১৯৭১ সালের মার্চে শুরু হয়ে ডিসেম্বরে মুক্তিযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। তবে দেশ ১৯৭২ সালের মার্চে সম্পূর্ণভাবে বিদেশি সেনাবাহিনীমুক্ত হয়। এর মধ্যে শত্রু-মিত্র সব বিদেশি সেনাবাহিনীর প্রস্থান সম্পন্ন হয়। তখন থেকেই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন ও অগ্রগতির পাশাপাশি আমার বাসনা ছিল, দেশের মাটি যেন আর কখনো শত্রু-মিত্র কোনো পরদেশি বাহিনীর পদানত না হয় কিংবা তাদের পদচারণে কলুষিত না হয়। সেই লক্ষ্যেই যতদূর সাধ্য ছিল, নিজেকে নিবেদিত করি। তখন বয়স ছিল তারুণ্যে।
৩ নভেম্বর, ১৯৭৫
কিন্তু সাড়ে ৩ বছর না যেতেই, ১৯৭৫-এর নভেম্বরের এক সকালÑ৩ তারিখ হবে বোধ হয়, জনমুখে গুজব বা সংবাদ, কোনটা জানি না, শুনলাম দেশে নাকি আমন্ত্রিত হয়ে কোনো এক বিদেশি বাহিনী ঢুকবে। বিদেশি বিমান বাহিনীর যুদ্ধজাহাজ নামবে আমারই বাসার নিকটবর্তী কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে । গুজব বা খবরÑছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মতো, আর তাতেই সাধারণ জনগণ ছুটেছে বিমানবন্দরের দিকে, শুয়ে পড়েছে রানওয়েতে, যাতে কোনো বিমান নামতে না পারে। নিরস্ত্র জাতির সশস্ত্র সম্ভাব্য আগমনের বীরোচিত প্রতিরোধ যেন জনমনে। খবরটি সত্য যদি না-ও হয়ে থাকেÑজনপ্রিয় গুজব সর্বাবস্থায় জনমনের প্রতিফলনই বটে তার সত্যাসত্য নির্বিশেষে। আর খবরটি হয়তো সত্যই ছিল।
১৫ আগস্ট অভ্যুত্থানে শেখ সাহেবের সপরিবারে মর্মান্তিকভাবে নিহত হওয়ার মাত্র কিছুদিন আগে থেকে রেডিওতে কাজ শুরু করেছি । ফলে আগস্ট থেকে নভেম্বরÑরক্তক্ষয়ী এ কয় মাসের ঘটনাবলি সেকালে শাহবাগে অবস্থিত রেডিও অফিসের মতো ঘটনা আর সংবাদগুলোর কেন্দ্রস্থল থেকেই দেখার, শোনার সুযোগ পেয়েছিলাম । বিমানবন্দরের পেছন দিকটি ছিল আসাদগেটের পাশে আমার বাসা থেকে হাঁটার দূরত্বে। কিন্তু সেদিকে যাওয়ার সুযোগ হয়নিÑরেডিও অফিসে কাজ ছিল গুরুত্বের, সেদিকে রওনা দিই। পথেই শুনলাম ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ সেনা অভ্যুত্থান ঘটানোর পর স্ব-নিয়ন্ত্রণাধীন বেসামরিক সরকারের মোড়কে নিজের সামরিক শাসন কায়েম, আর প্রতিপক্ষ থেকে তার রক্ষার জন্য মিত্রদেশের বাহিনীকে আমন্ত্রণের উদ্যোগ নিতে চাচ্ছেন। কত দূর সত্য কে জানেÑতবে সাধারণ জনগণ সেটাই বলছিলেন, গুজব রটনায়ই হোক আর পরিস্থিতি দেখে আন্দাজ করে হোক।
জেলহত্যা
