবনা প্রবল। তবে ক্ষমতায় কারা যাবে, সেটাই বর্তমান ক্রান্তিকালে শেষ কথা নয়। প্রধান বিরোধী দলের আসনে কারা বসবে, সেটাও আগামী দিনের রাজনীতির জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি আগামীতে ভোটে জিতলে তাদের অতীতের আন্দোলনের মিত্রদের নিয়ে নির্বাচনোত্তর ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের ব্যাপারে কথা দিয়ে রেখেছে। জামায়াতের নেতৃত্বে ইসলামপন্থিদের জোট যদি আগামী নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলের অবস্থান অর্জন করতে পারে, তবে সেটা আমার বিবেচনায় মন্দ হবে না। বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে তেমন একটি বন্দোবস্ত এবং সুসম্পর্ক বজায় রেখে গঠনমূলক ভূমিকা পালনের ব্যাপারে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে যদি সমঝোতা হয়ে থাকে, তবে তার ফলাফল ভালোই হওয়ার কথা।
এরপর থাকে ছাত্র-তরুণদের নবগঠিত দল জাতীয় নাগরিক পার্টি— এনসিপি। তারাই পতিত ফ্যাসিবাদের বিচার ও গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের আগে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রবল বিরোধিতা করছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিএনপির আগামী নির্বাচন ও সরকার গঠন প্রক্রিয়ায় এনসিপিকে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষপাতী। আন্দোলন ও নির্বাচনে সাফল্য এক কথা নয়। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় এনসিপির অবস্থান খুব নাজুক হবে বলেই আমি মনে করি। পৃথকভাবে নির্বাচন করলে তারা হয়তো কোনো আসনেই জিততে পারবে না। কিন্তু আগামী নির্বাচনে ভোটের হিসাব, এনসিপির পারফরম্যান্স ও এর নেতৃত্বের বর্তমান কাঠামো দিয়ে সবকিছু বিবেচনা করলে চলবে না। এই এনসিপিকে তারুণ্যের এবং একটি জেনারেশনের প্রতিনিধি হিসেবে ধরে নিতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে আস্থায় নিতে হবে এবং তাদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তরুণদের ব্যাপারে ‘ইনক্লুসিভ’ না হলে বিএনপির পক্ষে সফলভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। আর তাই সংস্কার ও জুলাই ডিক্লারেশনের ব্যাপারে একটা সমঝোতায় এসে বিএনপি ছাত্র-তরুণদের অ্যাকোমডেট করার উদ্যোগ নিতে পারে।
অতীতের ভুলভ্রান্তির কথা বাদ দিলেও হাসিনার ফ্যাসিস্ট রেজিম উৎখাতের পরও বিএনপি পদে পদে ভুল করে চলেছে। এই ভুলের ফাঁদ থেকে তাদের দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেনানেতৃত্ব, সিভিল প্রশাসন ও পেশাজীবীদের একটা বড় অংশ পক্ষ ত্যাগ করে বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে। তা ছাড়া প্রভাব খাটিয়ে রাষ্ট্রীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে বিএনপি তাদের সমর্থকদের বসাতে পেরেছে। কিন্তু এতেই ধরাকে সরাজ্ঞান করে বিএনপির অনেকে শত্রুশিবিরে ঠেলে দেওয়ার আত্মঘাতী নীতি অবলম্বন করে চলেছে। বড় দলসুলভ অহমিকাও বিএনপির সঙ্গে অনেকের দূরত্ব সৃষ্টি করছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার কোনো পক্ষ-প্রতিপক্ষের সরকার নয়। তারা কোনো বিষয়ে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বীও নয়। তবুও বিএনপি তাদের অপরিণামদর্শী অ্যাপ্রোচ ও ভুল কার্যকলাপের মাধ্যমে নিজেদের অন্তর্বর্তী সরকারের বিরোধী দল হিসেবে উপস্থাপন করে চলেছে। সর্বশেষে ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে উপস্থাপনের পর বিএনপি চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে। তারা প্রকারান্তরে হুমকি দিয়ে বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন না হলে দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাবে। এ ধরনের অ্যাপ্রোচকে সমাজের একটি বড় অংশ গ্রহণযোগ্য বলে মনে করে না। দ্রুত নির্বাচনের দাবির অতিরিক্ত পুনরাবৃত্তির কারণে অনেকে বিএনপিকে ইতোমধ্যেই স্বার্থপর ও ক্ষমতাব্যাকুল বলে চিত্রিত করছে। নিজেদের সংস্কারের ব্যাপারে অনাগ্রহী হিসেবেও প্রমাণ করেছে বিএনপি। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের ক্ষেত্রেও কিছুটা টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে। অথচ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের ক্ষেত্রে ড. ইউনূস ও তরুণদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সংস্কার খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ হিসেবে বিবেচিত। পতিত ফ্যাসিবাদী রেজিম এবং তাদের মদতদাতা ভারতের ব্যাপারে সাম্প্রতিককালে বিএনপির অবস্থান অনেকের কাছে অস্পষ্ট মনে হওয়ায় এ দলের প্রতি তাদের মধ্যে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপির ভিত্তিকে দৃঢ়মূল করতে হলে দ্রুত এসব বিভ্রান্তির অবসান ঘটাতে হবে। না হলে সাফল্য ও বিজয় সোনার হরিণ হয়ে বিএনপির হাতে সহসা ধরা দেবে না।
রাজনীতি অনেক কঠিন হয়ে গিয়েছে। শুধু দেশের ভেতরে নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সঠিকভাবে পারফর্ম করার যোগ্যতা না থাকলে নেতৃত্ব অধরাই থেকে যাবে। তাই অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রতিযোগিতায় বিএনপিকে উত্তীর্ণ হতে হবে। বিপুল জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও কেন দীর্ঘকাল ক্ষমতার বাইরে চরম হেনস্তায় কাটাতে হয়েছে, তা বিএনপিকে অনুধাবন করতে হবে। ফ্যাসিস্ট রেজিমের বিদায়ের পর বিএনপির প্রতি জনগণের আগের সেই সহানুভূতিমূলক মনোভাবে ও মন্দের ভালো হিসেবে তুলনামূলক সমর্থনে ভাটা পড়েছে। এখন নিজস্ব যোগ্যতা ও ইতিবাচক ভূমিকায় বিএনপিকে তার সমর্থন বাড়াতে হবে। কিন্তু একশ্রেণির নেতাকর্মী দলের শৃঙ্খলা ভেঙে দখল, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধে জড়িয়ে বিএনপির ব্যাপারে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করে চলেছে। দল ও রাজনীতি ঢেলে না সাজিয়ে শুধু কিছু সাংগঠনিক অ্যাকশন নিয়ে এ ক্ষতির হাত থেকে নিস্তার মিলবে না। সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সফল হতে হলে বিএনপিকে ভেঙে নতুন করে গড়ার বিকল্প নেই।
বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন এবারের বিশ্বের শত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের তালিকার লিডার ক্যাটাগরিতে ছয় নম্বরে ঠাঁই দিয়েছে বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। তার মাধ্যমে বাংলাদেশ আরেকবার বিরল মর্যাদায় ভূষিত হলো। মাইক্রোফাইন্যান্স-এর জনক, গরিবের ব্যাংকার, বাংলাদেশের গৌরব, নোবেলবিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সম্পর্কে টাইম-এর এ সংখ্যায় সাইটেশন লিখেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফার্স্টলেডি, প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পপুলার ভোটে জয়ী প্রার্থী হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটন। অভিনন্দন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এমন একজন ব্যক্তিত্বকে আমাদের এ পোড়ার দেশে আমরা বাই চান্স পেয়ে গেছি সরকারপ্রধান হিসেবে। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত দেশগুলোয় সুযোগ থাকলে ড. ইউনূস যদি রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তাহলে তিনি হয়তো বিপুল ভোটে জিতেও যেতে পারেন। কারণ তারা খাঁটি সোনা যাচাই করে নিতে জানে। আর তার জন্মভূমি বাংলাদেশে ভোটে দাঁড়ালে তিনি ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হতে পারবেন কি না, সন্দেহ আছে। আমরা ফাঁকিজুকি ও বুজিরুকিতে সম্মোহিত হই। আমাদের দেশ এতটা পিছিয়ে থাকার এটাও একটা বড় কারণ নয় কি?
পারস্য দেশের রূপকথায় আছে, একদল অশ্বারোহী পর্যটক এক গিরিপথ ধরে গন্তব্যে পৌঁছার পর পরম বিস্ময়ে দেখলেন, তাদের সবার অশ্বের খুরগুলো স্বর্ণের হয়ে গেছে। তারা বুঝলেন, পথে কোথাও এমন পাথর বসানো আছে, যার স্পর্শে ঘোড়ার খুর সোনায় পরিণত হয়েছে। কোথায় সেই পরশ পাথর বা কিমিয়া? শুরু হলো তার সন্ধান। বাস্তবে মানুষ সেই কিমিয়া বা পরশমণি খুঁজে পেয়েছে কি না জানি না। তবে কল্পনায় ও রূপকথায় রয়ে গেছে তার গল্প। পঞ্চম শতাব্দীর বিখ্যাত ইসলামি ধর্মতত্ত্ববিদ, রহস্যবাদী দার্শনিক ও পণ্ডিত আবু হামিদ মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ তুসি আল-গাজ্জালী সমধিক পরিচিত ছিলেন ইমাম গাজ্জালী সংক্ষিপ্ত নামে। সেই মনীষীর এক মহামূল্যবান গ্রন্থ কিমিয়ায়ে সা’আদাত। এর অর্থ সৌভাগ্যের পরশমণি। আমাদের আজ চাই সত্যিকারের কিমিয়ায়ে সা’আদাত। যার পরশে নানা দুর্বলতায় আকীর্ণ ও পাপে পঙ্কিল মানুষগুলো সোনার মানুষে রূপান্তরিত হতে পারে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক