লেখাটি শুরু করতে চাই কয়েকটি ঐতিহাসিক ঘটনার কথা বলে। এক. ১৯৫৭ সালের পলাশী প্রান্তরে যখন ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে নবাব সিরাজউদ্দৌলার বাহিনীর মরণপণ লড়াই, তখন দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অর্থাৎ ঔপনিবেশিকতার অধীনে পরাধীনতার প্রশ্নটিই ছিল একমাত্র মুখ্য বিষয়। তখন আশপাশে এ দেশীয় মানুষ জড়ো হয় এই ভেবে যে, রাজায় রাজায় যুদ্ধ হচ্ছে এতে আমাদের কী? তারা পলাশীর প্রান্তরে শুধু যুদ্ধ দেখছিলেন, কিন্তু এটা যে তাদের হাতে পরাধীনতার জিঞ্জির পরাবে, স্বাধীনতা বিপন্ন হবে, তা মানুষ ভাবেনি। পরবর্তীকালে একজন ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ঘটনাস্থল সরেজমিনে গিয়ে প্রত্যক্ষ করে লিখেছিলেন, সমবেত দেশীয় জনগণ যদি ব্রিটিশ বাহিনীর উদ্দেশ্যে একটি করেও পাথর টুকরো ছুড়ে মারত, তাহলে বাংলাসহ পুরো ভারতের ইতিহাস ভিন্ন হতে পারত। এ কারণেই ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য বর্ণনায় বলা হচ্ছে, ‘পলাশীর যুদ্ধে মানুষ ছিল শুধুই দর্শক।’ মানুষ চোখের সামনে দেখতে পেয়েছে স্বাধীনতা অস্তমিত যাওয়ার ঘটনা। এ বিষয়টি আলোচনা করলে এ সত্যটি বেরিয়ে আসে যে, ‘মীরজাফরসহ আরো যাদের সম্মিলিত ষড়যন্ত্র উদ্যোগ’, তারা সিরাজেরই এককালের অনুগত এবং বিশ্বাসীদের ষড়যন্ত্র। এ সম্পর্কে উইলিয়াম ডালরিম্পলের ‘দ্য অ্যানার্কি’সহ কয়েকটি বই আছে, যাতে তারা দেখিয়েছেন, যত টানা ব্রিটিশ বাহিনীর কৃতিত্ব, তার চেয়েও বেশি দায়ী ‘অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা’।
দুই. ১৮৫৭ সালের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ‘জাতপাত’ ভুলে ভারতের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র লড়াইয়ে লড়ছিলেন, তখন তার বিরোধিতা করেছিলেন রাম মোহন রায়ের অনুসারীরা। তারা তখন ১৮৫৭ সালের ২৪ জানুয়ারি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। আর ১৮১৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘হিন্দু কলেজ’। কার্ল মার্কস ১৮৫৭ সালের ব্রিটিশবিরোধী সিপাহিদের সশস্ত্র সংগ্রামকে ভারতের উপনিবেশবাদবিরোধী ‘প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু দেশের স্বাধীনতার চেয়েও বড় হয়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব কেন মহান হয়ে উঠেছিল, সে সম্পর্কে পণ্ডিত, জ্ঞানতাপস অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ‘ইংরেজি জানা একটি চাকরিজীবী মধ্যবিত্ত শ্রেণি’ প্রচেষ্টাই এ দেশীয় একটি শ্রেণির প্রয়াস ছিল। আর পেছনের উদ্যোক্তা ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ। অধ্যাপক রাজ্জাক বলেছেন, ‘কোম্পানি যে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলÑইংরেজি শিক্ষাÑতার পেছনে বড় কারণ ছিল এই যে, অন্তত খানিকটা ইংরেজি জানা বহুসংখ্যক স্থানীয় লোক কোম্পানির জন্য জরুরি হয়ে পড়েছিল। (Abdur Razzak; Political Parties in India; UPL, Feb. 2022; Page : 99-102)
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেছে, স্বাধীনতার চেয়েও পরাধীনতার দালাল হওয়ার আকাঙ্ক্ষা যে যুগে যুগে দালাল শ্রেণির কর্ম এবং ধর্ম।