৩ নভেম্বরে সে ভোরেই পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের চারজন প্রধান নেতাÑ(হাফেজ) তাজউদ্দীন, (ক্যাপ্টেন) মনসুর আলী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম আর কামারুজ্জামানকে কে বা কারা কারাগারেই গুলি করে হত্যা করে বলে খবর আসে ।
তারা বিনাবিচারে আটক ছিলেন বলেই মনে হয়Ñএমন হত্যাকাণ্ড মর্মান্তিক বোধ হয়। কে করল এটা, কেন? জনমুখে নানা জল্পনা ছিল। জল্পনার একটি ধারা ছিলÑখালেদ মোশাররফ তাদের দিয়ে বিকল্প সরকার গঠন করতে চাইবেন এবং তাদের দিয়ে গঠিত সরকার বিদেশি বাহিনীকে মিত্রতা চুক্তির আওতায় আমন্ত্রণ করে আনাবেন। এ ধারণা করে যে সরকারকে তিনি উৎখাত করেনÑতার প্রতি সহানুভূতিশীল সামরিক অফিসার বা তাদের কারো নির্দেশ বা নির্দেশ ছাড়াই মোশাররফবিরোধী কোনো এক বা একাধিক সৈন্য এই হত্যাটি করে সম্ভাব্য বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ ঠেকাতে।
জল্পনার অন্য আরেকটি ধারা ছিলÑবিচারপতি মেরুদণ্ডহীন দুর্বল রাষ্ট্রপতির অধীনে বেসামরিক সরকারের মোড়কে, প্রকৃত সামরিক শাসনের ভেতর দিয়ে নিজের ক্ষমতা দখলের উচ্চাভিলাষ ছিল খালেদ মোশাররফের। ওই চার নেতার মতো শক্তিশালী বেসামরিক রাজনৈতিক নেতার উপস্থিতি সেই আকাঙ্ক্ষিত সামরিক শাসনের পথে বড় প্রতিবন্ধক হবে বলে তারই ক্ষমতার স্বার্থে তাদের হত্যা করা হয় ।
সরকারহীন দেশ
দেশে ৩ থেকে ৭ নভেম্বর (১৯৭৫) কোনো সরকার ছিল না বাস্তবে । ৩ নভেম্বর ভোরের আগ পর্যন্ত যে সরকার ছিল, খালেদ মোশাররফের সেনা অভ্যুত্থানে তা উৎখাত হয়ে গিয়েছিল, ৩ নভেম্বর ভোর রাতে। তার বিকল্প হিসেবে খালেদ মোশাররফের ক্ষমতা দখল করে সরকার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা বিফল হয় । তখন, শোনা যায়, উৎখাতকৃত রাষ্ট্রপতির বিকল্প হিসেবে, নতুন বেসামরিক সরকারের মোড়কের প্রধান হিসেবে তখনকার প্রধান বিচারপতি সায়েমকে তার বাড়ি থেকে ধরে আনা হয় । তিনি নাকি বাড়ির ভেতর টেবিলের নিচে লুকিয়ে ছিলেন, সেখান থেকে তাকে ধরে এনে রাষ্ট্রপতি করে ঘোষণা দেওয়া হয়। যার বিকল্প হিসেবে তাকে রাষ্ট্রপতি করা হয়, সেই রাষ্ট্রপতি মোশতাককে নাকি নতুন সেনাপতি জেনারেল খালেদ মোশাররফের সেনা অভ্যুত্থানের পক্ষের সৈন্যরা ধরে নিয়ে গেলে তাকে নাকি বেদম প্রহার করে ‘হাড়গোড় ভেঙে দেওয়া’ হয় । একইভাবে পূর্বতন সেনপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকেও নাকি ধরে নিয়ে গিয়ে আটক করে।
শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় ছিল দেশ ৩ তারিখ থেকে। এরই ভেতর দৈনন্দিন জীবনের যা কিছু করা দরকার, করতে হচ্ছিল । দেশের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে প্রায়ই আমাদের শিক্ষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রধান (প্রফেসর) ডক্টর মুহম্মদ আজীজ আমাদের ‘আজীজ স্যারের সঙ্গে বসতাম আমরা কিছু কিছু ছাত্র । দেশের পরিস্থিতি, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রেক্ষিতে বোঝার বোধ তার ছিল অসাধারণ ।
খালেদ মোশাররফের পদোন্নতি, ৬ নভেম্বর
৬ নভেম্বর পত্রিকায় (সম্ভবত বাংলাদেশ টাইমস-এ) একটি ছবি প্রকাশিত হয়, তাতে খালেদ মোশাররফের মুখে এক অসাধারণ হাসি লক্ষণীয়, এমতাবস্থায় যেখানে ৩ তারিখের আগের তিন সেনাপতির দুজন নৌবাহিনীপ্রধান এম এইচ খান, আর বিমান বাহিনীপ্রধান তোয়াব তাকে ব্রিগেডিয়ার থেকে মেজর জেনারেলে পদোন্নতি ও সেনাপ্রধানের পদে প্রতিষ্ঠামূলক পদকাদি পরিয়ে দিচ্ছিলেনÑতৃতীয় সেনাপ্রধান, জিয়াউর রহমানের কোনো উপস্থিতি সেখানে ছিল না । ৬ নভেম্বরই হবে বা তা পরের দিন সকালÑআজীজ স্যার ছবিটি দেখিয়ে খালেদ মোশাররফের মুখের ওই হাসিটি লক্ষ করতে বলেন, ইঙ্গিত দেন, হাসিটি বা ছবিটি তাৎপর্যপূর্ণ । কী তাৎপর্য তিনি বোঝাতে চাচ্ছিলেনÑআজও জানি না ।
ছবির সঙ্গের সংবাদে বলা হয়, খালেদ মোশাররফের পদোন্নতি ৩ তারিখ থেকে কার্যকর, ৫ তারিখে এই খবর নাকি দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত হলেও তা ছিল ছবি ছাড়াÑঅনুষ্ঠান ও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আদায় হয় সম্ভবত তার পর, ৫ নভেম্বর বিকালে, যদিও ৩ তারিখ থেকেই খালেদ কার্যত সে পদের ক্ষমতায় ছিলেন বলেই ৬ তারিখে প্রকাশিত ছবির সঙ্গের সংবাদে তা বলা হয়, ততক্ষণে সেই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আদায় ও সংবাদপত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানপন্থিদের জন্য তা সম্ভব হয় বলে ।
ছবিতে নৌবাহিনীপ্রধান ও বিমান বাহিনীপ্রধান নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে পদকাদি পরিয়ে দিলেও, খালেদ মোশাররফের মতো হাসি তাদের মুখে ছিল না। সে সময় এসবের যে তাৎপর্যের ইঙ্গিত আজীজ স্যার দিয়েছিলেন, তা ছিল এটাই যে খালেদ মোশাররফ জনসমক্ষে প্রচারযোগ্য ওই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আদায় করেছিলেন বলপূর্বক আর বাকি দুই সেনাপ্রধানের তা বাধ্য হয়ে দিলেও তাতে তাদের আন্তরিক সমর্থন ছিল না। এক দিন পরই তা কার্যত দেখা যায়।
সায়েম ‘রাষ্ট্রপতি’
৩ থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে কার্যত নিয়ন্ত্রণক্ষম কোনো সরকার ছিল না। দেশ ছিল সম্পূর্ণরূপে নৈরাজ্যের কবলে। পূর্ববর্তী রাষ্ট্রপতিকে উৎখাত ও বন্দি করে তার জায়গায় ভীত-সন্ত্রস্ত প্রধান বিচারপতিকে ধরে এনে রাষ্ট্রপতি বলে ঘোষণা দিলেও, তিনি কোনো সরকার নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনার মতো অবস্থা ছিলেন না। যে বড় চার নেতাকে দিয়ে একটি বেসামরিক সরকার দাঁড় করানো যেত, তারা সবাই খালেদ মোশাররফের সামরিক অভ্যুত্থানে শুরুর দিকেই ৩ নভেম্বরের ভোর রাতে নিহত হন জেলে বন্দি অবস্থায়Ñখবরটি জনসমক্ষে বেরিয়েও এসেছিল। তাতে জনগণ বুঝতে পারছিল, বিচারপতি সায়েমের রাষ্ট্রপতি হিসেবে আসলে কোনো সরকারই ছিল না। খালেদ মোশাররফের সামরিক পক্ষ হয়তো রাষ্ট্রপতির বাসভবনের আর সেনা ছাউনির কোনো এলাকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেওÑরেডিও স্টেশনসহ দেশ বা বিদেশের সঙ্গে তাৎক্ষণিক গণমাধ্যমগত যোগাযোগের উপায় আর বিদেশি কোনো সাহায্য বা হস্তক্ষেপের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যর্থ হয়, প্রধানত. জনগণের হস্তক্ষেপে।
১৯৭৫-এর ৩ থেকে ৭ নভেম্বর, এই কদিনও বাংলাদেশের কোনো সরকার না থাকায় সাধারণ জনগণের সচেতন প্রতিরোধের মুখে বিদেশি দখলের সম্ভাবনা ও প্রতিহত হয়। ফলে প্রায় এক সপ্তাহ কোনোরূপ আনুষ্ঠানিক পার্থিব প্রতিরক্ষা ছাড়াই অলৌকিকভাবেই বাংলাদেশ যেন ছিল সম্পূর্ণই, আক্ষরিক অর্থেই ‘আল্লাহর হাওলা’! একমাত্র তারই হেফাজতে ।
সেনাবাহিনীতে অরাজকতা
আতিয়ার রহমান (আতিক) ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহপাঠী । মুক্তিযুদ্ধের পর দৈনিক গণকণ্ঠের সঙ্গে যুক্ত হলে সে সাংবাদিকতার জগতের সতীর্থও হয়Ñআমি সেকালে দেশের প্রায় সব পত্রপত্রিকায় দেদার লিখতাম। সেই সুবাদে যে কেউই যেকোনো পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হলেই সাধারণত সতীর্থ বা বন্ধুমহলের হয়ে যেত বা যেতেন। আতিকের সঙ্গে সেভাবেই কথাবার্তা হতো । ৬ তারিখ রাতে অথবা ৭ তারিখ সকালে আতিক জানাল, হাজার হাজার গ্রামবাসী ঢাকা আসছে, বিদেশি বাহিনী বা তাদের তাঁবেদার কারো হাতে ঢাকা দখল হওয়ার সম্ভাবনা ঠেকাতে। আতিক মুক্তিযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত ‘জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল’ (ম)-এ যোগ দিয়েছিল।
দলটি আমার পছন্দ ছিল নাÑতাকে সন্দেহের চোখে দেখতাম। তাদের নামটাতে নাৎসিবাদী স্বৈরতন্ত্র আর ষড়যন্ত্রের ঘ্রাণ ছিল যেন, তাদের নামটি ছিল নাৎসি দলের নামের (National Socialist Party-এর আক্ষরিক অনুবাদ)। তাদের নেতৃত্বের সামনের চেহারায় অতি সম্মানিত, স্বাধীনচেতা দেশপ্রেমিক মেজর আব্দুল জলীল আর দৃশ্যমান তাত্ত্বিকনীতি রচয়িতা হিসেবে এমআইটির পিএইচডি অধ্যাপক আখলাকুর রহমান স্যার থাকলেও, পেছনে অন্তরালের মূল দার্শনিক ও তাত্ত্বিক, নীতিনির্ধারক ছিলেন ‘দাদা ভাই’ (সিরাজুল আলম খান)। সিরাজুল আলম খান সম্পর্কে তখন যা শুনেছিলাম, তা হলো তিনি ছিলেন জাতীয় স্বার্থবিরোধী বিদেশি শক্তির চর। বাহ্যত বাঙালি স্বার্থ তার অবদান সত্ত্বেও, তার রহস্যময় অবস্থান ও আচরণ, ওই রকম গুজবসহ মনে তার সম্পর্কে সন্দেহের উদ্রেক করত বৈকি! কিন্তু জাসদের সূত্রেই সম্ভবত আতিকের প্রাপ্ত গ্রামবাসী কর্তৃক ঢাকাবাসী জনগণ ও দেশপ্রেমিক সিপাহিসহ রাজধানী ঢাকা দখলের উদ্যোগের খবরকে তেমন বিদেশি স্বার্থে বা দেশে বিশৃঙ্খলা বিস্তারমূলক কিছু মনে হয়নি। হওয়ার কথাও ছিল নাÑখবরটাই তো ছিল, তারা সবাই আসছে বিদেশি দখলের সম্ভাবনা প্রতিহত করতে ।
খালেদ মোশাররফ নিহত
খালেদ মোশাররফ সম্পর্কে গুজব বা খবর সত্য মিথ্যা যাই হোক, জনসাধারণ তাকে বিদেশি স্বার্থের পক্ষের বলে মনে করছিল বলে মনে হয়।
একপর্যায়ে তিনি নাকি আগরতলার দিকে পালিয়ে যেতে উদ্যত হলে একজন সৈন্য উল্টোদিক থেকে এসে তার জিপে ধাক্কা দিলে তা থেমে যায়, আর তখনই নাকি তাকে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি নাকি ঘটে আমার বাসারই অতি নিকট, মানিক মিঞা অ্যাভিনিউয়ে, লালমাটিয়ার অদূরে। সাধারণ লোকজন গিয়ে নাকি তার জীবিত বা মৃতদেহকে লাথি ইত্যাদি মেরে এমনই বিকৃত করে ফেলে যে, তার মাথা নাকি ছিঁড়ে দলিত-মথিত হয়ে যায়। আমি দেখিনি, তবে সে সময় জনমুখে এমনটিই শুনেছিলাম। হয়তো কিছুটা অতিরঞ্জিত ।
কিন্তু সে সময় জনমনে বিদেশি দখলের সম্ভাবনা যে প্রচণ্ড জনরোষ তৈরি হয়েছিল, এমন সব কথা তারই বহিঃপ্রকাশ ছিল ।
জাতীয় চরিত্রে নিষ্ঠুরতা
কীসের এবং কীজন্য সে বহিঃপ্রকাশ, তা বোধগম্য হলেও, তার নৃশংসতা ছিল অমানবিক । এমন নৃশংসতার প্রকাশ হয়েছিল মাত্র বছর তিন সাড়ে তিন পূর্বে, মুক্তিযুদ্ধের পরপর দেশের এক প্রান্তে প্রচুর লোকের ভিড়ের সম্মুখে অনেকটা উপভোগ্য দর্শনীয়ের মতোই শত্রুপক্ষের সমর্থক বা সহায়ক বলে প্রচার হয়ে পড়া একজন জ্যান্ত মানুষের চামড়া খুলে ফেলার সংবাদ ও যতদূর মনে পড়ে, প্রকাশিত চিত্রে। এমন নিষ্ঠুরতার মন-মানসিকতা নানা নিপীড়ন আর ঐতিহাসিক ঘটনার ভেতর দিয়ে এসে জাতীয় চরিত্রে সন্নিবেশিত যদি হয়েও এবং আসলেই হয়ে থাকলে, তা দূরীকরণ অতীব প্রয়োজন, সমাজ-শিক্ষামূলক সাংস্কৃতিক প্রচেষ্টায়।
জিয়ার অরাজকতা নিয়ন্ত্রণ, ৭ নভেম্বর
