হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

সুন্দর শরতে অসহ্য ডেঙ্গু

শওকত মাহমুদ

এই শরৎকালে সাদা মেঘের বিস্তারে আর শুভ্র কাশবনের সৌন্দর্যে আমরা মুগ্ধতায় অন্তরীণ। তবে এখন বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহর ঢাকা ও বাংলাদেশের ঘরে ঘরে জ্বর-সর্দি-ডেঙ্গু-হামের ভয়াবহ বিস্তারে ঢের বিষণ্ণ হয়ে আছি।

শরৎ এক ঐশ্বর্যময়ী ঋতু। মহান আল্লাহর গায়েবি সংকেতে মাটি থেকে আকাশ সেজে ওঠে। মৌসুমি বায়ুর বিদায়লগ্নে সোনালি রোদ বর্ষায় স্নাত চরাচরে যেন অপার্থিব রূপের উদ্ভাসে এক অলৌকিক মাত্রা যোগ করে। ‘আমি অনেক দিন ভেবেছি জগৎ এমন আশ্চর্য সুন্দর কেন... যেখানে আলস্য, সেখানে কৃপণতা। যেখানেই ঋণ শোধে ঢিল পড়ে আছে, সেখানেই সমস্ত কুশ্রী সমস্ত অব্যবস্থা’ (নাটক, শারদোৎসব : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।

এই বাংলাদেশ ধূলিতে, জীবাণুতে, পোকা-মাকড়ে যেন ঢেকে আছে। ঘরে ঘরে জ্বর-সর্দি, ডেঙ্গু, হামের রোগী। এই মঙ্গলবারেই ডেঙ্গুতে হাসপাতালে মারা গেছেন ১০ জন। হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জায়গা হচ্ছে না। হামে আক্রান্ত শিশুতে হাসপাতাল ঠাসা। এ এক মহাদুর্যোগ। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মনোযোগ সত্ত্বেও আমাদের যেন কিছুই করার নেই। মিডিয়ার পর্দা ও পাতায় শুধু মৃত্যু, অসুস্থতা, মহামারির খবর। নাম মনে নেই, একজন বিদেশি অর্থনীতিবিদ বলেছিলেন, যেসব দেশে পোকা-মাকড়, ভাইরাসজনিত মৃত্যু ও অসুখ বেশি, তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন আটকে থাকে। কেননা, মৃত্যু ও অসুস্থতার জন্য জাতির কর্মক্ষমতা কমে যায়।

আমরা দেখেও দেখি না, বাংলাদেশি জাতির ৯০ ভাগেরও মানুষ ওষুধ খায়। নিশ্চয়ই অসুস্থ অথবা ওষুধের দোকান, ডাক্তার বা ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানির প্রণোদনায় নিয়মিত ওষুধ খাচ্ছে। মহল্লায় মহল্লায় যত না মুদির দোকান, সম্ভবত এর চেয়েও বেশি ঝলমলে ফার্মেসি বা ওষুধের দোকান। বিভিন্ন রোগের ডাক্তারদের যেসব সমিতি আছে, অসুখগুলোর জাতীয় দিবসে তাদের দেওয়া পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, হৃদরোগে, কিডনি রোগে, হাড়ের ব্যাধিতে, বহুমূত্র বা উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত অথবা ব্যথায় কাতর রোগীর হিসাব করলে পুরো জনগোষ্ঠী কোনো না কোনো রোগে আক্রান্ত। কী ভয়াবহ অবস্থা! একটা জাতির সবাইকে কোনো না কোনো ওষুধ খেতে হবে কেন? যারা বিদেশ ভ্রমণ করেন, তারা কি এমন কোনো শহর দেখেছেন যে ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, নার্সিং হোম, হাসপাতালে ভর্তি? প্রতিদিন সকালে উপজেলা থেকে শুরু করে সব শহরে লাখ লাখ লোক ছুটছেন পেশাব-পায়খানা-রক্ত পরীক্ষার জন্য প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরির দিকে? চিকিৎসার এত সাইনবোর্ড কোথাও দেখবেন না।

কুমিল্লা শহরে বাস থেকে নামলেই অটো ড্রাইভার জিজ্ঞেস করতে থাকেন চিকিৎসা বা রক্ত-মল-মূত্র পরীক্ষার জন্য এসেছেন কি না। যদি ‘হ্যাঁ’ বলেন, তবে চালক আপনাকে নিয়ে যাবে তার পরিচিত স্থানে। দেশজুড়ে এই মুহূর্তে যদি জরিপ চালানো হতো, তবে বোঝা যেত প্রতি পরিবারে চিকিৎসা এবং ওষুধের পেছনে খরচের পরিমাণ খাদ্যসামগ্রী কেনার ব্যয়ের চেয়ে বেশি। ওষুধ কোম্পানিগুলোর রমরমা ব্যবসা। তাদের দেওয়া কমিশনে একশ্রেণির (বাড়ি-গাড়িসহ) ডাক্তাররা ধনী। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালসমৃদ্ধ শহরগুলো বহুতল ভবন বা শপিং সেন্টারের মালিকানায় স্থানীয় ডাক্তারদের ভূমিকা আছে। আমি ডাক্তারদের নিন্দা নয়; বরং অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা বা ওষুধ কেনানোর ঝোঁকের সমালোচনা করি। মিডিয়ায়ও এখন ওষুধ কোম্পানির মালিকদের বিনিয়োগ টের পাওয়া যাচ্ছে। একটি জনপ্রিয় পত্রিকায় বিভিন্ন রোগ নিয়ে এত গোলটেবিল আলোচনা হয় যে, সন্দেহ জাগে ওই পত্রিকার মালিক পক্ষের একটা ওষুধ কোম্পানি আছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ে আমরা অনেক কথাই বলি, কিন্তু ওষুধের দামে ভয়াবহ উল্লম্ফন নিয়ে টকশো করি না। প্রতিদিন টিভিতে ডাক্তারদের টকশো, আয়ুর্বেদীয় ওষুধের বিজ্ঞাপন এবং পত্রিকাগুলোতে কোন অসুখে কী করবেন-খাবেনÑএমন সব লেখার ভিড় দেখে মনে হয় রোগবালাই জাতির মূল সমস্যা। অহোরাত্র ডাক্তার, হাসপাতাল, ওষুধের প্রলোভন বিস্তারে বিজ্ঞাপন, মিডিয়া, স্পন্সরশিপের ক্ষান্তি নেই। শিশুর প্রত্যুষ থেকে বৃদ্ধের জরা পর্যন্ত বাঁধা তার খোয়াড়ের এলাকা।

আমরা আলোচনাই করতে চাই না, বেসরকারি হাসপাতালগুলো বিভিন্ন সেবার কী ধরনের ফি নেয়। বিদেশের হাসপাতালের চেয়েও কোন কোন ক্ষেত্রে বেশি ব্যয়বহুল। সরকারি হাসপাতালে স্বাভাবিক সেবা পেতে তদবির করতে হয়। এত রোগীর চাপে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও নাকাল হয়ে পড়ে। আজকাল গ্রামের নারীও বাচ্চা প্রসব করায় উপজেলা প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতেই দাইদের প্রসব হয় কম। ক্লিনিকে যাওয়াটা সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠি।

খানিকটা জ্বর-সর্দি হলে আমরা দোষ দিই মৌসুম পরিবর্তনের ওপর। এই যে শীত আসছে, অন্তর্বর্তী সময়টাতে জ্বর হবেই বলে মনকে প্রবোধ নিই। প্যারাসিটামল, মোনাস খাওয়া শুরু করে দিই। বিশেষজ্ঞরা বলেন, দূষিত, ধূলিময় বাতাসের জনপদে থাকলে রোগবালাই হবেই। একজন রোগীর মত হলো, আগেও জ্বর হতো। কিন্তু এখনকার জ্বর লম্বা সময় ধরে থাকছে। ভালো হতেই চায় না। কোভিডের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এখনো আছে। একজন ডাক্তারের কথা হলো, বাংলাদেশের মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও অনেক কমে গেছে। নব্বই দশকে বহুল শ্রুত একটা স্লোগানÑসবার জন্য স্বাস্থ্য, এখন আর শোনা যায় না। কারণ ওই স্লোগান আমরা বাস্তবায়িত করেছি অবকাঠামো, ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মী বাড়িয়ে। ঘরে ঘরে রোগী সৃষ্টি করে।

আমরা বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ স্বাস্থ্যকাঠামোর দেশ বানিয়ে ফেলেছি। গ্রাম পর্যন্ত কমিউনিটি ক্লিনিক করেছি। রোগপ্রতিরোধের ওপর জোর দিতে গিয়ে চিকিৎসাব্যবস্থার সম্প্রসারণ ঘটিয়ে ফেলেছি। ছোটবেলায় গ্রামে দেখেছি, এক যৌথ পরিবারের জন্য শোবার ঘর থেকে বেশ দূরে পায়খানার জায়গা। এক বদনা পানি ও হাত ধোয়ার ছাই যথেষ্ট। তখন তো এত অসুখ-বিসুখ শুনিনি। এখন অনেক ঘরে টাইলসের অ্যাটাচড টয়লেট, কত ধরনের সাবান আর পর্যাপ্ত সুপেয় পানি। কিন্তু অসুখের বিস্তার তো ভয়াবহ।

এখনো যদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক রিপোর্টগুলো দেখেন, তবে এই তথ্য পেয়ে যাবেন যে, অজ্ঞাত বা ভাইরাসজনিত রোগে মৃত্যুর সংখ্যা অন্য রোগে মারা যাওয়াদের চেয়ে কম নয়। আজকের আলোচনা স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাব্যবস্থার ময়নাতদন্ত নয়, বরং রোগাক্রান্ত পুরো জাতির উদ্ধার নিয়ে সচেতন হওয়া দরদি হওয়া। আমাদের সরকার বা স্বাস্থ্য প্রশাসনের চেষ্টার ঘাটতি নেই। মশা মারতে হাজার হাজার কমিটি আছে। কিন্তু কোথায় যেন একটা গিট্টু আছে। পূর্ব ইউরোপীয় কোনো এক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ বলেছিলেন, মাথাপিছু আয় বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি দিয়ে কোনো জাতির উন্নতি যাচাই ঠিক নয়। একটি জাতির মায়েরা কত ওজনের সুস্থ শিশু জন্ম দেয়, সেটাই জাতীয় উন্নতির মানদণ্ড হওয়া উচিত। একসময় অস্টারমিল্ক নামের গুঁড়া দুধের টিনে যে বাচ্চাটির ছবি দেওয়া হতো, সবাই কামনা করত তাদের সন্তান যেন এমন স্বাস্থ্যবান হয়। জন্মেচ্ছু শিশুর স্বাস্থ্য নির্ভর করে মায়ের স্বাস্থ্য, পুষ্টিগ্রহণ এবং যে পরিবেশে মাতৃত্ব বিস্তার করেÑঅর্থাৎ স্বামীর স্বাস্থ্য ও রুজি অর্জন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ইত্যাদির ওপর।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলে দিয়েছেন, মাতৃগর্ভে শিশুর বিকাশ সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ তার হাতে। আমরা কি তাঁর রহমত থেকে বঞ্চিত? তিনিই আবার বলেছেন, তাঁর রহমত থেকে নিরাশ হতে নেই। তবে আমাদের চেষ্টা থাকতে হবে। সুরা, রাদ-এ আল্লাহ জানিয়েছেন, বৃষ্টির পর নদী-নালা, খাল-বিলে পানি তৈরি হয়। এতে ফেনা সৃষ্টি হয়। পানির স্রোত সে জঞ্জাল ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

আমরা কি পারব না মশা ও ডেঙ্গুকে দমন করতে? শরতের মাস অক্টোবরে বার্ষিক এই দুর্যোগ ৫৫ বছরেও শেষ হলো না। রোজ শুনি, অক্টোবর হচ্ছে ডেঙ্গুর, ভয়াবহ মৃত্যুর মাস। জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের একেকটি পর্ব সমস্যার নতুন নতুন অধ্যায় খুলে চলেছে। ‘শারদোৎসব’ নাটকের এক অংশ আছে—রাজা জিজ্ঞেস করছেন মন্ত্রীকে, গল্প কিছু আছে? নেই বললেই হয়। যুদ্ধ? না। কোনো রকমের রক্তপাত? না। আত্মহত্যা? পতন ও মূর্ছা মতো? একেবারেই না।

আদিরস? বীররস? করুণ রস? না, কোনোটাই না। বাংলাদেশের অবস্থা কবে এমন পাব? শরৎকালের কাশের স্তবকÑসে না বাগানের! না মনের! সে হেলাফেলায় মাঠে-ঘাটে নিজের অকিঞ্চকতার ঐশ্বর্য বিস্তার করে বেড়াচ্ছে।

রোগবালাইয়ের স্তূপ থেকে উঠে দাঁড়াতে আমাদের প্রয়োজন মানসিকতার বিপ্লব। মুনাফাকেন্দ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থা হটাতে হবে। এই শরতেই ঐতিহাসিকভাবে আমরা শুনে আসছি প্রতিরোধের গানÑ‘কে ডাকে রে পিছন হতে, কে করে রে মানা? ভয়ের কথা কে বলে আজ, ভয় আছে সব জানা।’ ভাঙনের রঙ নিশ্চিতভাবে লাল। কিন্তু তারপর নির্মাণের রঙ শুভ্র। মানুষের লড়াই শেষ হয়নিÑসুন্দর একটা পৃথিবী গড়ে তোলার জন্যই এ লড়াই। এ লড়াই তো সেই সমাজের বিরুদ্ধে যে সমাজ অগস্তের মতো পৃথিবীর যৌবন-সমুদ্র শুষে খায়, যা ভয়ংকর, যা অন্ধকার, যার পা উল্টোদিকে, যা পেছনে হেঁটে চলে। (প্রখ্যাত পরিচালক, অভিনেতা, নাট্যসাহিত্য বিশরাদ কুমার রায় ২০০৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমিতে একক বক্তৃতা)

লেখক: সাবেক সভাপতি, জাতীয় প্রেস ক্লাব

সম্পাদক, উইকলি ইকোনমিক টাইমস

বাংলাদেশে এআইনির্ভর অর্থনীতি

বুয়েটিয়ানরা কেন দেশ ছাড়ে, পেশা ছাড়ে

ভারতে ‘জেনজি’র লক্ষ্য গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার

বিমানবন্দর, জবাবদিহিতা ও রাষ্ট্রের নৈতিকতা

ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি: স্থানীয় পর্যায়ে দায়িত্ব আছে, সম্পদ নেই

প্রধানমন্ত্রীর অ্যাকশন ও বিমানবন্দর ইস্যুতে গ্রেপ্তার

বাংলাদেশপন্থা: একটি নতুন রাষ্ট্রদর্শন

দেশ কি আরেক এক-এগারোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে

কুষ্টিয়ায় আওয়ামী পান্ডাদের অনুসরণ করছে ক্ষমতাসীনরা

আমাদের কিশোর সমাজ ও শিক্ষা কার্যক্রম