হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

রণাঙ্গনের জিয়া : ‘ফ্রিডম ফাইটারদের ভয় করলে চলে না’

এম আবদুল্লাহ

এম আবদুল্লাহ

‘মুক্তিযোদ্ধা জিয়া আর স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের রাজনৈতিক জিয়াউর রহমান কতটুকুন এক এবং ঘনিষ্ঠ তার বিচার-বিশ্লেষণ করবেন রাজনৈতিক পণ্ডিতরা। আমি শুধু এটুকুন বলতে চাই, ১৯৭১-এর স্বাধীনতা-সংগ্রামী জিয়াউর রহমান জাতীয় মুক্তি-সংগ্রামের স্মরণীয় ঐতিহ্য ধারণকারী অনেক বীরউত্তমের এমন এক ‘বীরউত্তম’, যার অবদান আর কারো কাছে না থাক, মুক্তিকালীন স্বতন্ত্র ঐতিহ্যের স্বাধীনচেতা বাঙালি জাতির কাছে চির জাগ্রত থাকবে। মুক্তিযুদ্ধের মেজর জিয়া অমর হয়ে থাকবেন, হয়তোবা তার আর অন্যান্য নামের চাইতে। মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক, লেখক, সেক্টর কমান্ডার ফোরামের সাবেক মহাসচিব হারুন হাবীব এভাবেই রণাঙ্গনের জিয়াকে তুলে ধরেছেন তার লেখা এক নিবন্ধে।

মুক্তিযুদ্ধকালে রণাঙ্গন থেকে প্রবাসী সরকারের মুখপত্র ‘জয় বাংলা’ ও ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’-এর সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেন হারুন হাবীব। বর্তমানে আওয়ামী লীগ ঘরানার বুদ্ধিজীবী ও লেখক হিসেবে সুপরিচিত। শেখ হাসিনা সরকারের প্রথম আমলে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসের প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। ওই সময় বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত এবং সর্বশেষ জার্নালিজম অ্যান্ড পিস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক হারুন হাবীব ১৯৮১ সালে লেখা নিবন্ধে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার স্বাধীনতার ডাক ও চট্টগ্রামে তার মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডকে বর্ণনা করেন এভাবে—‘যে চট্টলার কঠিন শীলা ছুঁয়ে মহাবিদ্রোহের ডঙ্কা বাজিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান ১৯৭১-এ, সেই চট্টলার মাটিতেই জীবনের শেষ রক্ত দিয়ে দেশপ্রেমের পতাকা উড়িয়ে দিলেন তিনি ৮১-তে।’

বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের (পিআইবি) নিয়মিত প্রকাশনা ‘নিরীক্ষা’র প্রথম বর্ষ ষষ্ঠ সংখ্যায় (মে-জুলাই ১৯৮১) ‘রণাঙ্গনের স্মৃতি থেকে : ফ্রিডম ফাইটারদের ভয় করলে চলে না’ শিরোনামে হারুন হাবীবের স্মৃতিচারণমূলক নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়। তখন ‘নিরীক্ষা’ সম্পাদক ছিলেন পিআইবির তৎকালীন মহাপরিচালক ও খ্যাতিমান সাংবাদিক এ বি এম মূসা। ১৯৮১ সালের ৩০ মে কিছু বিপথগামী সেনাসদস্যের গুলিতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে দেশের সফল রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ‘নিরীক্ষা’র মে-জুলাই ১৯৮১ সংখ্যাটি রাষ্ট্রপতি জিয়াকে ফোকাস করে প্রকাশিত হয়।

‘নিরীক্ষা’র ২১, ২২ ও ২৩—এই তিন পৃষ্ঠাজুড়ে প্রকাশিত প্রায় ২৩০০ শব্দের লেখাটিতে হারুন হাবীব মুক্তিযুদ্ধকালে রণাঙ্গনে জেড ফোর্সের অধিনায়ক জিয়ার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ এবং জিয়ার আগ্রহে যুদ্ধের বড় একটা সময় ধরে একসঙ্গে থাকা, আতিথেয়তা গ্রহণ, সেক্টর কমান্ডার জিয়ার মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে দক্ষতা, অসীম সাহসিকতা, জীবনবাজি রেখে যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া, মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিংয়ে বক্তৃতাসহ নানা বিষয়ে আলাপচারিতা নিয়ে স্মৃতি হাতড়ান। শুধু রণাঙ্গনের স্মৃতিই নয়, ব্যক্তি জিয়াকেও বিশ্লেষণ করেন নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে জিয়ার মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা শোনার পর নিজে জিয়াউর রহমানের আত্মার আত্মীয় হয়ে উঠেছিলেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

