সরকার জনগণের জীবনমানের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে থাকে। জনগণই ক্ষমতার উৎস এবং সেই জনগণের দ্বারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে জনগণের জন্য জনগণেরই সরকার জনগণের পক্ষে দক্ষ আর্থিক ব্যবস্থাপনার কর্মকুশলতায় দেশ ও সমাজ উন্নয়নগামী হয়ে থাকে। সরকারের আয় আসে জনগণ থেকে, আবার সেই আয় থেকে জনগণের জন্য যখন সরকার ব্যয় করে, তখন তা সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির জন্য আয়। মূলত সরকারের দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনাতেই জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত হয়। দেশজ সামষ্টিক উৎপাদন বা জিডিপির পরিমাপে সেই উন্নয়নের গতিপ্রকৃতি ধরা পড়ে। যেকোনো দেশের জিডিপি হচ্ছে চার ধরনের ব্যয়ের সমষ্টি, যেমন—ভোগ, বিনিয়োগ, সরকারি ব্যয় (পারচেজ) ও নিট রপ্তানি (রপ্তানি বিয়োগ আমদানি) এবং একটা অর্থনীতিতে পণ্য ও সেবার চাহিদার অন্যতম একটা অংশ হচ্ছে সরকারের ক্রয় (বা ব্যয়)। পণ্য উৎপাদন এবং সেবা সৃষ্টির সঙ্গে জনগণের চাহিদা পূরণ প্রয়াসের সুসমন্বয় সাধন সরকারি আর্থিক ব্যয় ব্যবস্থাপনার দায়িত্বশীলতা ও কর্মকুশলতার ওপর নির্ভরশীল।
সরকার জনগণের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য বন্দুক ও রাইফেল, দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে রকেট লাঞ্চার, ট্যাংক এবং অন্যদিকে জনসেবার জন্য সরকার সরকারি কর্মকর্তাদের সেবা ক্রয় করে থাকে; জনসম্পদ তৈরির জন্য সরকার স্কুল নির্মাণ করে, শিক্ষক নিয়োগ দেয় ও লাইব্রেরির জন্য বই কেনে এবং জনস্বাস্থ্য সেবার জন্য হাসপাতাল গড়ে তোলে। অবকাঠামো গড়ে তুলতে সরকারি ব্যয়ের মধ্যে আরো আছে রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট ও অন্যান্য খরচ এবং এসব মিলিয়ে সংগঠিত হয় সরকারি ব্যয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ব্যয় সে দেশের জিডিপির ২০-২৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশে জিডিপির প্রায় ১৮ শতাংশ। অর্থনীতির প্রকৃতি অনুযায়ী সরকারকে আরো কিছু ক্ষেত্রে বাড়তি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় যেতে হয়। যেমন বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও দারিদ্র্য অধ্যুষিত অর্থনীতিতে সরকারি ব্যয়ের একটা সম্পূর্ণ আলাদা খাত হচ্ছে বিশেষত গরিব খানাগুলোকে আলাদা অর্থ দিয়ে সাহায্য করা, অথবা বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ভর্তুকি প্রদান করা, যেমন—বয়স্কভাতা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার জন্য অর্থ সাহায্য, সার বা ডিজেলের ওপর ভর্তুকি এবং অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। এ ধরনের সরকারি ব্যয় হস্তান্তর দেনা বলা হয়ে থাকে। অন্য ব্যয়ের সঙ্গে এই বিশেষ ব্যয়ের পার্থক্য হচ্ছে, সরকারি অন্যান্য ক্রয়ের কাজ অর্থনীতির কিছু পণ্য ও সেবার বিনিময়ে হয়ে থাকে, কিন্তু হস্তান্তর দেনা পরোক্ষভাবে কোনো পণ্য ও সেবার চাহিদাকে প্রভাবিত করে না। সরকার সক্ষম-সচ্ছল নাগরিকের ওপর কর আরোপ করে যেমন তাদের খরচ করার ক্ষমতা হ্রাস করে, তেমনি দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ভর্তুকি দিয়ে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ায়। জনগণের করের অর্থে যেহেতু ভর্তুকি দেওয়া হয়, তাই এসব সুবিধাভোগীর প্রাপ্তির সমান হচ্ছে করদাতাদের হারানো অর্থ। আর সে কারণে হস্তান্তর দেনা জিডিপির অংশ নয়। একইভাবে ভর্তুকির