গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ, আর সাংবাদিকদের বলা হয় জাতির বিবেক। একটি সুস্থ ও গণতান্ত্রিক সমাজে সাংবাদিকের কলম হবে আপসহীন, তার অবস্থান হবে সবসময় সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে। কিন্তু যখন সেই কলম ক্ষমতার কাছে বিক্রি হয়ে যায়, তখন রাষ্ট্র ও সমাজের কাঠামো ভেতর থেকে পচে যেতে শুরু করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকতার এই অবক্ষয় আজ এক চরম বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে আমরা দেখেছি সাংবাদিকতার নামে এক নজিরবিহীন চাটুকারিতা। সে সময় একশ্রেণির সাংবাদিক নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব ভুলে ক্ষমতাসীন দলের অন্যায়, দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোকে শুধু প্রশ্রয়ই দেননি, বরং নানাভাবে সেগুলোর বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার সুবাদে তারা রাষ্ট্রযন্ত্রের নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পদ বাগিয়ে নিয়েছেন, প্লট-ফ্ল্যাট বাগিয়েছেন এবং রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। জনতার কাঠগড়ায় তারা আজ শুধু সাংবাদিক নন, বরং স্বৈরাচারী ব্যবস্থার ‘দোসরে’ পরিণত হয়েছেন।
কিন্তু ক্ষমতার পালাবদল বা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যদি চাটুকারিতার সংস্কৃতি একই থেকে যায়, তবে তা জাতির জন্য আরো বড় অশনিসংকেত।
অন্যায়ের যেমন নির্দিষ্ট কোনো রঙ বা দল নেই, তেমনি অন্যায়ের দোসরদেরও আলাদা কোনো পরিচয় নেই। আওয়ামী লীগের আমলে যারা নীতি বিসর্জন দিয়ে সুবিধা ভোগ করেছেন, তারা যেমন অপরাধী, বর্তমানে বিএনপির বা অন্য কোনো দলের ছত্রছায়ায় থেকে যারা একই কাজ করছেন বা করবেন, তারাও ঠিক একইভাবে অপরাধী। তারা কেউই সাংবাদিক নন, তারা নিছকই ক্ষমতার দালাল। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ যারা দম্ভভরে ক্ষমতার রোষানলে সত্যকে ধামাচাপা দিচ্ছেন এবং অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে আখের গোছাচ্ছেন, কালের বিবর্তনে তাদেরও একদিন বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
সবশেষে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে সামনে আসে, তা হলো—কোথায় গেল সাংবাদিকদের নীতি ও নৈতিকতা? সাংবাদিকতা কোনো ক্ষমতার সিঁড়ি নয়, এটি একটি ব্রত। যে পেশায় সত্য প্রকাশই একমাত্র ধর্ম হওয়ার কথা, সেখানে দলকানা হয়ে সুবিধা খোঁজা পেশার সঙ্গে চরম বেঈমানি। দল ও মতের ঊর্ধ্বে উঠে যেদিন দেশের গণমাধ্যম ও সাংবাদিকরা মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারবেন, শুধু সেদিনই রাষ্ট্র তার প্রকৃত আয়না খুঁজে পাবে। অন্যথায়, এক দলের দোসরের বদলে আরেক দলের দোসরের জন্ম হতেই থাকবে, আর মাঝখান থেকে বারবার পরাজিত হবে দেশের সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিকতার মহান আদর্শ।
লেখক : সমাজকর্মী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