জিয়ার শাহাদতের পর সরকারি ব্যবস্থাপনায় ঢাকা থেকে এক দল সাংবাদিককে বিমানে চট্টগ্রাম নিয়ে যাওয়া হয় সরেজমিন রিপোর্ট করার জন্য। ওই সাংবাদিক দলের একজন ছিলেন হারুন হাবীব। তিনি রিপোর্টার হিসেবে সেই সাংবাদিক টিমে অন্তর্ভুক্ত হন। বিমানে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে ১০ বছর আগে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালের তরতাজা যে স্মৃতি তার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে, তাই নিরীক্ষার নিবন্ধে তুলে ধরেছেন বলে উল্লেখ করেন।

হারুন হাবীব তার স্মৃতিচারণমূলক নিবন্ধটি শুরু করেন এভাবে “যে দেশে হাজারো মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে নৃশংস ক্ষুধা আর বুলেটের নির্মম আঘাতে, সে দেশের নিহত কোনো এক রাষ্ট্রপতির স্মৃতিচারণ করব আমি। ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি’ চাইতে চাইতে যে দেশের নিরস্ত্র নিরপরাধ মানুষের মাথার খুলি আর বুকের পাঁজর ঝাঁজরা হয়ে যায় আঁততায়ীর গুলিতে, সে দেশেরই এক স্বাধীনতা-সংগ্রামী রাষ্ট্রীয় কর্ণধারের স্মৃতি-তর্পণ করব আমি।”

তিনি লেখেন ‘একটা অদ্ভুত ব্যক্তিত্ব ধারণ করতেন জনাব জিয়াউর রহমান। শান্ত, শীতল, প্রখর চোখ দুটো তাকে অনেকের কাছে রহস্যময় করে প্রতিভাত করলেও ওই শক্তিশালী ব্যতিক্রমী চোখ দুটোই তার অনেক প্রতাপশালী বিরুদ্ধবাদীর মস্তক অবনত করে দিয়েছে বহুবার। একাত্তরের রণাঙ্গনে সহযোদ্ধা জিয়াকে অনেক কাছে থেকে দেখেছিলাম। স্বাধীনতার সূর্য ওঠার পর থেকে অনেক ঘূর্ণাবর্তে সামরিক শাসক ও রাষ্ট্রপতি জিয়াকে দেখারও সুযোগ হয়েছে আমার দেশে এবং বিদেশে একজন শ্রমজীবী সাংবাদিক হিসেবে। আর শেষবারের মতো দেখলাম তার জমাটবাঁধা কালো রক্ত ১ জুন ১৯৮১ চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসের দোতলায়। যে চট্টলার কঠিন শীলা ছুঁয়ে মহাবিদ্রোহের ডঙ্কা বাজিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান ১৯৭১-এ, সেই চট্টলার মাটিতেই জীবনের শেষ রক্ত দিয়ে দেশপ্রেমের পতাকা উড়িয়ে দিলেন তিনি ৮১-তে।’

স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টিতে জিয়ার আত্মোৎসর্গের কথা স্মরণ করে প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, ‘১৯৭১-এর ৯ মাসব্যাপী মুক্তিসংগ্রামই মূলত পরবর্তীকালের জিয়াউর রহমানের জন্ম দিয়েছিল। যেমনি তার দেশটাকে জন্ম দিতে তিনি নিজে আত্মোৎসর্গ করেছিলেন তার জেড ফোর্সের অগণিত বীর সৈনিকদের সঙ্গে। জয় করেছিলেন দেশের জন্য স্বাধীনতা আর নিজের জন্য আকর্ষণীয় জনপ্রিয়তা।’

রণাঙ্গনে মেজর জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের স্মৃতি রোমন্থন করে তিনি লিখেছেন, ‘সীমান্তের এক পাহাড়ে মেজর জিয়ার সঙ্গে যেদিন আমার প্রথম দেখা হলো, বলতে দ্বিধা নেই সেদিনের আমার বিদ্রোহী তারুণ্য আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠেছিল। আমি দেখছিলাম অবিশ্বাস্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী সেই তরুণ বাঙালি অফিসার, যার সঙ্গে আত্মার আত্মীয়তা হয়ে গেছে কালুরঘাট বেতারের এক ঘোষণায়, ঠিক তিনিই আমার সামনে দাঁড়িয়ে। হাত বাড়িয়ে দিলেন তিনি। বললেন—‘মেজর জিয়া’। কালো সানগ্লাসের মাঝ দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন তিনি। সময়টা বোধকরি জুলাই, ১৯৭১।’

জিয়াউর রহমান আগ্রহ করে তাকে রণাঙ্গনের সঙ্গী করেছিলেন জানিয়ে হারুন হাবীব জানান, ‘তৎকালীন সংসদ সদস্যদের কেউ কেউ আমার পরিচয় দিতেই ভীষণ খুশি হলেন তিনি। বললেন—‘আপনি সাংবাদিক, আমাদের সেক্টরে আপনার প্রয়োজন। আপনি থেকে যান হাবীব সাহেব এখানেই। সব ব্যবস্থা করে দেব আমি, কোনো প্রবলেম হবে না আপনার। আমাদের এখানকার ছেলেরা এত যুদ্ধ করছে অথচ তেমন প্রচার নেই...। এ লড়াইয়ের খবর জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে না পারলে মানুষ জানবে কী করে তাদের ছেলেরা কেমন মৃত্যুপণ যুদ্ধে শত্রু হননে নিজেদের উৎসর্গ করেছে।’

জিয়াউর রহমানই তাকে অস্ত্র চালানোর ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন জানিয়ে হারুন হাবীব লেখেন—‘অনেকটা ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্যের জন্যই অস্ত্র চালানোর আনুষ্ঠানিক কোনো ট্রেনিং নেওয়া হয়নি। কথায় কথায় বলতেই তিনি ব্যবস্থা করে দিলেন। দু-একদিনের মধ্যেই দেখা হয়ে গেল টাঙ্গাইলের ব্যারিস্টার শওকতের সঙ্গে। তৎকালীন সংসদ সদস্য শওকতের সঙ্গে মিলে দুজনে সপ্তাহ কয়েকের মধ্যে রাইফেলসহ অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র চালানো রপ্ত করে ফেললাম। কী যে ভালো লাগছিল সেদিন বোঝাতে পারব না!’

তিনি লেখেন—“জেড ফোর্সের নাম এসেছিল মেজর জিয়ার নাম থেকে। যেমন : মেজর সফিউল্লাহর নেতৃত্বে ছিল ‘এস ফোর্স’ আর মেজর খালেদ মোশাররফের ‘কে ফোর্স’। ১৯৭১-এর জুন-জুলাইয়ে (তারিখটা ঠিক মনে পড়ে না) চট্টগ্রামেরই কোনো এক জায়গায় জন্ম নিয়েছিল এ ব্রিগেডের। চট্টগ্রাম সেক্টরে (অথবা ১ নম্বর সেক্টরে) প্রাক্তন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বীর জোয়ানদের নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল এই ‘জেড ফোর্স’। প্রাথমিক পর্যায়ে মেজর জিয়া নবগঠিত বিদ্রোহী অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে যুদ্ধ থেকে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিককার স্মরণীয় ‘চট্টগ্রাম বিদ্রোহের’ সূত্রপাত করেন।”

হারুন হাবীবের ভাষায়—“মেজর জিয়ার ‘জেড ফোর্স’-এর সদর দপ্তর স্থানান্তরিত হলো চট্টগ্রাম থেকে ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে, উত্তর ময়মনসিংহ ও রংপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা ঘিরে পাকিস্তান বাহিনীকে ঘায়েল করতে। জিয়াউর রহমানের কৃতিত্ব হলো, প্রথমদিকে অপর্যাপ্ত রসদ-সেনাদল নিয়ে তার ব্রিগেড গঠিত হলেও মাত্র কিছুদিনের মধ্যেই দুর্বার সাংগঠনিক ক্ষমতায় পূর্ণাঙ্গ করে ফেললেন তিনি তার ব্রিগেড। সৃষ্টি করলেন তিনি ইলেকট্রিক্যাল-মেকানিক্যাল ডিভিশন, মেডিকেল কোর, সামরিক পুলিশ, অস্ত্র নির্মাণ সেকশনসহ একটা পূর্ণাঙ্গ ব্রিগেডের প্রয়োজনীয় শাখা। শুধু বিভিন্ন ব্রিগেডের যন্ত্রপাতিই আমদানি হলো না, একটা পূর্ণাঙ্গ ব্রিগেড গড়ে তোলার জন্য জনবলও নিয়োজিত হলো ‘জেড ফোর্সে’ স্বাধীনতাকামী জনতার বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে। একদিকে চলল নিয়মিত প্রশিক্ষণ আর অন্যদিকে পর্যায়ক্রমিক আক্রমণ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামের ঐতিহাসিক কামালপুরে ‘জেড ফোর্সে’র অসম সাহসী যোদ্ধারাই চালিয়েছিল প্রাথমিক আক্রমণগুলো। রংপুরের রৌমারী, রাজিবপুর, চিলমারী, গাইবান্ধাসহ বিশাল অঞ্চলে ‘জেড ফোর্সের’ স্বাধীনতা যোদ্ধারা প্রতিদিন মারাত্মক সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছিল, তখন পাকিস্তানি সৈন্য আর তাদের এ দেশীয় অনুচর আলবদর রাজাকার বাহিনীর বিরুদ্ধে। দেশের ত্রিশ-চল্লিশ মাইল অভ্যন্তরে, ময়মনসিংহের দেওয়ানগঞ্জ, বাহাদুরাবাদ, জামালপুর-শেরপুর পর্যন্ত ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছিল মুক্তিযোদ্ধারা। প্রতিদিন খবর আসছিল, রক্তাক্ত সংঘর্ষের আর আসছিল পাঁচজন-ছয়জন তারুণ্যদীপ্ত মুক্তিসংগ্রামীর রক্তমাখা দেহ।”

প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা এবং সেগুলোতে জিয়াউর রহমানের নিয়মিত তদারকির কথা উল্লেখ করে প্রবন্ধে বলা হয়, “মেজর জিয়া প্রায়ই আসতেন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে, ভাষণ দিতেন মুক্তিযোদ্ধা গেরিলাদের উদ্দেশে। ‘জেড ফোর্স’-এর নিয়মিত বাহিনীর সঙ্গে এক হয়ে রৌমারী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের তরুণ যোদ্ধারা প্রতিনিয়ত আক্রমণ পরিচালনা করতে থাকে এলাকার বিভিন্ন ফ্রন্টে। তারা ভয়াবহ যুদ্ধে লিপ্ত হয় তারাবাড়িতে, হাজারীর চরে, চর সাজাইয়ে এবং চালিয়াপাড়ায়। এসব যুদ্ধে নিজেদের সামান্য কিছু ক্ষয়ক্ষতি হলেও মুক্তিযোদ্ধারা শত্রুদের শুধু পরাস্ত করেই ক্ষ্যান্ত হয়নি, তারা সক্ষম হয়েছিল বিপুলসংখ্যক পাকিস্তানিকে হত্যা করতে, গোলাবারুদ দখল করতে। আর সৃষ্টি করেছিল ওদের মনে ভয়াবহ ত্রাস, যা পাকিস্তানিদের মনোবল ভেঙে দিয়েছিল দারুণভাবে।’

সেনাপতি জিয়ার বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে—‘মনে পড়ছিল সেনাপতি জিয়ার লক্ষণীয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো। নিজে অস্বাভাবিক পরিশ্রম করতেন ভদ্রলোক। দেখতাম সেই সূর্য ওঠার আগে থেকেই তিনি বাঁশের চেয়ার-টেবিলে বসে যুদ্ধের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রগুলো দেখছেন। মাটিতে আঁকা মানচিত্রে অন্যান্য সহযোদ্ধাদের সঙ্গে চোখ রেখে যুদ্ধ পরিকল্পনা নিয়ে কথাবার্তা বলছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ছুটছেন এদিক-সেদিক, ভাষণ দিচ্ছেন এখানে-সেখানে। সেই এক নিরলস জীবন তার। নিয়মিত বাহিনীর সাধারণ যোদ্ধাদের সঙ্গে মেজর জিয়ার সার্বক্ষণিক একটা যোগাযোগ ছিল। ছোট-বড় প্রায় প্রতিটি অপারেশনের আগে হাত মেলাতেন তিনি সহযোদ্ধাদের সঙ্গে, কথা বলতেন, সাহস জোগাতেন। মূল ব্যাপারটা বোধকরি ছিল জিয়াউর রহমানের উল্লেখযোগ্য সাংগঠনিক ক্ষমতা, ব্যক্তিত্ব, কঠোর কর্মচেতনা আর সার্বক্ষণিক যোগাযোগ, যা থেকে নিজের ভাবমূর্তিকে শক্ত করে প্রোথিত করতে পেরেছিলেন তিনি সাধারণ যোদ্ধাদের অন্তরে।’

প্রকাশিত স্মৃতি-নিবন্ধের শিরোনামটি যে স্মৃতি থেকে নিয়েছেন, তা বর্ণনা করে হারুন হাবীব লিখেছেন—“আর এক দিন। পাকিস্তানি বাহিনী বাহাদুরাবাদ ও চিলমারী থেকে প্রায় প্রতিদিনই আক্রমণ করে চলেছিল রৌমারী। শুধু তাই নয়, পাকিস্তান বিমানবাহিনীর জাহাজগুলো প্রচণ্ড গোলা নিক্ষেপ করে হতাহত করে চলেছিল পার্শ্ববর্তী এলাকার অসংখ্য গ্রামবাসীকে। ঠিক এমনই একটি দিনে মুক্তিযোদ্ধাদের দখলকৃত ছোট একটি লঞ্চে চেপে রওনা দিলাম আমরা রৌমারীর দিকে। যতটুকু মনে করতে পারছি, সেদিন আমাদের সঙ্গে ছিলেন তারুণ্যদীপ্ত স্বাধীনতাযোদ্ধা তৎকালীন মেজর শাফায়াত জামিল এবং একদল সৈনিক। ছোট্ট নৌযানটিতে চেপে দেশের অভ্যন্তরভাগের মুক্তাঞ্চলের দিকে রওনা করলেও ব্যক্তিগতভাবে আমি সন্দেহমুক্ত হতে পারছিলাম না পাকিস্তান বাহিনীর হঠাৎ আক্রমণের ভয় থেকে। আমাদের সঙ্গে দশ-বারোজনের যে ছোট্ট যোদ্ধা দলটি রয়েছে, তা খুবই অপ্রতুল। আর শত্রুর বিমান আক্রমণ প্রতিহত করতে একটি হালকা মেশিনগানকে লঞ্চের সামনের ছাদে আকাশমুখী করে বেঁধে রেখে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা হলেও, ব্যবস্থাটা মনঃপূত হচ্ছিল না আমার। মেজর জিয়া বোধকরি আমার সমস্যাটা ধরতে পেরেছিলেন। বললেন—‘ভয় পাচ্ছেন নাকি হাবীব’। উত্তরে জানালাম, ‘না ঠিক ভয় নয়, তবে যেভাবে বৃষ্টির মতো গোলা নিক্ষেপ করে পাকিস্তানের বিমানগুলো এ অঞ্চলে, ঠিক সেভাবে আমাদের প্রতিরক্ষাটা হয়নি। সামান্য মেশিনগান দিয়ে তো আর এন্টি-এয়াক্রাফটের কাজগুলো চলে না...’। হাসলেন খুব মেজর জিয়া। বললেন, ‘আরে ভয় পাবেন না সাহেব। ফ্রিডম ফাইটারদের ভয় করলে চলে না। এখানে আর কি এয়ার স্ট্রাইক হয়, চট্টগ্রামের এলাকাতে তো আপনি ছিলেন না। থাকলে বুঝতেন...।”

মেজর জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ভাসমান লঞ্চে কথোপকথনের স্মৃতি উল্লেখ করে হারুন হাবীব লেখেন—“...প্রায় দু’ঘণ্টার মতো সেদিন নদীতে ভাসতে হয়েছিল আমাদের, প্রায় ১০টা নাগাদ, বিকল ইঞ্জিন না সারানো পর্যন্ত। বেশ কথাবার্তাও হয়েছিল সেদিন মেজর জিয়ার সঙ্গে। বেশ কিছুক্ষণ লঞ্চের বাইরে দাঁড়িয়ে পূর্ণ চাঁদটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন এক দৃষ্টিতে। লঞ্চের ভেতরে বসে সিগারেট টানছিলাম আমি। মেজর শাফায়াত লঞ্চের পেছনদিকে। —‘হাবীব সাহেব লোকে কি বলে আমাকে নিয়ে’? হাতের ইশারায় ডেকে মুসকি হেসে প্রশ্ন রাখলেন জিয়া। —‘ভালোই তো বলে, খারাপ বলার কী আছে’? আমি বললাম এবং তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। —‘ওকে, বাদ দিন ওসব। আপনি একটা ভালো আর্টিকেল লিখে ফেলুন। ফ্যাক্ট অ্যান্ড ফিগার আমি দেব। বাইরের পৃথিবীতে মুক্তিযোদ্ধাদের পাবলিসিটি দরকার। তা না হলে ওয়ার্ল্ড ওপেনিওন গড়ে উঠবে না। মনে রাখবেন, ইংরেজিতে লিখতে হবে এবং কোনো একটা ভালো ইংরেজি কাগজে ছাপানোর ব্যবস্থা করতে হবে...।”

স্বাধীন বাংলাদেশ নিয়ে জিয়াউর রহমানের স্বপ্ন তুলে ধরে আলোচ্য নিবন্ধে আরো লেখেন, ‘প্রচুর কথা হলো তার সঙ্গে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ কেমন হবে, মুক্তিযোদ্ধাদের একটা বিশেষ প্রসেসের মধ্য দিয়ে দেশ গড়ার কাজে ব্যবহার করতে হবে, ইত্যাদি অনেক কিছু। আমার তখন যা বয়স আর সাংবাদিকতার পরিচিতি, তাতে আমাকে এমন ধরনের কোনো সিরিয়াস আলোচনায় সঙ্গী করে নেওয়ার কোনো কারণই ছিল না। কিন্তু মেজর জিয়াকে দেখলাম আমাকে তার কথা বলার উপযুক্ত লোক ভেবে একের পর এক টেনেই চলেছেন প্রসঙ্গ। মুক্তিযুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান, যুদ্ধ-পরবর্তীকালের ভবিষ্যদ্বাণী, মুক্তিযুদ্ধের আশু বিজয় ইত্যাদি প্রসঙ্গে কথা বলতেন তিনি। কেন জানি না, বারবার আড়চোখে আমি তার মুখের দিকে তাকাচ্ছিলাম আর দেখছিলাম—স্বাধীন জন্মভূমির এ অংশে দাঁড়িয়ে জিয়ার মুখটা পূর্ণ চাঁদের স্পষ্ট আলোতে ভরে গেছে। কি ভাবছিলেন তিনি, আমি বুঝিনি হয়তোবা তার দেশ-স্বদেশ, হয়তোবা অনেক বছর পরের বাংলাদেশ।’

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও যুগ্ম সম্পাদক, আমার দেশ

মুক্তিযুদ্ধোত্তর হতাশা আর বেসামরিক আমলাতন্ত্র

পঞ্চান্নয় পা বাংলাদেশের, নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই

স্বাধীনতা অর্জনে আত্মত্যাগ আর যুদ্ধে অংশগ্রহণ এক প্রশ্নহীন ইতিহাস

অগ্নিঝরা ২৩ মার্চ: পাকিস্তান দিবসে প্রতিরোধ

ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবরা ও ভবিষ্যতের শঙ্কা

নব্যদের পাহারাদারিতে জাতীয়তাবাদী দলের সংস্কৃতি-চেতনা

ঈদের বাঁশির সেই সুর...

রমজানের ট্রিলিয়ন টাকার অর্থনীতি

এবারের বিমর্ষ ঈদ

সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ এবং মিডিয়ার নৈতিক সংকট