হোম > মতামত

নারী কমিশন হেফাজত দ্বন্দ্বে কার ইন্ধন?

মাহতাব মুহাম্মদ

নারী সংস্কার কমিশনের সুপারিশমালার মধ্যে কিছু বিষয় সম্প্রতি তুমুল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। নারীদের উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত নীতিমালা, পতিতাবৃত্তিকে বৈধ করাসহ কয়েকটি বিষয় নিয়ে সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করছে। তারই ধারাবাহিকতায়, এ নিয়ে নারী সংস্কার কমিশন ও অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, যা একটি নতুন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নিয়েছে। নারী সংস্কার কমিশনের বিতর্কিত সুপারিশকে কেন্দ্র করে হেফাজতের তীব্র প্রতিক্রিয়া এবং পরবর্তীতে কমিশনের পাল্টা প্রতিক্রিয়া একটি সুস্পষ্ট বিভাজন তৈরি করেছে, যাকে বলা যায়—নারী কমিশন বনাম ধর্মীয় মূল্যবোধ।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই দ্বন্দ্ব কি কেবল আদর্শিক, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও গভীর রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ইন্ধন? দেশের সাধারণ মানুষ ও হেফাজতে ইসলাম বলছে, নারী সংস্কার কমিশনের বক্তব্য ইসলামি মূল্যবোধের পরিপন্থি। তারা দাবি করছে, কমিশন ‘পাশ্চাত্য ধাঁচের’ নারী স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে পরিবার, সমাজ ও দেশের বহুমাত্রিক সংস্কৃতিকে হুমকির মুখে ফেলছে। তারা আরও বলছে, নারী সংস্কার কমিশনের প্রদত্ত প্রতিবেদন সংবিধানের ৪১ নম্বর অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, যে অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ ধর্ম পালন ও প্রচারের অধিকার দেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, নারী কমিশন পবিত্র কুরআনে বর্ণিত আইনকে কটাক্ষ করে মূলত ইসলামি আইন পালনকেই বাধা দিতে চেয়েছে, যা প্রচলিত সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

অন্যদিকে, নারী কমিশনের ভাষ্য, তারা নারীদের অধিকার নিয়ে কথা বলছে এবং তাদের অবস্থান থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, ধর্মীয় মূল্যবোধের বিষয়টি তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই যে মুখোমুখি অবস্থান, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—কারা এই মুহূর্তে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে এবং কেন? প্রথমত, নারী কমিশন হয়তো চাইছে—যে করেই হোক, তাদের পাশ্চাত্য আয়নায় দেখা তথাকথিত বয়ান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার এটি একটি সুবর্ণ সুযোগ। হতে পারে, প্রফেসর ইউনুসও চান নারী সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হোক। তিনি সম্প্রতি নিজ মুখে এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের কথা বলেছেন। কিন্তু তিনি কেন এ সুপারিশের সঙ্গে একমত হলেন? এর একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে—নারী অধিকার, উন্নয়ন ও প্রগতিশীলতার নামে কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দাতাগোষ্ঠীর মন রক্ষা করা সরকারের কৌশলের অংশ। সরকার চাইছে, নারী কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্বের কাছে এটি প্রমাণ করতে যে, বাংলাদেশে নারী বৈষম্য দূরীকরণে সরকার তৎপর। এর মাধ্যমে হয়তো সরকার পশ্চিমা সমর্থন আদায়ের কৌশল নিয়েছে। কিন্তু পশ্চিমাদের সমর্থন অর্জনের প্রয়োজনে কিংবা কিছু তথাকথিত এনজিওর মন রক্ষার জন্য বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সমর্থন হারালে, সেটি সরকারের দূরদর্শিতার ঘাটতি হিসেবে বিবেচিত হবে। দ্বিতীয়ত, কোনো গোষ্ঠী হয়তো কৌশলে ধর্মীয় সংগঠনকে সরকারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চাইছে।

