হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ইসরাইলের নির্মমতা : গাজায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ

আমীর খসরু

আমীর খসরু

যুদ্ধ, সমরসজ্জা শুধু অর্থের হিসাব নয়। এই নৃশংসতার পেছনে অর্থব্যয়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবন দিচ্ছেন মানুষ। আহত, গৃহহীন, দেশহীন ও ঠিকানাবিহীন করা হচ্ছে। অর্থের বিনিময়ে মানুষবিনাশী, জনবাস্তুচ্যুতির ঘটনা দিনে দিনে বাড়ছেই। সিরিয়া থেকে ইউক্রেন। ইউক্রেন, লেবানন, ইয়েমেন, সিরিয়া, সুদান, ভেনেজুয়েলা, কিউবা—অর্থাৎ যেখানেই যুদ্ধ, সেখানেই নিদারুণ নৃশংসতা, ধ্বংসযজ্ঞ। এক কথায় অর্থব্যয়ে ধ্বংস আর বিনাশী যত আয়োজন চলছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’ বলছে—২০১৬ সালেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বেশি—অর্থাৎ সাত কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। এই সংখ্যা ২০১৭ সালে বেড়ে দাঁড়ায় আরো বেশি, যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। মাত্র ১৮টি দেশেই ভয়াবহ অভুক্ত—অর্থাৎ সোজা কথায় বিক্ষিপ্তভাবে দুর্ভিক্ষের মুখে পড়ে আছেন প্রায় আট কোটি মানুষ। এ তথ্য গত মাসের।

জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস দপ্তর বলছে, প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ২০২৫ সালের হিসাবে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ, সংঘাত বেড়েছে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি। জাতিসংঘ খুবই যাচাই-বাছাই করে যে হিসাব—অর্থাৎ রক্ষণশীল হিসাব দিয়েছে, তাতে দেখা যায়, ২০২৪ সালেই ৪৮ হাজার ৩৮৪ জন সাধারণ মানুষ যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। এছাড়া যুদ্ধে ৫০২ মানবাধিকার কর্মী নিহত হন। শুধু গাজায় ২০২৩-এর অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত সাংবাদিক নিহত হয়েছেন ২৬২ জন। জাতিসংঘ দুঃখ করেই তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, ‘প্রতিটি সংখ্যার পেছনেই রয়েছে একজন মানুষের জীবনের গল্প আর কাহিনি। প্রতিটি পরিসংখ্যার পেছনে রয়েছে বিশাল ব্যক্তিগত তথ্যভান্ডার, যা মানবিক এবং অনেক জনসমষ্টির সমন্বিত কাহিনি।’ জাতিসংঘ তাদের ২০২৪-এর প্রতিবেদনে বলেছে, যে বিশাল জনসমষ্টি যুদ্ধে আহত হয়, তাদের শতকরা ২৮ ভাগ হয়ে যায় স্থায়ীভাবে পঙ্গু।

যুদ্ধে নারী এবং শিশুদের ক্ষতি

এ কথা বলা হয়ে থাকে আদিযুগ থেকে যে, যুদ্ধে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তিনটি বিষয়। এক. সত্যি, দুই. নারী, তিন. শিশু।

২০২৫ সালের এক হিসাবে দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ এবং সশস্ত্র সংঘাতে নিহত নারী এবং শিশুদের সংখ্যা ক্রমেইই বাড়ছে। মোট বেসামরিক নিহতের ৪০ শতাংশই নারী। এর আগের দুই বছরে এ সংখ্যা ছিল এর অর্ধেক। শিশু নিহত হয় ৩০ শতাংশ। জাতিসংঘের হিসাব বলছে, ২০২৩ সালে বেসামরিক নাগরিকদের নিহত হওয়ার সংখ্যা ৩৩ হাজার ৪৪৩ জন। ২০২৪-এর হিসাব আগেই দিয়েছি। ২০২২-এর তুলনায় এই সংখ্যা ৭২ শতাংশ বেশি। এই নিহতের বিশাল একটি সংখ্যা ইসরাইল কর্তৃক ফিলিস্তিন নিরীহ মানুষের।

সবশেষ তথ্য, ২০২৫ সালে যে ৪৯ হাজার মানুষ মারা যায়, তার মধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার নারী ও এবং চার হাজারের বেশি মাসুম শিশু। অন্য এক হিসাবে দেখা গেছে, ২০০৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত যুদ্ধে কমপক্ষে এক লাখ পাঁচ হাজার শিশু নিহত এবং চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত সময়ে নিহত হয়েছে কমপক্ষে ১৫ হাজার শিশু। পঙ্গু হয়েছে অর্ধ লক্ষাধিক। ওই হিসাবে দেখা গেছে, ২০২৪ এবং ২০২৫ সময়কালে যুদ্ধাক্রান্ত এলাকায় বসবাস করে ৫০ কোটিরও বেশি শিশু। এর মধ্যে ২০২৫ সালেই জন্ম নিয়েছে—অর্থাৎ মানবিক সংকটের মধ্যেই জন্ম ৭৭ লাখ শিশুর।

এখানে বলা প্রয়োজন, এই হিসাব এতটাই রক্ষণশীল এবং পশ্চিমানির্ভর দাতা বা সাহায্য ও মানবিক সহায়তা সংস্থার। এর মধ্যে পুরো সত্যসন্ধান সম্ভব হয়নি এবং এটা সম্ভবও নয়। কারণ যুদ্ধ সশস্ত্র সংঘাত, সহিংসতাকে দেখতে হয়েছে, অনিবার্যভাবেই পশ্চিমাদের চোখে ও দৃষ্টিভঙ্গিতে। কাজেই একে পুরো সত্য ভাবাটা কোনোক্রমেই উচিত হবে না। আর সব তথ্যও একেবারে হালনাগাদ, তাও নয়। কারণ এর পেছনে প্রয়োজন রয়েছে পশ্চিমাদের অনুমোদন। এই অনুমোদনপ্রাপ্ত তথ্যের মাধ্যমেই বুঝতে পারবেন, পরিস্থিতি যুদ্ধের নামে, সংঘাতের অজুহাতে, আক্রমণের দোহাই দিয়ে কীভাবে চালানো হচ্ছে।

Humanitarian Action নামে একটি যুদ্ধবিরোধী সংস্থা বলছে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যে যুদ্ধ চলছে, তা ইতিহাসের ভয়াবহতম। ২০২৩ সালেই বিশ্বজুড়ে ছোট-বড় যুদ্ধ ও সংঘাত ছিল ৫৯ স্থানে। ২০২৬ সালের হিসাবে বিশ্বের ১৩০টি দেশ বা স্থানে চলছে। ১৯৪৬—অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরের বছর থেকেই রাষ্ট্রভিত্তিক বা রাষ্ট্রের সঙ্গে সশস্ত্র ঘটনা ঘটছে। এই সশস্ত্র সংখ্যা বর্তমানে কোনোক্রমেই বছরে ২৩০ থেকে ২৪০-এর নিচে নামছে না। সংস্থাটি বলছে, ২০২৪-এর ছোটখাটো মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা মাত্র পাঁচ দেশেই—অর্থাৎ ফিলিস্তিনি, মিয়ানমার, সুদান এবং সাব সাহারার আফ্রিকায় ঘটেছে।

যুদ্ধে আগে থেকেই যুক্ত হয়েছে উচ্চমাত্রার জীবনঘাতী বিস্ফোরক অস্ত্র। আর এই বিস্ফোরক অস্ত্র, বোমা বা মাইন বিস্ফোরণের জন্য ব্যাপকহারে বিস্ফোরক এবং এর যন্ত্র (আইইডি) ব্যবহৃত হয়। এই বিস্ফোরকের কারণে ২০২৪ সালেই কমপক্ষে ৩৫ হাজার নিরীহ বেসামরিক মানুষ নিহত হন। অন্য এক সংস্থার তথ্য বলছে, ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সময়ে সাড়ে ৪৭ হাজার শিশু জীবন হারায় অকালে।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শিশুরা যে যুদ্ধের কাছে অসহায়, বিপন্ন তা প্রমাণিত হয় এক হিসাবে। বিশ্বের প্রতি পাঁচটি শিশুর মধ্যে একটি শিশুর স্বাভাবিক জীবন নেই, যুদ্ধ, সশস্ত্র সংঘাত বা এসব কারণে। এই সংখ্যা ৪০ কোটির নিচে নয়। সুদানে এই সংখ্যা স্বল্প সময়ে বেড়েছে ৪৮০ শতাংশ। ২০২৪ সালেই যুদ্ধ সংঘাতে সুদানে মারা গেছে কমপক্ষে ৬ হাজার ৩০০ জন। এই সংখ্যা আরো অনেক বেশি হবে বলে জাতিসংঘ বলছে। কারণ খবর পাওয়া যায় না, খবর মেলে না ঠিকমতো নানা সংঘাতের কারণে।

বিশ্বজুড়ে সংঘাত, যুদ্ধ

ইউক্রেনের যুদ্ধের খবর এখন বাসি হয়ে গেছে। কিন্তু রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ কিন্তু চলছেই। কয়েক দিন আগেই—অর্থাৎ জানুয়ারির ৩ তারিখে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেল সম্পদসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে সস্ত্রীক অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্র। কিউবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ২০২৬-এর মার্চে শুরু করেছেন জ্বালানি অবরোধ। আর এ কারণে অন্ধকারে ডুবে আছে কিউবা। খাদ্য, চিকিৎসাসহ মানবিক এক ভয়াবহ সংকটে পড়েছে কিউবা। জ্বালানি অবরোধের ফলে দেশটিতে কেউ তেল বিক্রি করতে পারবে না। যুদ্ধ চলছে লেবাননে, ইয়েমেন, সুদান ও সিরিয়ায়। ঠিক এই মুহূর্তে মিয়ানমার ওইসব রাষ্ট্রসহ বিশ্বের ১৩০টি স্থানে বড়-ছোট মিলিয়ে যুদ্ধ, সংঘাত ও সহিংসতা চলছে।

কিন্তু এর খবর আমাদের কাছে পৌঁছায় না। পৌঁছাবে না সাম্রাজাবাদী, নয়া ঔপনিবেশিক কর্মকাণ্ড আর কূটকৌশলের কারণে। পশ্চিমা মিডিয়া এখন আর স্বাধীন নয়, সাম্রাজ্যবাদ, নয়া ঔপনিবেশিকতার অন্যতম হাতিয়ার।

এ রকমই একটা ঘটনার কথা সারা দুনিয়ার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে ইচ্ছাকৃতভাবে। ঘটনাটি হচ্ছে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায়। ইরান যুদ্ধের কারণে সবকিছুকেই লুকিয়ে ফেলা, ইতিহাস গায়েব করা সহজ হয়েছে।

গাজায় চলছে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ

ফিলিস্তিনের গাজায় চলমান ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে লাখ লাখ মানুষ বিপন্ন হয়ে পড়েছে। অন্তত ১৬ লাখ মানুষের অবস্থা সংকটাপন্ন বলে ২০২৬-এ এপ্রিলের প্রতিবেদনে জানিয়েছে জাতিসংঘ। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় মৃত্যুর দুয়ারে রয়েছেন ৫ লাখ ৭০ হাজার মানুষ। এছাড়া প্রায় দুর্ভিক্ষের কবলে রয়েছেন লাখ লাখ গাজাবাসী, যার সংখ্যা ওই ১৬ লাখের ৭৭ শতাংশ। এসব কারণে গাজার জনসংখ্যা প্রতিদিনই কমছে। বর্তমানে গাজা উপত্যকায় জনসংখ্যা ২১ লাখ। ফিলিস্তিনের পরিসংখ্যান বলছে, গেল বছরখানেক সময়েই এই জনসংখ্যা ২ লাখ ৫৪ হাজারেরও বেশি কমেছে।

দুর্ভিক্ষ, খাদ্যসংকট, ইসরাইলের নিষেধাজ্ঞা এবং হত্যাযজ্ঞের কারণে ২০২৩-এর থেকে এ পর্যন্ত ৭২ থেকে ৭৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে এর অধিকাংশই মারা গেছে না বলে নিহত হয়েছে—বলাই যুক্তিসংগত। জাতিসংঘ বলছে, খাদ্য পরিস্থিতি বিপজ্জনকভাবে নাজুক।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, ২০২৩ সালের তুলনায় গাজা উপত্যকায় জনসংখ্যা কমেছে কমপক্ষে দুই লাখ থেকে আড়াই লাখ। পুরো ফিলিস্তিনের সংখ্যার হারও বাড়ছে মাত্র ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ হারে। ২০২২ সালে এই বৃদ্ধির হার ছিল ২ দশমিক ৩ শতাংশ হারে। বর্তমানে ফিলিস্তিনের জনসংখ্যা ৫৬৯২৭৯০ জন, যা ২০২২ সালে ছিল ৫৩০৫২৭০ জন।

