হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ভারতে মুসলিমবিদ্বেষের নগ্ন দৃষ্টান্ত

এলাহী নেওয়াজ খান

বছরের শেষ দিনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের ঢাকা আগমনের পর অনেকে মনে করেছিলেন, দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে। হয়তো নতুন বছরের শুরুতে সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। কিন্তু সপ্তাহ পার হতে না হতে বছরের শুরুতেই বিখ্যাত ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনা এবং পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশের অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে শর্তারোপ দুই দেশের সম্পর্ককে বরং আরো জটিল ও তিক্ত করে তুলেছে।

মোস্তাফিজ ইস্যুতে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত দুটি। তার একটি হচ্ছে, আসন্ন অনুষ্ঠেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ অংশ নেবে; কিন্তু নিরাপত্তার কারণে ভারতের মাটিতে খেলবে না। তারা শ্রীলঙ্কা কিংবা অন্য যেকোনো ভেন্যুতে খেলবে। দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত হচ্ছে, আইপিএলের খেলা সম্প্রচার না করা, যা ভারতকে যথেষ্ট আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলবে। বাংলাদেশের এ দুটি সিদ্ধান্ত সঠিক হয়েছে বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। কারণ যদি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বয়কট করা হতো, তাহলে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের আগামী এক বছর কোনো ম্যাচ থাকত না। ফলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হতো। তবে আইপিএলের খেলা সম্প্রচার না করার সিদ্ধান্ত একটা যথাযথ জবাব হয়েছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।

যা হোক, এখানে উল্লেখ করতে হয়, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর ঢাকায় এসেছিলেন গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সমবেদনা জানাতে। আর মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনা ঘটে শ্রী জয়শঙ্করের ঢাকা ত্যাগের তিন দিনের মাথায় গত ৩ জানুয়ারি। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে আশার আলো দেখা তো দূরের কথা, বরং হিন্দুত্ববাদের আরো ভয়ংকর রূপ বিশ্ববাসী দেখল।

যে প্রেক্ষাপটে ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই) কেকেআর থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দিয়েছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মূলত বিজেপি, শিবসেনা ও অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের নেতারা বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চলছে বলে যে উগ্র প্রচারণা চালায়, তার প্রেক্ষাপটেই মোস্তাফিজুর রহমানকে কেকেআর থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। যদিও বিসিসিআই সচিব দেবজিৎ সাইকেয়া নিরাপত্তার ইস্যু টেনে বাদ দেওয়ার কথা বলেছেন। এটা কি বিশ্বাস করা যায়? তবে ব্যাপারটা এমন হতে পারে যে, বাংলাদেশের তথাকথিত সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়ে ভারতের হিন্দুত্ববাদীরা এতটা ক্ষুব্ধ যে, তাদের আক্রমণ থেকে মোস্তাফিজকে রক্ষা করার সামর্থ্য ভারত সরকারের ছিল না! অবশ্য বৃহৎ শক্তি হিসেবে দাবি করা ভারত সরকার একজন খেলোয়াড়কে নিরাপত্তা দিতে সক্ষম নয়, তা কেউ বিশ্বাস করে না। আর যেখানে খোদ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলে হচ্ছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সভাপতি, সেখানে নিরাপত্তার ইস্যুটি অবান্তর ছাড়া আর কী হতে পারে? এক্ষেত্রে বলা যায়, মূলত মুসলিমবিদ্বেষ থেকে এই নাটকের অবতারণা করা হয়েছে।

অন্যদিকে ভারতের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার ইস্যুটি তুলে ধরায় বাংলাদেশ সরকারের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়েছে। আর সে কারণেই বাংলাদেশ প্রশ্ন করতে পারছে যে, একজন ব্যক্তিকে যে দেশ নিরাপত্তা দিতে পারে না, সে দেশ কীভাবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টে একটা ক্রিকেট টিমের এত লোককে নিরাপত্তাদান করবে? আর এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশ ভারত ছাড়া অন্য ভেন্যুতে খেলার দাবি করেছে। এটা সম্পূর্ণ যৌক্তিক একটি দাবি।

