হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

অধিকাংশই তস্কর হলে উপায় কী

ড. মো. ফখরুল ইসলাম

সরকারি চাকরি মূলত জনসেবার দায়িত্ব। একজন কর্মকর্তা জনগণের করের অর্থে বেতন পান, সরকারি অফিস ব্যবহার করেন, রাষ্ট্রীয় গাড়ি ও অন্যান্য সুবিধা গ্রহণ করেন। তার হাতে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়, সেটিও জনগণের পক্ষ থেকে অর্পিত। ফলে সরকারি কর্মকর্তারা জনগণের ওপর কর্তৃত্ব করার জন্য নন। তাদের দায়িত্ব জনগণকে আইনসম্মত ও নিরপেক্ষভাবে সেবা দেওয়া। কিন্তু কোনো কর্মকর্তা সেবা দিতে গিয়ে ঘুস দাবি করলে, ফাইল আটকে রাখলে, অযথা হয়রানি করলে কিংবা পরিচিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিকে নিয়মের বাইরে সুবিধা দিলে ক্ষতিটা শুধু নির্দিষ্ট সেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এতে রাষ্ট্রের ওপর নাগরিকের আস্থা ক্ষয়ে যায়।

সম্প্রতি ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলা মিলনায়তনে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘আমাদের... অদ্ভুত দেশ! অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা চোর। এগুলো নানা ধরনের ঘুসখোরী, লুটপাট এসব করে; যার ফলে মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। আওয়ামী লীগের নেতা, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী—এগুলো দেশের সর্বনাশ করে দিয়েছে লুটপাট করে। আওয়ামী লীগ আমলের একটা প্রতিমন্ত্রী (সাবেক ভূমিমন্ত্রী), তার ৩৬০টা বাড়ি পাওয়া গেছে লন্ডনেই। দুবাইয়ে বাড়ি আছে, আমেরিকায় বাড়ি আছে। জনগণের টাকা লুণ্ঠন করে তারা এভাবে নিয়ে গেছে।...এখনো প্রশাসনে তাদের বেশ কিছু লোক বসে আছে, যে জন্য প্রকৃত চিত্র এখনো জনগণের কাছে ভালোভাবে পৌঁছাচ্ছে না।’

এরপর গত ১৫ সেপ্টেম্বর লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের হলরুমে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু বলেছেন, ‘আমাদের রাজনীতিবিদদের কাজ হলো বক্তৃতা দেওয়া। সরকারি চাকরিজীবীদের কাজ হলো—কিছু চুরি করা, কিছু কাজ করা, এক তালে যাবে না এটা। তবে আমরা চাই, বর্তমান প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমাজটা পরিবর্তন হোক। যে সমাজে আমাদের ছেলেমেয়েরা ভবিষ্যতে এমন একটা জীবন কাটাতে পারে, যেটা তাদের জন্য হবে অর্থবহ।’

দুর্নীতির নানা চেহারা আছে। ঘুস তার সবচেয়ে পরিচিত রূপ। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে সরকারি ক্রয়ে কারসাজি, প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিক বাড়ানো, নিম্নমানের কাজ অনুমোদন, নিয়োগে অনিয়ম, বদলি-পদায়নে প্রভাব, সরকারি জমি বা সম্পদ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি এবং সরকারি সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে ব্যবহার।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, দুর্নীতি যখন দীর্ঘদিন চলে, তখন সমাজের একটি অংশ সেটিকে আর অপরাধ হিসেবে দেখে না; ‘সিস্টেম’ হিসেবে মেনে নেয়। কেউ বলেন, ‘ঘুস না দিলে ফাইল নড়ে না।’ কেউ বলেন, ‘কিছু খরচ করলে কাজ দ্রুত হয়।’ কেউ আবার বলেন, ‘সবাই নেয়, আমিও নেব।’ এই মানসিকতাই দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।

