দু’বছর আগে অবিস্মরণীয় এক গণবিস্ফোরণে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পলাতক ফ্যাসিস্ট শাসক শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দিয়েছেন। নির্বাসনে থাকা দলের নেতাদেরও তার সঙ্গে দেশে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে গত বৃহস্পতিবার রাতে টেলিফোনে সাক্ষাৎকার দেন দিল্লিতে আশ্রিত শেখ হাসিনা। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি নির্দিষ্ট করে আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার কথা বলেন। সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ সরকার তাকে ফেরত পাঠাতে ভারতকে চিঠি দিচ্ছে, কিন্তু তিনি নিজেই দেশে ফিরবেন। তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের প্রায় সব নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং তাদের অনেকেই আত্মগোপনে আছেন। তাই আমি বলেছি, এবার আমি দেশে ফিরছি। একদিন তোমরাও সবাই এসো। আমরা সবাই একসঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ করব।’ বিচারব্যবস্থায় বিশ্বাস আছে বলে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হলে মানুষ বুঝতে পারবে আদালতটি কতটা প্রহসনের। আর আমি সেটাই প্রমাণ করতে চাই।’
শেখ হাসিনার এ বক্তব্য নিয়ে আলোচনার ঝড় তোলার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। তার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দেশে-বিদেশে সরবে-নীরবে থাকা ফ্যাসিস্ট দোসর ও কালচারাল ফ্যাসিস্টরা ভার্চুয়াল জগতে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তারা এমন প্রশ্নও রাখছেন—‘এবার কী করবে সরকার?’ দেশে ঘাপটি মেরে থাকা শেখ হাসিনার তাঁবেদার মিডিয়া পাড়ায়ও কেমন জানি ফুরফুরে ভাব দেখা যাচ্ছে। ফ্যাসিবাদের এক সেবাদাসী লাইভে বলছিলেন, ‘শেখ হাসিনা কোনো কথা বললে বা ঘোষণা দিলে তা রক্ষায় ঝুঁকি নেন, এটা প্রমাণিত।’
এমন একটি সময়ে মিডিয়া ও ভার্চুয়াল জগৎ শেখ হাসিনার ‘ফেরা নাটক’ নিয়ে ব্যস্ত, যখন দেশে জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী সমুপস্থিত। জুলাই অভ্যুত্থান বার্ষিকী পালনে যারা আগ্রহী ও উৎসাহী, তাদের এক ধরনের বার্তা দিতেই হয়তো এই সময়টিকে বেছে নেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে—শেখ হাসিনা কেন ছয় মাস পরে একটি নির্দিষ্ট সময় দিয়ে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন? ডিসেম্বরে যদি ফিরতে আগ্রহী হন তাহলে আগস্টে কেন নয়? আবার লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, নিজের ফেরার পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীদের ফেরার ব্যাপারে যে বক্তব্য দিয়েছেন তার মধ্যেও শুভঙ্করের ফাঁক আছে; বলেছেন, ‘এবার আমি দেশে ফিরছি, একদিন তোমরাও সবাই এসো। আমরা সবাই একসঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ করব।’ এর মানে কী? শেখ হাসিনা ফিরবেন, তিনি মেহমানখানায় রেস্টে থাকবেন, তারপর একসময় বিদেশে পলাতকরা আসবেন। অতঃপর তিনি সবাইকে নিয়ে ঢাকঢোল বাজাতে বাজাতে আত্মসমর্পণ করবেন। বাহ! দারুণ পরিকল্পনা বটে! একজন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি দেশের সীমানার মধ্যে প্রবেশ করা মাত্র তার ব্যাপারে রাষ্ট্র বা সরকারের করণীয় কী, সেটা শেখ হাসিনা জানেন না? তিনি আত্মসমর্পণের সুযোগ পাবেন কীভাবে? ফাঁসির দণ্ড ছাড়াও তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে কতগুলো, সেটা কি তার কাছে হিসাব আছে?
