হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

বাজেট নিয়ে যে জরুরি প্রশ্নটি কেউ করে না

আমিনুল মোহায়মেন

বাজেট নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আমাদের কোনো ফোরামেই প্রায় উত্থাপিত হয় না—সংসদের ভেতরে কিংবা বাইরে, কোথাও নয়। ফলে বাজেট-আলোচনা হয়ে ওঠে গতানুগতিক, ভাসাভাসা এবং অনেকাংশেই ফলহীন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো প্রস্তাবিত বাজেটই উল্লেখযোগ্য সংশোধন ছাড়া পাস হয়েছে! কারণ, আলোচনায় সাধারণত এমন প্রশ্নই ওঠে, যার উত্তর মোটামুটি সবারই জানা। যেমন—শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৩ শতাংশ না হয়ে ২ শতাংশ কেন অথবা কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর কর বাড়ানো হলো কেন।

কিন্তু যে প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেটি কী?

প্রশ্নটি বোঝার জন্য শিক্ষা খাতের দিকে তাকানো যাক।

১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বাজেট ছিল ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১,১১,১৫৭ কোটি টাকাÑঅর্থাৎ প্রায় ৩৫ গুণ বৃদ্ধি। প্রশ্ন হলো, বাজেট ৩৫ গুণ বাড়লেও কি শিক্ষার মান বা কার্যকারিতা ৩৫ গুণ বেড়েছে?

বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। শিক্ষার আওতা কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও গুণগত মান তলানিতে ঠেকেছে। বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের Learning to Realize Education’s Promise প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের তৃতীয় শ্রেণি পাস করা প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থীর মৌলিক গণিত দক্ষতা নেই। একইভাবে, একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, পঞ্চম শ্রেণি উত্তীর্ণ ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সি নারীদের প্রায় ৯০ শতাংশ একটি বাংলা বাক্যের সব শব্দ সঠিকভাবে পড়তে পারেননি।

স্বাস্থ্য খাতেও একই চিত্র দেখা যায়। ২০০০-০১ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১,১১২ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৪১,৪০৮ কোটি টাকাÑপ্রায় ৩৭ গুণ বৃদ্ধি। কিন্তু সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান বা বিস্তৃতি কি ৩৭ গুণ উন্নত হয়েছে?

এখানেই আসে সেই অনালোচিত প্রশ্নটি—

‘এত বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু সেই অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে বাস্তব ফল নিশ্চিত করতে সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে?’

এই প্রশ্ন শুধু শিক্ষা বা স্বাস্থ্য নয়; আইনশৃঙ্খলা, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্যবিমোচনসহ প্রতিটি খাতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

অনেকে বলতে পারেন, বাজেটের কাজ তো বরাদ্দ দেওয়া; ব্যয়ের ফল নিশ্চিত করা কি বাজেটের দায়িত্ব?

উত্তর হলো—হ্যাঁ, অন্তত তার জন্য কাঠামোগত ব্যবস্থা তৈরির সুযোগ অবশ্যই আছে। এজন্য নিচের বিষয়গুলো আলোচনায় আনা যেতে পারেÑ

১. মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোকে আলোচনায় আনতে হবে

এক দশক ধরে বাজেটের সঙ্গে ‘মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো’ প্রকাশ করা হয়ে থাকে। এতে উল্লেখ থাকে, প্রস্তাবিত ব্যয় থেকে কী ধরনের ফল প্রত্যাশিত। কিন্তু এই দলিল নিয়ে সংসদে বা জনপরিসরে খুব কম আলোচনা হয়।

উদাহরণ হিসেবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ধরা যায়। তাদের মধ্যমেয়াদি কৌশলগত উদ্দেশ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ’। কিন্তু ৪৬ দশমিক ৭৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করে শিক্ষার মান কতটা উন্নত হবে, সাক্ষরতা বা গণিত দক্ষতা কত শতাংশ বাড়বেÑএ ধরনের পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য সেখানে নেই।

জনপ্রতিনিধি ও গবেষকদের উচিত এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন তোলা।

২. প্রণোদনা প্যাকেজের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে

প্রতিবছর বিভিন্ন খাতে প্রণোদনা দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য থাকে দুর্বল খাতকে সহায়তা করা। কিন্তু এসব অর্থ কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্যে ব্যয় হচ্ছে কি নাÑতা নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা কীÑসেই প্রশ্ন খুব কমই ওঠে।

প্রণোদনার অর্থের ব্যবহার, ফল এবং জবাবদিহির কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা প্রয়োজন।

৩. রাজস্ব ব্যয়ের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নের ব্যবস্থা কোথায়

উন্নয়ন প্রকল্প মূল্যায়নের জন্য বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) রয়েছে। কিন্তু রাজস্ব বাজেটের আওতায় পরিচালিত কর্মসূচি ও কার্যক্রম মূল্যায়নের জন্য কোনো পৃথক প্রতিষ্ঠান নেই।

অথচ এখন রাজস্ব বাজেটে শুধু বেতন-ভাতা বা পরিচালন ব্যয় নয়, বিপুল পরিমাণ উন্নয়নধর্মী ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকে। জনগণের অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে এবং তার ফল কীÑতা জানার জন্য একটি কার্যকর মূল্যায়ন ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

৪. অডিট ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করতে হবে

সরকারি ব্যয়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম হাতিয়ার হলো নিরীক্ষা। কিন্তু অডিট রিপোর্ট প্রকাশে দীর্ঘ সময় লেগে গেলে তার কার্যকারিতা কমে যায়। অতি সম্প্রতি পাঁচ বছর আগের, ২০২১-২২ সালের, অডিট রিপোর্ট রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।

যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নিরীক্ষা কার্যক্রমে অগ্রগতি হয়েছে, তবু সময়মতো অডিট সম্পন্ন ও রিপোর্ট প্রকাশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এই বিভাগের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়ার জন্য সংসদ সদস্যদের সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া উচিত।

৫. সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে বিশেষজ্ঞ সহায়তা দিতে হবে

প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য জাতীয় সংসদে একটি স্থায়ী কমিটি রয়েছে। কিন্তু শুধু সংসদ সচিবালয়ের প্রশাসনিক ও সাচিবিক সহায়তায় জটিল নীতিগত ও কারিগরি বিষয় মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।

উদাহরণস্বরূপ, প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান পরিমাপ করা একটি বিশেষায়িত কাজ। এজন্য বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান বা গবেষকদের সহায়তা প্রয়োজন। স্থায়ী কমিটিগুলোর জন্য এমন সহায়তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত বাজেট ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা থাকা জরুরি।

বাংলাদেশের জনগণ কর এবং ঋণের বোঝা বহন করে একটি বিশাল বাজেটের অর্থ জোগান দেয়। তাই শুধু কত টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলো, সেই আলোচনা যথেষ্ট নয়। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলোÑসেই অর্থ থেকে জনগণ কী ফল পাচ্ছে।

বাজেট আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত এই প্রশ্ন : ‘ব্যয় নয়, ফল কোথায়?’

যেদিন সংসদ সদস্য, গবেষক ও নাগরিক সমাজ এই প্রশ্নটিকে বাজেট আলোচনার মূল বিষয় বানাবে, সেদিনই বাজেট পর্যালোচনা আরো অর্থবহ এবং কার্যকর হয়ে উঠবে।

লেখক : জনঅর্থ ব্যবস্থাপনা ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ

‘ক্ষমতার বদহজম’ এবং আজকের রাজনীতি

আগুনে যেন না পোড়ে বাংলাদেশের স্বপ্ন!

প্রশ্নপত্র ফাঁসের পুরোনো ব্যাধি

বিরোধিতার মাঝে ঐক্যের প্রত্যাশা

অনলাইন চাকরির প্রতারণা ও প্রতিকার

ভারতে হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসের যথাসাধ্য প্রতিবাদ করুন

শিক্ষকতা যেন ‘উপায়হীন বিকল্প’ না হয়

ফিলিস্তিন রক্ষার দায়বদ্ধতা

খুব বেশি পথ খোলা নেই সৌদি আরবের

ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে ফেলাই সমাধান