আজ পহেলা জুলাই। ঠিক দুবছর আগে এই দিনে আমাদের লড়াকু ছেলেমেয়েরা সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে আন্দোলনে নেমেছিল; যার পরিণতিতে মাত্র ৩৬ দিনের মধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাসের নিকৃষ্টতম ফ্যাসিস্ট শাসককে দেশ থেকে পালিয়ে দিল্লিতে তার প্রভুর চরণে আশ্রয় নিতে হয়েছিল।
আমি তখন ইস্তান্বুলে নির্বাসিত জীবনযাপন করছি। আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে আমি ভেবেছিলাম আগের কোটা আন্দোলনের চেয়ে বেশি কিছু প্রাপ্তি এবারও ঘটবে না। কিন্তু অতিদ্রুত কোটা সংস্কার আন্দোলনের সংকীর্ণ বয়ান বৃহত্তর বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ার আকাঙ্ক্ষার দিকে ধাবিত হলে আশান্বিত হয়ে উঠলাম।
আন্দোলনকারীদের এক অংশ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের প্রথমে অবৈধ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও পুলিশের আইজির পদত্যাগ, ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ এবং পর্যায়ক্রমে সরকার পতনের এক দফা দাবির পরামর্শ দিয়েছিলাম। যেহেতু আমি দেশের বাইরে ছিলাম, কাজেই মাঠের প্রকৃত উত্তাল চিত্র আমার জানা ছিল না।
এ প্রজন্মের অসীম সাহসিকতার মাত্রাও দূরে থেকে উপলব্ধি করতে পারিনি। আন্দোলনের গতি আমার ধারণাকে ছাড়িয়ে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় তখন চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। ১৬ জুলাই দুই হাত প্রসারিত করা আবু সাঈদের অবিস্মরণীয় শাহাদতের দৃশ্যে আমার মনে হয়েছিল এবার আর সম্ভবত শেখ হাসিনার শেষরক্ষা হবে না।
জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে তুরস্কের প্রখ্যাত মিডিয়া ‘ইয়েনি শাফাক’-এর স্টুডিওতে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি নিয়ে আমার একটি একক বক্তৃতা ছিল। সেখানে দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলাম, শুধু ভারতের সমর্থনের জোরে জনবিচ্ছিন্ন শেখ হাসিনার সরকার আর বেশিদিন টিকতে পারবে না। তার পরের ঘটনাপ্রবাহ আপনাদের সবারই জানা।
সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে ছয় বছরের নির্বাসন শেষে তরুণ বিপ্লবীদের প্রতি অগাধ স্নেহ আর অপরিসীম শ্রদ্ধার যুগপৎ অনুভূতি নিয়ে দেশে ফিরে এসেছিলাম। আমার প্রত্যাশা ছিল বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় হেজেমনির বিরুদ্ধে অন্যসব রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ দেখতে পাব। আমি রাজনীতিবিদ নই বলেই হয়তো বোকার মতো একেবারেই অবাস্তব স্বপ্ন দেখেছিলাম। দেশে ফিরে মোহভঙ্গ হতে সময় লাগেনি। দেখলাম, ক্ষমতায় যাওয়ার উদগ্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে।
ফ্যাসিবাদের দোসরদের চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করার পরিবর্তে তারা পরস্পরের ছিদ্রানুসন্ধানে ব্যস্ত। ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ করার জরুরি দাবিটিও আমাকে উত্থাপন করতে হয়েছিল। ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের প্রায় সমাপ্তি পর্যন্ত দুই দফার বন্দিজীবনে যাদের দিনের পর দিন জেলখানায় এক পাতে খেতে দেখেছিলাম, ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তি পেয়েই তারা একে অন্যের বিরুদ্ধে দিনরাত বিষোদ্গার করছেন। ১৫ বছর যারা একই ধরনের মজলুম ছিলেন, তারা একে অন্যকে যথাক্রমে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী এবং রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধী বলে গালমন্দ করছেন।
প্রসঙ্গক্রমে পুরোনো কথা বলছি। ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় জামায়াতের তৎকালীন আমির মতিউর রহমান নিজামী কৃষিমন্ত্রী এবং বিএনপির বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। সে সময় বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনরত আমি এবং তৎকালীন কৃষি প্রতিমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মিলে বাংলাদেশে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের এক ব্যতিক্রমধর্মী মেলার আয়োজন করেছিলাম। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সেই উদ্যোগে খুব আনন্দিত হয়েছিলেন এবং নিজে চীন মৈত্রী হলে মেলার উদ্বোধন করেছিলেন।
সেই সূত্র ধরেই বিএনপির বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেছিল। বিনিয়োগ বোর্ডের অফিসেই আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল। এরপর তার রাজনৈতিক জীবনের উত্থানের অনেক ঘটনাই আমি কাছ থেকে দেখেছি। আমার মনে পড়ছে না তিনি ‘রাজাকার মন্ত্রীর’ অধীনে প্রতিমন্ত্রিত্ব নিয়ে কখনো ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। চলমান সংসদেও তিনি নিজামীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। কিন্তু যখন সেই আলমগীর ভাইকে বাংলাদেশে মৌলবাদের কথিত উত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ নিয়ে একেবারে আওয়ামী বয়ানে বক্তব্য দিতে শুনি, তখন বড়ই আশ্চর্য হই। মুদ্রার অপর পিঠের কাহিনিও আছে।
আমার প্রায় পাঁচ বছরের জেল জীবনের অধিকাংশ সময় কাশিমপুর দুই নম্বর জেলে কেটেছে। সেই দীর্ঘ সময়ের বিভিন্ন পর্যায়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, এম কে আনোয়ার, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, আবদুস সালাম পিন্টু, রুহুল কবির রিজভী, শামসুজ্জামান দুদু, শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানিসহ বিএনপির অনেক নেতাকর্মী একই জেলে বন্দি ছিলাম। জামায়াত নেতাদের মধ্যে মীর কাসেম আলী তিনতলায় আমার পাশের সেলে প্রায় দুবছর ছিলেন। তিনি চলে যাওয়ার পর ওই একই সেলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একাধিকবার থেকেছেন। বর্ষীয়ান সাংবাদিক শফিক রেহমানও ওই সেলে বন্দি ছিলেন। জামায়াতের বর্তমান সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মৃত্যুদণ্ডের রায় পর্যন্ত প্রায় এক বছর একই বিল্ডিংয়ের দোতলার সেলে থাকতেন।
তিনি আমাকে বুড়ো বয়সে পবিত্র কোরআন শরিফ পড়তে শিখিয়েছিলেন। আর একজনের কথা না বললেই নয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দীর্ঘদিনের বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুন আমাদের বিল্ডিংয়ের তিনতলায় আরেক প্রান্তের সেলে থাকতেন। মামুনের সেলেই আমরা জামাতে নামাজ পড়তাম। মীর কাসেম আলী নামাজে ইমামতি করতেন। তিনি চলে যাওয়ার পর আমাদের নিয়মিত জামাতে নামাজ পড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
মামুনের সেলের সামনের বারান্দায় আমাদের তিনবেলা খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। সপ্তাহে এক দিন আমরা বাসা থেকে খাওয়া পেতাম। এছাড়া জেল কর্তৃপক্ষ আমাদের আলাদা রান্নার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। একজন কারারক্ষী আমাদের টাকায় বাজার করে আনতেন। গিয়াসউদ্দিন আল মামুন এসব কিছু দেখাশোনা করতেন। জেলে রান্না করা এবং সবার বাসা থেকে আনা সাপ্তাহিক খাবার আমরা ভাগ করে খেতাম। তখন কিন্তু কোনো জামায়াত নেতাকে বলতে শুনিনি যে, আমরা কোনো চাঁদাবাজের বাসা থেকে আনা অথবা তার টাকায় কেনা খাবার গ্রহণ করব না। রাজাকার ও চাঁদাবাজরা যে একে অন্যের দৃষ্টিতে অস্পৃশ্যÑসেটি আজকের ক্ষমতাবান নেতাদের বোধ হয় ফ্যাসিস্ট আমলে কারাগারে স্মরণে ছিল না।
রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য একে অন্যকে গালাগাল করবেন; আবার বিপদে পড়লে মুহূর্তের মধ্যেই গালাগালি ছেড়ে গলাগলি করবেনÑএতে আমাদের মতো আমজনতার কিছু যায়-আসে না। বরং এদের কাজকারবারে আমরা বেশ আমোদ অনুভব করি। কিন্তু তারা এত তাড়াতাড়ি যেভাবে ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তনের রাস্তা নির্মাণ করছেন, সেটি বিপজ্জনক। ভাই, ক্ষমতার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ভালো কথা।
কিন্তু আপনাদের কর্মকাণ্ডে যদি কোনোভাবে জুলাই বিপ্লব নিয়ে বৈধতার সংকট তৈরি হয়, তাহলে আপনারা তো বিপদে পড়বেনই, সেই সঙ্গে দেশের সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের অধিকারও আবার হুমকির মুখে পড়বে। ৩৬ জুলাই না ঘটলে আজকের সরকারি কিংবা বিরোধী দল কোনোটাই সৃষ্টি হতো না। আপনারা কি দেখতে পাচ্ছেন না যে, আপনাদের বিভাজনের সুযোগে এদেশের চিহ্নিত ভারতপন্থিরা আবার ফ্যাসিবাদের পক্ষে বয়ান তৈরির চেষ্টা করছে? দিল্লি থেকে শেখ হাসিনা এ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশে ফেরার হুমকি দেওয়ারও সাহস পাচ্ছে!
এদিকে সুশীলরা ফতোয়া দিচ্ছেন, স্বাধীনতার পর থেকে সব সন্ত্রাসের হোতা আওয়ামী লীগকে আর ‘সন্ত্রাসী’ বলা যাবে না। অথচ ব্যক্তিসন্ত্রাস থেকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, জনগণের ওপর যাবতীয় নির্যাতনের পন্থা আওয়ামী কারখানা থেকেই উৎপন্ন হয়েছে। ১৯৭৫ সালে একদলীয় বাকশাল যেমন আওয়ামী ‘প্রডাক্ট’ ছিল, একইভাবে এ শতাব্দীতে আওয়ামী ঘরানা থেকেই ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদ জন্ম নিয়েছে। শেখ মুজিব রক্ষীবাহিনী দিয়ে যে গুমের জন্ম দিয়ে গিয়েছিলেন, তাকেই শেখ হাসিনা ডিজিএফআই এবং র্যাবকে ব্যবহার করে আরো ব্যাপক ও নির্মমভাবে প্রয়োগ করেছেন।
‘আগেই ভালো ছিলাম’-মার্কা আওয়ামী বয়ান তৈরির জন্য দুর্নীতির কথিত সূচককে আবার ব্যবহার করা হচ্ছে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশে সব আমলেই দুর্নীতি হয়েছে। ড. ইউনূসের আমলও দুর্নীতিমুক্ত ছিল না। কিন্তু শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট জমানায় দুর্নীতি যে মাত্রায় উঠেছিল, তার সঙ্গে এ যাবৎ অন্য কোনো আমলের তুলনা হতে পারে না। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের তথাকথিত সুশীল সমাজ সে সময় ভয়ানক সব দুর্নীতি দেখেও না দেখার ভান করেছে।
একের পর এক ব্যাংক দখল হয়েছে এবং আমানতকারীদের লাখো-কোটি টাকা ডাকাতি হয়েছে; অথচ সুশীলরা নীরব থেকেছেন। তারা নাকি যুক্তি দিতেন, শেখ হাসিনা খারাপ হতে পারেন; তবে দেশের অন্য যেকোনো নেতার তুলনায় তিনি মন্দের ভালো। ফ্যাসিস্ট আমলে তারেক রহমান সম্পর্কে তারা কী বলতেন, সেটি লিখে বোধ হয় আজ আর কোনো লাভ নেই। ক্ষমতা প্রাপ্তির আনন্দে বিএনপি নেতারা সেগুলো শুনতে আগ্রহী নন। শুধু স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আপনাদের নতুন বন্ধুরাই ২০০১ থেকে টানা পাঁচ বছর বাংলাদেশের ললাটে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিপরায়ণ রাষ্ট্রের তিলক পরিয়ে দেওয়ার অনুঘটক ছিলেন। দুদিন আগে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের দুর্নীতির অনুসন্ধান দুদক দিয়ে করানোর জোরালো ঘোষণা দিয়েছেন।
অথচ আজ পর্যন্ত বিএনপির কোনো মন্ত্রীর মুখে আওয়ামী আমলের দুর্নীতির অনুসন্ধানের কথা শুনিনি। বরং শেখ পরিবার, অলিগার্ক ও আওয়ামী নেতাদের বিরুদ্ধে ড. ইউনূস আমলের সব অনুসন্ধান এখন দুদকে বাক্সবন্দি হয়ে আছে। তাহলে কি আমরা ধরে নেব যে, সুশীলদের মতো বিএনপির শীর্ষ নেতারাও বিশ্বাস করেন শেখ হাসিনা অন্যদের, এমনকি তাদের চেয়েও ভালো ছিলেন? স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী কদিন আগেই বিএনপি বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় মহানুভবতার সঙ্গে ফ্যাসিস্ট সরকারের জুলুম জাতিকে ভুলে যেতে বলেছেন।
সব মজলুম তার মতো এতটা মহৎ নাও হতে পারেন। প্রধানমন্ত্রীর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ দেখেও মনে হচ্ছে তিনি বাংলাদেশের ‘মন্দের ভালো’ এবং ‘আগেই ভালো ছিলাম’-মার্কা আওয়ামীপন্থি সুশীল সমাজের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে অধিকতর আগ্রহী। যাই হোক, প্রধানমন্ত্রী কোন রাজনীতিচর্চা করবেন কিংবা কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবেন, সেসব একান্তই তার বিবেচনা। আমাদের মতো আদার ব্যাপারীর সেই জাহাজের খবর নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ সংগ্রামে যৎকিঞ্চিৎ ভূমিকার কারণে হয়তো আজকের বিশেষ দিনে জুলাই বিপ্লব নিয়ে কিছু কথা বলার অধিকার দাবি করতে পারি।
৩৬ জুলাইকে আমি প্রথমাবধি বিভিন্ন বক্তব্য ও লেখায় ‘বিপ্লব’ বলে আখ্যায়িত করেছি। ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে আমার অন্যতম নালিশ ছিল যে, তিনি বিপ্লবী সরকার গড়তে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও তার সুশীল সমর্থকরা জুলাইকে ‘মব সন্ত্রাস’ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। বাংলাদেশের মিডিয়ায় ঐতিহ্যগতভাবে প্রভাবশালী ভারতপন্থি বাম তাত্ত্বিকরাও জুলাইকে ভয়ানক অপছন্দ করেন। কারণ, তাদের তত্ত্ব অনুযায়ী এটি একটি ইসলামপন্থি অভ্যুত্থান ছিল।
মব সন্ত্রাসের সঙ্গে ইসলামপন্থা জুড়ে দিয়ে এরা হাসিনার পতনের বিপক্ষে দেশ-বিদেশে বয়ান উৎপাদনের চেষ্টা করে চলেছেন। যে চিহ্নিত গোষ্ঠী একসময় বাংলাদেশে ইসলামি জঙ্গিবাদ আবিষ্কার করে হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনের পক্ষে বৈধতা উৎপাদন করত, তারাই ড. ইউনূসের আমলে মৌলবাদ ও উগ্রবাদের উত্থান খুঁজে পেয়েছিল। এখন আবার নতুন করে দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আনা হয়েছে। জুলাইকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সরকারি দল বিএনপি বেশ সমস্যায় পড়ে যায়। কারণ, তারা বিপ্লবের প্রধান উপকারভোগী। হাসিনার পতনের পর দলে ‘গুপ্ত জামায়াতের’ বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান চালাতে গিয়ে শীর্ষ নেতৃত্ব ‘গুপ্ত আওয়ামীদের’ জন্য দরজা খুলে দিয়েছেন। এ কারণেই গত প্রায় দেড় বছরে বিএনপি নেতাদের বয়ানের মধ্যে উপরোক্ত বাম ও আওয়ামীকরণ আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। তারাও নাকি বাংলাদেশে উগ্রবাদের উত্থান দেখছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনার পলায়নের পর বিএনপির আবেগাপ্লুত প্রভাবশালী নেতারা মিডিয়ায় যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন, সেখান থেকে তারা গত দুবছরে অনেকটাই সরে এসেছেন। নিজেদের সেসব বক্তব্য আবার শুনলে পার্থক্যটা তারা নিশ্চয়ই ধরতে পারবেন। জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির রাজনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আপত্তিকে সরকারে থাকার অভিজ্ঞতার আলোকে আমি একেবারে অযৌক্তিক মনে করি না।
কাজেই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ অপ্রত্যাশিত নয়। তবে সনদ বাস্তবায়নের ভয়ে খোদ জুলাই বিপ্লবকে ছোট করে দেখার মনোভাব সরকারি দলের নেতাদের আপন স্বার্থেই পরিত্যাগ করা উচিত। বিএনপির জুলাই নিয়ে বয়ান আওয়ামী প্রোপাগান্ডা ও ভারতপন্থি বাম ঘরানার তাত্ত্বিক বয়ানের সঙ্গে মিলে গেলে শেখ হাসিনার পতনের প্রক্রিয়াই যে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়— সেটি আশা করি বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব উপলব্ধি করবেন। শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন কি করেননি— এ বিতর্ক যারা তোলেন, তাদের উদ্দেশ্য সরকার বুঝতে না পারলে আখেরে তারাই পস্তাবেন। এক-এগারো থেকে কোনো শিক্ষা বিএনপি নিয়েছে কি না—সেটিও আমার জানা নেই।
মোট কথা, ৩৬ জুলাই ঘটিয়ে প্রকৃত স্বাধীনতাপ্রাপ্তির যে সুযোগ আমাদের তরুণরা সৃষ্টি করেছে, তাকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। কেউ ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করতে আর কেউ যথাসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য লড়াই করতে গিয়ে জুলাইয়ের মর্যাদাহানি করে উভয় গোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশের ও জনগণের জন্য বিপদ তৈরি করছে। ইতিহাস আপনাদের এই সুযোগসন্ধানী স্বার্থপরতাকে ক্ষমা করবে না।