অর্থ যথাপাত্রে যাচ্ছে কি না, ভর্তুকি যথা উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তার ওপর নির্ভর করছে সমাজে সমান বণ্টন ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা। সরকার নিজে এই দায়িত্ব পালনে সরকারি অর্থ বণ্টন ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ হলে, কিংবা ভেদবুদ্ধির অভিসারী হলেই দেখা যাবে ‘ক্ষমতা’প্রাপ্তরা সম্পদশালী হয়েছে, আর নিঃস্বরা হয়েছে বঞ্চিত। পুরো অর্থনীতির সামষ্টিক ভারসাম্য এর দ্বারা বিনষ্ট হতে বাধ্য।
সরকারের উন্নয়ন ব্যয় যথাশৃঙ্খলায় না থাকলে সম্পদ সৃষ্টি ব্যতিরেকে অর্থ অর্থনীতিতে চলে যায় এবং অনুন্নয়ন ব্যয়ে যদি যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করা না হয় এবং উন্নয়ন ব্যয়ের মাধ্যমে তৈরি সম্পদ বা অবকাঠামোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ না করা হয়, তাহলে অর্থের অপচয় ও অপব্যবহার বৃদ্ধি পায়। এর ফলে একদিকে সম্পদের ক্ষয় হয়, অন্যদিকে অর্থনীতিতে অবৈধ সম্পদের প্রবাহ বাড়ে। এতে সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির ভারসাম্য দুর্বল হয়ে পড়ে। বাস্তবে যা ঘটে তা হলো ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত প্রতিষ্ঠান থেকে গৃহীত ঋণের পরিমাণ বাড়ে। সরকার যদি তার পরিকল্পিত ঋণের পরিমাণ রাজস্ব আহরণসহ ব্যাংক-বহির্ভূত প্রতিষ্ঠান থেকে নিতে ব্যর্থ হয়, কেবল তখনই ব্যাংকের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তবে একই সময়ে মনে রাখা দরকার, সরকার যখন সঞ্চয়পত্র থেকে কম ঋণ নেয়, তখন ব্যাংক জমাও বৃদ্ধি পায় এবং যেহেতু ব্যাংকের জমা বেড়ে যায়, তাই যুক্তি দেখানো যেতে পারে, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করেও অতিরিক্ত ঋণের চাহিদা মেটানো যায় তবে, এ ক্ষেত্রে ঋণের মাঠ থেকে ব্যক্তি খাতকে হটিয়ে দেওয়ার (ক্রাউড আউট) সম্ভাবনা কম থাকে।
সরকারের দরকারি-অদরকারি ব্যয় বিভাজনে ব্যর্থতার পরিবেশকে অর্থনীতিতে নোবেলবিজয়ী অমর্ত্য সেন ২০০১ সালে ‘নেহেরু বক্তৃতা’য় মিত্রপক্ষের গুলি (ফ্রেন্ডলি ফায়ার) পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করেছেন। সেনাবাহিনী সাধারণত শত্রু দেখলে তাক করে গুলি চালায় সত্য, কিন্তু শত্রু-মিত্র শনাক্ত করতে না পেরে কোনো কোনো সময় নিজের গুলিতে নিজের লোক মারা যায়। এটাকে ফ্রেন্ডলি ফায়ার বা আত্মঘাতী আক্রমণ বলা হয়। এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, আত্মঘাতী আক্রমণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর কমপক্ষে ৩০ শতাংশ সৈন্য মিত্রপক্ষের আক্রমণের শিকার হয়। অর্থনীতিতে আত্মঘাতী ব্যয় হিসেবে এমন কিছু সরকারি ব্যয়ের কথা বলা যায়, যা উপকারে না এসে বরং উল্টো অপকারে আসে।
এ কথা অনস্বীকার্য, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের স্বার্থে সরকারকে অব্যাহতভাবে ব্যয় বৃদ্ধি করতেই হবে। যেকোনো প্রকল্পের সার্বিক সাফল্যের জন্য যথাযথ ব্যয়ের প্রয়োজন আছে ঠিকই, কিন্তু এই ব্যয় যাতে সঠিকভাবে পরিচালিত হতে পারে সেই লক্ষ্যে মূল্যায়ন, তদারকি এবং দীর্ঘমেয়াদি ও অর্থ-বহির্ভূত প্রভাব পর্যালোচনা করা আবশ্যক। দরকারি ব্যয় বৃদ্ধি ও অদরকারি ব্যয় কমানোর জন্য শুধু নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলেই যথেষ্ট হবে না, সেগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও আরো বেশি নজরদারি বাড়ানো আবশ্যক।
লেখক : উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক