হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ডিপ স্টেটের গভীরে বাংলাদেশ

মে জে. (অব.) রোকন উদ্দিন

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বাস্তব ধারণাগুলোর মধ্যে একটি হলো ‘ডিপ স্টেট’ বা গভীর রাষ্ট্র। অনেকে এটিকে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বলে উড়িয়ে দেন, অনেকে আবার এটিকে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে দেখেন। সত্য হলো, ধারণাটি যতটা অস্বীকার করা হয় ততটা কাল্পনিক নয়; আবার যতটা রহস্যময় করে উপস্থাপন করা হয়, ততটা অদৃশ্যও নয়। এটি বোঝার জন্য প্রথমে এর মূল স্বভাবটি বুঝতে হবে।

ডিপ স্টেট বলতে বোঝায় রাষ্ট্রযন্ত্রের এমন একটি স্তর, যা নির্বাচিত সরকার বা আনুষ্ঠানিক ক্ষমতার কাঠামোর বাইরে থেকে প্রকৃত ক্ষমতা চর্চা করে। এটি সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং বড় করপোরেট স্বার্থের মধ্যে গড়ে ওঠা এমন একটি অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক, যা কোনো নির্বাচনের মাধ্যমে আসে না, কোনো নির্বাচনের মাধ্যমে যায় না, কিন্তু রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সরকার বদলায়, প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি আসেন-যান, কিন্তু এই নেটওয়ার্ক থেকে যায় এবং তার নিজস্ব এজেন্ডা অব্যাহত রাখে।

তুর্কি ভাষায় ‘derin devlet’ শব্দটি থেকেই ইংরেজি ‘deep state’ পরিভাষাটির জনপ্রিয়তা। তুরস্কে দশকের পর দশক ধরে সেনাবাহিনী নিজেকে কামালিস্ট ধর্মনিরপেক্ষতার রক্ষক হিসেবে দেখেছে এবং যখনই কোনো নির্বাচিত সরকার তাদের সংজ্ঞায় সেই আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, সেনাবাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে হস্তক্ষেপ করেছে। ১৯৬০, ১৯৭১, ১৯৮০ ও ১৯৯৭ সালে তুরস্কে সামরিক অভ্যুত্থান বা চাপের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হয়েছে। নির্বাচিত সরকার ছিল, কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল অন্যত্র।

আমেরিকার ক্ষেত্রে ডিপ স্টেটের আলোচনা ভিন্ন মাত্রায় হয়। সিআইএ, এফবিআই ও পেন্টাগনের মতো সংস্থাগুলোর দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ রয়েছে, যা কোনো একটি প্রশাসনের মেয়াদের চেয়ে অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী। আইজেনহাওয়ার ১৯৬১ সালে বিদায়ী ভাষণে যখন ‘মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স’ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন, তখন তিনি মূলত এই ধারণারই একটি রূপ বর্ণনা করেছিলেন। প্রতিরক্ষা ঠিকাদার, গোয়েন্দা সংস্থা এবং কংগ্রেসের মধ্যে যে ত্রিভুজীয় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, তা কোনো নির্বাচনের ফলাফলে মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয় না। জন এফ কেনেডি হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে ইরাক যুদ্ধের মিথ্যা তথ্য—এই প্রতিটি ঘটনায় রাষ্ট্রের গভীর স্তরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং সেই প্রশ্নগুলো আজও সম্পূর্ণ উত্তরিত নয়।

পাকিস্তানের উদাহরণটি দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে সুস্পষ্ট। সেখানে সেনাবাহিনী ও আইএসআই মিলে যে কাঠামো গড়ে তুলেছে, তা রাষ্ট্রের মধ্যে আরেকটি রাষ্ট্র হিসেবে কাজ করে। নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীরা আসেন এবং যান; কিন্তু পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তানীতি ও ভারত-সম্পর্কিত কৌশল মূলত রাওয়ালপিন্ডি থেকে নির্ধারিত হয়, ইসলামাবাদ থেকে নয়। ইমরান খান থেকে নওয়াজ শরিফ—যে নির্বাচিত নেতাই সামরিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংঘাতে গেছেন, তাকেই ক্ষমতা থেকে সরানো হয়েছে। এটি তত্ত্ব নয়, এটি পর্যবেক্ষণযোগ্য ইতিহাস।

এবার বাংলাদেশের প্রশ্নে আসা যাক। বাংলাদেশে কি ডিপ স্টেট কাজ করে? এই প্রশ্নের সরল উত্তর হলো—হ্যাঁ, তবে তার রূপটি পশ্চিমা বা পাকিস্তানি মডেলের মতো নয়। বাংলাদেশের ডিপ স্টেট আরো বহুস্তরীয়, আরো অনানুষ্ঠানিক এবং আরো জটিলভাবে পরিবর্তনশীল। বাংলাদেশে সামরিক বাহিনীর সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতা চর্চার ইতিহাস রয়েছে। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তন থেকে শুরু করে ১৯৮২ সালের এরশাদের অভ্যুত্থান পর্যন্ত সেনাবাহিনী সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। ১/১১-এর সময়ে ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেভাবে রাজনীতি পুনর্বিন্যস্ত করার চেষ্টা করেছিল—দুই নেত্রীকে মাইনাস করার পরিকল্পনা, ব্যবসায়িক নেতৃত্ব পরিবর্তনের উদ্যোগ—তা স্পষ্ট করে, নির্বাচিত কাঠামোর বাইরে একটি সমান্তরাল ক্ষমতাকেন্দ্র সক্রিয় থাকে।

কিন্তু বাংলাদেশের ডিপ স্টেট শুধু সামরিক বাহিনীতে সীমাবদ্ধ নয়। আমলাতন্ত্র এখানে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি স্থায়ী কাঠামো গঠন করে। সরকার বদলায়, কিন্তু সচিবালয়ের একটি বড় অংশ থেকে যায় এবং নীতির বাস্তবায়নে সে তার নিজস্ব বিবেচনা প্রয়োগ করে। একটি সংস্কারমনা সরকার যদি আমলাতন্ত্রের গভীরে প্রোথিত স্বার্থগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যায়, সেই সংস্কার কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়ে—কারণ বাস্তবায়নের হাতগুলো সেই স্বার্থগোষ্ঠীরই অংশ।

বাংলাদেশে ব্যবসায়িক অভিজাত শ্রেণি এবং রাজনীতির মধ্যে যে অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে গত দুই দশকে, তা ডিপ স্টেটের একটি নতুন স্থানীয় রূপ তৈরি করেছে। বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো ব্যাংক খাত নিয়ন্ত্রণ করে, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করে, রাজনৈতিক দলে অর্থ সরবরাহ করে এবং নীতিনির্ধারণের কক্ষে সরাসরি প্রভাব রাখে। এরা নির্বাচনে দাঁড়ায় না, কিন্তু যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক তাদের সঙ্গে একটি কার্যকর সম্পর্ক স্থাপন করে নেয়। এই শ্রেণির স্বার্থকে আঘাত করে এমন কোনো নীতি বাংলাদেশে টিকে থাকতে পারেনি।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিভিন্ন সরকারের আমলে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সরকার বদলালেও এরা বদলায় না—নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ নিয়ে টিকে থাকে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরেও আমলাতন্ত্র, সামরিক প্রতিষ্ঠান ও বিচার বিভাগ মূলত অপরিবর্তিত। গভীর কাঠামো না বদলালে পরিবর্তন কেবল উপরিতলেই সীমাবদ্ধ থাকে। ডিপ স্টেট ধারণার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এর অদৃশ্য অবয়ব। যা দেখা যায় তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, যা দেখা যায় না তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। একটি দুর্নীতিগ্রস্ত মন্ত্রীকে বরখাস্ত করা যায়, একটি ব্যর্থ সরকারকে নির্বাচনে পরাজিত করা যায়, একটি অন্যায় আইনকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যায়; কিন্তু যে ক্ষমতা কোনো মুখ ধারণ করে না, কোনো পদবি বহন করে না, কোনো দলিলে স্বাক্ষর করে না—সেই ক্ষমতাকে কোথায় খুঁজবে জনগণ, কীভাবে চ্যালেঞ্জ করবে, কার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে? এটাই ডিপ স্টেটের সবচেয়ে চতুর প্রতিরক্ষা—তার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করার সুবিধা।

গণতন্ত্র তখনই কার্যকর হয়, যখন ক্ষমতা কেবল নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে থাকে এবং সেই ক্ষমতা জনগণের কাছে জবাবদিহিযোগ্য হয়। কিন্তু এই সংজ্ঞাটি একটিহ আদর্শের বিবরণ—বাস্তবের নয়। বাস্তবে গণতন্ত্রের দুটি স্তর থাকে। একটি দৃশ্যমান স্তর—নির্বাচন, সংসদ, মন্ত্রিপরিষদ, সংবাদ সম্মেলন, বাজেট বক্তৃতা। আরেকটি অদৃশ্য স্তর—যেখানে সত্যিকারের সিদ্ধান্ত হয়, যেখানে চুক্তি হয়, যেখানে ভয় দেখানো হয়, যেখানে পুরস্কার বিতরণ হয় এবং যেখানে শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়—সবটাই আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে, জনদৃষ্টির আড়ালে। যখন এই দুটি স্তরের মধ্যে ব্যবধান বেড়ে যায়, তখন নির্বাচন একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়, সংসদ একটি মঞ্চে পরিণত হয়—মঞ্চে অভিনয় বদলায়, কিন্তু পর্দার আড়ালের পরিচালনা একই থাকে।

বাংলাদেশের জনগণ বারবার রাস্তায় নেমে পরিবর্তন এনেছে—১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব। প্রতিটি আন্দোলনে সাহস ছিল অকল্পনীয়, আত্মত্যাগ ছিল অপরিসীম, প্রতিশ্রুতি ছিল আকাশছোঁয়া। কিন্তু প্রতিবারই একই ঘটনা ঘটেছে—দৃশ্যমান ক্ষমতার মুখ বদলেছে, কিন্তু অদৃশ্য ক্ষমতার কাঠামো অটুট থেকেছে। নতুন সরকার পুরোনো আমলাদের ওপর নির্ভর করেছে, নতুন নেতৃত্ব পুরোনো ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের সঙ্গে আপোশ করেছে, নতুন প্রতিশ্রুতি পুরোনো প্রাতিষ্ঠানিক জড়তায় আটকে গেছে। বিপ্লব হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড অপরিবর্তিত থেকেছে।

এই বারবার একই চক্রে ফেরার কারণ শুধু নেতৃত্বের ব্যর্থতা নয়, শুধু দুর্নীতির সংস্কৃতি নয়, শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব নয়। কারণটি আরো গভীরে—কাঠামোগত। যে মাটিতে গণতন্ত্রের গাছ লাগানো হচ্ছে, সেই মাটি প্রস্তুত না হলে গাছ বারবার মরে যাবে, যতবারই নতুন চারা রোপণ করা হোক না কেন। বাংলাদেশে সেই মাটি হলো রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো—বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও তথ্য কমিশন। এই প্রতিষ্ঠানগুলো যদি স্বাধীন না হয়, যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হয়, যদি নাগরিকের কাছে সত্যিকার অর্থে জবাবদিহিযোগ্য না হয়—তাহলে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, ডিপ স্টেটের অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতা সেই শূন্যতা পূরণ করে নেবে।

প্রকৃত গণতন্ত্রের জন্য শুধু নির্বাচন নয়, চাই রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। ডিপ স্টেট স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়ে না—সে আমলাতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা, মিডিয়া ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মাধ্যমে সংস্কার প্রতিহত করে। যেসব দেশ ডিপ স্টেটকে দুর্বল করেছে, তারা করেছে দীর্ঘ নাগরিক আন্দোলন, স্বাধীন গণমাধ্যম ও শক্তিশালী বিচার বিভাগের মাধ্যমে। বাংলাদেশের পথ কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। রাস্তার আন্দোলন দিয়ে যা শুরু, তা শেষ করতে হবে প্রতিষ্ঠান গড়ার ধৈর্যে। প্রশ্ন একটাই—‘বাংলাদেশ কি সেটা হতে চায়?’

লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক, গবেষক ও লেখক

বাজেট নিয়ে যে জরুরি প্রশ্নটি কেউ করে না

নিষেধাজ্ঞার পরও প্লাস্টিক ব্যাগের বিরুদ্ধে লড়াই

বাংলা ভাগের আড়ালে নৌ-অফিসার

‘পুশইন’ কূটনীতির অনিষ্টেও নির্বিকার?

ড. এম উমর চাপরার সতর্কবার্তা ও বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের বাস্তবতা

ভারত-বাংলাদেশ স্বামী-স্ত্রীর যুগ ও অনিচ্ছাকৃত পুশইন

বলকানের মুসলমানদের নিয়ে পশ্চিমা-ইসরাইলি নয়া চক্রান্ত

সাইবার আইন ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষা

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে অবিশ্বাসের দেয়াল

রাজনৈতিক মতবিরোধ থেকে ইসলামবিদ্বেষ