জুলাই নদীর হাওয়া
একদল লোক কথায় কথায় নব্বইয়ের সঙ্গে চব্বিশেরে মেলাতে চায়। আরেক দল লোক এটাকে উনসত্তরের চেয়েও অনেক মাইল্ড বানাতে চায়। এটি তারা কেন করে, সেটি আমরা জানি। তারা এটিকে স্রেফ একটা সরকার পরিবর্তন বা পতন হিসেবে দেখতে চায়। কিন্তু এটি যে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বৈপ্লবিক বাঁক পরিবর্তন, সেটি তারা মানতে চান না। এ বিষয়ে আলোচনার আগে নব্বই আর উনসত্তরের সঙ্গে চব্বিশের তুলনাটা দেখে নিই।
নব্বই নিয়ে আসলে বেশি আলোচনা করা অপ্রয়োজনীয়। কারণ এখন সবাই বোঝে হাসিনার তুলনায় এরশাদ আসলে শিশু। ফলে এরশাদের ৯ বছর আর হাসিনার ১৬ বছরের পার্থক্য আকাশ-পাতাল এবং এরশাদকে হটানো এবং হাসিনাকে হটানোর পার্থক্যও আকাশ-পাতাল।
আমরা বরং উনসত্তরকে বোঝার চেষ্টা করি। তবে প্রথমেই পরিষ্কার করা ভালো এটি উনসত্তরের সঙ্গে চব্বিশের কোনো ফুটবল খেলা না এবং উনসত্তর আর চব্বিশ প্রতিপক্ষ তো না-ই, বরং দুটোই আমাদের জার্নির অংশ। দুটোই আমাদের রাজনৈতিক জীবনে বড় প্রভাব ফেলছে। ফলে দুটোকেই পাশাপাশি রেখে একটু দেখার চেষ্টা করি এবং এই পর্যালোচনাটা করতে হবে কিছু প্রশ্ন দিয়ে। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান দেশব্যাপী ছড়িয়েছে। কিন্তু সেই আন্দোলনে কতজন মানুষ মারা গেছে? কত হাজার রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়েছে? হেলিকপ্টার থেকে নিজের দেশের মানুষদের ওপর গুলি করা হয়েছে একটাও?
এবার আসেন প্রশ্ন করি, উনসত্তরের আগে কতজন মানুষকে গুম করে পেট কেটে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে? বিরোধী দলের কতজন নেতা ক্রসফায়ারের শিকার হয়েছেন? কতজন নি-ক্যাপিংয়ের শিকার হয়ে সারাজীবন পঙ্গুত্ব বয়ে বেড়িয়েছেন? যারা ওয়াকিবহাল নন, তাদের জন্য বলছি, হাসিনার আমলে অনেক ধরনের ভয়াবহ উপায় ওরা বের করেছিল মানুষকে অত্যাচার করার জন্য। এর মধ্যে একটা হচ্ছে হাঁটুর কাছে গুলি করে চিকিৎসা না করতে দেওয়া। পরে ওই পা কেটে ফেলতে হতো। সারাজীবন এভাবেই তাদের পঙ্গুত্ব বয়ে বেড়াতে হতো। এটি খুলনা-সাতক্ষীরা-যশোর বেল্টে প্রচুর হয়েছে।
উনসত্তরের আগে বিরোধী দলের কতজন সদস্যের চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছে? যেটি হাসিনার আমলে প্রচুর হয়েছে। উনসত্তরের আগে কত লক্ষ লোক ভুয়া মামলায় নির্যাতিত হয়েছে? এই ১৬ বছর যে হাজার হাজার গায়েবি মামলা হয়েছে, এটি বিশ্বরেকর্ড কি না, গবেষণা করে দেখা যেতে পারে।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কথা আমরা জানি। এই ১৬ বছরে তো খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ আজকের সরকার এবং বিরোধী দলের নেতাদের নামে কয়েক ডজন ষড়যন্ত্র মামলা হয়েছে। ভুয়া মামলায় সাজা হয়েছে।
উনসত্তরের আগে কতজন রাজনৈতিক নেতা বিচারের নামে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন? সে সময় কি আমরা স্কাইপে কেলেঙ্কারির কথা শুনেছি, যেখানে রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে মামলার রায় বাইরে থেকে লিখে দিত? উনসত্তরের আগে দেশের প্রধান বিচারপতিকে গোয়েন্দা সংস্থা জোর করে রিজাইন করিয়ে বিদেশ পাঠিয়েছে, এ রকম নজির আছে?
এবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেটি হচ্ছে স্বাধীন দেশের পরাধীনতার কলঙ্কিত অধ্যায়। বাংলাদেশ তার ইতিহাসে এই ১৬ বছরের মতো পরাধীনতার শৃঙ্খলে আর কখনো পড়েনি। জাস্ট দু-চারটি কথা বিবেচনায় আনলেই পরিষ্কার হয় কেন চব্বিশ অর্জন করা ভয়াবহ কঠিন কাজ ছিল।
আমরা কি ভুলে গেছি আমাদের ইলেকশনে কে আসবে, কে আসবে না, কে জিতবে, কে জিতবে না—এগুলো বাইরে থেকে নির্ধারিত হয়ে আসত!
আমরা কি ভুলে গেছি এ দেশেরই পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদাধিকারীর গর্বিত উক্তি—‘আমি ভারতে গিয়ে বলে এসেছি হাসিনা সরকারকে যেন ক্ষমতায় রাখে’?
আমরা কি ভুলে যাব কিছুদিন আগে ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাবেক সেনাপ্রধানের সাক্ষ্য, যেখানে তিনি বলছেন কীভাবে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো কমপ্রোমাইজড হয়েছে?
কুঠার ভুলে যেতে পারে, গাছ ভোলে না। বাংলাদেশের মানুষ এগুলো ভোলেনি, ভুলবে না। ভুলবে না জুলাই খালি ৩৬ দিনের হত্যাকাণ্ড থেকে নাজাতের ঘটনা না, জুলাই ১৬ বছরের অত্যাচার থেকে নাজাত।
আজকে একধরনের আত্মঘাতী প্রশ্রয়ে কোথাও কোথাও টেলিভিশন আর নিউজপেপারে যেসব লোক বলেন, ‘জুলাই তেমন বড় কিছু না’, তারা বড় ধরনের শয়তানি করেন। যারা জুলাইকে জাস্ট আরেকটা সরকার বদল ভাবেন, তারা একটা বড় ধরনের শয়তানি করেন। তারা এটা করেন ফ্যাসিবাদের পাপ হালকা করার জন্য। তারা ভুলেই যান এত বড় বড় অপরাধ জাস্ট মিডিয়ায় উৎপাদিত দুর্বল ন্যারেটিভে ধুয়ে-মুছে যাবে না।
গণহত্যার পর রিকনসিলিয়েশনের একমাত্র রাস্তা মিডিয়া পাওয়ার দিয়ে ফেইক ন্যারেটিভ বানানো নয়। মিডিয়ার কথার ওপর বাংলাদেশের মানুষের আস্থা থাকলে তো জুলাই বিপ্লব হওয়ার কথা না। মিডিয়া তো ১৬ বছর ধরে উন্নয়ন আর প্রগতির বয়ান ফেরি করেছে। এক সুখী বাংলাদেশের ছবি এঁকেছে। কই মানুষ তো সেই সুখে ঘরে বসে থাকল না। কারণ পরাধীনতার চেয়ে মানুষ মৃত্যুকে শ্রেয় মনে করে।
ফলে আজকে যখন আলাপ হওয়ার কথা বিচারের, তারা আলাপ তুলছে ফেরাফেরির। তাদের জানা উচিত ফেরার একমাত্র পথ বিচার এবং অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া।
নব্বই, উনসত্তর ও চব্বিশের তুলনা বাজারে ছেড়ে কাজ হবে না। একাত্তর কেন আমাদের সবচেয়ে বড় ঘটনা, এটি যেমন মানুষ বোঝে। চব্বিশও কেন একাত্তর-পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী বাংলাদেশের একটা অন্যতম বড় ঘটনা, এটি মানুষ বোঝে। তাকে এটি টকশো দেখে বা নিউজপেপার পড়ে বুঝতে হয় না। কারণ সে-ই জুলাই ঘটিয়েছে। সে জানে কী কাজটা সে করেছে এবং কেন করেছে।
শেষে বর্তমান সরকারের সাফল্য কামনা করে তাদের উদ্দেশে কয়টা কথা বলতে চাই। সরকারকে গৌরবের সঙ্গে মনে রাখতে হবে, তারা জুলাই বিপ্লবের অন্যতম নায়ক। তাদের এটাও মনে রাখতে হবে, তারা ওয়ান-ইলেভেন মার্কা অধ্যায়ের পরের সরকার না। তারা একটা বিপ্লব-পরবর্তী সরকার।
বিপ্লবের দুটি পক্ষ থাকে। আর বিপ্লব জনতার শত্রুদের বিরুদ্ধেই হয়। তাই বিপ্লব-পরবর্তী কার্যক্রম স্বাভাবিক সময়ের মতো হলে বিপদ। জনগণ একটা রক্তাক্ত বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাদের তাড়িয়েছে, তাদের বিচার এখনো হয়নি। তারা ক্ষমা চাওয়া তো দূরের কথা, এখনো অস্বীকারের মধ্যে আছে। তারা পিস্তল নিয়ে ঘুরছে বিপ্লবীদের মারবে বলে। তাদের মুখে ‘আরো খুন করবো’ ছাড়া কোনো ভাষা নেই। খুন ছাড়া আর কোনো নতুন রাজনীতির কথা বলছে না। আপনি তাদের সঙ্গে স্বাভাবিক পথে এনগেজড হতে পারবেন না। আপনি তাদের স্পেস দেওয়া বা এমপাওয়ারড করতে পারেন না, যতক্ষণ বিচার এবং রিকনসিলিয়েশনের অধ্যায় শেষ না হচ্ছে। আজকে এতটুকু বললাম। পরে কখনো সরকারের উদ্দেশে বিস্তারিত বলব।
লেখক : অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও চলচ্চিত্র নির্মাতা