যদিও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কের একটা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে, কারণ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এই দেশটি আমাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশকে করদ রাজ্য হিসেবে ভাবার ভারতীয় শাসকদের মানসিকতার কারণে এ সম্পর্ক কখনোই সন্দেহমুক্ত যৌক্তিক পর্যায়ে উপনীত হয়নি; বরং বলা যায়, জুলাই বিপ্লবের মুখে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান এবং শেখ হাসিনাসহ দলটির নেতাকর্মীদের ভারতে আশ্রয় গ্রহণের পর সম্পর্কটা প্রায় তলানিতে পৌঁছে গেছে। তা আরো তিক্ততায় রূপ নিয়েছে মোস্তাফিজুর রহমানকে কেন্দ্র করে।

বিশেষ করে সাম্প্রদায়িকতার অজুহাতে মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় এটা প্রতিভাত হচ্ছে, ভারত ক্রমান্বয়ে এমন একটি অসহিষ্ণু ও উগ্রবাদী হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ইঙ্গিত বহন করছে। যুক্তি, কূটনীতি, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সৌজন্য প্রভৃতি সবকিছু সেখানে মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। ভারতের যারা শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ তারাও ক্রমান্বয়ে কোণঠাসা পড়েছে। পরিস্থিতিটা এখন এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিজেপি শাসনামলে ভারতের হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো কেবল রাজনৈতিক মাঠে নয়, এখন খেলাধুলার মাঠেও হাত প্রসারিত করেছে এবং খেলাকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এটা এমন একটা দৃষ্টান্ত, যা আধুনিক যুগে অগ্রহণযোগ্য এবং পশ্চাৎপদ মানসিকতারই প্রতিফলন।

যদিও এরই মধ্যে ভারতের মাটিতেই অনেক ক্রীড়া সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতা মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন। একজন সাবেক ক্রীড়া সাংবাদিক ও বিশ্লেষক মোস্তাফিজের প্রসঙ্গ তুলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, এই সংস্থাটি একদম নখদন্তহীন। তিনি বলেছেন, যদি ফিফা হতো, তাহলে ভারতের কান ধরে এই খেলোয়াড়কে খেলাতে বাধ্য করত।

তিনি একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরে বলেন, ২০০২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের ভেনু ছিল উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া—এই দুই দেশে। কিন্তু দুদেশের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ থাকায় তারা আয়োজন করতে অস্বীকার করছিল। তখন ফিফা তাদের সাফ জানিয়ে দেয়, তারা যদি বিশ্বকাপের আয়োজন করতে না পারে, তাহলে তাদের ফিফা সদস্যপদ বাতিল করে দেওয়া হবে। এই হুমকির পর তারা দুই দেশ বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজন করতে বাধ্য হয়েছিল।

এই ক্রীড়া বিশ্লেষক আরো যে কথাটা বলেছেন তা খুবই মজার। তিনি বলেছেন, বর্তমানে ওই সংস্থার যিনি সভাপতি তার নাম হচ্ছে জয় শাহ। তিনি খোদ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ছেলে—কোনোদিন ক্রিকেট ব্যাট হাতে নেননি। তাই তিনি তাকে একটু কটাক্ষ করে বলেন, ‘আমগাছে আমই হয়, আমড়াগাছে আমড়াই হয়।’

অন্যদিকে ভারতের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, কলামিস্ট ও কংগ্রেসদলীয় সংসদ সদস্য শশী থারুর ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডকে আরো এক হাত নিয়েছেন। তিনি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বিসিসিআইয়ের সিদ্ধান্তের নৈতিকতার প্রসঙ্গ তুলে প্রশ্ন করেছেন, বাংলাদেশি হিন্দু ক্রিকেটার হলে কি একই আচরণ করা হতো? তিনি বলেন, ‘ধরা যাক, লিটন দাস বা সৌম্য সরকার—যারা বাংলাদেশ দলের হিন্দু ক্রিকেটার—এবার আইপিএল নিলামে বিক্রি হতেন, তাহলে কি তাদেরও বাদ দেওয়া হতো? তা যদি না দেওয়া হতো, তাহলে আমরা কী বার্তা দিচ্ছি? আমরা কি মুসলিম বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে, কিন্তু হিন্দু বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে নই?’

তিনি আরো বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই ভেবেচিন্তে নেওয়া হয়নি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপে নেওয়া হয়েছে। এটা আমাদের দেশ হিসেবে ছোট করে, আমাদের কূটনীতিকে ছোট করে, আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ছোট করে। তাই এই লজ্জা আমরা নিজেরাই ডেকে এনেছি।’

সম্প্রতি অর্থাৎ বিদায় বছরের ডিসেম্বর মাসে ভারতের বিভিন্ন স্থানে খ্রিষ্টানদের ওপরে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের আক্রমণের রেশ কাটতে না কাটতেই মোস্তাফিজ ইস্যু ভারতের ইমেজকে আরো প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। এই হিন্দুত্ববাদীরা মোস্তাফিজ ইস্যুতে কেকেআরের মালিক এবং প্রখ্যাত অভিনেতা শাহরুখ খানকে বিশ্বাসঘাতক বলতেও দ্বিধাবোধ করেনি। কারণ তিনি একজন মুসলমান। এ প্রসঙ্গে মকবুল ফিদা হোসেনের কথা মনে পড়ছে। তিনি ছিলেন পৃথিবীবিখ্যাত শিল্পী, যার আঁকা ছবি কোটি কোটি টাকায় বিক্রি হতো। তিনি সিনেমাও নির্মাণ করেছেন। অসামান্য কীর্তির জন্য ভারত সরকার তাকে পদশ্রী পুরস্কারও দিয়েছিল। কিন্তু ২০০৬ সালে একটি পেইন্টিংকে কেন্দ্র করে হিন্দুত্ববাদীরা তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয় এবং তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় অসংখ্য মামলা। ক্রমাগত হত্যার হুমকির প্রেক্ষাপটে একপর্যায়ে তিনি ভারত ত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং নির্বাসিত জীবন বেছে নেন। নির্বাসনকালেই ইংল্যান্ডে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। হয়তো একদিন ভারতে এমন অবস্থায় সৃষ্টি হতে পারে যে, শাহরুখ খানদের মতো মুসলমানদেরও ভারত ত্যাগ করে অন্যত্রে নির্বাসিত হতে হবে।

এদিকে মোস্তাফিজ ইস্যুতে হিন্দুত্ববাদীদের প্রচারণায় বাংলাদেশের যে ঘটনাটি সবচেয়ে বেশি প্রচারিত হয়েছে, সেটা হচ্ছে ময়মনসিংহে একজন হিন্দু যুবককে পুড়িয়ে মারার ঘটনা। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে নিষ্ঠুরভাবে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করার ঘটনাটি বড় করে দেখানো হয়েছে। এটা একটি মর্মান্তিক ঘটনা, যা নিন্দা করার ভাষা আমাদের নেই। তবুও বলব, এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক চিত্র নয়, বরং একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা; কারণ বাংলাদেশে নানা স্বার্থে হিন্দু-মুসলমান উভয় ক্ষেত্রেই এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে। এর সঙ্গে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং সরকার ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে জড়িত সন্দেহে বেশ কয়েকজন গ্রেপ্তার করেছে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অঙ্গীকারও করেছে। কিন্তু ভারতে গরুর গোশত রাখার মিথ্যা অভিযোগে গোরক্ষকরা কত মুসলমানকে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করেছে, তার হিসাব নেই। এ ব্যাপারে যারা জড়িত পরবর্তী সময়ে তাদের গ্রেপ্তার কিংবা শাস্তির ঘটনা যেমন অজানা রয়ে গেছে, তেমনি এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের জনগণ কখনো উগ্র মনোভাব পোষণ করেনি। বরং বলা যায়, বাংলাদেশ চিরকালই অসাম্প্রদায়িক এবং অনন্য এক সম্প্রীতির দেশ, যেখানে হিন্দু-মুসলমান একই রেস্টুরেন্টে একই টেবিলে চা ভাগাভাগি করে পান করে। এখানে ভারতের মতো জাত-পাতের বৈষম্য নেই, যেন কবি নজরুল ইসলামের সেই বিখ্যাত লাইনটির মতো—‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।’

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক