হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে হলে কেন দরকার ডিজিটাল নজরদারি

মহিউদ্দিন আহমেদ

ধরুন, গতকাল বাজারে পেঁয়াজ ছিল ৪০ টাকা কেজি। আজ হঠাৎ ৭০ টাকা। কেন? দোকানি বলবেন, ‘আমদানি কম হয়েছে।’ পাইকার বলবেন, ‘গুদামে টান পড়েছে।’ কিন্তু সত্যিটা কী—দেশে আসলে কত পেঁয়াজ মজুত আছে, কোথায় আছে, কার হাতে আছে—তার কোনো সমন্বিত ও হালনাগাদ চিত্র রাষ্ট্র বা ক্রেতা কারো কাছেই নেই। এই ‘না-জানা’টাই বাংলাদেশের বাজারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। আর এই দুর্বলতার সুযোগ নেয় একদল মানুষ, যাদের আমরা বলি সিন্ডিকেট।

একটি দেশের অর্থনীতি ভালো থাকলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে, ব্যবসা বাড়ে, জীবন সহজ হয়। কিন্তু বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে, হঠাৎ দাম বেড়ে গেলে, কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি হলে সেই সুফল ভেস্তে যায়। তাই বাজার সুশৃঙ্খল রাখা শুধু অর্থনীতির প্রশ্ন নয়, এটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতারও প্রশ্ন।

দাম বাড়লে সরকার পড়ে বিপদে—মিসরের শিক্ষা

২০১২ সালে মিসরে নির্বাচিত হন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি। তার সময় জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎবিভ্রাট আর নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ২০১৩ সালে সেনাবাহিনী তাকে সরিয়ে দেওয়ার পরপরই আশ্চর্যজনকভাবে জ্বালানি আর বিদ্যুতের সংকট কমে যায়। প্রশ্ন ওঠে—আগের সংকট কি সত্যিই ঘাটতির কারণে ছিল, নাকি একটি অংশ ইচ্ছা করেই সংকট বাড়িয়েছিল সরকারকে অস্থির করতে? এর নিশ্চিত প্রমাণ নেই, মুরসি সরকারের নিজস্ব ভুলও নিশ্চয়ই ছিল। কিন্তু শিক্ষাটা স্পষ্ট—বাজার অস্বচ্ছ থাকলে দ্রব্যমূল্য নিছক অর্থনৈতিক সমস্যা থাকে না, তা যেকোনো সরকারকে ফেলে দেওয়ার রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।

সমস্যা কি পুরোপুরি বন্ধ করা যায়? না, কিন্তু ঠেকানো যায়

কোনো দেশেই মজুতদারি বা কারসাজি একেবারে বন্ধ করা যায় না। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রের কাজ শুধু সংকট হওয়ার পর অভিযান চালানো নয়—সংকট বড় হওয়ার আগেই তা ধরে ফেলা। প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ ভালো।

দাম বাড়ার পেছনে দুই ধরনের কারণ থাকে। এক ধরনের কারণ সত্যিকার—ডলারের দাম বাড়া, জ্বালানি খরচ বাড়া, বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফলন কমা। আরেক ধরনের কারণ মানুষের তৈরি—আমদানিকারক, মিলমালিক, পাইকার, আড়তদার, গুদামমালিক ও পরিবহন ব্যবসায়ীদের একাংশের সমন্বয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে পণ্য আটকে রাখা। কিন্তু সমন্বিত ও তাৎক্ষণিক তথ্য না থাকায় এই দুই ধরনের কারণের মধ্যে দ্রুত পার্থক্য করা রাষ্ট্রের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

তথ্য ছড়িয়ে আছে, কিন্তু কেউ জোড়া লাগায় না

কাস্টমস জানে বন্দরে কত পণ্য এসেছে। ব্যাংক জানে কত ঋণপত্র খোলা হয়েছে। কৃষি বিভাগ জানে উৎপাদনের হিসাব। প্রশাসন আর ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর করে বাজার তদারকি। কিন্তু এসব তথ্য যার যার দপ্তরে বন্দি—কেউ এক জায়গায় জোড়া লাগায় না। ফলে দেশে পর্যাপ্ত পণ্য থাকলেও কোথায় সংকট তৈরি হলো, কে অস্বাভাবিক মুনাফা করছে, তা সময়মতো কেউ বলতে পারে না।

এই তথ্যঘাটতি থেকেই জন্ম নেয় এক ধরনের ‘অদৃশ্য বাজার সরকার’—কেউ তাদের ভোট দেয়নি, তবু তারাই ঠিক করে কখন পণ্য বাজারে ছাড়া হবে, কতটা আটকে রাখা হবে, কোন অজুহাতে দাম বাড়বে। প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র কি বাজারের লাগাম এই অদৃশ্য শক্তির হাতে ছেড়ে দেবে?

উত্তর একটাই—‘না।’

সমাধানটা কেমন হতে পারে—একটা সহজ উদাহরণ

কল্পনা করুন, কুরিয়ারে একটা পার্সেল পাঠালে আপনি মোবাইলে ট্র্যাক করতে পারেন—পার্সেলটা এখন কোথায়, কবে পৌঁছাবে। দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে এই সুবিধাটাই নেই। পেঁয়াজের একটা ট্রাক বন্দর থেকে বের হয়ে কোথায় গেল, কোন গুদামে থামল, কবে বাজারে এলো—কেউ জানে না।

এই সমস্যার সমাধানে চালু করা যায় একটি ‘কেন্দ্রীয় ডিজিটাল মজুত ও বাজার পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা’—সহজ কথায়, নিত্যপণ্যের জন্য একটা জাতীয় ট্র্যাকিং অ্যাপ ও ওয়েবসাইট। এতে নিবন্ধিত থাকবেন লাইসেন্সপ্রাপ্ত আমদানিকারক, মিলমালিক, বড় পাইকার, আড়তদার, গুদামমালিক ও পরিবহনকারীরা।

তাদের নিয়মিত জানাতে হবে—কত পণ্য এলো, কতটা বিক্রি হলো, বর্তমান মজুত কত, কী দামে কেনাবেচা হচ্ছে। কাজটা কঠিন নয়—মোবাইল ফোনে কয়েকটা ঘর পূরণ করলেই হয়, প্রয়োজনে রসিদের ছবি তুলে যুক্ত করা যায়। ইন্টারনেট না থাকলেও তথ্য ফোনে জমা থাকবে, সংযোগ ফিরলেই আপলোড হয়ে যাবে। ব্যবসায়ীর দেওয়া তথ্য কাস্টমস, ব্যাংক, ই-চালান, গুদাম পরিদর্শন ও পরিবহন নথির সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিলিয়ে দেখার ব্যবস্থা থাকতে হবে; ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দেওয়ার জন্য থাকতে হবে শাস্তি।

কে কী দেখতে পাবে, কে পাবে না

সবার সব তথ্য দেখার দরকার নেই, আর দেখা উচিতও না। ব্যবসায়ী দেখবেন শুধু নিজের প্রতিষ্ঠানের তথ্য। সরকারি কর্মকর্তা দেখবেন বাজার তদারকির জন্য যতটুকু দরকার। সাধারণ মানুষ দেখবেন শুধু দৈনিক বাজারদর আর সরবরাহ পরিস্থিতি। কারো ব্যবসার গোপন তথ্য কারো কাছে ফাঁস হবে না—স্বচ্ছতা থাকবে, আবার ব্যক্তিগত গোপনীয়তাও সুরক্ষিত থাকবে। তথ্য কে দেখতে পারবেন, কত দিন সংরক্ষিত থাকবে এবং কোন পরিস্থিতিতে তদন্তে ব্যবহার করা যাবে—আইন ও নিরপেক্ষ তদারকির মাধ্যমে তা নির্ধারণ করতে হবে। শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা ছাড়া এমন কেন্দ্রীভূত তথ্যভান্ডার নিজেই ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

একটা গল্প দিয়ে বোঝা যাক : পেঁয়াজ কোথায় গেল

ধরুন একটি প্রতিষ্ঠান ভারত বা চীন থেকে পেঁয়াজ আমদানি করল। বন্দরে কাস্টমস ছাড়পত্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমদানির পরিমাণ, দাম আর গন্তব্য গুদাম—সব তথ্য প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়ে যাবে। এরপর কোন পাইকারের কাছে কতটা গেল, তাও নথিভুক্ত থাকবে। দেশে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ ঢোকার পরও যদি বাজারে ছাড়ার হার হঠাৎ কমে যায়, সিস্টেম নিজে থেকে সতর্কবার্তা পাঠাবে। প্রশাসন তখন নির্দিষ্ট গুদামে গিয়ে তদন্ত করবে—হাজারো নিরপরাধ ব্যবসায়ীকে অন্ধভাবে হয়রানি করার দরকার পড়বে না। যে অপরাধী নয়, সে বিরক্ত হবে না; যে অপরাধ করছে, সে ধরা পড়বে।

অন্য দেশ কী করছে

ভারতের e-NAM নামের ডিজিটাল বাজারব্যবস্থা বহু কৃষিবাজারকে এক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করেছে। এর মাধ্যমে কৃষক বিভিন্ন বাজারের দাম জানতে পারেন এবং স্বচ্ছ নিলামের ভিত্তিতে ভালো মূল্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। চীনে কৃষিপণ্যের পাইকারি মূল্যসূচক প্রায় ২০০টি পাইকারি বাজারের তথ্য থেকে তৈরি হয় এবং প্রতিদিন হালনাগাদ করা হয়; ফলে মূল্য পরিবর্তনের প্রবণতা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। তুরস্কের ‘Hal Kayıt Sistemi’-তে ফল ও সবজির উৎপাদন, মালিকানা পরিবর্তন, স্থানান্তর ও বাজারজাতকরণের তথ্য ইলেকট্রনিকভাবে নথিভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশ এই তিন দেশের ভালো দিকগুলো মিলিয়ে নিজের মতো একটা মডেল তৈরি করতে পারে। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আমাদের আছে; প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আন্তঃদপ্তরীয় সমন্বয় এবং নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ।

