হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও ফিনল্যান্ড-জাপানের উদাহরণ

আক্তার খান মুকুল

শিক্ষাক্রম বা কারিকুলাম হলো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা শিক্ষাব্যবস্থায় নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য পরিকল্পিতভাবে সাজানো পাঠ্যবিষয়, শিক্ষণ-শিখন কার্যক্রম, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শিক্ষার অভিজ্ঞতার সমষ্টি। সহজভাবে বলতে গেলে, শিক্ষার্থীরা কী শিখবে, কীভাবে শিখবে এবং কীভাবে তাদের শেখা মূল্যায়ন করা হবে—এসবের পূর্ণ পরিকল্পনাই শিক্ষাক্রম।

পৃথিবীর সব দেশেই সমাজ-সভ্যতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাক্রমকেও যুগোপযোগী করতে হয়। কারণ সমাজ নিয়ত পরিবর্তনশীল। এ পরিবর্তনের ধারায় রাষ্ট্রকে সমাজ, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, বহির্বিশ্বের সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে খাপ খাইয়ে নিতে দক্ষ, সুনাগরিক এবং সমাজ-স্বীকৃত প্রচলিত মূল্যবোধের সঙ্গে আত্মস্থ করে নিতে সমাজ, রাষ্ট্রের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হয়। তা না হলে দেশ-বিদেশে আমাদের ছেলেমেয়েরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।

আমাদের দেশে গতানুগতিক শিক্ষাক্রমের ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশোনায় তেমন আগ্রহ সৃষ্টি হয় না। দেশের গতানুগতিক শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত পরীক্ষার চাপ, বইয়ের চাপের ফলে বিদ্যালয় উপস্থিত হওয়ার ভীতি, অনীহা তাদের মধ্যে কাজ করে। তাছাড়া, প্রচলিত শিখন-শেখানোর কৌশলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একঘেয়েমির ছাপ স্পষ্টত লক্ষ করা যায়। বর্তমান সরকার এ সমস্যা দূর করতে কাজ করে যাচ্ছে। এ সময়ের আলোচিত কনসেপ্ট হলো, আনন্দময় শিক্ষণ বা লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস কী এবং কীভাবে কাজ করে। লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস বলতে, এমন একটি শিক্ষণ-পদ্ধতিকে বোঝায়, যেখানে আনন্দ, আগ্রহ, ইতিবাচক অনুভূতি এবং অংশগ্রহণের মাধ্যমে শেখানো ও শেখা হয়। এর মূল ধারণা হলো—শিক্ষার্থীরা যদি আনন্দের সঙ্গে শেখে, তাহলে তারা বিষয়গুলো আরো ভালোভাবে বুঝতে, মনে রাখতে এবং প্রয়োগ করতে পারে। এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, গল্প, গান ও সৃজনশীল কার্যক্রমের মাধ্যমে শেখানো, ভয় বা চাপমুক্ত শিক্ষার পরিবেশ, সক্রিয় অংশগ্রহণ, কৌতূহল ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক দক্ষতার উন্নয়ন ঘটে।

আনন্দময় শিক্ষণ মানবজীবন ও সমাজে গভীর এবং দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এর প্রভাব নির্ভর করে এটি কতটা পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে; শিক্ষার মান বজায় থাকছে কি না এবং শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতাও অর্জন করছে কি না।

ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম সফল ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত। কারণ তাদের শিক্ষার্থীদের জন্য কম হোমওয়ার্ক ও কম পরীক্ষা। তাদের শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, সৃজনশীলতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখানো। শিক্ষকরা উচ্চ প্রশিক্ষিত এবং পাঠদান পদ্ধতি নির্ধারণে স্বাধীনতা পান। শ্রেণিকক্ষে মানসিক সুস্থতা ও শিক্ষার্থীর কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ বেশি থাকে। আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে দীর্ঘদিন ধরে ভালো ফল করেছে। বিদ্যালয় ত্যাগের হার তুলনামূলকভাবে কম। সিঙ্গাপুরে ‘Teach Less, Learn More’ নীতির মাধ্যমে আনন্দময় ও গভীর শিক্ষার ওপর জোর দেয়। তাদের শিক্ষাব্যবস্থা মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে বিশ্লেষণধর্মী । প্রকল্পভিত্তিক ও অনুসন্ধানমূলক কার্যক্রম। প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার। শিক্ষক প্রশিক্ষণে ব্যাপক বিনিয়োগ। ফলে গণিত, বিজ্ঞান ও পাঠ দক্ষতায় ধারাবাহিকভাবে বিশ্বসেরাদের মধ্যে অবস্থান। উদ্ভাবনী চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বৃদ্ধি। কানাডার বহু প্রদেশে শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। যেমন : দলগত শিক্ষা। প্রকল্পভিত্তিক মূল্যায়ন। সামাজিক ও আবেগীয় দক্ষতার বিকাশ। ফলে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস ও সহযোগিতামূলক মনোভাব বৃদ্ধি পায়। জাপানে আনন্দময় শিক্ষার সঙ্গে শৃঙ্খলা ও নৈতিক শিক্ষার সমন্বয় করা হয়েছে। তাদের শিশু শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মার্জিত সুন্দর আচার-আচরণ শিক্ষা দেওয়া। তাদের শিক্ষার্থীরা নিজেরাই শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করে। দলগত কাজ ও পারস্পরিক সহযোগিতার চর্চা করে। নৈতিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক। এর ফলে দায়িত্ববোধ, আত্মনির্ভরতা ও সামাজিক শৃঙ্খলা গড়ে ওঠে। নিউজিল্যান্ডে দেখা যায়, এ দেশের শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীর আগ্রহ, সৃজনশীলতা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে, শিক্ষার্থীরা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখে। শেখাকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।

জন ডুয়ি বলেছেন, ‘Education is not preparation for life; education is life itself.’

মারিয়া মন্টেসোরি বলেছেন, ‘শিশু স্বাভাবিকভাবেই শেখার প্রতি আগ্রহী। আনন্দময়, স্বাধীন ও অনুসন্ধানভিত্তিক পরিবেশে শিশু সবচেয়ে ভালো শেখে।’

মনোবিজ্ঞানী লেভ ভাইগোটস্কির মতে, সামাজিক যোগাযোগ, সহযোগিতা এবং দলগত কার্যক্রম শিক্ষাকে আনন্দদায়ক ও অর্থবহ করে তোলে। শিক্ষক ও সহপাঠীর সহযোগিতায় শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ শেখার সুযোগ পায়।

জেরোমি ব্রানার আবিষ্কারভিত্তিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, শিক্ষার্থীরা নিজেরা আবিষ্কার করে শিখলে শেখা আনন্দদায়ক ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।

হাওয়ার্ড গার্ডনারের মতে, প্রতিটি শিক্ষার্থীর শেখার ধরন ভিন্ন। শিক্ষাকে আনন্দময় করতে হলে শিক্ষার্থীর বৈচিত্র্যময় প্রতিভা ও আগ্রহকে গুরুত্ব দিতে হবে।

খেলাধুলা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং আনন্দময় কর্মকাণ্ড শিশুর বুদ্ধি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আনন্দের পরিবেশে শিক্ষার্থীরা শেখার প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহী হয়। মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে অর্থবহ ও স্থায়ী শেখা সম্ভব হয়। ভয়, অতিরিক্ত চাপ ও পরীক্ষাভীতি কমে। আত্মবিশ্বাস, আত্মসম্মান এবং ইতিবাচক মনোভাব গড়ে ওঠে। প্রশ্ন করা, নতুন ধারণা তৈরি করা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ে। ভবিষ্যতের কর্মজীবনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জিত হয়। আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহযোগিতা, সহমর্মিতা, সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠে। অন্যের মতামতকে সম্মান করার অভ্যাস তৈরি হয়। শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল নয়, বাস্তব জীবনে দক্ষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি হয়। সৃজনশীল ও দক্ষ জনশক্তি উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। যুক্তিবোধ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং দায়িত্বশীল নাগরিকত্বের চর্চা বৃদ্ধি পায়। তবে এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

অনেক শিক্ষক এখনো প্রচলিত বক্তৃতানির্ভর পদ্ধতিতে অভ্যস্ত। অনেক সরকারি বিদ্যালয়ে এক শ্রেণিতে ৫০-৮০ বা তারও বেশি শিক্ষার্থী থাকে। এত বড় শ্রেণিতে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা কঠিন। অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার, খেলার মাঠ ও ডিজিটাল প্রযুক্তির অভাব রয়েছে।

শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান লক্ষ্য পরীক্ষায় ভালো ফল। ফলে আনন্দময় ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা অনেক সময় গুরুত্ব হারায়। অভিভাবক প্রায়ই মনে করেন, কঠোর পড়াশোনা ও বেশি পরীক্ষা মানেই ভালো শিক্ষা। যদি মূল্যায়ন প্রধানত লিখিত পরীক্ষার ওপর নির্ভরশীল থাকে, তবে দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও সহযোগিতার যথাযথ মূল্যায়ন সম্ভব হয় না। শহরের তুলনায় অনেক গ্রামীণ বিদ্যালয়ে শিক্ষক, প্রযুক্তি ও শিক্ষা-উপকরণের ঘাটতি বেশি।

শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রমে ঘন ঘন পরিবর্তন হলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে।

শিক্ষাকে আনন্দময় করতে হলে উপযুক্ত কারিকুলাম প্রণয়নের পাশাপাশি এসব সংকট দূর করতে হবে। আমাদের উচিত ফিনল্যান্ড, জাপান, সিঙ্গাপুর, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ভালো করে পর্যালোচনা করে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করা।

লেখক : ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক স্টান্টবাজি

মেটিকুলাস ডিজাইন এবং মন্দবুদ্ধির উপাখ্যান

বিএনপির ভুল করতে চায় না আ.লীগ!

হালাল তহবিল ও জাতীয় গভর্ন্যান্স কাঠামো

ওসমানীর কেন ফিল্ড মার্শাল প্রাপ্য

ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠার উপায়

চব্বিশ, নব্বই, উনসত্তর

ভুল পরামর্শে কৃষকের সর্বনাশ

ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার

স্কুলে বিকালে ক্লাস নয়, খেলাধুলার সুযোগ দিন