তবে এখানে একটি মৌলিক সতর্কতা জরুরি। দেশের অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা চোর—এমন কোনো সর্বজনীন সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে দাবি করা যায় না। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি বড় অংশ নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তাদের সবাইকে একই পাল্লায় মাপা ঠিক নয়। কিন্তু স্পিকার বা একজন মন্ত্রীর মুখে এমন অভিযোগ উচ্চারিত হওয়া প্রশাসনে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগকে উপেক্ষা না করার বার্তা দেয়। বরং এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন তুলতে হবে—কেন দুর্নীতির অভিযোগ এত প্রবল? কেন মানুষ সরকারি দপ্তরকে সেবার বদলে হয়রানির জায়গা মনে করে? কেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরও একই অভিযোগ বারবার ওঠে? এখানে বড় ভাবনার বিষয় হলো, সরকারি কাজে সাফল্যের গল্পের চেয়ে দুর্নীতির অভিযোগ মানুষের আলোচনায় বেশি জায়গা করে নিচ্ছে কেন?

আমাদের দেশে দুর্নীতির অভিযোগের ব্যাপকতা, নাগরিকের হয়রানির অভিজ্ঞতা এবং সরকারি অর্থের অপচয় নিয়ে প্রশ্নগুলো বাস্তব। তাই সমস্যাটিকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও জবাবদিহির দুর্বলতার আলোকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। দুর্নীতির অভিযোগ কেন এত দৃশ্যমান, তার প্রথম কারণ সরকারি সেবার সঙ্গে নাগরিকের সরাসরি যোগাযোগ। ভূমি, পাসপোর্ট, পুলিশ, স্থানীয় সরকার, কর, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিবন্ধনসহ অসংখ্য সেবা নিতে মানুষকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতে হয়। কোথাও নিয়ম জটিল, কোথাও সময়সীমা অস্পষ্ট, কোথাও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা একজন কর্মকর্তার হাতে কেন্দ্রীভূত। এই পরিস্থিতি ঘুস ও অনিয়মের সুযোগ তৈরি করে। দ্বিতীয়ত, সরকারি অফিসগুলোতে সেবাদানপ্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা রয়েছে। নাগরিক যদি না জানেন তার কাজ কতদিনে হবে, কত টাকা সরকারি ফি এবং কোন কর্মকর্তা সিদ্ধান্ত দেবেন, তাহলে মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের সুযোগ তৈরি হয়।

তৃতীয়ত, দুর্নীতির অভিযোগ এখন আগের চেয়ে অনেক দ্রুত প্রকাশিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সাংবাদিকতার কারণে একটি অনিয়ম মুহূর্তেই হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এতে দুর্নীতির ঘটনা এখন বেশি দৃশ্যমান ও আলোচিত হচ্ছে। এর সঙ্গে প্রচলিত রাজনীতি দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয় কি না, তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব, বিশেষ করে নিয়োগ, পদায়ন, বদলি, টেন্ডার ও প্রকল্পে অযাচিত হস্তক্ষেপ দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে কোনো কর্মকর্তা পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে দায়িত্ব পালন করেছেন, এটিই তার বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ নয়। প্রশাসন রাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিষ্ঠান। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে কর্মকর্তাদের পেশাগত পরিচয় পরিবর্তিত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু রাজনৈতিক আনুগত্য যদি পেশাগত যোগ্যতার চেয়ে বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে, তখনই সমস্যা তৈরি হয়।

এমন পরিবেশে সৎ কর্মকর্তারা দুর্বল হন আর ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠরা নিজেদের প্রভাবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ পান। একটি বড় প্রকল্পে অনিয়ম বা সরকারি সম্পদ আত্মসাতের ঘটনা সাধারণত একক ব্যক্তির পক্ষে ঘটানো কঠিন। সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অনুমোদন, বাস্তবায়ন, অর্থছাড়, তদারকিসহ বিভিন্ন স্তর থাকে। আবার কেউ কেউ অনিয়ম দেখেও নীরব থাকেন, কেউ অনুমোদন করেন, কেউ সুবিধা নেন। এভাবেই তৈরি হয় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির নেটওয়ার্ক। তাই শুধু ছোটখাটো ঘুসখোরকে ধরে দুর্নীতি দমন করা যাবে না।

বড় অনিয়মের অর্থের উৎস, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা এবং সুবিধাভোগীদেরও চিহ্নিত করতে হবে। সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পদ বিবরণী দুর্নীতি শনাক্তের গুরুত্বপূর্ণ উপায়। কিন্তু শুধু বিবরণী জমা নিলে উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। ঘোষিত আয়, সম্পদ বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার মধ্যে অস্বাভাবিক পার্থক্য থাকলে তা যাচাই করতে হবে। ভূমি, কর, কোম্পানি নিবন্ধনসহ বৈধ সরকারি তথ্য সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। তবে এই ব্যবস্থা যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অস্ত্র না হয়। স্বচ্ছতা যেমন দরকার, তেমনি ন্যায়সংগত তদন্তও দরকার।

সৎ কর্মকর্তারা রাষ্ট্রের সম্পদ। দুর্নীতির অভিযোগের কারণে ঢালাওভাবে সরকারি কর্মকর্তাদের সন্দেহ করা যাবে না। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সৎ কর্মকর্তারাই। যিনি ঘুস প্রত্যাখ্যান করেন, সরকারি অর্থের অপচয় ঠেকান, অবৈধ নির্দেশ মানেন না এবং নাগরিককে নিয়ম অনুযায়ী সেবা দেন, তাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। তাদের পদোন্নতি ও কর্মমূল্যায়নে শুধু জ্যেষ্ঠতা নয়, সততা, দক্ষতা ও নাগরিকসেবার মানকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

স্পিকার ও মন্ত্রীর আক্ষেপের প্রেক্ষাপটে সামনের দিনগুলোতে আমাদের নীতিনির্ধারকদের কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, যাতে সরকারি কাজের সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগের ব্যবধান কমানো যায়। ১. প্রতিটি সরকারি সেবার সময়সীমা ও সরকারি ফি প্রকাশ করা। ২. যতটা সম্ভব সেবা ডিজিটাল ও নগদবিহীন করা। ৩. সরকারি ক্রয় ও বড় প্রকল্পের তথ্য উন্মুক্ত রাখা। ৪. সম্পদ বিবরণীর কার্যকর যাচাই করা। ৫. রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা। ৬. দুর্নীতির তথ্যদাতা ও সৎ কর্মকর্তাদের সুরক্ষা দেওয়া। ৭. নাগরিকের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করা এবং দুর্নীতির মামলায় তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমানো।

সরকারি কাজের চেয়ে চুরি-দুর্নীতির অভিযোগ বেশি আলোচিত হওয়া কোনো সুস্থ রাষ্ট্রব্যবস্থার লক্ষণ নয়। কিন্তু এর জন্য সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দুর্নীতিবাজ আখ্যা দেওয়াও কোনো সমাধান নয়। আমাদের দেশে সরকারি কাজে সমস্যার মূল জায়গা হলো—অস্বচ্ছতা, জটিলতা, অতিরিক্ত বিবেচনাধিকার, দুর্বল তদারকি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং জবাবদিহির ঘাটতি। এই কাঠামো বদলাতে পারলে দুর্নীতির সুযোগ কমবে। আর সৎ কর্মকর্তা ও দক্ষ প্রশাসনকে শক্তিশালী করতে পারলে সরকারি কাজের ইতিবাচক ফলও মানুষের সামনে বেশি দৃশ্যমান হবে এবং সামাজিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন

ধর্ম যার যার...

যুক্তরাষ্ট্রকে তাড়াতে তেহরানের কৌশল

মাধ্যমিক থেকেই সেমিস্টার পদ্ধতি চালু হোক

বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দাও জাপান

আওয়ামী শিক্ষানীতি আর কতকাল চলবে

ভারতে সর্বগ্রাসী নজরদারির আওতায় জনজীবন

ব্যর্থ রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্র থেকে সাবধান

ক্ষমতা নয়, প্রয়োজন সুশাসন

রাষ্ট্র সংস্কারে চিন্তা ও মূল্যবোধের পুনর্গঠন জরুরি

যাত্রাটা অব্যাহত রাখতে হবে