কীভাবে শুরু করা যায়

একসঙ্গে সারা দেশে চালু করার দরকার নেই। প্রথম ছয় মাসে মাত্র ১০টি পণ্য দিয়ে শুরু করা যায়—চাল, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, চিনি, ডাল, আলু, ডিম, আটা-ময়দা, রসুন ও আদা। প্রথমে বড় বন্দর, বড় আমদানিকারক আর প্রধান পাইকারি বাজারগুলো যুক্ত হবে, পরে ধাপে ধাপে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠন করা যায় একটি বাজার তথ্য ও সরবরাহ পর্যবেক্ষণ ইউনিট, যেখানে থাকবেন অর্থনীতিবিদ, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, পরিসংখ্যানবিদ আর ভোক্তা প্রতিনিধিরা। তারা প্রতিদিন তথ্য বিশ্লেষণ করবেন, সপ্তাহে সতর্কতা প্রতিবেদন দেবেন, আর নিয়মিত সাধারণ মানুষকে জানাবেন বাজারের হালচাল।

শুধু প্রযুক্তি দিয়ে হবে না

একটা কথা স্পষ্ট করে বলা দরকার—শুধু অ্যাপ বানালেই সিন্ডিকেট ভাঙবে না। সফটওয়্যার তৈরির নামে যদি অস্বচ্ছ দরপত্র হয়, বাড়তি খরচ হয়, তথ্যের অপব্যবহার হয়, তাহলে পুরো উদ্যোগ ভেস্তে যাবে। একই সঙ্গে বন্ধ করতে হবে পরিবহনে চাঁদাবাজি আর দলীয় পরিচয়ে বাজার দখল। ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ যদি আড়ত বা ট্রাক টার্মিনাল দখল করে, দলীয় পরিচয় না দেখেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। মানুষ তখনই বিশ্বাস করবে সরকার সিন্ডিকেট ভাঙছে, যখন আইন নিজের দলের প্রভাবশালীর বিরুদ্ধেও সমানভাবে প্রয়োগ হবে।

শেষকথা

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ কোনো একটা মন্ত্রণালয়ের সাময়িক অভিযান দিয়ে হয় না। এটা অর্থনীতি, প্রশাসন, প্রতিযোগিতা আর রাজনৈতিক জবাবদিহিতার সম্মিলিত কাজ। কেন্দ্রীয় ডিজিটাল মজুত ও বাজার পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা সৎ ব্যবসায়ীর জন্য তৈরি করবে সমান প্রতিযোগিতা, কৃষককে জানাবে প্রকৃত বাজারমূল্য, সরকারকে দেবে আগেভাগে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা, আর সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায্য দামে পণ্য পাওয়ার পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করবে।

বাংলাদেশে বাজার অস্থিরতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বছরের পর বছর। এখন আর দরকার নেই আরেকটা কমিটি বা সাময়িক অভিযান। দরকার এমন একটা ব্যবস্থা, যেখানে কোন পণ্য কোথায়, কতটুকু, কত দামে আছে—তার উত্তর রাষ্ট্রের হাতে থাকবে প্রতিদিন। বিএনপি সরকার যদি এই স্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে, তাহলে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সেটাই হবে তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য।

লেখক: মহিউদ্দিন আহমেদ, কানাডাপ্রবাসী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপে নতুন বিধিনিষেধ যুক্তরাষ্ট্রের

দাদনের জালে দুঃসহ জীবন যমুনাপাড়ের জেলেদের

১১ অঞ্চলে বৃষ্টির পূর্বাভাস দিল আবহাওয়া অধিদপ্তর

ওআইসির নতুন মহাসচিব ইসমাইল উলদ শেখ আহমেদ

পাঁচ ছাত্র সংসদের পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা

ভেনেজুয়েলার তেলভান্ডারের এক-পঞ্চমাংশ দখলে নেওয়ার ঘোষণা ট্রাম্পের

ছয় মাসের যুদ্ধেও অটুট ইরান, লক্ষ্যহীন যুক্তরাষ্ট্র

নদীতে ডুবে শিশুর মৃত্যুই যেখানে নিয়তি

দিল্লির তাঁবেদারি করতে মিথ্যা তথ্য ছড়ায় ফ্যাসিস্ট সরকার

হাইভোল্টেজ ম্যাচে চ্যাম্পিয়নস লিগ জমজমাট