অক্টোবর ২০২৩ থেকে গাজায় চলছে ইসরাইলি ভয়াবহ নিপীড়ন এবং খাদ্যসহ বিভিন্ন অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা। ওই সময় গাজা অবরোধের সঙ্গে সঙ্গে খান ইউনিস এবং রাফা আক্রমণ। এর আগে—অর্থাৎ ২০০৭ সাল থেকে ২০০৮-৯ এবং ২০১৪ সালে চালানো হয় নির্মম ‘নির্মূল ধ্বংসযজ্ঞ’। সেই থেকে কমবেশি অবরোধ চললেও ২০২৩-এর ৭ অক্টোবর থেকে ওই অবরোধ এখনো অব্যাহত আছে। যার মধ্যে ২০২৫-এর ফ্লোটিলা সামুদের পরে সামান্য অবস্থায় অবরোধ শিথিল করার কথা বলা হলেও তা ছিল ভাঁওতা। আবার অবরোধ এবং নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। যার ফলে সৃষ্টি হয়েছে এই দুর্ভিক্ষের মতো মারাত্মক মানবিক বিপর্যয়।

সেভ দ্য চিলড্রেন বলছে, সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আবার গাজায় তাদের প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়েছে। আরেকটি মানবিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেন বলছে, খাদ্য সহায়তা হিসেবে প্রতিদিন ১০ লাখের মতো মানুষের তৈরি খাবার রান্না করা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফিলিস্তিনবিষয়ক একজন বিশেষজ্ঞ বলছেন, গাজা উপত্যকায় এবং অধিকৃত ফিলিস্তিনে ইসরাইল খাদ্য, চিকিৎসাকে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। খাদ্য এবং চিকিৎসাকে অস্ত্র বানানোর কৌশল সম্পর্কে ইসরাইলের ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টা ডড ডাইসগ্লাস ২০০৬ সালে প্রথম বলেছিলেন, ‘ফিলিস্তিনিদের কম খাবার দেওয়া হবে, তবে গণহারে মরতে দেওয়া হবে না। এই পদ্ধতিই এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে।’

গাজায় এই দুর্ভিক্ষ, অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে ইসরাইলের অবস্থান জানিয়ে দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট ফিলিস্তিনিদের ‘মানবপশু’ আখ্যা দিয়ে অবরোধ এবং নিষেধাজ্ঞার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। এরই প্রতিধ্বনি শোনা যায়, ইসরাইলি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিজের কণ্ঠে। তিনি গাজার পরিস্থিতিকে ন্যায্য এবং নৈতিক বলে উল্লেখ করে লাখ লাখ গাজাবাসীর দুর্ভিক্ষাবস্থাকে জোরালো সমর্থন জানান। ২০২৩ সালে গাজা অবরোধ এবং যুদ্ধের আগে ওই স্থানে প্রতিদিন ৫০০ ট্রাকবাহী পণ্য নেওয়ার কথা জাতিসংঘ জানালেও বর্তমানে তা প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হয়েছে। মাঝেমধ্যে ১৯টি ট্রাক প্রবেশ করতে দেওয়া হয়।

বিশেষজ্ঞরা এই খাদ্যাভাব এবং স্থায়ী দুর্ভিক্ষকে ইসরাইলের ক্যালোরি কলাপস বা ক্যালোরির পতন নীতি বলে উল্লেখ করেন।

গাজাবাসী পানিসংকটেও ভুগছেন। ৮৪ লিটার নির্ধারিত পানির বদলে দেওয়া হয়েছে মাত্র তিন লিটার এবং তাও আবার অনিয়মিত।

মানবাধিকার সংস্থা অক্সফাম তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২৫-এর তথাকথিত যুদ্ধবিরতি এবং শিথিল অবরোধের সময় ইচ্ছাকৃতভাবে গাজাবাসীকে ১০০ দিন পরেও ওই তিন লিটার পানিও দেওয়া হচ্ছে না।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বলছে, ইসরাইলের একটি কৌশল হলো সাহায্য আটকে দেওয়া এবং সাহায্য দেওয়ার নামে তাতে নানা কারসাজি করা, যাতে গাজাবাসী সাহায্য না পান। গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) নামে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র একটি ভুয়া এবং সাহায্য তছরুপকারী সংস্থা গঠন করে। এই সংস্থার সাহায্য বিতরণের নামে যে হুলস্থূল এবং নৈরাজ্য, বিচ্ছৃঙ্খলা ইচ্ছাকৃতভাবে সৃষ্টি করা হয়, তাতে শত শত গাজাবাসীসহ ফিলিস্তিনি নিহত হন। পরে অবশ্য খবর বের হয়, হামাসকে জনবিচ্ছিন্ন করার জন্য এই কৌশল নেওয়া হচ্ছে, দোষ চাপিয়ে।

অনাহার এবং খাদ্য অপ্রাপ্তিকে ইসরাইল দমনমূলক ‘প্রতিরোধবিরোধী’ একটি কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেছে। ফিলিস্তিনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং গবেষক সুলাইমান বাশারাত গণমাধ্যমকে বলেন, দুর্ভিক্ষ, খাদ্যাভাব, পানির অপ্রাপ্তিসহ যা কিছু, তা করা হচ্ছে ফিলিস্তিন প্রতিরোধকে সমর্থনকারী সামাজিক এবং মানবিক ব্যবস্থা ও ভিত্তিকে বিপন্ন করা এবং তারাসহ ফিলিস্তিনিদের মনোযোগ শুধু জীবনটাকে টিকিয়ে রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার জন্য। যাতে ইসরাইলবিরোধী রাজনৈতিক চিন্তা এবং প্রতিরোধ চেষ্টার আর অবকাশ না থাকে।

এই দুর্ভিক্ষসহ ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের পরিস্থিতি সৃষ্টিকে ইসরাইলের নীতি হিসেবে উল্লেখ করে বিশ্লেষকরা বলছেন, নানা নীতিকৌশল ইতোমধ্যে ইসরাইল সরকার গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে প্রধানতমটি হচ্ছে স্বেচ্ছামূলক অভিবাসন বা গাজা ত্যাগ করতে বাধ্য করা।

দুর্ভিক্ষে গত দুই বছরের কম সময়ে কমপক্ষে ৭০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হলেও ইসরাইল-ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে বাধ্য করছে সংখ্যা কমাতে। বন্দুকের নল আর হত্যার হুমকির কারণে আনুষ্ঠানিক তথ্য ৪৭৫ জনে সীমিত রাখা হয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্যবিষয়ক বিশেষ দূত মাইকেল ফাকরি বলতে বাধ্য হয়েছেন, এই সংখ্যা অতিরক্ষণশীল।

শত বাধা-বিঘ্ন সত্ত্বেও গাজার স্বাস্থ্য দপ্তর বলছে, খাদ্যাভাবে মোট জনসংখ্যার ৪১ শতাংশ (৬০ বছরোর্ধ্ব) এবং ৩৫ শতাংশ শিশু খাদ্যাভাবজনিত ভয়াবহ ব্যাধিতে আক্রান্ত। মানবিক সাহায্য সংস্থাগুলো বলছে, গাজা উপত্যকার ২১ লাখ মানুষই লেভেল-৩—অর্থাৎ মারাত্মক খাদ্যসংকটের ঝুঁকিতে আছেন। যাকে দুর্ভিক্ষ বলা যায় সহজেই; কিন্তু বলা যাবে না ইসরাইলিদের নির্মমতা আর বর্বরতার কারণে।

বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে শিশুরা

সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে শিশুরা। ভয়াবহ দুর্ভিক্ষকবলিত—অর্থাৎ মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা—অর্থাৎ কোনো মতে জীবন আছে—এমন ১৬ লাখ মানুষের অর্ধেকই শিশু। সেভ দ্য চিলড্রেন বলছে, আট লাখ শিশুর জীবন এখন গভীর শঙ্কার মধ্যে। প্রতি মিনিটে ৩৫টি শিশুর জন্ম হচ্ছে দুর্ভিক্ষের এই দুনিয়ায়।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, ২০২৩ থেকে এ পর্যন্ত সময়ে এমন কোনো দিন নেই, যেদিন গাজায় প্রতি ঘণ্টায় ইসরাইলি আক্রমণে এবং দুর্ভিক্ষে অন্তত একটি করে শিশু জীবন দেয় না, দিচ্ছে না। ২৩ মাসের এক হিসাবে কম করে হলেও ২০ হাজার শিশু গাজায় নিহত হয়েছে। ইসরাইলি বাধার মুখেও এই তথ্য গাজার কর্তৃপক্ষের। প্রকৃত হিসাব আরো বেশি হবে। কারণ ইসরাইল নিহতের প্রকৃত সংখ্যা দিতে বাধা দেয়। নিহত এই শিশুদের মধ্যে মাত্র এক বছরও হয়নি এমন সংখ্যা ১ হাজার ৯ জন। জন্মেই নিহত হয় ৪৫০ জন—অর্থাৎ তারা পৃথিবীর মুখই দেখেনি। আহত হয়েছে কমপক্ষে ৪৩ হাজার শিশু। এরা এমনভাবে আহত হয়েছে, কোনো দিন তারা আর কর্মক্ষম থাকবে না।

পশ্চিমা প্রচারমাধ্যম দুর্ভিক্ষ বলে না। বলে না তথাকথিত পশ্চিমা দাতা ও মানবিক সংস্থাও। অথচ বর্তমানে লাখো লাখো মানুষ দুর্ভিক্ষসীমায় আছে, আছে সীমাহীন খাদ্যসংকট। সেভ দ্য চিলড্রেনই বলছে, গাজার শিশুদের মধ্যে দুর্ভিক্ষাবস্থায় (ফেস-৫)—অর্থাৎ গুরুতর সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে এক লাখ বত্রিশ হাজার শিশু। আর এদের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। এরই মধ্যে দুর্ভিক্ষে ও না খাওয়ার কারণে প্রতি পাঁচ শিশুর মধ্যে চারজনকেই বেঁচে থাকতে হয়। এদের অনেকেরই বাঁচার সম্ভাবনা ক্ষীণ। গত ২২ আগস্ট ইসরাইলের প্রচণ্ড বাধার মুখেও শিশুদের জন্য দুর্ভিক্ষাবস্থা ঘোষণা করা হয়। দুর্ভিক্ষ ঘোষণার দিনই মারা যায় ২১ শিশু।

জাতিসংঘের সেভ দ্য চিলড্রেন সংস্থার আঞ্চলিক প্রধান Ahmad Alheuwal অশ্রুসিক্ত চোখে এক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে বলেন, এসব পরিসংখ্যান, অঙ্কের সংখ্যা সব গ্লানির, কলঙ্কের। এর চরিত্রের তুলনা করা যায় শুধু যুদ্ধের ভয়াবহ নিম্নপর্যায়ের কার্যক্রম হিসেবে। এটি এমন এক পদ্ধতিগত অপরাধ এবং আক্রমণ, যা তুলনারও অযোগ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্য এবং আফসোস—বিশ্ব এই ভয়াবহতার দিকে তাকিয়েও দেখবে না, দেখে না।

লেখক : গবেষক, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাবিষয়ক বিশ্লেষক

বাঙালির জীবনে পহেলা বৈশাখ

বিচার বিভাগ কেন স্বাধীন হয় না

ভূরাজনীতিতে ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে ভারত

বাংলা নববর্ষের ইতিহাস

বাংলার হারানো সনের কথা

চোরতন্ত্রের দেশে নেপোকিডরা

শিক্ষক প্রশিক্ষণ : চাই শ্রেণিকক্ষে বাস্তব পরিবর্তন

পাঁচ জেনারেল ও বাংলার ট্র্যাজেডি

আমেরিকা কি আরেকটি যুদ্ধে হেরে গেল

বৈশাখী নববর্ষ, লাল ঝুঁটির মোরগ, কী আনন্দ!