দেশে আসতে হলে তার ট্রাভেল ডকুমেন্ট লাগবে। পাসপোর্ট তো বাতিল করা হয়েছে অভ্যুত্থানের পরই ড. ইউনূস সরকারের সময়ে। এখন তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে হলে বা নিজে আসতে চাইলে প্রথমে দিল্লির মিশন থেকে ট্রাভেল ডকুমেন্ট ইস্যু করতে হবে। তাছাড়া তো তিনি বিমানেই আরোহণ করতে পারবেন না। ইমিগ্রেশন ক্রস করতে পারবেন না। দিল্লিপতি নিয়মনীতির বাইরে গিয়ে কোনো একটা এয়ারক্রাফটে তুলে দিলেই কি সেটাকে ঢাকায় স্বাগত জানানো হবে? তা হতে হলে দুদেশের সরকারি পর্যায়ে বোঝাপড়া হতে হবে। দণ্ডিত শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ঢাকা যে তাগাদাপত্র দিয়েছে একাধিকবার, তার আওতায় নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় পলাতক আসামিদের যেভাবে ধরে আনা হয়, সেভাবে আসতে হবে শেখ হাসিনাকে। এর আগে একবার শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘আমি কাছেই আছি। যেকোনো সময় টুপ করে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ব।’ তখনো দলের কিছু নির্বোধ নেতাকর্মী সীমান্তের দিকে চেয়েছিলেন; বলেছিলেন, ‘নেত্রী দিল্লি ছেড়ে সীমান্তবর্তী রাজ্যে চলে এসেছেন।’ সেই ‘টুপ করে’ ঢুকে পড়া দেড় বছরেও কিন্তু হয়নি।
স্টান্টবাজিতে শেখ হাসিনার জুড়ি মেলা ভার। দলীয় নেতাকর্মীদের সংগঠিত করা, চাঙা রাখা এবং মনোবল ধরে রাখার কৌশল হিসেবে তিনি এমন আওয়াজ দিচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। যারা ভাবছেন, শেখ হাসিনা ঝুঁকি নেবেন, তারা একবারও চিন্তা করেন না—ঝুঁকি নেওয়ার মুরোদ থাকলে তো চব্বিশের ৫ আগস্টেই নিতেন। অন্য নেতা, মন্ত্রী, আমলা বা স্পিকার শিরীন শারমিনের মতো ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় নেওয়ার ন্যূনতম ঝুঁকিও তো নিতে চাননি। কথায় কথায় জীবনটা জনগণের জন্য উৎসর্গ করার বয়ান দিলেও দেশ ও জনগণের চেয়ে নিজের জীবনের মায়া যে কত বেশি, তা শেখ হাসিনা বারবার প্রমাণ করেছেন। পঁচাত্তর সালে বাবা-মাসহ পরিবারের সব সদস্যের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর কি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের শেষবারের মতো দেখা কিংবা দাফন-কাফনের জন্য আসার চেষ্টা করেছিলেন? না, করেননি। এমনকি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় সরকারের পক্ষ থেকে বারবার দেশে ফেরার অনুকূল পরিবেশ ও নিরাপত্তার বিষয়টি জানান দেওয়ার পরও তখন অন্তত তিনবার ফেরার তারিখ পরিবর্তন করেছেন। সংবাদপত্রের পাতায় তার প্রমাণ আছে। সর্বশেষ এসেছেন রাষ্ট্রপতি জিয়াকে খুনের ষড়যন্ত্র চূড়ান্ত করে। তার ফেরার অল্প কিছুদিনের মাথায় নন্দিত রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানকে জীবন দিতে হয়।
আবার ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন-পরবর্তী মইন-ফখরুদ্দীনের শাসনেও জীবন দেওয়া তো দূরে থাক জেলের ঝুঁকিও বেশি দিন নিতে পারেননি শেখ হাসিনা। মাইনাস টু ফর্মুলার আওতায় সম্মত হয়ে সমঝোতা করে দেশ ছেড়ে চলে যান। তখন মাথার ওপর মৃত্যুদণ্ডের রশি ঝোলেনি। রাজনীতি না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েই সে সময় দেশ ছেড়েছিলেন তিনি। পরে বেগম খালেদা জিয়াকেও একইভাবে রাজনীতি থেকে মাইনাস করে নির্বাসনে পাঠাতে চাইলে তিনি রাজি হননি। তার দৃঢ় ও অনমনীয় মনোভাবের সুবিধা পান শেখ হাসিনা। একপর্যায়ে খালেদা জিয়াকে রাজি করাতে না পারার যুক্তিতে শেখ হাসিনাকে ফিরতে দিতে বাধ্য হয় সেই সেনাসমর্থিত সরকার।