৭ নভেম্বর তেজকুনীপাড়ায়, হলিক্রস কলেজের গলি হয়ে আজীজ স্যারের বাসায় যাই দেশের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে । হয়তো তখনই পূর্বে বর্ণিত খালেদ মোশাররফের ছবি ও তার তাৎপর্যের কথা হয়। সেখান থেকে বেরিয়ে, সম্ভবত বেলা ১১টার দিকে বা আরো পরে ফার্মগেটের মোড়ে, যেখানে এখন হলিক্রস কলেজের নিকটতর ওভারব্রিজ হয়েছে, সেখানে দেখি এমন সব দৃশ্য, যাতে দেশে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ আর বিশৃঙ্খলার লক্ষণ দেখতে পাই।
মোড়ে বহু লোক ছিল। সবাই যেন ছুটোছুটি করছিল। একটি সামরিক ট্রাক ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল, সেনা ছাউনির তরফ থেকে গ্রিন রোডের শুরুর দিকে। খামারবাড়ির একটু পরে এলে দেখলাম ট্রাকটিতে দাঁড়িয়ে নাতিদীর্ঘ শরীর জিয়াউর রহমান, হাতে একটি ‘হ্যান্ড মাইক’ বা ওরকম কিছু ধরে, তাতে বলছেন, ‘আমি জিয়া বলছি, আপনারা যার যার ব্যারাকে ফিরে যান’ বা ওই মর্মে কিছু। পরে শুনলাম, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অংশ বা পদক্ষেপ হিসেবে জাসদেরই প্রযুক্ত ধারণায় সাধারণ সৈন্যরা সব সামরিক কর্মকর্তাকে মেরে ফেলতে শুরু করেছিল। ‘সিপাহি জনতা ভাই ভাই, সিপাহির ওপরে কেউ নাই’ বা ওই মর্মে কিছু বলে স্লোগান দিচ্ছিল । শ্রেণিহীন সেনাবাহিনী সৃষ্টির অংশ হিসেবে নাকি জাসদ সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈন্যদের ভেতর এই ধারণা চালু করেছিল।
সব অফিসার মেরে ফেলাটা মনে হলো সেনাবাহিনীকে মেধা ও অভিজ্ঞতাশূন্য করে ফেলে দেশের প্রতিরক্ষা ধ্বংসের পথ, তা পরিকল্পিতভাবে সে উদ্দেশ্যেই হোক বা বেখেয়ালে ঘটনা চক্রে, অন্য কোনো সদুদ্দেশ্যেই হোক। তখন আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নাতকোত্তরের শেষদিকে, যুদ্ধকৌশল বিদ্যা (Strategic Studies’) এ বিশেষজ্ঞায়ন (Specialisation) করছি। তখুন বুঝতে পারি দেশের সেনাবাহিনীর এমনটি হওয়া কতটা ভয়ংকর। এমন অবস্থায় দেখলাম, জিয়াউর রহমানের ওই হাতে ‘হ্যান্ড-মাইক’ নিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে সৈন্যদের যার যার ব্যারাকে ফিরে যেতে বললে, সৈন্যরা সব রাস্তা থেকে সরে যাচ্ছিলÑসৈন্যদের ভেতর তার জনপ্রিয়তা দেখা যাচ্ছিল আর তাতে তার সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরে যেত বলায় কাজও হচ্ছিল। সৈন্যদের ভেতর জনপ্রিয় সমরনায়কের নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণই যেন ছিল এখানে ।
বিদেশি সৈন্যের অনুপ্রবেশ?