তিন. ১৭৬৩ থেকে শুরু হওয়া বাংলার ‘কৃষক আন্দোলন এবং সংগ্রাম, যা চলে দশকের পর দশক, অর্থাৎ দফায় দফায় শতাব্দীজুড়েÑতাও ছিল অসাম্প্রদায়িক এবং ধর্ম, বর্ণ, জাতপাত নির্বিশেষে। এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন শমসের গাজী, ভবানী পাঠক, ফকির মজনু শাহ, মুসা শাহ ও দেবী চৌধুরানী। কৃষকরা হয়তো কাঠামোগত বিদ্যায় ‘ঔপনিবেশিকতা’র মর্মার্থ বুঝতে পারেননি। কিন্তু তারাই প্রথম সোজাসাপ্টা বুঝতে পেরেছিলেনÑতার দেশ আর তাদের হাতে নেই। দেশ পরাধীন হয়ে গেছে। এ জন্য হাজার হাজার কৃষক অসংখ্য সশস্ত্র সংগ্রাম করেছেন এবং লড়াইয়ে শহীদ হয়েছেন। কিন্তু তাদের কথা কেউই মনে রাখেনি। এই কৃষক আন্দোলন-সংগ্রামের বিরুদ্ধে নিদারুণ দমন-পীড়নে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার সপক্ষে দালাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল আমাদের দেশীয় মানুষই। তারা জমিদার এবং কৃষিভিত্তিক অভিজাত ও ধনিক শ্রেণির একদল মানুষ তাদের আমরা রেনেসাঁর মালিক-মোক্তারসহ নানা তকমা দিই ভুয়া বা জাল বয়ানতত্ত্বের বদৌলতে।
অথচ যাদের ইতিহাসে আসল স্থান দালাল হিসেবেই। এদের প্রায় সবাই কলকাতাকেনন্দ্রিক উচ্চবিত্তের জীবনযাপনকারী এবং অর্থের জোগানদাতা এ দেশের গরিব কৃষককুল। এভাবেই ইতিহাসে নায়ককে ভিলেন বানানো হয় এবং এখনো হচ্ছে।
চার. ব্রিটিশদের নীলচাষ এবং নীলকর বাংলার ইতিহাসের এক নির্মমতম ঘটনার উদাহরণ। এই নীলচাষ এবং করের বিরুদ্ধে বাংলার কৃষকদের এমন তীব্র আন্দোলন এবং সংগ্রাম গড়ে উঠেছিল ১৮৫৯ থেকে ১৮৬২ সময়কালে। যাতে ব্রিটিশদের ক্ষমতা নড়বড়ে হয়ে পড়ে। ঠিক এ সময়ে কলকাতায় বিলাসী জীবনযাপনকারী ওই জমিদার এবং অভিজাত ধণিক শ্রেণির ১০১ জন ইংল্যান্ডে ব্রিটিশ রানির দপ্তরে চিঠি পাঠিয়ে এই সন্ত্রাসী আন্দোলন দমনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি এবং প্রয়োজনে নিজেদের সবটুকু দিয়ে এদের দমনে আত্মনিয়োগ করার প্রত্যয় ঘোষণা করে। এরা দালালিতে এবং পরাধীনতার আনন্দে এমনই বিভোর ছিল যে, ‘নীল বিদ্রোহ’রত কৃষকদের সন্ত্রাসী বলতেও এদের দ্বিধা হয়নি। এরা দলাল হলেও এ দেশেরই। শুধু দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীল দর্পণ’ নাটক, হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকার সম্পাদক হরিস চন্দ্র মুখার্জির কিছু লেখালেখি এবং ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের নৈতিকসহ নানা ধরনের সমর্থন ছাড়া ‘নীলকর সংগ্রামী’দের পাশেও আর কেউ ছিলেন না।
এ কথাটি বলতেই হবে, ১৭৯৩ সালের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ আইনটির প্রণয়নের কারণ হিসেবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশক শাসকরা ‘এটি শুধু ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং বাড়তি করপ্রাপ্তি’র কথা বললেও এটি ছিল বড় ধরনের রাজনৈতিক কূটকৌশল। এর মধ্য দিয়েই এতদিনকার ভূমির স্বভোগী মুসলমান জমিদার, তালুকদারসহ একটি বিশাল শ্রেণিকে হটিয়ে দিয়ে অনগ্রসর শ্রেণিতে রূপান্তরিত করা হয়। রাজনৈতিক কূটকৌশলের পেছনে ‘ধর্মীয়’ পরিচয় যুক্ত করার প্রচেষ্টা যারা করেছে, তারাও এ দেশেরই মানুষ। আর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমেই কলকাতার লবণ ব্যবসায়ী দ্বারকানাথ ঠাকুররা রাতারাতি হয়ে যান জমিদার। আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারী রাম মোহন রায় ১৮৩১-এ উপাধি পান ‘রাজা’র।
সঠিক ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলো খুবই জরুরি। জরুরি এ কারণে যে, জাল বা মিথ্যা ইতিহাস এভাবেই রচিত হয়।
