হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ভারতে সংখ্যালঘুদের অস্তিত্বের সংকট

ড. শাহজাহান খান

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য নিউইয়র্ক টাইমস প্রথম পাতায় একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে, কীভাবে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) ক্ষমতায় এনে নরেন্দ্র মোদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরএসএস হিটলারকে আদর্শ হিসেবে দেখে, নাৎসিদের স্বস্তিকা প্রতীক ব্যবহার করে, ভারতের সংবিধানকে দুর্বল করতে চায়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণে বিশ্বাস করে, বাবরি মসজিদ ধ্বংসে ভূমিকা রেখেছে এবং তাদের রাজনৈতিক আদর্শ খ্রিষ্টানবিরোধী ও ইসলামবিদ্বেষী।

জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিবেদনে মুসলমান এবং কিছু ক্ষেত্রে খ্রিষ্টান ও অন্যান্য সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে ধর্মীয় বৈষম্য, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, নির্বিচার গ্রেপ্তার, হেফাজতে নির্যাতন, বাড়িঘর ধ্বংস এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর ক্রমবর্ধমান বিধিনিষেধের তথ্য উঠে এসেছে।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২১ সালের জরিপ অনুযায়ী, ভারতের ২১ শতাংশ মুসলমান জানিয়েছেন, আগের এক বছরে তারা ধর্মীয় বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। উত্তর ভারতে এই হার ছিল ৪০ শতাংশ। ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ মুসলমান হলেও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় তাদের প্রতিনিধিত্ব অত্যন্ত কম। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর ৫৪৩ সদস্যবিশিষ্ট লোকসভায় মাত্র ২৪ জন মুসলিম সদস্য নির্বাচিত হন, যা মোট সদস্যের প্রায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। বর্তমানে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় একজনও মুসলিম সদস্য নেই।

স্বাধীন পর্যবেক্ষক সংস্থা ইন্ডিয়া হেট ল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ১ হাজার ১৬৫টি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনা এবং ২০২৫ সালে ১ হাজার ৩১৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা এক বছরে প্রায় ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। সংস্থাটির মতে, এসব ঘটনার প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিলেন মুসলমানরা।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ গরু-সংক্রান্ত অভিযোগে মুসলমানদের ওপর হামলা, গণপিটুনি এবং সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের পর মুসলমানদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভেঙে ফেলার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৫ সালে গুজরাটে হাজার হাজার স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং এক হাজার পাঁচশরও বেশি মানুষকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যাদের মধ্যে পরবর্তী সময়ে অনেকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে শনাক্ত হন। এসব ঘটনা বিচার বিভাগীয় তদারকি ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের দাবিকে আরো জোরালো করেছে।

ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রথম ৯ মাসে পুলিশ হেফাজতে ১২১ জন, বিচার বিভাগীয় হেফাজতে ১ হাজার ৫৮৮ জন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে ৯৩ জন নিহত হন। ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসে এই সংখ্যা যথাক্রমে ১১৩ জন, ১ হাজার ৫৩৫ জন ও ১৩২ জন। যদিও এসব তথ্য ধর্মভিত্তিকভাবে বিভাজিত নয়, তবুও মানবাধিকার সংস্থাগুলো মনে করে, নথিভুক্ত ঘটনার অনেকাংশই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে ঘটেছে।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিটি ভারতকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য আইনি সুরক্ষা জোরদার, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দমন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং একটি সমন্বিত বৈষম্যবিরোধী আইন প্রণয়নের আহ্বান জানায়। ভারতের মানবাধিকার পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এসব সুপারিশ গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। বাস্তবে প্রকৃত অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি।

হায়দরাবাদ, জুনাগড় এবং জম্মু-কাশ্মীরের মতো দেশীয় রাজ্যগুলোর অন্তর্ভুক্তি নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক আজও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক আলোচনায় প্রভাব বিস্তার করে। ভারত এসব অঞ্চলকে তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করলেও ইতিহাস ও আইনগত ব্যাখ্যা নিয়ে ভিন্নমত বিদ্যমান। তবে এসব বিতর্ক যা-ই হোক না কেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অধীনে সব বাসিন্দার মৌলিক অধিকার রক্ষা করা একটি সর্বজনীন দায়িত্ব। মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ কিংবা শিখ—যেকোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রতিটি ঘটনাই নিঃশর্তভাবে নিন্দার যোগ্য।

ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন এবং তাদের ঘরবাড়ি ও উপাসনালয়ে হামলা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কার্যকর হস্তক্ষেপ বা ভারত সরকারের প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ খুব একটা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এই প্রবণতা আরএসএসের উগ্র হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডার অংশ বলেই প্রতীয়মান হয়, যার লক্ষ্য ভারতকে একটি একক হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করা এবং বিশেষ করে মুসলমান, খ্রিষ্টান, শিখসহ অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রান্তিক বা অধীনস্থ করে রাখা।

