ইউরোপের বলকান অঞ্চলকে ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক সংযোগস্থল হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলো প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রতিযোগিতা করে। দীর্ঘদিন ধরে অস্থির এই অঞ্চলটি আজ আর শুধু একটি মনোরম ট্রানজিট করিডোর বা যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের ক্ষেত্র নয়; বরং এটি এমন এক কৌশলগত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে, যেখানে পশ্চিমা বিশ্ব ও ইসরাইল নতুন বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক মানচিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছে।
কৃষ্ণ সাগর, অ্যাড্রিয়াটিক ও ভূমধ্যসাগরীয় ট্রানজিট করিডোর এবং এর প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং ভূগর্ভস্থ সম্পদের জন্য বলকান অঞ্চলের সামরিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব অপরিসীম। ইউরোপে আজ যখন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের গুঞ্জন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, তখন বলকান অঞ্চল বহুমাত্রিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে। বিশ্ব শক্তিগুলোর কূটকৌশল, গোয়েন্দা যুদ্ধসহ নানামুখী লড়াইয়ে নতুন রূপ পাচ্ছে এই অঞ্চলটি।
আলবেনিয়া নিয়ে পশ্চিমা আগ্রহ
আলবেনিয়ায় সম্প্রতি শুরু হওয়া প্রবল গণবিক্ষোভের মূল কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জারেড কুশনারের মালিকানাধীন কোম্পানির অর্থায়নে বিলাসবহুল রিসোর্ট নির্মাণ প্রকল্প। আলবেনিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের সাজান দ্বীপে ভেন্ডারে নামে পরিচিত সংরক্ষিত জলাভূমি ও ফ্লেমিঙ্গো পাখির প্রজনন কেন্দ্রে এই রিসোর্ট নির্মাণের প্রতিবাদে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভ ‘ফ্লেমিঙ্গো বিপ্লব’ নামে পরিচিতি পাচ্ছে। স্থানীয় জনগণ মনে করে, কুশনারের প্রকল্পের মাধ্যমে আলবেনিয়ার ভূমি ও প্রকৃতি বিদেশিদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। রাজধানী তিরানাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাজার হাজার মানুষ ‘আলবেনিয়া বিক্রির জন্য নয়’ স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ করছেন।
আলবেনিয়ার খ্রিষ্টান প্রধানমন্ত্রী এডি রামার সরকার সম্প্রতি জারেড কুশনারের ওই পর্যটন প্রকল্প বাস্তবায়নে আইন সংশোধন করে। সংবেদনশীল একটি অঞ্চলে এই প্রকল্পটি ‘গোপন দখলদারিত্বের’ ভয় জাগিয়ে তুলেছে আলবেনীয়দের মধ্যে। ইসরাইলি বিনিয়োগকারীরা ইউরোপের নাগরিকত্ব ব্যবহার করে বলকান অঞ্চলে জমি কিনছেÑএমন অভিযোগে এই উদ্বেগ আরো বেড়েছে।
আলবেনীয় শিক্ষাবিদ ফ্রেডিনান্ট হাসমুচা তার দেশের পর্যটন, রিয়েল এস্টেট, জ্বালানি এবং পরিষেবা খাতে ইসরাইল-সংশ্লিষ্ট ৬৮টি কোম্পানি কার্যক্রম শুরু করেছে, যার মধ্যে ৫৪টি সরাসরি ইসরাইলি নাগরিকদের প্রতিষ্ঠিত এবং ১৪টি আলবেনীয় ও ইসরাইলি অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে গঠিত। ইসরাইলি বিনিয়োগকারীরা বুলগেরিয়া, রোমানিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নাগরিকত্ব ব্যবহার করে বা সরাসরি আলবেনীয় জাতীয়তা অর্জন করে ‘গোপন’ পদ্ধতিতে এখানে জমি কিনছে।
এই বিনিয়োগ শুধু ইউরোপ, আড্রিয়াটিক ও ভূমধ্যসাগরের প্রবেশদ্বারই নয়, বরং আলবেনিয়ার পাশালিমান নৌঘাঁটির মতো কৌশলগত সামরিক অঞ্চলেরও খুব কাছে অবস্থিত। এ অঞ্চলে তুর্কি নৌবাহিনীও তাদের উপস্থিতি বজায় রাখে। হাসমুচা বলেন, এই এলাকায় জমি কেনার পেছনে পর্যটনের আড়ালে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক হিসাবনিকাশ রয়েছে।
গত জানুয়ারিতে ইসরাইল সফরের সময় দেশটির পার্লামেন্ট নেসেটে দেওয়া ভাষণে এডি রামা ইসরাইলি নীতির প্রতি আলবেনিয়ার কূটনৈতিক সমর্থন জানান। তিনি বলেন, ‘যতক্ষণ না হামাসকে সম্পূর্ণ নির্মূল করা হচ্ছে, ততক্ষণ গাজার ২০ লাখ বন্দি কখনোই সত্যিকারের মুক্তি পাবে না এবং কোনো শান্তিই স্থায়ী হবে না।’
এছাড়া আলবেনিয়াকে ইসরাইলের দেওয়া সাইবার নিরাপত্তা সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে রামা দুদেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ঘোষণাও দেন। তিনি বলেন, ‘ইসরাইল আমাদের বন্ধু দেশ। আমরা প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে ইসরাইলের সঙ্গে সহযোগিতা আরো গভীর করব।’
ধর্মীয় প্রকৌশল
২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী আলবেনিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশ মুসলিম। কিন্তু দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ এই জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে একধরনের সূক্ষ্ম ‘পরিচয় প্রকৌশল’ চলছে। দেশটির সুফি মতবাদভিত্তিক শিয়া গোষ্ঠী বেকতাশি সম্প্রদায় বলকান অঞ্চল, বিশেষ করে আলবেনিয়ায় সক্রিয় রয়েছে। ১৩০০ শতাব্দীতে তৎকালীন আনাতোলিয়ায় (বর্তমান তুরস্ক) হাজি বেকতাস ওয়ালী এই সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু বর্তমানে এর আন্তর্জাতিক সদর দপ্তর আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় অবস্থিত। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী এই সম্প্রদায়ের সদস্য সংখ্যা আলবেনিয়ার জনসংখ্যার ৫ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে। এই সম্প্রদায়ের বর্তমান নেতা ‘বাবা মন্ডি’ ও প্রধানমন্ত্রী এডি রামা রাজধানী তিরানায় ভ্যাটিকান ধাঁচের একটি সার্বভৌম মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নিয়ে ২০২৪ সালে আলোচনা করেন। ‘বাবা মন্ডি’ সম্প্রতি ভ্যাটিকানে পোপের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করে বেকতাশি ক্ষুদ্র-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা নিয়ে আলোচনা করেন।
সমালোচকদের মতে, এই উদ্যোগ পরিকল্পিত রাজনৈতিক চাল, যা বলকান অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী মুসলিম কাঠামোকে ভেঙে ফেলার এবং এই অঞ্চলে তুরস্কের দীর্ঘদিনের সফট পাওয়ারকে প্রতিহত করার একটি চক্রান্ত। একটি নির্দিষ্ট সুফি সম্প্রদায়ের জন্য এই ব্যতিক্রমী ক্ষুদ্র-রাষ্ট্রের প্রতি আলবেনিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও খ্রিষ্টান নেতা এডি রামার জোরালো সমর্থন এই সন্দেহকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে যে, পশ্চিমা বিশ্ব তাদের সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা এজেন্ডা বাস্তবায়নে এই অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চক্রান্ত করছে।
আলবেনিয়ার মুসলমানরা এই উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করে করে বলেছেন, ‘এ ধরনের উদ্যোগ বিপজ্জনক এবং তা দেশের ধর্মীয় সম্প্রীতিকে হুমকির মুখে ফেলবে। ইসলাম ধর্ম একটি অখণ্ড সত্তা। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রগঠন অগ্রহণযোগ্য’, যা ঐতিহ্যবাহী মুসলিম সমাজের ভাঙনের আশঙ্কাকে জোরদার করেছে। ভূরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ জাঙ্কো শেপানোভিচ বলেছেন, তিরানাভিত্তিক সার্বভৌম বেকতাশি রাষ্ট্রগঠনের উদ্যোগ আলবেনিয়াসহ এ অঞ্চলে তুরস্কের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিহত করার জন্য পরিকল্পিত ‘বলকান ইসলাম’-এর পশ্চিমা-সমর্থিত একটি মডেল।
পশ্চিমা বিশ্ব ও ইসরাইলের এই যৌথ রাজনৈতিক কৌশলের বিরুদ্ধে আলবেনিয়ার মুসলমানরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ইলির মেটা এবং বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা এই উদ্যোগের নিন্দা জানিয়ে রামাকে সংবিধান লঙ্ঘন ও ‘অন্ধকার আন্তর্জাতিক এজেন্ডা’ বাস্তবায়নের জন্য অভিযুক্ত করেছেন। তারা বলছেন, বহিরাগত শক্তির নিরাপত্তা কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে এই চক্রান্ত করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটন ও ন্যাটোর জন্য পশ্চিম বলকান একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট অঞ্চল এবং তাদের প্রভাবের একটি ক্ষেত্র যা ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগর, কৃষ্ণ সাগর ও মধ্য ইউরোপের মধ্যে একটি কৌশলগত সংযোগ স্থাপন করে। এ অঞ্চলে মার্কিন কূটনীতির প্রধান লক্ষ্য হলো সার্বিয়া ও সার্ব রাজনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় রাশিয়ার কৌশলগত প্রভাব সীমিত করা এবং সার্বিয়ার সম্পূর্ণ মস্কোর বলয়ে চলে যাওয়া ঠেকানো।