বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ নতুন কিছু নয়। কিন্তু কিছু প্রতিশ্রুতি থাকে রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা তেমনই একটি বিষয়। এটি কোনো দলীয় এজেন্ডা নয়। এটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। নাগরিকের নিরাপত্তার প্রশ্ন। ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্ন।
এ জায়গাতেই বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে বিএনপি সরকার। ক্ষমতায় আসার মাত্র তিন মাসের মাথায় তারা স্বতন্ত্র সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের করা সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫ বাতিল করা হয়েছিল। এখন পুরো সচিবালয়ই তুলে দেওয়া হলো।
এটি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা এবং সেই বার্তা হলো—ক্ষমতায় গেলে রাজনৈতিক দলগুলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চায় না। তারা বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই রাখতে চায়।
সবচেয়ে বড় সংকট হলো, বিএনপি এই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেদের কথাই অস্বীকার করেছে। দলটির বহুল আলোচিত ৩১ দফার ১০ নম্বর দফায় স্পষ্ট ভাষায় বলা ছিল, “বর্তমান বিচারব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষ্যে একটি ‘জুডিশিয়াল কমিশন’ গঠন করা হবে, যা বিচার বিভাগের সমস্যাবলি চিহ্নিত করে সুপারিশ দেবে। সংবিধান ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনার আলোকে বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ হিসেবে অধস্তন আদালতগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা তত্ত্বাবধানের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিচার বিভাগের প্রশাসনিক দক্ষতার জন্য সুপ্রিম কোর্টের অধীন পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণে সংবিধানে পূর্ববর্তী সময়ে বিদ্যমান সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পদ্ধতি পুনঃপ্রবর্তনের কথা বলা হয়েছে। এর জন্য সংবিধানে সংশোধনী আনার কথা উল্লেখ রয়েছে। বিচারপতি নিয়োগে দলীয় পক্ষপাত এড়িয়ে যোগ্যতা ও মাপকাঠিভিত্তিক ‘বিচারপতি নিয়োগ আইন’প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।” বলা হয়েছে, বিচার বিভাগের জন্য সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি পৃথক সচিবালয় থাকবে। শুধু তাই নয়, তাদের নির্বাচনি মেনিফেস্টোতেও বলা হয়েছিল, বিচার বিভাগের জন্য সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন সচিবালয়কে আরো শক্তিশালী করা হবে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, এখন তারা কোন অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে?
যে সচিবালয় বিলুপ্ত করা হলো, তার মূল উদ্দেশ্যই ছিল নিম্ন আদালতের বিচারকদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করা। অর্থাৎ বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলা—এসব বিষয়ে সরকারের প্রভাব কমানো।
বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। ১৯৯৯ সালের ঐতিহাসিক ‘মাসদার হোসেন’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার নির্দেশ দিয়েছিল। পরে নানা সংস্কার এলেও বাস্তবে নিম্ন আদালত এখনো প্রশাসনিকভাবে সরকারের প্রভাবমুক্ত হতে পারেনি। এই বাস্তবতায় স্বতন্ত্র সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। অন্তর্বর্তী সরকার সেটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটিকে অনেকেই গণতান্ত্রিক সংস্কারের একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু বিএনপি সরকার সেটি বাতিল করল।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে রাজনৈতিক সততা নিয়ে। বিএনপির অনেক সমর্থক এখন যুক্তি দিচ্ছেন, দলটি জুলাই সনদের অনেক জায়গায় নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল। তাই তারা সেগুলো মানতে বাধ্য নয়। এই যুক্তি হয়তো আংশিকভাবে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারযোগ্য। কিন্তু এখানে সমস্যাটি অন্য জায়গায়। কারণ, স্বতন্ত্র সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের বিষয়ে বিএনপি কোনো দ্বিমত দেয়নি। বরং নিজেদের ৩১ দফায় একই প্রতিশ্রুতি লিখেছে। নির্বাচনি মেনিফেস্টোতেও একই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অর্থাৎ এটি শুধু জুলাই সনদের প্রশ্ন নয়। এটি বিএনপির নিজের ঘোষণাপত্রের প্রশ্ন। তাহলে জনগণ বিশ্বাস করবে কাকে?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সবচেয়ে বড় সংকট এখানেই। তারা বিরোধী দলে থাকলে সংস্কারের কথা বলে। ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্রযন্ত্রের পুরোনো সুবিধাগুলো আঁকড়ে ধরে। আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন বিচার বিভাগকে দলীয় প্রভাবের আওতায় এনেছিল—এমন অভিযোগ বহুবার উঠেছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার ঘটনাও সেই বিতর্ককে তীব্র করেছিল। আবার খায়রুল হকের রায় নিয়েও বহু সমালোচনা হয়েছে। বিরোধী দল হিসেবে বিএনপি তখন বলেছিল, বিচার বিভাগকে দলীয় নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে হবে।