ভারতের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অবনতি শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এর প্রভাব সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় পড়ে। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বাংলাদেশ ও পাকিস্তানসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। পারস্পরিক আস্থা ও সুসম্পর্ক কেবল অর্থনৈতিক সহযোগিতার ওপর নয়, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মৌলিক মানবাধিকারের প্রতি সম্মানের ওপরও নির্ভরশীল।

বাংলাদেশের কোনো হিন্দু নেতা কিংবা নিজেদের প্রগতিশীল দাবি করা কোনো নেতাকে ভারতে মুসলমানদের ওপর চলমান পরিকল্পিত ও ভয়াবহ নির্যাতনের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে দেখা যায় না। অথচ তাদের মধ্যে কেউ কেউ বাংলাদেশে ধর্মীয় সহিংসতার ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে একটি পৃথক হিন্দু প্রদেশ প্রতিষ্ঠার দাবি এবং হুমকি দিয়ে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। বাংলাদেশের মুসলমানদের উচিত হবে না এসব ষড়যন্ত্রকারীর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উসকানিতে প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে তাদের ফাঁদে পা দেওয়া।

বাংলাদেশ বহুবার প্রমাণ করেছে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে রক্ষায় বাংলাদেশি মুসলিমরা সংযম ও দায়িত্বশীল আচরণ দেখিয়েছে, দিনরাত হিন্দুদের মন্দির পাহারা দিয়েছে। যে দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষ ধর্মীয় বিদ্বেষ, ঘৃণা ও সহিংসতাকে প্রত্যাখ্যান করে, তখন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা সম্ভব। এটি অন্য ধর্মাবলম্বীদের অধিকার রক্ষার ইসলামি শিক্ষারই প্রতিফলন।

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের একটি বৃহৎ অংশের নীরবতা এমন ধারণার জন্ম দিয়েছে যে, ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে মুসলমানদের ওপর হামলা যেন একটি স্বাভাবিক ঘটনা। এই স্বাভাবিকীকরণ অত্যন্ত বিপজ্জনক। ভারত দীর্ঘদিন ধরে তার সংবিধানসম্মত ধর্মনিরপেক্ষতা, বহুত্ববাদ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে গর্ব করে এসেছে। এগুলোই তার অন্যতম প্রধান শক্তি। কিন্তু বিজেপি সরকারের সময় মুসলমানদের ওপর দমন-পীড়ন এবং ইসলামের ধর্মীয় আচার পালনের অধিকারে সীমাবদ্ধতা আরোপের অভিযোগ প্রকাশ্যে উঠে এসেছে। এই মৌলিক নীতিগুলো রক্ষা করতে হলে ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত সহিংসতার প্রতিটি অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে হবে, অপরাধীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে এবং ধর্ম নির্বিশেষে সব নাগরিককে আইনের সমান সুরক্ষা দিতে হবে।

জাতিসংঘের সংস্থাগুলো, বাংলাদেশ এবং ওআইসি, বিশেষ করে যেসব আরব দেশ লাখ লাখ ভারতীয়কে কর্মসংস্থানের সুযোগ দিয়েছে, তাদের উচিত বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে ভারত সরকারের সঙ্গে কার্যকর সংলাপে যুক্ত হওয়া এবং নির্যাতন বন্ধে উদ্যোগ গ্রহণ করা। মুসলমানরা ৬৫০ বছরেরও বেশি সময় ভারত শাসন করেছে; সেই দীর্ঘ সময়ে ধর্মীয় নিপীড়ন বা বৈষম্যকে রাষ্ট্রনীতি হিসেবে অনুসরণ করা হয়নি। অথচ বর্তমান ভারতের মুসলিম শাসকদের অবদান মুছে ফেলতে ঐতিহাসিক স্থান ও স্থাপনার নাম পরিবর্তন করা হচ্ছে। এ ধরনের মুসলিম ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর নাম পরিবর্তন করে হিন্দু নামকরণ ও ঐতিহ্যবাহী ওয়াক্‌ফ সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ করার আগে ভারতীয় সরকারের উচিত তার ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা।

মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান, শিখ ও অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য।

লেখক : অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ডের ইমেরিটাস অধ্যাপক, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের প্রবাসী ফেলো এবং এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের সাবেক উপাচার্য

পলিথিন নিয়ন্ত্রণে দরকার উচ্চ শুল্কহার

জুলাই শুধু একটি মাস নয়, বিবেকের প্রতিচ্ছবি

পদ্মা বাঁধ পানির ন্যায্য হিস্যার বিকল্প নয়

সংসদে কি বদলাচ্ছে রাজনৈতিক সংস্কৃতি?

অনৈক্যের সংকটে সাংবাদিকতা

ভারতকে একদলীয় ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে কংগ্রেস!

কাঁটাতারে আজও ঝুলে আছে রাষ্ট্রের বিবেক

জুলাই শহীদদের কতবার শহীদ করা আমরা সহ‍্য করব

শেখ হাসিনার অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য

পররাষ্ট্রনীতির বৈশ্বিক বাস্তবতায় আমাদের অবস্থান