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ অঞ্চলে ব্যাপক অবকাঠামোগত বিনিয়োগ, রেলপথ উন্নয়ন, জ্বালানি প্রকল্প এবং অর্থায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে চীনের অর্থনৈতিক প্রভাবের দ্রুত বিস্তারে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ বাড়ছে। তবে, এ অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক কৌশল শুধু প্রধান বিশ্ব শক্তিগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
বাড়ছে ইসরাইলি প্রভাব
বলকান অঞ্চলে ইসরাইলের পরিকল্পনাও ক্রমেই উন্মোচিত হচ্ছে। গ্রিসের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্বের বাইরেও অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা, অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর মাধ্যমে ক্যাস্পিয়ান সাগর থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি রেখা বরাবর ইসরাইল তার কৌশলগত প্রভাব প্রসারিত করছে।
বলকান দেশগুলোর নির্বাচনে ইসরাইলি কারসাজির প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে এবং এর ফলে ইসরাইলপন্থি রাজনৈতিক পরিবর্তনের ভিত্তি দৃঢ় হচ্ছে। ইসরাইলি বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অপতথ্যের মাধ্যমে বলকানসহ বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক নির্বাচনকে বানচাল বা প্রভাবিত করে আসছে।
বুলগেরিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতায় ইসরাইলের এই ছায়া হস্তক্ষেপ বাস্তব ফল দিয়েছে। গত এপ্রিলে ইসরাইলের প্রতি অনুকূল বলে বিবেচিত একটি সরকার ক্ষমতায় আসে বুলগেরিয়ায়। এর আগে স্লোভেনিয়ায়ও অনুরূপ ঘটনা ঘটে। স্লোভেনিয়ায় এ বছরের নির্বাচনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী রবার্ট গোলোবের দল সর্বাধিক ভোট পাওয়া সত্ত্বেও ইসরাইলপন্থি বিরোধী দল সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল। গুঞ্জন আছে যে, ইসরাইল বিরোধী গোলোব নির্বাচনে কারসাজির শিকার হয়েছেন। এই জল্পনার সূত্রপাত হয় ইসরাইলি বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থা ব্ল্যাক কিউবের বিরোধী দলের সঙ্গে কাজ করার বিষয়টি ফাঁস হওয়ার পর। এসব ঘটনা থেকে স্পষ্ট, নিজেদের অনুগত সরকার বসানোর জন্য ইসরাইল বলকান অঞ্চলে হস্তক্ষেপ করে থাকে।
ইসরাইল তার প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে সার্বিয়ার সঙ্গেও সম্পর্ক গভীর করেছে। ২০২১ সালে দুদেশ সামরিক-প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং ২০২২ সালে সাইবার নিরাপত্তা অংশীদারত্ব চুক্তি করে। সার্বিয়ার এসডিপিআর এবং ইসরাইলের এলবিট সিস্টেমস যৌথ ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। এতে ইসরাইলি সংস্থাটির ৫১ শতাংশ অংশীদারত্ব থাকবে। আরেক বলকান দেশ মন্টিনিগ্রো ২০২২ সালের যৌথ অর্থনৈতিক সহযোগিতা চুক্তির মাধ্যমে ইসরাইলি অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে। এই চুক্তি অ্যাড্রিয়াটিক উপকূলে বিপুল ইসরাইলি পুঁজি বিনিয়োগে ভূমিকা রেখেছে।
এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো স্থানীয় ঘটনা নয়, বরং বৈশ্বিক দাবা খেলার পরস্পর সংযুক্ত চাল, যেখানে নতুনভাবে মেরূকরণ করা বিশ্বে রণাঙ্গনগুলো সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত হচ্ছে। বলকান অঞ্চলের দেশগুলো ছোট এবং ভঙ্গুর। এসব দেশ তাদের অর্থনীতির উন্নয়ন এবং অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে জোট গঠন করতে বাধ্য হয়। এ খেলায় দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হওয়া এড়ানো ও চক্রান্ত থেকে দূরে থাকার জন্য বলকান দেশগুলোর একমাত্র উপায় হলো নিজেদের সার্বভৌম ও স্বাধীন কণ্ঠস্বর স্পষ্টভাবে তুলে ধরা।
ডেইলি সাবাহ অবলম্বনে মোতালেব জামালী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