ওই ফার্মগেট মোড়ে জিয়ার অগ্রসরমাণ ট্রাক আসতে থাকলে সৈন্য বা সাধারণ জনগণ যারাই ছিল, এদিক-ওদিক ছুটে সরে যাচ্ছিল । এই ছোটাছুটির ভেতরই লোকজন একজন সৈন্যকে ধরে ফেলে সে বিদেশি সৈন্য বলে চেঁচাতে শুরু করে। সৈন্যটির রঙ ছিল খুবই কালো, বাংলাদেশের লোক সাধারণত শ্যামল বর্ণই হয়ে থাকে, যাকে একটু গাঢ় হলে, ‘কালো’-ও বলে। তার সামরিক পোশাক ছিল সেকালে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর খাকি পোশাকের পরিবর্তে প্রতিবেশী মিত্রদেশের সেনাবাহিনীর পোশাকের মতো জলপাই রঙের। সে সময় বাংলাদেশে দেশের সেনাবাহিনীর পাশাপাশি বিশেষায়িত রক্ষীবাহিনী দাঁড় করানো হয়েছিলÑতার সদস্যরা প্রায় সবসময়ই খুব কালো হতো আর তার পোশাক তৈরি করা হয়েছিল প্রতিবেশী দেশের সেনাবাহিনীর মতো জলপাই রঙের, সে দেশ থেকেই তৈরি করিয়ে আনা হয়েছিল ।
আমি ভাবি, লোকে যে সৈন্যটিকে ধরেছে, সে সম্ভবত রক্ষীবাহিনীর সদস্য হবে। কিন্তু লোকে বলছিলÑসে মাদ্রাজ রেজিমেন্টের সৈন্য হবে, কেন না সে বাংলা বলতে পারছিল না আর ওমন কালো চামড়ার সৈন্য মাদ্রাজ রেজিমেন্টের হয়, আর জলপাই রঙের পোশাক ওই দেশেরই সেনাবাহিনীর হয়। কী যে সত্য ছিল, কী ভুল জানি না, সৈন্যটির পরে কী হয়, তাও জানি না। আমি তো স্রেফ পথচারী ছিলাম, কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে ছিলামÑতাতে যা দেখি, শুনিÑতা অসম্পূর্ণই ছিল, তার অর্থটাও পুরোপুরি বুঝিনি।
তবে রক্ষীবাহিনীর অসাধারণ পর্যায়ে সবারইÑএকমাত্র তার একসময়ের প্রধান, খুবই শ্বেতকায় ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামান ছাড়াÑগাত্রবর্ণ কালো হওয়া, তাদের পোশাক যানবাহন সবই প্রতিবেশী মিত্রদেশ থেকে আনা ও তাদের মতো হওয়া এবং দেশে তাদের ভূমিকা নিয়ে এক ধরনের প্রশ্ন থেকে যায় । বছর দু-এক পর আমি নিজে উচ্চশিক্ষায় অস্ট্রেলিয়া গেলে আর ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামান সেখানকার সিডনিতে কন্সাল জেনারেল হয়ে এলে তাকে ‘দুলা ভাই’ ডাকতাম বলে হাসিঠাট্টার সুযোগ ছিলÑসেই সুবাদে তাকে জিজ্ঞাসাই করে বসি রক্ষীবাহিনীর গাত্রবর্ণ নিয়ে । বলি, ‘আপনি নিজে এত ফরসা, কিন্তু আপনার রক্ষীবাহিনীতে সব বেছে বেছে কাল নিলেন!’ উনি কোনো উত্তর দিতেন নাÑশুধু হাসতেন ।
সে সময় অনেকেই বলাবলি করত, রক্ষীবাহিনীতে সৈন্য হিসেবে সব কৃষ্ণবর্ণ ভর্তি করা হতো, তাদের পোশাক আর যানবাহনও করা হতো প্রতিবেশী মিত্রদেশের মতো সেখান থেকে বানিয়ে আনা হতো, দেশে কোনো একসময় দেশীয় রক্ষীবাহিনীর মতো দেখতে মিত্রদেশের বাহিনীর মাদ্রাজ রেজিমেন্টের মতো সৈন্যদের অলক্ষ্যে এনে ঢোকার রাস্তা করে রাখার জন্য । এসব হয়তো গুজবই ছিল, কিন্তু জনমনোভাবের অন্তত কিয়দংশের প্রকাশ ।
ছোট দেশ, বড় জাতি
জিয়াউর রহমানকে নাকি বন্দি অবস্থা থেকে ছাড়িয়ে এনেছিল সাধারণ সৈন্যরা । এভাবে বিমুক্ত হয়ে ৭ নভেম্বর তিনি সেনাপ্রধান হিসেবে পুনর্বহাল হয়ে দেশ ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেন । একইভাবে সাধারণ সৈন্যরাই ৩ নভেম্বরের আগের রাষ্ট্রপতি মোশতাককেও ছাড়িয়ে এনে, তখন শুনেছিলাম শরীরের ‘হাড়গোড় ভাঙা অবস্থা’ স্ট্রেচারে করে রেডিও বাংলাদেশে বা সে রকম কোনো জায়গায় নিয়ে আসে। তখন তিনি একটি সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। আসলেই তার হাড়গোড় ভেঙেছিলÑনা তাকে মারপিট করা হয়েছিল, তা বোঝাতেই লোকে অতিরঞ্জনে তা বলছিলÑজানি না।
সেই সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় একসময় তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশ ছোট হতে পারে, কিন্তু আমরা জাতি বড়’ বা ওই মর্মেই কিছু। সেই তরুণ বয়সে, দেশপ্রেম ও জাতি হিসেবে গর্বে আপ্লুত হৃদয়ে সেদিন ওই কথা কয়টি দাগ কেটে থেকে যায়, যদিও ওই বক্তৃতার আর তেমন কিছুই মনে থাকেনি। অমন কথাটি মনে দাগ কাটে, তখন সারা জাতির ভেতর যে জাতীয় চেতনা জেগেছিল তখনকার ঘটনাগুলোর কারণে। কথাটি কে বললেন তার কোনো বিবেচনা ছাড়াই মানুষের মনে দাগ কাটে।
৩ নভেম্বর-পূর্ববর্তী সেই রাষ্ট্রপতি নাকি ৭ নভেম্বরে আর রাষ্ট্রপতি হিসেবে পুনর্বহাল হতে রাজি হননি। হয়তো তাকে যেমন মারপিট করা হয়, তাতেই এমন সিদ্ধান্ত অথবা অন্য কোনো বিবেচনা ছিল।
প্রধান বিচারপতি সায়েমই এখনো রাষ্ট্রপতি থেকে যান। আর জিয়াউর রহমানসহ তিন সেনাপ্রধানের সরকারের আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব দেন । কার্যকর নেতৃত্ব যদিও থাকে জিয়াউর রহমানের।
এভাবে ৩ থেকে ৭ নভেম্বরের সরকারহীনতার নৈরাজ্য থেকে মুক্ত হয়ে জাতি আবার তার পায়ে দাঁড়িয়ে অগ্রযাত্রায় অগ্রসর থাকার সুযোগ পায় । কিন্তু এই কটা দিনে জাতি হারায় খালেদ মোশাররফের মতো একজন মেধাবী সমরনায়ক আর জেলহত্যায় নিহত চার নেতার মতো অভিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতা । এসবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনাপরম্পরায় জাতি কর্নেল তাহেরের মতো আরেকজন মেধাবী সমরনায়ককেও হারায়Ñবেশ কিছু তরুণ অফিসারও। সিপাহি জনতার জাতীয় সংহতিতে বৈপ্লবিক প্রতিরোধে জাতি রক্ষা পাওয়ার মহান আনন্দের সঙ্গে মিশ্রিত সেই ক্ষয়ের শোকের বেদনা ।
লেখক: ঢাকা ও যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রফেসর