পাঁচ. বাংলাদেশের ইতিহাসে সিরাজ সিকদার একটি বিপ্লবী চেতনার নাম। তাকেও রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য দলের অভ্যন্তরের একজনের নাম পাওয়া যায়। তবে এখন পর্যন্ত এ রহস্য উদঘাটন করেনি রাষ্ট্রযন্ত্র। পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি আন্দোলনের বিপ্লবী বীর চারু মজুমদারকেও ওই একইভাবে ধরিয়ে দেওয়া হয়।
এভাবেই এ দেশে এবং অঞ্চলে জনগণের আন্দোলন-সংগ্রাম আর বিপ্লবকে যুগে যুগে হত্যা করা হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে বিপ্লবী বীরদের।
সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ
১৯৪৭ সালের ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের সরাসরি বিদায় এবং দুটো দেশ ভারত এবং পাকিস্তান গঠিত হলেও অর্থাৎ দেশবিভাগ হলেও ঔপনিবেশিক কাঠামো একই রয়ে গেছে। শাসক বদল হয়েছে মাত্র। ফরাসি দার্শনিক ফ্রান্স ফ্যানন এমন পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে যে, ‘ঔপনিবেশিক আধিপত্য শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণ নয়, বরং এটি ঔপনিবেশিক মনস্তত্ব এবং আত্মপরিচয়য়ের ওপরও গভীরভাবে প্রভাব ফেলে, যা মানসিক বিচ্ছিন্নতা এবং দমন, অবদমন তৈরি করে। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে শুধু রাজনৈতিক নয়, এর সঙ্গে মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রয়োজন।
এই বিপ্লবের বদলে পাকিস্তানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিস্তার হতে থাকে ১৯৫০-এর দশকের প্রথম থেকে। মানবিক সাহায্য, প্রতিরক্ষা সাহায্যের হাত ধরে ১৯৫৪-৫৫ সালের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং সেন্টো, সিয়াটো নামের প্রতিরক্ষা দুটি জোটে অংশগ্রহণ দেশটিকে শুধু যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর করে ফেলে।
এই শৃঙ্খল থেকে অর্থাৎ কোনো ধরনের সাম্রাজ্যবাদ, নয়া উপনিবেশবাদের কিংবা আধিপত্যবাদের হাত থেকে মুক্তির জন্য ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ হয়Ñযাতে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল কৃষক, শ্রমিক, নিম্ন এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত পর্যায়ের। তারা মুক্তিযুদ্ধকে দেখেছিলেনÑভাত, কাপড়, বাসস্থানসহ নিত্যদিনের একান্ত চাহিদাটুকু মিটবে এবং কারো গোলামি না করার ‘নিশ্চয়তাটুকু’। তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি বিপ্লব এবং বিপ্লবে বিজয়ের স্বপ্ন। আর এর লক্ষ্য ছিল, রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কার এবং নয়া বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন একটি দেশপ্রাপ্তির। এটাই হচ্ছে সাধারণ মানুষের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।
কিন্তু আগেই বলেছি, উপনিবেশ-উত্তরকালে যে শাসনকাঠামো থাকে এবং এর ফলে কতিপয়ের শাসন বিদ্যমান থাকে, তাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পরাধীনতা এবং ভিনদেশি আধিপত্যবাদনির্ভর। সাধারণ মানুষের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লিখিত কিংবা সংবিধানের লিপিবদ্ধ শব্দমালা বা কথামালা নয়, তাদের কাছে চেতনায় থাকে ভাত-কাপড়ের নিশ্চয়তার স্বপ্নে এবং এর বাস্তবতায়। শুধু শাসক বদল নয়, শাসনব্যবস্থার বদল, সরকার প্রভু নয়, আর জনগণ দয়া প্রার্থী ভৃত্য নয়Ñএটাই তাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।
কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়কালে এসে সাধারণ মানুষ বিশাল ধাক্কা খায় এই বলে যে, তাদের একান্ত আপন মুক্তিযুদ্ধ নামের বিপ্লব ব্যর্থ করে ছিনতাই করে নিয়ে গেছে। সেই নতুন এক শাসক বা নতুন প্রভু। জরুরি অবস্থা জারি, একদলীয় শাসন, সংবাদপত্র বন্ধ হওয়া, রক্ষীবাহিনী, মুজিববাহিনীর আবির্ভাব। এর ওপরে নিদারুণ দুর্ভিক্ষ হয়ে যায় বাস্তব।
এর ওপরে পররাষ্ট্রনীতি একদেশনির্ভর হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ হয়ে পড়ে নয়া এক আধিপত্যবাদের কবলে। ২৫ বছরের মৈত্রী চুক্তির কথা আমাদের জানা আছে। কিন্তু ১৯৭২-এর ২৮ মার্চ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আট দফার এক অসম বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদিত হয়, তা বোধকরি অনেকেরই জানা নেই। এই বাণিজ্য চুক্তি এমন চরমতম পর্যায়ের অসম ছিল যে, তৎকালীন ছাত্রলীগের একাংশের (যা পরবর্তীকালে জাসদ) পক্ষ থেকেই বলা হয়, ‘অর্থনৈতিক আকাশে অশুভ নক্ষত্রের অভ্যুদয় ঘটছে।’
ভারতের আদলে আসলে বাংলাদেশে রক্ষীবাহিনী গঠিত হয়। রক্ষীবাহিনীর গঠন ও কার্যক্রম ছিল ভারতের সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ বা সিআরপির আদলে। সিআরপি গঠিত হয়েছিল ওই দেশের বামপন্থি এবং ভিন্নমতাবলম্বী নির্মূল করার জন্য।
আরো একটি বিষয় জেনে আশ্চর্যান্বিত হতে হয়, তাহলোÑবিতর্কিত মুজিববাহিনীর প্রধান ব্যক্তি জেনারেল এসএস উবানকে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের প্রধান ব্যক্তি শেখ মুজিবুর রহমান তার ‘ব্যক্তিগত উপদেষ্টা হিসেবে’ নিয়োগ দিয়েছিলেন। কার্যত রক্ষীবাহিনীসহ বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার কাজ অর্থাৎ জেনারেল উবানই ছিলেন কার্যত জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা।
তথ্য সূত্র : মেজর জেনারেল এসএস উবান, ফ্যান্টমস অব চিটাগং, দি ফিফথ আর্মি ইন বাংলাদেশ, (বাংলা ভাষান্তর); কীলক প্রকাশনী, ঢাকা, অক্টোবর ২০২৪, পৃষ্ঠা : ১৪৯-১৫১)
এসব ঘটনাবলি ঘটেছিল স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে। আর এটাই পুরো ঘটনাবলি বা পুরো চিত্র, তাও নয়। অনেক ঘটনার সামান্য কয়েকটি উদাহরণ মাত্র। আর এসব ঘটনাবলি বুঝতে না পারেল আমাদের বুঝতে কষ্ট হবে যে, বাংলাদেশ এক উনুন থেকে আরেক উনুনের মধ্যে পড়েছে। যাকে ইংরেজি Idiom বা বাগধারা হিসেবে বলা যায়, Out of the firing pan into fire. (তপ্ত কড়াই থেকে আগুনের মধ্যে পড়া)। পাকিস্তানের উনুনের হাত থেকে রক্ষা পেতে আমরা জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে পড়েছি।
এ ক্ষেত্রে চাণক্যের দুটো উদ্ধৃতি দিতে চাই। ক. নিকট রাজ্য স্বাভাবিকভাবেই শত্রু হয়ে যায়। খ. কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই তারা বন্ধু হতে চায়। (তথ্য সূত্র : চাণক্যনীতি এবং কৌটিল্য অর্থশাস্ত্র, পৃষ্ঠা : ১১৫)
দ্য প্রিন্স-এ নিকোলো মেকিয়াভেলি পররাজ্যের সাহায্য সম্পর্কে বলেন, কেউ সাহায্যের জন্য অনুরোধ করে এদের আনলে তা সবসময়ই বিপজ্জনক হবে। কারণ পরাজিত হলে তার কিছুই করার থাকে না। আর বিজয়ী হলে সেই বাহিনীর কাছে তিনি (শাসক) জিম্মি হয়ে যান। (তথ্যসূত্র : দ্য প্রিন্স পৃষ্ঠা : ৫৭)
এত সময়ে যে কথাগুলো বলা হলো, তার বাস্তবতা উপলব্ধি না করলে আবার পরিস্থিতি আরো বিপজ্জনক হয়ে পড়বেÑএ কথাটি নিশ্চিত। শুধু এ কথাটি মনে রাখতে হবে, আধিপত্যবাদী শক্তির আগ্রাসন চলমান আছে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তা চলমান থাকবে।
স্বাধীনতা-উত্তর সময় থেকে এ পর্যন্ত প্রায় সবটা সময়, (শুধু সামান্য বৈরী সময় ছাড়া) আধিপত্যবাদবেষ্টিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ রয়েছে। এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার আর কোনো প্রয়োজন নেই।
আধিপত্যবাদ তার কর্মপদ্ধতি এবং কৌশল পরিবর্তন করে তাকে আরো ক্ষুরধার ও শানিত করেছে মাত্র। এরই ধারাবাহিকতায় স্বৈরশাসক এরশাদ, ১/১১-এর কুশীলবদের দিয়ে চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এর পরে ২০০৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত তারা সফল হয়েছে।
বাংলাদেশ এবং এর জনগণ সমতার ভিত্তিতে প্রতিবেশী যেকোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সরকারের মধ্যে সুসম্পর্ক চায়। বাংলাদেশের জনগণ, ব্যক্তির সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কে বিশ্বাসী তো নয়ই, বরং এর ঘোরতর বিরোধী। আর বিপত্তিটা সেখানে। ব্যক্তি একটি সত্তা অথবা একক অস্তিত্ব ও একমাত্রিক। রাষ্ট্র জনগণের স্বাধীন, সার্বভৌম সর্বোচ্চ রাজনৈতিক সংস্থা এবং এটি বহুমাত্রিক। ব্যক্তিসত্তাকে জনগণের বহুমাত্রিক রাজনৈতিক আলাদা অস্তিত্বের সঙ্গে তুলনা কোনো যুক্তি, বিজ্ঞান বা কোনো স্বার্থই সমর্থক নয়। সংকটটা এখানেই। এটাকে বড়জোর শক্তি দিয়ে যা ইচ্ছা তাই করার মানসিকতা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এই মানসিকতা যতদিন না দূর হবে, সংকট আরো ঘনীভূত হবে।
শক্তি দিয়ে অবৈধকে বৈধ করার জন্য একটি শ্রেণি প্রয়োজন। তারও আয়োজন তারা সম্পন্ন ইতোমধ্যে করেছে। আর ওই শক্তির মাধ্যমে যা ইচ্ছা করার মানসিকতার পক্ষে ভুয়া বা জাল বয়ান তত্ত্ব ও (Fake narrative theory) ব্যবহৃত হচ্ছে।
আর এ কারণেই তাদের মধ্যে ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব ভীতি ধরিয়ে দেয়। জুলাই বিপ্লব বিশ্বমান কাঠামোর পরিবর্তে জনঅংশীদারত্বমূলক ‘নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্তের’ কথা বলে। আধিপত্যকামী শক্তির কাছে জুলাই এক আতঙ্কের নাম।
জুলাই বিপ্লব পরাধীনতা না প্রকৃত স্বাধীনতা তার রাজনৈতিক ব্যারোমিটার অথবা জনমতের রাজনৈতিক সূচক। এই নির্বাচনই হবে এই রাজনৈতিক বিভাজনের ভিত্তিতে। এই নির্বাচনের প্রধান এজেন্ডা কে কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার ভিত্তিতে নয়। নির্বাচন হবে হুমকি মোকাবিলা এবং এই লক্ষ্যে সক্ষম জাতীয় প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তাকৌশল উপলব্ধির ভিত্তিতে এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির নিরিখে।
যারা ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবসকে ‘পাকিস্তান ভারত যুদ্ধে’ ভারতের ‘বিজয় দিবস’ হিসেবে দেখবে। ২০২৪-এর জুলাই শহীদদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করবে আর যাই হোক তারা এবং তাদের দালাল শ্রেণি বাংলাদেশের বন্ধু কোনোদিনই হবে না।
লেখার শুরুতেই পলাশীর যুদ্ধ, ১৮৫৭-এর সিপাহি বিপ্লব, কৃষক এবং নীলকর সংগ্রামসহ কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করেছি। এবারের নির্বাচনেও সেভাবে দালালশ্রেণি থাকবে, যারা ওই একই ভূমিকা যুগে যুগে পালন করেছে। আর ভুয়া বয়ানের কারণে জনগণ বিভ্রান্ত হয়েছে।
এই নির্বাচনও একটি যুদ্ধ এবং এটি জাতি হিসেবে টিকে থাকার, স্বাধীন থাকার, মাথা উঁচু করে নিজ বাসভূমিতে নিঃশ্বাস নেওয়ার। তাই আসুন আমরা দেশের পরাধীনতার এবং স্বাধীনতার শত্রুমিত্র নির্ধারণ করি। আর তা করতে হবে এই নির্বাচনেই।
লেখক : গবেষক, সাংবাদিক