এরশাদের আমলেও শেখ হাসিনা জেল-জুলুমের ঝুঁকির পরিবর্তে বোঝাপড়ায় ক্ষমতার রাজনীতির অন্ধকার গলিতে হেঁটেছেন। মোটা অঙ্কের লেনদেন করে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে গিয়ে এরশাদের স্বৈরশাসনকে বৈধতা দিয়েছেন। সেই শেখ হাসিনা এখন মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে দেশে আসবেন, এমনটা বিশ্বাস করা অত সহজ নয়। জুলাই বিপ্লবের অন্যতম নায়ক এনসিপির প্রধান নাহিদ ইসলাম বলেছেন, শেখ হাসিনাকে আসতে হবে বা ফিরিয়ে আনতে হবে মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকরের অংশ হিসেবে। তিনি বলেন, ‘এটা তো শেখ হাসিনা ঠিক করবেন না, তিনি কীভাবে আসবেন। তিনি কাদের নিয়ে আসবেন, সারেন্ডার (আত্মসমর্পণ) করবেন কি করবেন না—এটা ঠিক করতে হবে বাংলাদেশ সরকারকে। বাংলাদেশ সরকার এটা নিয়ে কথা বলবে দিল্লির সঙ্গে, এখানে আর কোনো পক্ষ নেই। ফলে এটা সরকার ঠিক করবে—তাকে কখন আনবে, কীভাবে আনবে এবং কীভাবে বিচারের রায় কার্যকর করবে। সব প্রস্তুতি নিয়েই তাকে আনতে হবে।’
এর আগের লেখায় বিস্তারিত লিখেছিলাম, গণঅভ্যুত্থানে বিতাড়িত ও দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরশাসকরা কোন কোন প্রেক্ষাপটে ফিরতে পারেন। সে ধরনের প্রেক্ষাপট ডিসেম্বরের মধ্যে তৈরি হবে—এমনটা বিশ্বাস করার মতো অর্বাচীন শেখ হাসিনা নন। তবে হ্যাঁ, মজ্জাগতভাবে ষড়যন্ত্রকারী শেখ হাসিনার কোনো ব্লু-প্রিন্ট থাকতে পারে। সে ব্লু-প্রিন্ট বাস্তবায়ন করতে ক্ষমতাসীন তারেক রহমানের সরকার কিংবা জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষ শক্তি দেবে কি না, সেটা দেখার বিষয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরকারের পদক্ষেপ পতিত শক্তিকে যে আশান্বিত করে তুলছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এখন পর্যন্ত প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও বিভিন্ন বাহিনীতে শেখ হাসিনার অনুগতরা সক্রিয় রয়েছে। অনেকে বেশ ভালোভাবেই আছেন। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা অনেকের যত্ন-আত্তিতে হাসিনাঘনিষ্ঠ অনেক সামরিক-বেসামরিক আমলা সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছেন। ফলে সরকারের ভেতরকার রাজনৈতিক কৌশল ও প্রশাসনিক পরিকল্পনা খুব দ্রুতই জেনে যাচ্ছেন সীমানার বাইরে থাকা পলাতক নেতারা। শেখ হাসিনা নিজেও যোগাযোগ রাখছেন। কাউকে খোঁটা দিয়ে, কাউকে ধমক দিয়ে কব্জায় রাখতে চাইছেন।
শেখ হাসিনা নেতাকর্মীদের সঙ্গে ভার্চুয়াল যেসব বৈঠক করছেন, সেগুলোয় দেশে ফেরার বিষয়ে আলোচনায় একটি বিষয় প্রাধান্য পাচ্ছে বলে জানা গেছে। যত বিলম্ব হবে, ফেরা তত কঠিন হবে বলে আলোচনায় উঠে আসছে। যত দিন যাবে, সরকার ততই নিজের অবস্থান সংহত করে নেবে বলেও নেতারা ভার্চুয়ালি মত দিচ্ছেন। প্রশাসন পুরো মাত্রায় পুনর্বিন্যস্ত হলে আন্দোলন সফল করা কঠিন হবে—এমনটাই বলছেন তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতারা। বিশেষত শেখ হাসিনার অনুগত আমলা ও বিভিন্ন বাহিনীর পলাতক ও পদচ্যুত-চাকরিচ্যুত কর্মকর্তারা ভার্চুয়াল সভায় ও যোগাযোগে যুক্তি দেখাচ্ছেন—আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার আন্দোলনে সহায়তা করার সুযোগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
অভ্যুত্থানের দু’বছরের মাথায়ও হাসিনার দেড় দশকে নিয়োগপ্রাপ্তরা প্রশাসন, বিভিন্ন বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখতে পেরেছে। তাদের মধ্যে গোপন যোগাযোগ এবং শলাপরামর্শ নিয়মিতভাবে হচ্ছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে হলে সহসা সরকারকে বড় ধাক্কা দিতে হবে। নতুন নিয়োগ ও বড় ধরনের পরিবর্তন হয়ে গেলে তা কঠিন হয়ে যাবে, এমন আলোচনা হচ্ছে ভার্চুয়াল যোগাযোগে।
রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে বড় ধরনের নাশকতা এবং আন্দোলনের ছক কষছেন পলাতক নেতারা। তারা শেখ হাসিনাকে আশ্বস্ত করেছেন, বিমানবন্দর ঘিরে বিপুল লোকসমাগম করলে এবং পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অংশ নিষ্ক্রিয় থেকে পরোক্ষ সহযোগিতা করলে সরকার বেসামাল অবস্থায় পড়বে। বাধ্য হয়ে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় স্থগিত করে তাকে রাজনীতির সুযোগ দেবে। এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া অধিকাংশ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী জামিনে মুক্তি পাওয়ায় বিচারাঙ্গন নিয়েও তাদের মধ্যে আশাবাদের জায়গা আছে। উচ্চ আদালতে এখন পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনে নিয়োগপ্রাপ্তদের সংখ্যাধিক্য রয়েছে। আপাতত তারা বিএনপির আইনজীবী নেতাদের তুষ্ট করে টিকে আছেন। সময়মতো স্বরূপে ফেরার অপেক্ষায় আছেন বলেও আওয়ামী মহলে আলোচনা রয়েছে। একই অবস্থা মিডিয়া পাড়ায়ও। বড় ধরনের পরিবর্তন না হওয়ায় সময়মতো প্রয়োজনীয় সাপোর্ট পাওয়ার ব্যাপারে পতিত দলটি আশাবাদী।
অনেকের স্মরণ থাকার কথা, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে ভারতের মধ্যস্থতায় মইন-ফখরুদ্দীনের সরকারের সঙ্গে বোঝাপড়ার পাতানো নির্বাচনে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি ক্ষমতা গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ। এক বছরের মাথায় তারা নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ স্থায়ীভাবে রুদ্ধ করার পথে হাঁটতে শুরু করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রথমে আদালতের মাধ্যমে বাতিল ও পরে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে স্থায়ীভাবে রহিত করে। তখনো শেখ হাসিনার সরকার প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, আদালতসহ সব পর্যায়ে নিজেদের বিশ্বস্ত ও অনুগত লোক বসিয়ে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল অনেক বিশিষ্টজন তখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পরামর্শ দিয়েছিলেন, তাৎক্ষণিকভাবে সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তুলে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহালে বাধ্য করতে; প্রয়োজনে সরকার পতনের আন্দোলন ডাক দিতে। খালেদা জিয়াও এতে সম্মত ছিলেন।
কিন্তু বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাংশ এবং ঢাকা মহানগরের তৎকালীন শীর্ষ নেতৃত্ব তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে সর্বাত্মক আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নেন। তারা বলেন, এতে অহেতুক শক্তিক্ষয় হবে। বরং সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে এক মাসের সর্বাত্মক আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার ফেলে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহালে বাধ্য করা যাবে। যারা ২০১০-১১ সালের দিকে সর্বাত্মক আন্দোলনের পরামর্শ দিয়েছিলেন, তাদের ‘হঠকারী’ ট্যাগ দিয়ে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মূলত এই ভুলই বিএনপিকে ১৬ বছর শুধু ভোগায়নি, অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দেয়। ২০১৩ সালের মধ্যে সরকার ক্ষমতার নিয়ামক শক্তিগুলোর ওপর একাধিপত্য এবং সব পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান শক্তপোক্ত করে ফেলে। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের আন্দোলন তীব্র ও বিধ্বংসী হলেও সরকারের গদি টলানো যায়নি সামরিক-বেসামরিক আমলা, পুলিশ, বিজিবি, বিচারালয়সহ সর্বস্তরে শেখ হাসিনার অন্ধ অনুগতদের দিয়ে সাজিয়ে ফেলার কারণে। যতটা জানা যাচ্ছে, বিএনপির সেই ভুলটি করতে চায় না আওয়ামী লীগ। প্রশাসন, বিচারাঙ্গনসহ ক্ষমতাবলয়ে আওয়ামী লীগের প্রতি অনুগত ও সহানুভূতিশীলরা থাকতেই বড় ধরনের ধাক্কা দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যেতে চায় দলটি। শেখ হাসিনার ঘোষণার পেছনে এটাও এক কারণ হতে পারে। তবে তাদের এ ছক কতটা বাস্তবায়িত বা ফলপ্রসূ হবে, তা নির্ভর করছে জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক, জুলাই-আকাঙ্ক্ষার সংস্কার ও প্রত্যাশিত সুশাসন নিশ্চিতের ওপর।
লেখক : যুগ্ম সম্পাদক, আমার দেশ এবং সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট