হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

এক-এগারোর দুঃসময় ভোলা যাবে না

মন্তব্য প্রতিবেদন

মাহমুদুর রহমান

এবারের ঈদুল ফিতরে আমরা সংবাদকর্মীরা টানা পাঁচ দিনের দীর্ঘ ছুটি উপভোগ করেছি। ছুটি শেষে ২৪ তারিখ সকালে পত্রিকা অফিসে এসেই এক-এগারোর অন্যতম খলনায়ক, মহাদুর্নীতিবাজ লে. জে. (অব.) মাসুদের গ্রেপ্তারের সংবাদে বেজায় অবাক হয়েছিলাম। বর্তমান সরকারের ‘অন্দরে-বাহিরে’ এক-এগারোর কুশীলব, সমর্থক, সুশীল মিডিয়ার সব তাত্ত্বিক নেতা এবং তাদের ‘ফুট সোলজার’দের বাড়বাড়ন্ত দেখে মনে হয়েছিল, ভিকটিম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমান বাস্তবতায় ‘রিয়ালপলিটিক’ অনুশীলন করতে গিয়ে ইতিহাসের ওই পাতা একেবারে উল্টে ফেলেছেন। স্বাধীনতা দিবসের একেবারে ভোরে এক-এগারোর আরেক প্রধান কুচক্রী, সাবেক ডিজি, ডিজিএফআই, লে. জে. (অব.) মামুন খালেদের গ্রেপ্তারের খবরে নিশ্চিন্ত হলাম যে তিনি ভোলেননি।

আমরা মুষ্টিমেয় যারা কখনো এক-এগারোর পটপরিবর্তন মেনে নিইনি, তাদের কাছে ভারতীয় জেনারেল উবানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রক্ষীবাহিনীর অফিসার মাসুদ এবং ২০০৮ সালে দিল্লির ‘ডিপ স্টেট’ ও মইন-মাসুদ-ড. ফখরুদ্দীন-ড. শামসুল হুদারা মঞ্চায়িত নির্বাচনের অন্যতম কারিগর মামুন খালেদের গ্রেপ্তার নিঃসন্দেহে একটি আনন্দদায়ক সংবাদ। ব্যক্তিগতভাবে আমার লেখালেখির জগৎ এবং মিডিয়ায় আগমনই ঘটেছিল এক-এগারোর বিরোধিতা করতে গিয়ে। নইলে আজও হয়তো আমি বেসরকারি খাতের একজন উদ্যোক্তা কিংবা কোনো দেশি-বিদেশি কোম্পানির বড় সাহেব হয়েই থেকে যেতাম। সেই বিপজ্জনক ও ঘটনাবহুল সময়কার লেখালেখি নিয়ে আমার ‘জাতির পিতা ও অন্যান্য’ এবং ‘এক-এগারো থেকে ডিজিটাল’ নামে দুটি বই প্রকাশিত হয়েছিল। সেসব এখন অনেক পুরোনো কথা। আজকের তরুণ প্রজন্ম, যারা জুলাই বিপ্লবে অকাতরে জীবন দিয়ে আমাদের নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিয়েছে, তাদের বাল্যস্মৃতিতে সম্ভবত এক-এগারোর সেই চরম বৈরী সময় একেবারেই অস্পষ্ট হয়ে গেছে। সেই অসীম সাহসী, দেশপ্রেমিক তরুণদের কিছু তথ্য জানানোর জন্যই আমার আজকের এই মন্তব্য প্রতিবেদন।

এক-এগারোর প্রেক্ষাপট

২০০১ সালের নির্বাচনে ভারত, আওয়ামী লীগ এবং দেশের দিল্লিপন্থি সুশীল সমাজের সব হিসাবকিতাব উল্টে দিয়ে, বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী দল এবং তিনটি ইসলামপন্থি দলের সমন্বয়ে গঠিত মোর্চা দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসন নিয়ে ভূমিধস বিজয় লাভ করেছিল। আওয়ামী লীগের আসনসংখ্যা বর্তমান সংসদে জামায়াতে ইসলামীর থেকেও কম ছিল; দলটি সাকল্যে ৫৯টি আসন পেয়েছিল। সেই নির্বাচন পরিচালনায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের মেয়াদে আওয়ামী লীগের দুর্নীতি ও সন্ত্রাসে বিরক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব এবং এশিয়ার উদীয়মান প্রতিদ্বন্দ্বী বিশ্বশক্তি চীন সব আন্তর্জাতিক মহলকে অবাক করে একযোগে বেগম খালেদা জিয়ার বিজয়কে অভিনন্দন জানিয়েছিল। সেই সময় আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে ভারত সাময়িকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ায়, দিল্লিরও শেখ হাসিনার পরাজয় চুপচাপ মেনে নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। তবে আজকের ইরানে মার্কিন হামলার মতো একটি অপ্রত্যাশিত বিপদ মাথায় নিয়ে সেদিনও নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছিল।

বাংলাদেশে ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাত্র তিন সপ্তাহ আগে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষিতে, পশ্চিমা বিশ্বে যে ইসলামোফোবিয়ার ঢেউ উঠতে শুরু করেছিল, নব্বই শতাংশ মুসলমানের বাংলাদেশের পক্ষে তার অশুভ প্রতিক্রিয়া থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব হয়নি। কিছুদিনের মধ্যে প্রেসিডেন্ট বুশ ইসলামি বিশ্বের বিরুদ্ধে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধ’ ঘোষণা দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘কৌশলগত মিত্র’ মর্যাদা দেন। দিল্লি এই সুযোগ গ্রহণ করে আমাদের অঞ্চলের প্রভুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী সরকার পরিবর্তন করে বশংবদ ও ইসলামোফোবিক শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা দেশের ‘ডিপ স্টেটের’ মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তারা প্রধানত ত্রিমুখী প্রচারণা কৌশল গ্রহণ করে—

১. দিল্লির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দেশি ও বিদেশি মিডিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশে ইসলামি জঙ্গি ও মৌলবাদের কথিত উত্থানের গল্প বিভিন্ন ধাপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা, ২. বিএনপি সরকার, বিশেষ করে জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে, দুর্নীতির অর্ধসত্য ও মিথ্যা তথ্যমিশ্রিত অব্যাহত প্রচার চালু রেখে জনমত প্রভাবিত করা এবং ৩. জিয়া পরিবারকে ক্রমাগত বিতর্কিত করে তোলা।

উপরোক্ত পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে, এক-এগারোর প্রাথমিক অবস্থায় সাধারণ জনগণ বিভ্রান্তিতে পড়েছিল এবং মইন-ফখরুদ্দীন সরকারের তথাকথিত দুর্নীতিবিরোধী অভিযান বেশ জনপ্রিয়তাও পেয়েছিল। মাইনাস-টু ফর্মুলার প্রচারণার আড়ালে আসলে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা যে, দিল্লি সমর্থিত এক-এগারোর মূল লক্ষ্য ছিল, তা জনগণকে বোঝাতে আমাদের অত্যন্ত বৈরী পরিবেশে দীর্ঘদিন লেখালেখি করতে হয়েছে। প্রচণ্ড চাপের মুখেও বেগম খালেদা জিয়ার অনমনীয় দৃঢ়তা ও প্রশংসনীয় আপসহীনতা আমাদের সেই দুরূহ কাজে সহায়ক হয়েছিল। শেখ পরিবারের দীর্ঘকালের ভারতীয় মুরব্বি প্রণব মুখার্জি এবং মইন-মাসুদের সঙ্গে যোগসাজশে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে লন্ডনে পালিয়ে গেলেও দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় জিয়া পরিবার সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন। যেকোনো সময় বন্দি হয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য পরিস্থিতিতেও আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তখন যথেষ্ট সাহস দেখিয়েছিলেন। জনগণের সেসব ইতিহাস জানা দরকার। তাই আমার জানা অংশটুকু আজ লিখছি।

এক-এগারোর সরকার ২০০৭ সালের ৭ মার্চ তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করেছিল। তার কয়েক দিন আগে তিনি আমাকে টেলিফোন করেছিলেন। তার তৎকালীন পিএস, বর্তমানে সরকারি সংসদীয় দলের হুইপ নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু ফোনে আমাকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন।

তারেক রহমান আমাকে জানালেন, মইন-মাসুদের পক্ষ থেকে তাকে দুটি বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রথমটি নির্বাসনে যাওয়া এবং দ্বিতীয়টি কারাবরণ। তিনি আমার আন্তরিক পরামর্শ চাইলেন। আমি জানতে চেয়েছিলাম, বাবা-মায়ের মতো দেশের জন্য রাজনীতি করা তার জীবনের লক্ষ্য কি না। তিনি ‘হ্যাঁ’-সূচক জবাব দিলে আমি তাকে গ্রেপ্তারের ঝুঁকি নিয়ে দেশেই থাকতে বলেছিলাম। কিন্তু তার সেনা হেফাজতে নির্যাতিত হওয়ার খবর পেয়ে পরে আমি সেদিনের পরামর্শের জন্য প্রচণ্ড অনুশোচনায় ভুগতাম। বিশেষ করে, ২০০৮ সালে তিনি মুক্তি পাওয়ার পর পিজি হাসপাতালে তার যন্ত্রণাকাতর চেহারা দেখে আমি বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিলাম। কবি ও লেখক ফরহাদ মজহারকে সঙ্গে নিয়ে সেদিন তাকে পিজিতে স্ট্রেচারে শায়িত অবস্থায় দেখে এসেছিলাম। তারপর তিনি যুক্তরাজ্যে নির্বাসনে যান। কিন্তু আজ যখন তারেক রহমান বাবা-মায়ের পথ ধরে দেশের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তখন মনে হয় আমার সেদিনের পরামর্শে একজন রাজনীতিবিদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি থাকলেও, তারেক রহমানের জীবনের বৃহৎ লক্ষ্য অর্জনের পটভূমিতে সেটা ছিল একটি সাহসী সিদ্ধান্ত।

কেন কুশীলবদের সাজা জরুরি

বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় এক-এগারো প্রকৃতপক্ষে দীর্ঘমেয়াদি ধ্বংসের বীজ রোপণ করেছিল। বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে সেনাবাহিনী পর্যন্ত, সেই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান রক্ষা পায়নি। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদ এক-এগারোর ধারাবাহিকতা ছিল। জিয়া পরিবারের প্রতি কুশীলবরা যে ভয়াবহ জুলুম চালিয়েছিল, সেই প্রতিশোধ প্রধানমন্ত্রী নেবেন কি না—সেটা একান্তই তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ব্যাপার। কিন্তু রাষ্ট্র ধ্বংসের অপরাধ ক্ষমা করার কোনো সুযোগ নেই বলে আমি মনে করি। রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি কুচক্রীরা চালিয়েছিল, তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়ার চেষ্টা করছি—

১. বিচার বিভাগ : সামরিক অফিসারদের আদালতে পাঠিয়ে বিচারকে নগ্নভাবে প্রভাবিত করার সংস্কৃতি এক-এগারোর সরকার শুরু করেছিল। সর্বশেষ গ্রেপ্তারকৃত সামরিক কুচক্রী লে. জে. মামুন কদিন আগে প্রকাশ্য আদালতে দাবি করেছেন, তিনি নাকি সে সময় কুমিল্লার জিওসি থাকাকালে তারেক রহমানের জামিনের জন্য সুপারিশ করেছিলেন। তার বক্তব্য বিশ্বাস করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু যদি সত্যও থাকে, তাহলে সেটি গর্হিত অপরাধ। কোন অধিকারে একজন সেনা অফিসার আদালতের কাজে হস্তক্ষেপ করতে পারেন? কোনো জিওসি আদালতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করলে তাকে অবশ্যই বরখাস্ত করা উচিত। সব আইনজীবী জানেন, সেই সময় কোন রাজনীতিবিদকে কত বছর কারাদণ্ড দেওয়া হবে, সেটি ডিজিএফআইয়ের অফিসাররা জজের দিকে ইশারা করে প্রকাশ্যেই দেখিয়ে দিতেন। বিচার বিভাগের সেই লাশের কফিনে শেখ হাসিনা ফ্যাসিস্ট জমানায় শেষ পেরেক গেঁথে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও মানবাধিকার ধ্বংস করেছিল বিচার বিভাগ, যার শুরুটা এক-এগারোর সরকারের কীর্তি ছিল। সেই সময় আমি ‘স্বাধীন বিচারের নামে তামাশা’ শিরোনামে একটি মন্তব্য প্রতিবেদন লিখলে, আদালত অবমাননা মামলায় আমার সাজা হয়েছিল।

২. নির্বাচন কমিশন : ড. শামসুল হুদা নির্বাচন কমিশন ২০০৮ সালে বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস করার যে আয়োজন করে শেখ হাসিনার হাতে ক্ষমতা অর্পণ করে বিদায় নিয়েছিল, এরই ধারাবাহিকতায় আমরা ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের ভুয়া নির্বাচন দেখেছি। শামসুল হুদা নির্বাচন কমিশন বিএনপি ভাঙার মিশনে ব্যর্থ হয়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে ৮৭ শতাংশ ভুয়া ভোট দেওয়ার হার দেখিয়ে আওয়ামী লীগের অবিশ্বাস্য বিজয়ের ব্যবস্থা করেছিল। এই দায় থেকে ড. হুদা এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গরা কখনো মুক্তি পাবেন না।

৩. সেনাবাহিনী : এক-এগারোর অপশাসন শুধু জনগণের সঙ্গে সেনাবাহিনীর দূরত্বই সৃষ্টি করেনি, এটি আমাদের দেশপ্রেমিক বাহিনীকে সবদিকে কলুষিত করেছে। ওই সময় থেকেই ডিজিএফআইয়ের আয়নাঘরে নিয়ে রাজনীতিবিদ, ভিন্ন মতাবলম্বী জনগণ, আলেম এবং সেনা অফিসারদের ভয়াবহ নির্যাতন, বিনাবিচারে হত্যা এবং অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধে সেনাবাহিনীর নাম সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। এক অপরাধ মানুষকে যেমন দ্রুত অন্য অপরাধের দিকে টেনে নিয়ে যায়, সেভাবেই জবাবদিহিতাহীন সিনিয়র সেনা কর্মকর্তারা একসময় মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে লাগামহীন দুর্নীতি ও অন্যান্য অনৈতিক অপরাধেও জড়িয়ে পড়েন। এই পটভূমিতেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সন্ত্রাসী পরিবারের অতি নিম্ন মেধার ব্যক্তিও সর্বোচ্চ পদ অধিকার করতে পেরেছিলেন।

৪. দিল্লির কাছে দেশের সার্বভৌমত্ব বিসর্জন : যেকোনো দেশের সেনাবাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষা করা। ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে, যেদিন জেনারেল মইন তৎকালীন ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জির সঙ্গে নিজের নিরাপত্তা ও চাকরি রক্ষার বিনিময়ে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন, সেদিনই আমাদের সার্বভৌমত্বের অবসান ঘটে গিয়েছিল। দেশের সব ক্যান্টনমেন্ট, বিশেষ করে ডিজিএফআই কার্যালয়ে ভারতীয় গোয়েন্দাদের অবাধ যাতায়াতের গল্প তারপর অনেকটা ‘ওপেন সিক্রেট’ হয়ে পড়েছিল।

এমনকি আইসিটিতে জবানবন্দি দেওয়ার সময় সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া ডিজিএফআই প্রধান কার্যালয়ে ‘র’-এর অফিসের কথা স্বীকার করেছেন। তাছাড়া, বর্তমানে ডিজিএফআইয়ের একাধিক সাবেক ডিজিসহ ভারতীয় অ্যাসেট লে. জে. মুজিবের মোদির কাছে আশ্রয় গ্রহণ করা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার করুণ অবস্থার প্রমাণ দিচ্ছে। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরের এসব চিহ্নিত দেশদ্রোহীরা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কীভাবে এবং কার সহযোগিতায় নিরাপদে দেশ ত্যাগ করে প্রভুর কাছে আশ্রয় নিতে পারল, সেটা জানাটাও আবশ্যক। আশা করি, বর্তমান সরকার আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এই রহস্য উদঘাটনেরও সর্বাত্মক চেষ্টা করবে।

৫. সংসদীয় ব্যবস্থার দাফন : ২০০৮ সালের সাজানো নির্বাচনে ভারতীয় ‘ডিপ স্টেট’ এবং এক-এগারো সরকার মিলে শেখ হাসিনাকে তিন-চতুর্থাংশ আসনে বিজয়ী করানোর উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের ওপর চিরস্থায়ী ভারতীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। সংসদের নামে আওয়ামী লীগের পান্ডা ও ভাড়দের অশ্লীল খিস্তিখেউড়ের মঞ্চ খুলে পনেরো বছর ফ্যাসিস্ট শাসনকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবার মেয়াদ শেষে হাসিনার শাসন দীর্ঘায়িত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিভিন্ন ধরনের উৎকোচের বিনিময়ে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা হয়েছে।

৬. মিডিয়া : রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে পরিকল্পিত প্রচারণায় এক-এগারো সরকার যে মিডিয়াকে ব্যবহার করেছিল, সেটি ইংরেজি দৈনিক দি ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন। তিনি অবশ্য বিএনপিবিরোধী প্রচারণা সম্পর্কে সম্পূর্ণ নীরব থেকে তার ব্যর্থতার জন্য শেখ হাসিনার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। আমরা অবশ্য এদিক দিয়ে তুলনামূলক ভাগ্যবান ছিলাম। বর্তমান সরকারের স্ট্র্যাটেজি, তথ্য ও সংস্কৃতি উপদেষ্টা আমার দেশকে তুচ্ছ পত্রিকা বিবেচনা করলেও ডিজিএফআইয়ের কোনো ক্ষমতাধর আমাদের মাধ্যমে কোনো বানোয়াট সংবাদ প্রকাশ করানোর চেষ্টা করেনি। কারণ তারা জানত বিশেষ কোনো ‘হ্যাডম’ না থাকলেও আমার দেশ কখনো কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করে না। শেখ হাসিনার আমলে সেনাসদর আমার দেশকে জড়িয়ে সেনাবিদ্রোহের ষড়যন্ত্রের এক কল্পকাহিনি ফেঁদে বসলে পত্রিকা অফিসে বন্দি থাকা অবস্থায় আমি সেনাসদরসহ দেশবাসীর কাছে এক খোলা চিঠি লিখেছিলাম। সেই খোলা চিঠির প্রেক্ষিতে তৎকালীন সেনাসদরকে তখন ভুয়া ষড়যন্ত্র তত্ত্ব থেকে পিছিয়ে যেতে হয়েছিল।

বেশ দ্রুততার সঙ্গে এক-এগারোর কুশীলবদের আইনের আওতায় আনার প্রচেষ্টার প্রতি আমাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সরকারের যেকোনো পদক্ষেপের প্রতি আমার দেশের অব্যাহত সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছি।

উপদেষ্টা ডাক্তার জাহেদের আত্মপক্ষ সমর্থন প্রসঙ্গ

ভিন্ন প্রসঙ্গে আলোচনা করে আজকের পুনরায় দীর্ঘ লেখা শেষ করব। গত বুধবার ‘নব্যদের পাহারাদারিতে জাতীয়তাবাদী দলের সংস্কৃতিচেতনা’ শিরোনামের মন্তব্য প্রতিবেদনে প্রসঙ্গক্রমে সরকারের প্রভাবশালী স্ট্র্যাটেজি, সংস্কৃতি ও তথ্য উপদেষ্টা ডাক্তার জাহেদ উর রহমানের প্রথম আলোর প্রতি অন্ধ পক্ষপাতিত্ব এবং আমার দেশ-এর প্রতি তীব্র বিদ্বেষ সম্পর্কে আমার কিছু মন্তব্য ও মতামত ছিল। সেই লেখার জবাবে তিনি তার ইউটিউব চ্যানেলে মিনিট-পাঁচেকের একটি কনটেন্ট তৈরি করে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন। তিনি আমার বিরুদ্ধে ‘ডিসইনফরমেশনের’ অভিযোগ করলেও প্রকৃতপক্ষে তার সম্পর্কে আমার দেওয়া সব তথ্যের সত্যতা স্বীকার করে নিয়েছেন। মোটা দাগে ডাক্তার জাহেদ নিজের পক্ষে যে পাঁচটি যুক্তি পেশ করেছেন, সত্যের খাতিরে সেগুলোর খণ্ডন করা উচিত বলে আমি মনে করেছি।

১. আমার দেশ সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য তার ভাষায় ‘ওন (Own)’ করে নেওয়ার পরও তার অদ্ভুত যুক্তি হলো, তিনি যেহেতু আমার দেশ-এর নাম উচ্চারণ করেননি, তাই আমার দেশ বিদ্বেষের অভিযোগ থেকে তিনি মুক্ত। কনটেন্টে একেবারে অপ্রাসঙ্গিকভাবে আমার দেশকে হেয় এবং হাসিনার পনেরো বছরের জুলুমের একপ্রকার ন্যায্যতা উৎপাদন করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘একটি পত্রিকা অনেক দিন বন্ধ থাকার পর চালু হয়ে মনে করেছিল কি না কী হয়ে যাবে।’ তিনি যদি আমার দেশ বুঝিয়ে না থাকেন, তাহলে আত্মপক্ষ সমর্থনে কোন পত্রিকাকে বুঝিয়েছেন, তার নাম প্রকাশ করা সরকারের একজন উপদেষ্টার ন্যূনতম স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার মধ্যে পড়া উচিত ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ডাক্তার জাহেদের মধ্যে সেই নৈতিকতাবোধ এবং সততা আমরা আত্মপক্ষ সমর্থনেও দেখতে পেলাম না। যেহেতু তিনি নিজের বক্তব্য ‘ওন’ করেছেন, সে ক্ষেত্রে সরাসরি আমার দেশ পত্রিকা ও আমার প্রতি বিশেষ বিদ্বেষ থাকাটাও মেনে নিলে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী উপদেষ্টার তো কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

২. ডাক্তার জাহেদ আমার দেশ সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য কোনো রকম দুঃখ প্রকাশ ছাড়া ‘ওন’ করলেও তিনি যে বাংলাদেশের কোনো পত্রিকাকেই প্রথম আলোতুল্য ‘হ্যাডমওয়ালা’ মনে করেননি, এটি স্বীকার করতে তার সংকোচে আমি বেশ কৌতুকবোধ করেছি। তাকে এবং আমার পাঠকদের অনুরোধ করব, তার যে কনটেন্ট নিয়ে আমি গত বুধবারের মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেছিলাম, সেটি আর একবার কষ্ট করে শুনতে। কে ‘ডিসইনফর্মেশন’ করছে, তার প্রমাণ পেয়ে যাবেন। তিনি যে কেন প্রথম আলোর প্রতি অন্ধ আনুগত্য স্বীকার করতে অস্বস্তিতে পড়ে গেছেন, তার কারণটিও বোধহয় আমি বুঝতে পেরেছি।

বাংলাদেশে আমার দেশ একমাত্র কোনো ‘অলিগার্কের’ মালিকানাবহির্ভূত এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত, পাঠকনন্দিত জাতীয় পত্রিকা। আমাদের পেছনে ‘এস্টাবলিশমেন্ট’ কিংবা ‘ক্ষমতার’ কোনো আশীর্বাদ না থাকায় উপদেষ্টা মহোদয় সঠিকভাবেই বুঝেছেন যে, তিনি যেহেতু সরকারে আছেন, তাই আমার দেশ-এর প্রতি তার বিদ্বেষ থাকলে কোনো অসুবিধা নেই। তিনি আমাদের সঙ্গে ফ্যাসিস্ট হাসিনার মতোই ব্যবহার করতে পারেন। ক্ষমতা ও অর্থবিত্তহীন আম-জনতার প্রতিনিধি একটা পত্রিকার সব সরকারের আমলে জুলুম সহ্য করা ছাড়া আর কী-বা করার আছে? কিন্তু, পাঠক ‘অলিগার্ক’দের কথা তো ভিন্ন। এই শ্রেণি সর্ব আমলে ক্ষমতাবান। তারা সব রাজনৈতিক দলকে অর্থায়ন করে থাকেন। কাজেই তাদের পত্রিকাকে প্রথম আলোর তুলনায় তুচ্ছ করলে উপদেষ্টা মহোদয়ের সরকারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ার সমূহ আশঙ্কা তৈরি হবে। ফলে একমাত্র প্রথম আলোকে ‘হ্যাডমওয়ালা’ পত্রিকার সার্টিফিকেট দেওয়া বক্তব্য ‘ওন’ করা ডাক্তার জাহেদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।

৩. ডাক্তার জাহেদের মতে, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী সাংবাদিক অলিউল্লাহ নোমান জামায়াতে যোগ দেওয়ায় আমার দেশও জামায়াত সমর্থক হয়ে গেছে। পাঠকরা অবগত আছেন যে, অলিউল্লাহ নোমান ২০১২ সালে তুমুল আলোচিত ‘স্কাইপ কেলেঙ্কারি’ সংবাদ উদঘাটন করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। এবারের নির্বাচনে প্রাথমিকভাবে তাকে হবিগঞ্জের একটি আসনে জামায়াতে ইসলামী নমিনেশন দিলেও পরে ১১-দলীয় জোটপ্রার্থীর সমর্থনে তিনি সেই প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করে নেন। আমি তার রাজনৈতিক দলে যোগদানের বিষয়টি পছন্দ না করলেও একজন ব্যক্তির স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ আমার নীতিবিরুদ্ধ। তাছাড়া আমার বাধা অলিউল্লাহ নোমান মানবেনই বা কেন? অতএব, ডাক্তার জাহেদ আমার দেশকে জামায়াতপন্থি প্রমাণের মোক্ষম অস্ত্র পেয়ে গেছেন! নব্য বিএনপিদের নিয়ে এখানেই সমস্যা। এরা তো দলটির ইতিহাস কিছুই জানেন না। আমার দেশ সম্পর্কে উপদেষ্টাকে কিছু তথ্য দিয়ে সহায়তা করছি।

সম্পাদক ছাড়াও নির্বাহী সম্পাদক, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক এবং চিফ রিপোর্টার—সব সংবাদপত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ এবং তারা নীতিনির্ধারক ব্যক্তিদের অন্যতম। নির্বাহী সম্পাদক প্রকৃতপক্ষে যেকোনো সংবাদপত্রের দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তি। আমার দেশ-এ উপরোক্ত তিন পদে সৈয়দ আবদাল আহমদ, জাহেদ চৌধুরী এবং বাছির জামাল দায়িত্ব পালন করছেন। আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগে থেকেই তারা তিনজন আমার দেশ-এ সাংবাদিকতা করছেন। তথ্য উপদেষ্টা ডাক্তার জাহেদ কি তাদের চেনেন? আচ্ছা, আমি চিনিয়ে দিচ্ছি। নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি ছিলেন। এবারের নির্বাচনে তিনি ঢাকা-১৭ আসনে তারেক রহমানের পক্ষে দল বেঁধে ক্যাম্পেইন করেছেন। আমার দেশ পুনঃপ্রকাশের পর প্রায় সম্পাদকীয় পাতায় প্রতিটি ‘পোস্ট’ জিয়া পরিবার এবং বিএনপিকে সমর্থন করেই আবদাল আহমদ লিখেছেন। খানিকটা নিভৃতচারী ব্যবস্থাপনা সম্পাদক জাহেদ চৌধুরী আজীবন বিএনপিকে শুধু সমর্থনই করেননি, নিবেদিতভাবে কাজ করেছেন। তিনিও দেশের একজন বিখ্যাত পেশাদার সাংবাদিক। আমার দেশ-এর সাংবাদিক ইউনিয়নের ইউনিটপ্রধান এবং চিফ রিপোর্টার বাছির জামাল বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে বিএনপিপন্থি সাংবাদিক। এই রমজান মাসে ডাক্তার জাহেদের সরকার বাছির জামালকে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে।

বিএনপির সব নেতাকর্মীর কাছে পরিচিত তিনজন সিনিয়র বিএনপিপন্থি সাংবাদিক আমার দেশ-এ কাজ করলে পত্রিকাটি বিএনপি সমর্থক হয় না। অথচ, একজন সাবেক সাংবাদিক (অলিউল্লাহ নোমান বর্তমানে দৈনন্দিন পত্রিকার কাজে সম্পৃক্ত নন) বিরোধী দলে যোগদান করলে সেই পত্রিকা শত্রু দলের সমর্থক হয়ে যায়, এমন যুক্তি গ্রহণযোগ্য কি না—সেই সিদ্ধান্তের ভার পাঠকদের ওপর ছেড়ে দিলাম। আর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভিন্নমতের প্রতি একজন উপদেষ্টার এতখানি বিদ্বেষ কেন থাকবেÑসেটাও আমার বোধগম্য নয়।

৪. ডাক্তার জাহেদ আমাদেরকে আশ্বাস দিয়েছেন যে, কখনো আমার দেশ-এর ওপর প্রথম আলোর মতো জুলুম হলে তিনি তারও নাকি প্রতিবাদ করবেন। উপদেষ্টা মহোদয় আবারও ভুল করলেন। আমার দেশ-এর ওপর ফ্যাসিবাদী নিপীড়ন ভবিষ্যতের কোনো বায়বীয় কল্পনাবিলাস নয়। এটা অতীতের আলোচিত ঘটনা। দীর্ঘ পনেরো বছর আমরা হাসিনার নির্মম জুলুমের শিকার হয়েছি। মৃত্যুর আশঙ্কা থেকেও আল্লাহর অনুগ্রহে একাধিকবার বেঁচে এসেছি। এই লড়াই অবশ্য উপদেষ্টার বোঝার কথা নয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে আমার দেশ-এর মতো নিগ্রহের শিকার কোনো পত্রিকা হয়নি যা স্বীকার করতে ডাক্তার জাহেদ অদ্যাবধি কুণ্ঠাবোধ করছেন বলেই আমার কাছে মনে হয়েছে। আমাদের ছাপাখানার মেশিনপত্র হাসিনার পুলিশ হেফাজতে লুট হয়ে গেলেও অন্যদের মতো আমরা মাসের পর মাস ‘ভিকটিম কার্ড’ খেলে সহানুভূতি পাওয়ার কোনো চেষ্টা করিনি। মন্ত্রীমিনিস্টার, কূটনীতিকদের ডেকে এনে ফটোসেশন করিনি। উপদেষ্টার ভাষায়, আমরা ‘কী না কী হয়ে যেতে পারিনি’। তবে গরিবি হালতে নিজেদের সাধ্যমতো উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি।

সর্বশেষ ইউটিউব কনটেন্টে ডাক্তার জাহেদ পরিস্থিতির চাপে আমার দেশ-এর ভূমিকার কথা খানিকটা হলেও উল্লেখ করতে বাধ্য হয়েছেন। প্রথম ভিডিও তৈরির সময় এসব কথা তার স্মরণে আসেনি। তিনি তো অনেক দিন ধরে ইউটিউব কনটেন্ট তৈরি করছেন, প্রথম আলোতে লিখছেন, অ্যাকটিভিজম করছেন। জানার কৌতূহল হচ্ছে যে, জুলাই বিপ্লবের আগে কিংবা পরে, তার কোনো লেখা কিংবা বক্তব্যে তিনি কি কখনো আমার দেশ-এর ওপর ফ্যাসিস্ট আমলের জুলুমের প্রতিবাদ তো দূরের কথা, কোনো প্রসঙ্গে উল্লেখটাও কি করেছেন? আমি ছয় বছর নির্বাসনে থাকায় তার সব কর্মকাণ্ড জানার সুযোগ ছিল না। সেজন্যই এই প্রশ্ন।

৫. সর্বশেষ ডাক্তার জাহেদ তার কনটেন্টে একটা সরল স্বীকারোক্তি দিয়েছেন, যার মাধ্যমে তার অজান্তেই আমার দেশ-এর দলনিরপেক্ষতা এবং সম্পাদকীয় নীতিতে সব মত ধারণ করার প্রচেষ্টা প্রমাণিত হয়েছে। উপদেষ্টা আপনাকে ধন্যবাদ। ডাক্তার জাহেদ উর রহমানের সঙ্গে আমার একবার মাত্র সামনাসামনি দেখা হয়েছে। যতদূর মনে পড়ে সেটা বাংলা একাডেমিতে। আমরা তখন পুনঃপ্রকাশের কাজে মহা ব্যস্ত দিন কাটাচ্ছি। তাকে সেদিন ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বরের প্রথম সংখ্যায় লিখতে অনুরোধ করেছিলাম। আমাদের সম্পাদকীয় বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত অ্যাসোসিয়েট এডিটর আলফাজ আনামও একাধিকবার তাকে একই অনুরোধ জানিয়েছিলেন। অর্থাৎ তার প্রতি আমাদের কখনো কোনো বিদ্বেষ ছিল না। কিন্তু তিনি যে প্রথম আলোর প্রতি এতটা পক্ষপাতদুষ্ট এবং আমার দেশ-এর প্রতি ভয়াবহ বিদ্বেষ পোষণ করেন, সেটা আগে জানতাম না। এই বিদ্বেষের কারণ অবশ্য আজও জানি না। হতে পারে ২০১৩ সালে তিনি ভারতীয় মদতপুষ্ট শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চের সমর্থক ছিলেন, যার বিরুদ্ধাচরণকে আমার দেশ সর্বদা বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্ব এবং সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের অন্যতম ভিত্তি বিবেচনা করে এসেছে। সেই টালমাটাল সময়কার আমার দেশ-এর বিখ্যাত শিরোনাম ‘শাহবাগে ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি’ বাংলাদেশের লড়াকু, স্বাধীনতাকামী জনগণকে ফ্যাসিবাদের স্বরূপ চেনাতে সহায়তা করেছিল। আজ সবাই ফ্যাসিবাদের কথা বলে থাকেন। সেদিন কিন্তু আমার দেশ ছাড়া আর কেউ সাহস করে ফ্যাসিবাদের কথা উচ্চারণ করেনি।

ডাক্তার জাহেদ সাংস্কৃতিক লড়াই চলমান থাকা এবং মতাদর্শ পাল্টে যাওয়ার কথা বলে তার সংক্ষিপ্ত কনটেন্ট শেষ করেছেন। বাঙালি মুসলমানের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসে লালিত আমার মতাদর্শ অবশ্য কোনোদিন পাল্টায়নি। নব্য বিএনপির শীর্ষস্থানীয় স্ট্র্যাটেজিস্ট ও বুদ্ধিজীবী, আপনাকে স্বাগতম। প্রায় দুই যুগ ধরে আদর্শ ও বিশ্বাসের কোনো পরিবর্তন না ঘটিয়ে অবিচলিতভাবে ওই সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের কাজটাই আমরা করে যাচ্ছি। সমালোচনাকে ধারণ করার পুরোনো বিএনপির গৌরবোজ্জ্বল অতীত ইতিহাস থেকে প্রত্যাশা করি, মতাদর্শ ও লেখাকে দলটির নব্য সাংস্কৃতিক পাহারাদাররা লেখা ও মতাদর্শ দিয়েই মোকাবিলা করবেন, আওয়ামী বুদ্ধিজীবীদের মতো ফ্যাসিবাদের পথে ধাবিত হবেন না।

জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায় জনগণের অংশগ্রহণ

দখল ও সংঘাতপ্রিয় একটি রাষ্ট্র

শিক্ষা বোর্ড ও বছরভেদে পরীক্ষার ফলে তারতম্য কতটা যৌক্তিক

আইন ও এখতিয়ারের প্রশ্নে যে বিভ্রান্তি

জ্বালানি সংকটে ভাঙছে জোট : রাশিয়ামুখী ভারত

ফ্যাসিবাদী শাসনে সেনাবাহিনীর ভেতরের অভিজ্ঞতা

যে হাসপাতালকে যুদ্ধ থামাতে পারেনি

সাধারণ চাওয়াগুলো পূরণ কি অসম্ভব

আলেমদের বঞ্চনা

দেশের ইমেজের জন্য অশনিসংকেত