কারণ, এ দেশের মানুষ অত্যন্ত ধর্মভীরু। ধর্মীয় উসকানিমূলক কোনো কার্যক্রমে সরকারকে যুক্ত করতে পারলে, ধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গে সরকারের বিরোধ তৈরি হবে। দেশের সিংহভাগ মানুষ ধর্মানুরাগী হওয়ায় সরকারের সঙ্গে জনসাধারণের দ্বন্দ্ব দেখা দেবে এবং সরকার দ্রুত জনসমর্থন হারাবে। ফলে ধর্মপ্রাণ মানুষ ধর্মবিরোধী নীতির প্রতিবাদে রাস্তায় নামবে, আর একটি গোষ্ঠী এই ঘটনাকে 'ইসলামপন্থিদের উত্থান' বলে আন্তর্জাতিক মহলে প্রচার করবে—এই বলে যে, শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশ মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। তখন ফ্যাসিবাদী দোসররা আহাজারি করে বলবে—‘হায় হায়! দেশটা তো রসাতলে গেলো! আফগানিস্তান হয়ে গেলো! হাসু আপাই কত ভালো ছিলেন!’

এর ফলে ইউনুস সরকারের জনসমর্থন দেশে ও বিদেশে ধীরে ধীরে হ্রাস পাবে—যা ওই ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী প্রতিনিয়ত চায়। প্রশ্ন ওঠে—এ মুহূর্তে নারী কমিশনকে দিয়ে ধর্মীয় আইন পালনে বিরোধিতা করার মতো সুপারিশ কারা করালো? ইউনুস সরকার কেন সেই ফাঁদে পা দিল? কেন এমন একটি নারী কমিশন গঠন করা হলো, যা সব নারীর প্রতিনিধিত্ব করে না এবং বিতর্কিত সুপারিশ পেশ করে? কেন ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে সরকারের মুখোমুখি করার মতো বোকামি করা হলো? সরকার কি বুঝতে পারছে না যে, একটি চক্র সবসময় চায় ইউনুস সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাস পাক? একটি দায়িত্বশীল সরকারের এতটুকু দূরদর্শিতা থাকা উচিত। তৃতীয়ত, বর্তমান প্রেক্ষাপটে নারী কমিশনের ধর্মবিরোধী সুপারিশ প্রদানে ভারতের ভূরাজনৈতিক প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। বরং, এ কাজে ভারতের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ইন্ধন দেওয়ার বিষয়টি অধিক বিবেচনাযোগ্য। কারণ, ভারত ইউনুস সরকারকে চায় না; তারা হাসিনাকে পুনরায় ক্ষমতায় দেখতে চায়। সুতরাং, ইউনুস সরকারের ক্ষতি সাধনের সকল চেষ্টা ভারত করবে—এটা ওপেন সিক্রেট।

অনেকের মতে, ভারত সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে নারী কমিশনের মতো সংস্থাকে উসকে দিয়ে সমাজে ধর্মীয় সংগঠনের বিরুদ্ধচিত্র তৈরি করতে আগ্রহী। বিশেষ করে আসাম, পশ্চিমবঙ্গ কিংবা ত্রিপুরায় ধর্মীয় চেতনার প্রসঙ্গে ভারত যে ধরনের সংবেদনশীলতা দেখায়, তার প্রভাব বাংলাদেশেও পরোক্ষভাবে পড়ছে। হতে পারে, ভারত একদিকে ইউনুস সরকারকে ধর্মীয় সংগঠনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বেকায়দায় ফেলতে চাইছে, অপরদিকে, ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে নারী অধিকারবিরোধী বলে একটি মিথ্যা বর্ণনা তৈরি করতে চাইছে। ভারতের এই দুই উদ্দেশ্যের লক্ষ্য একটাই—বাংলাদেশে হাসিনা সরকারের পুনরুত্থান, ভারতীয় আধিপত্য কায়েম রাখা এবং হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসন জারি রাখা।

লেখক : গবেষক, মিজার্পুর

জেলা: টাঙ্গাইল

অনিশ্চিত সময়ে ঐক্যবদ্ধ না হলে সবাই ডুববেন

সাধারণে বিপর্যয়, অসাধারণে অর্জন

অরুণাচলে ভারতের পরাজয়ের শঙ্কা

আওয়ামী লীগ পুনর্মিলনের আলোচনার আড়ালে

ক্ষমতার পালাবদল ও সাংবাদিকতার নৈতিকতা

ঋণের জালে অর্থনীতি

হামের টিকা নিয়ে উদ্বেগ: শিশুদের জন্য মানসম্মত টিকা নিশ্চিত করুণ

চীন-জাপানের প্রতিযোগিতা ও বাংলাদেশ

কিছুই ভালো যাচ্ছে না মুহাম্মদ বিন সালমানের

তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আত্মঘাতী খেলা