আজ ক্ষমতায় এসে তারাই উল্টো পথে হাঁটছে। এটি শুধু রাজনৈতিক দ্বিচারিতা নয়। এটি রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক। কারণ বিচার বিভাগ স্বাধীন না থাকলে শেষ পর্যন্ত কেউ নিরাপদ থাকে না। আজ ক্ষমতাসীন দলের লোক হয়তো ভাবতে পারেন, সরকারের প্রভাবাধীন আদালত তাদের জন্য সুবিধাজনক। কিন্তু ক্ষমতা স্থায়ী নয়। একদিন সেই একই ব্যবস্থার শিকার তারাও হতে পারেন। আইনের শাসন মানে শুধু প্রতিপক্ষের বিচার নয়। নিজের পক্ষের অন্যায়ের বিচারও নিশ্চিত করা।
বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বহুবার বলেছেন, বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা ছাড়া প্রকৃত বিচারিক স্বাধীনতা অসম্ভব। মরহুম ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনও অতীতে বলেছেন, বিচার বিভাগকে নির্বাহী নিয়ন্ত্রণে রেখে গণতন্ত্র টেকসই হয় না।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও একই কথা বলে। অনেক গণতান্ত্রিক দেশে বিচার বিভাগের নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো রয়েছে। কারণ আদালত যদি সরকারের দপ্তরের মতো পরিচালিত হয়, তাহলে বিচারকের স্বাধীনতা কাগজে থাকে, বাস্তবে নয়। বাংলাদেশে এই সংস্কার তাই বিলাসিতা ছিল না। এটি ছিল প্রয়োজন।
সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, বিএনপি সরকার খুব দ্রুত এ অবস্থানে গেছে। মাত্র তিন মাসের মাথায় এমন সিদ্ধান্ত জনগণকে একটি পরিষ্কার বার্তা দিয়েছে—সংস্কারের ভাষণ আর বাস্তব রাজনীতি এক জিনিস নয়।
এখন প্রশ্ন হলো, এর রাজনৈতিক মূল্য কী হবে? স্বল্প মেয়াদে হয়তো খুব বেশি কিছু হবে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দলীয় আনুগত্য এখনো প্রবল। সমর্থকরা প্রায়ই নিজেদের দলের অন্যায়ও নীরবে মেনে নেন। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এ ধরনের সিদ্ধান্ত জনগণের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস তৈরি করে। বিশেষ করে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে।
জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের যে নতুন রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তার কেন্দ্রে ছিল জবাবদিহি, প্রতিষ্ঠানগত সংস্কার এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। মানুষ ভেবেছিল অন্তত এবার হয়তো রাজনৈতিক দলগুলো কিছু শিখেছে।
কিন্তু পুরোনো চিত্রই আবার ফিরে আসছে। এখানে বিএনপির সমর্থকদেরও দায়িত্ব আছে। গণতন্ত্রে অন্ধ সমর্থন বিপজ্জনক। যে দলকে ভালোবাসেন, তার ভুলের বিরুদ্ধেও কথা বলতে হয়। কারণ দল বড় নয়, রাষ্ট্র বড়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কোনো দলীয় সুবিধার বিষয় নয়। এটি সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থলের প্রশ্ন।
যখন প্রশাসন অন্যায় করবে, যখন পুলিশ হয়রানি করবে, যখন ক্ষমতাবান কেউ জমি দখল করবে, তখন মানুষ আদালতের দিকেই তাকায়। সেই আদালত যদি সরকারের প্রভাবমুক্ত না হয়, তাহলে নাগরিক কোথায় যাবে? এ কারণেই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ‘নন-নেগোশিয়েবল’।
জামায়াত, এনসিপি বা অন্য বিরোধী দলগুলোরও এখানেই দায়িত্ব আছে। শুধু বিবৃতি দিয়ে দায় শেষ করলে হবে না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ তৈরি করতে হবে। কারণ এই প্রশ্ন কোনো একক দলের নয়। আজ বিএনপি করছে। কাল অন্য কেউ করবে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা। খালেদা জিয়া ২০১৭ সালে বলেছিলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের অধীনে আলাদা সচিবালয় স্থাপন করা হবে।’ সেই প্রতিশ্রুতিই এখন বাতিল হলো। এটি নিছক নীতিগত পরিবর্তন নয়। এটি জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতারণা।
গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন নয়। গণতন্ত্র মানে প্রতিষ্ঠান তৈরি করা। এমন প্রতিষ্ঠান, যেগুলো ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে পারে। বাংলাদেশ বারবার সেই জায়গাতেই ব্যর্থ হয়েছে। আজকের এই সিদ্ধান্ত সেই ব্যর্থতার নতুন উদাহরণ হয়ে থাকল।
লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন