হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় ন্যায্যতার প্রশ্ন

ড. মোহাম্মদ আবদুর রব

ড. মোহাম্মদ আবদুর রব

বাংলাদেশের জন্ম নদীকেন্দ্রিক ভূগোলের ভেতর। এদেশের ভূরাজনীতিতে নদী কেবল প্রকৃতির অনুষঙ্গ নয়, এটি সভ্যতা-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, কৃষি, পরিবেশ ও জাতীয় নিরাপত্তারও অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম নদীগুলোর উজানে অবস্থানরত ভারত দীর্ঘদিন ধরে একতরফা পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিম্ন অববাহিকার দেশ বাংলাদেশকে এক জটিল জলরাজনীতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ‘হাইড্রো পলিটিক্স’ আজ কেবল পানি বণ্টনের প্রশ্ন নয়; এটি আঞ্চলিক বা আঞ্চলিক ক্ষমতা, কূটনৈতিক ভারসাম্য এবং অস্তিত্বের লড়াইয়ের প্রশ্নে রূপ নিয়েছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদী রয়েছে। কিন্তু এই বিশাল নদীনির্ভর সম্পর্ক সহযোগিতার চেয়ে দ্বন্দ্ব ও অবিশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উজানের রাষ্ট্র হিসেবে ভারত দীর্ঘদিন ধরে পানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একধরনের কৌশলগত সুবিধা ভোগ করছে, আর ভাটির দেশ বাংলাদেশ ক্রমাগত পানি সংকট, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে। বিশেষত ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর পদ্মার পানিপ্রবাহে যে পরিবর্তন এসেছে, তা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, নৌপথ, মৎস্যসম্পদ এবং পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ১৯৭৫ সালে গঙ্গার পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে ভারতের নির্মিত এই বাঁধ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি সংকট সৃষ্টি করে। শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নৌপরিবহন ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। খুলনা ও সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়ে যায়, যা মানুষের জীবনযাত্রা ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই বাঁধের কারণে দেশের দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলের আরো চার কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি চুক্তি একটি কূটনৈতিক অগ্রগতি ছিল, বাস্তবে বাংলাদেশ ন্যায্য হিস্যা কখনো পায়নি।

বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের এত আলোচনা সত্ত্বেও পানি ইস্যুতে ন্যায়সংগত সমাধান আসেনি। মুখে যতই বন্ধুত্বের কথা বলুক, বাস্তবতা হলো উজানের দেশ ভারত তার আঞ্চলিক কৌশলগত নিরাপত্তা ও নিজস্ব উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, যেখানে ভাটির দেশ বাংলাদেশের অধিকার ও উদ্বেগ ভারতের কাছে সব সময় গৌণ থেকে যায়। আন্তর্জাতিক নদী আইনের অন্যতম নীতি হলো অভিন্ন নদীর পানি ন্যায্য ও যৌক্তিকভাবে ব্যবহার করা। কিন্তু বাস্তবে দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য এতটাই অসম যে ছোট রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে নিজেদের অধিকার আদায় কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পানি বণ্টন ইস্যুতেও এর প্রতিফলন ঘটে। বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃসীমান্ত নদীর পানিবণ্টনে ভারত আন্তর্জাতিক ন্যায্যতার নীতির তোয়াক্কা করে না। আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী, কোনো উজান রাষ্ট্র এমনভাবে পানি ব্যবহার করতে পারে না, যাতে ভাটির দেশের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ভারত আন্তর্জাতিক নীতির অনুসরণ না করে প্রায়ই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রয়োজন ও আঞ্চলিক কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। তিস্তা চুক্তি তার বড় উদাহরণ। তিস্তা নদী ইস্যু আরো স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয়, দক্ষিণ এশিয়ায় পানি কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি রাজনৈতিক ক্ষমতারও প্রতীক। প্রায় দেড় দশক ধরে আলোচনার পরও তিস্তা চুক্তি ঝুলিয়ে রেখেছে ভারত পশ্চিমবঙ্গের আঞ্চলিক রাজনীতির দোহাই দিয়ে। একটি ফেডারেল কাঠামোর অজুহাতে নয়াদিল্লি কার্যকর সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে বাংলাদেশকে প্রতি শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র সংকট মোকাবিলা করতে হয়। অথচ উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের কৃষি ও জীবনযাত্রা তিস্তার পানির ওপর নির্ভরশীল।

ফারাক্কা বাঁধ চালু হওয়ার দু’দশকেরও বেশি সময় পর ১৯৯৬ সালে ভারত ও বাংলাদেশ ৩০ বছর মেয়াদি ওই চুক্তি সম্পাদন করে। গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরেই শেষ হচ্ছে। গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ নবায়ন করা হবে, নাকি দুই দেশের মধ্যে নতুন করে চুক্তি হবে, তা নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা না এলেও দুই দেশের কারিগরি দল এ বিষয়ে প্রাথমিক প্রস্তুতির কাজ শুরু করেছে। আর এই প্রস্তুতির মধ্যেই অনানুষ্ঠানিকভাবে ভারতের দিক থেকে নতুন চুক্তির ক্ষেত্রে নতুন ফর্মুলার কথা বলা হচ্ছে, যেটিকে বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা ‘অযৌক্তিক’ বলে মনে করছেন। ভারতের দিক থেকে নতুন করে যেসব বক্তব্য আসছে, তাতে চুক্তি নবায়নের বিষয়টি সংকটের মুখে পড়তে পারে। পানি বণ্টন চুক্তিতে রয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারত কী পরিমাণ পানি পাবে, সেটা নির্ভর করবে উজানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, পানির প্রবাহ ও গতিবেগের ওপর। এখন গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে আসার প্রেক্ষাপটে কয়েক বছর ধরেই চুক্তির নবায়ন কিংবা নতুন চুক্তির ক্ষেত্রে নতুন প্রস্তাবের বিষয়টি আলোচনায় আসছে। চুক্তির নবায়ন ইস্যুতে ভেতরে ভেতরে যে প্রাথমিক প্রস্তুতি চলছে, তাতে ভারত চাইছে ফারাক্কা পয়েন্টে পানি প্রবাহের ভিত্তিতে চুক্তির ফ্রেমওয়ার্ক দাঁড় করাতে।

অন্যদিকে ফারাক্কা পয়েন্টে পানির গড় প্রবাহ কম থাকায় বাংলাদেশকে পুরো নদীর পানি প্রবাহকে বিবেচনায় নিয়ে পানি ভাগাভাগি করার শর্তে জোর দিতে হবে। কারণ উজান থেকে ভারত একতরফা পানি প্রত্যাহার করার কারণে ফারাক্কা ব্যারাজ-সংলগ্ন অঞ্চলে পানির প্রবাহ অনেক কম থাকে। এছাড়া দুই দেশ যেহেতু আগেই সম্মত হয়েছিল গঙ্গার পানি নদীর পরিমাণভিত্তিক ভাগ হবে, তাই বাংলাদেশকে এই পয়েন্টে শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে হবে। নতুন চুক্তিতে পলির গুরুত্ব অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, কেননা পলি বদ্বীপের টিকে থাকা নিশ্চিত করবে। তাই নতুন চুক্তিতে পানির পাশাপাশি পলির বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, ভারতের বাঁধগুলোতে বাইপাস ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং নির্ধারিত সীমার বেশি পলি আটকে গেলে জরিমানাসহ পর্যবেক্ষণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ১৮ কোটি মানুষের বদ্বীপ রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের টিকে থাকা নির্ভর করছে পলির ওপর, যে পলি ভূমিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপরে ধরে রাখে।

অপরদিকে ফারাক্কা ব্যারাজের নেতিবাচক প্রভাব থেকে বাংলাদেশকে বাঁচাতে প্রথম পর্যায়ে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ব্যবস্থায় স্বাদু পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা। এর ফলে পদ্মায় শুষ্ক মৌসুমের পানি ধরে রাখা যাবে এবং তা দক্ষিণ-পশ্চিমে নদ-নদীতে প্রবাহিত করা যাবে। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে এবং সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য হুমকিস্বরূপ লবণাক্ততা কমবে। প্রাণ ফিরে পাবে মৃতপ্রায় বিশেষত গড়াই, মধুমতী, বড়াল ও ইছামতীর মতো নদীগুলো। একই সঙ্গে কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশে আসবে ইতিবাচক পরিবর্তন। তবে এর কিছু নেতিবাচক প্রভাবও সৃষ্টি হতে পারে, যেমন ব্যারাজের উজানে নদীতে পলিপতনের ফলে তলদেশ ভরাট হয়ে যেতে পারে এবং ব্যারাজের প্রস্তাবিত স্থান পাংশা থেকে রাজশাহী পর্যন্ত প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার নদীর দুই তীরে বন্যা এবং পাড়ভাঙন বৃদ্ধি পেতে পারে। এছাড়া প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে এই নদীর পানি দক্ষিণ-পশ্চিমে অপসারিত হলে দেশের মধ্যাঞ্চল এবং মেঘনা মোহনার জন্য পানি হ্রাস পাবে। এর ফলে আড়িয়াল খাঁসহ অন্যান্য নদীর প্রবাহ কমে যাবে এবং মেঘনা মোহনা দিয়ে লবণাক্ততা দেশের আরো ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। এসব নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর পরিকল্পনা আগে থেকেই নিতে হবে, যাতে করে পরিবেশ, জনজীবন নিরাপদ থাকে এবং ব্যারাজের মাধ্যমে উপকৃত হতে পারে। দেশের ভেতরেও বাংলাদেশকে পলির কার্যকর ব্যবস্থাপনা করতে হবে—নদী খনন, শাখা নদী পুনরুদ্ধার এবং নিয়ন্ত্রিত প্লাবনের মাধ্যমে ভূমি গঠনের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। যে সমস্যার সমাধান চুক্তির মাধ্যমে হওয়ার কথা ছিল, তা মোকাবিলায় ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকার অবকাঠামো নির্মাণ কূটনৈতিক ব্যর্থতারই প্রমাণ। তারপরও পদ্মা ব্যারাজ প্রমাণ করে, টিকে থাকার প্রয়োজন দেখা দিলে বাংলাদেশ বৃহৎ অবকাঠামো বাস্তবায়নের সক্ষমতা রাখে। এখন প্রশ্ন হলো, এই কাঠামো কি এমন সমাধান নিশ্চিত করবে, যা বদ্বীপের বাস্তবতাকে—অর্থাৎ পানি ও পলি উভয়কে—একসঙ্গে বিবেচনায় নেয়? নাকি এক সংকট সমাধান করতে গিয়ে আরেক সংকটকে ত্বরান্বিত করবে? নির্মাণকাজ শুরু হয়ে গেলে সময়ের সুযোগ দ্রুত সংকুচিত হবে।

ভারত ২০০৩ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে বরাক নদীর ওপর বিতর্কিত টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ শুরু করে, যা মণিপুরের চুরাচাঁদপুর জেলার টিপাইমুখ উপবিভাগে বরাক ও তুইভাই নদীর মিলনস্থলের কাছে অবস্থিত। ১৯৯৯ সালে ভারত সরকার প্রকল্পটি অনুমোদন করে। বরাক ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃসীমান্ত নদী। বাংলাদেশে প্রবেশের পর নদীটি সুরমা ও কুশিয়ারা নদীতে বিভক্ত হয়, যা পরে মেঘনা নদীতে মিলিত হয়ে গঙ্গা বদ্বীপের অংশে প্রবেশ করে। এই নদী ব্যবস্থা বাংলাদেশের বিশাল হাওরাঞ্চলকে টিকিয়ে রাখে, বিশেষ করে সিলেট বিভাগের হাওরগুলোয় মৌসুমি বন্যা, মৎস্যসম্পদ ও ধানচাষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের আশঙ্কা নদীর প্রবাহব্যবস্থায় পরিবর্তন এলে হাওরাঞ্চলের বন্যার সময় ও পরিমাণ প্রভাবিত হতে পারে। শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে গেলে সেচ ও মাছের প্রজনন ব্যাহত হতে পারে। আবার শীতকালে অতিরিক্ত পানি আটকে রাখলে হাওরাঞ্চলে চাষাবাদের সময় কমে যেতে পারে। প্রায় ৬০ হাজার মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওরকে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। টিপাইমুখ প্রকল্পটি ভারত-বাংলাদেশ পানি কূটনীতির একটি বিতর্কিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। বাঁধ পরিচালনার অনিশ্চয়তা এবং আন্তঃসীমান্ত পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে উদ্বেগ রয়ে গেছে। এ ছাড়া বাঁধস্থলটি ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত, যা বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে জলাধারের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটলে তা ভারত ও বাংলাদেশের ঘনবসতিপূর্ণ ভাটির অঞ্চলের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই বিশাল বাঁধ নির্মাণ এবং বরাক নদীর পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা ও কুশিয়ারা নদী ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব ফেলবে, যা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের পরিবেশ, প্রতিবেশ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ ও সামগ্রিক আর্থসামাজিক ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করবে।

ভারতের ভেতরেও স্থানীয় বিরোধিতা প্রবল ছিল। বিশেষ করে হমার স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন এবং মণিপুর ও মিজোরামের বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন অভিযোগ করে, বাঁধ নির্মাণ আদিবাসী জনগণের অধিকার লঙ্ঘন করবে এবং জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোকে হুমকির মুখে ফেলবে। টিপাইমুখ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটির সম্ভাব্য পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কায় দেশ-বিদেশে ব্যাপক প্রতিবাদ ও সমালোচনার মুখে নির্মাণকাজ স্থগিত করা হয়। ভারত সরকার দাবি করে আসছে, এই বাঁধের মূল উদ্দেশ্য বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন; নদীর পানি সেচের জন্য সরিয়ে নেওয়া নয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ উত্থাপিত সব উদ্বেগ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে বলেও ভারত আশ্বাস দিয়েছে। ভারতের আশ্বাসে নির্ভরশীল না হয়ে বাংলাদেশকে এর প্রভাব পর্যালোচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ভবিষ্যতে প্রকল্পটির অগ্রগতি অনেকাংশে নির্ভর করবে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের অধীনে উভয় দেশের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি কাঠামো গড়ে ওঠার ওপর এবং কঠোর পরিবেশগত সুরক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের ওপর।

ফেনী নদীর উৎপত্তি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে হলেও এই নদীর ওপর একক আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে ভারত। গত প্রায় এক যুগ ধরে ৩৭টি স্থানে পাম্প বসিয়ে ফেনী নদী থেকে অবিরাম পানি তুলে নিচ্ছে ভারত। শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় ভারত ফেনী নদী থেকে আরো ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করতে পারবে। পক্ষান্তরে, নিজ দেশের নদীর পানি ব্যবহার করতে গেলে বাংলাদেশের কৃষকদের অস্ত্র উঁচিয়ে হুমকি দিচ্ছে বিএসএফ। ভারতের একতরফা উত্তোলনে পানি শুকিয়ে অসংখ্য চর জেগে উঠেছে ফেনী নদীতে। যেদিকে চোখ যায় শুধুই বালুচর; বলতে গেলে খরস্রোতা ফেনী নদী এখন মৃতপ্রায়। এ অবস্থায় ভারতে ইনটেক ওয়েল প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ মুহুরি সেচ প্রকল্প হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আর এ সমঝোতা স্মারকের প্রতিবাদ করায় বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ ছাত্রলীগের একদল সন্ত্রাসীর নির্মম নির্যাতনে নিহত হন। যে ফেনী নদীর বুক চিরে একসময় বড় বড় নৌকা চলত, সে নদীতে এখন গোসল করারও পানি নেই। পানির অভাবে নাব্যতা হারিয়ে এককালের স্রোতস্বিনী ফেনী নদী রূপ নিয়েছে বালুচরে। বাংলাদেশকে অবিলম্বে বিগত আমলের সমঝোতা স্মারকটি পুনর্বিবেচনা করে দেশের স্বার্থে ভারতের সঙ্গে ফেনী নদীর পানিপ্রবাহ ঠিক রাখতে চুক্তি করতে হবে।

বর্তমান বিশ্বে পানি আগামী দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক সম্পদে পরিণত হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় এই বাস্তবতা আরো তীব্র। ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেও নদী কেবল পরিবেশগত ইস্যু নয়, এটি কৌশলগত ক্ষমতার প্রশ্ন। বাংলাদেশ যদি সময়মতো কার্যকর পানি কূটনীতি গড়ে তুলতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ এবং অর্থনীতি আরো বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে। ভারতের সঙ্গে নদীর পানির হিস্যা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বরাবরই সমঝোতা ও কূটনৈতিক সংলাপের পথ অনুসরণ করেছে। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, সীমান্ত, বাণিজ্য কিংবা নিরাপত্তা সহযোগিতায় বাংলাদেশ ছাড় দিলেও পানি ইস্যুতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি খুবই সীমিত। কেবল নমনীয়তা দেখিয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা সম্ভব নয়। বাস্তবতা হলো, জলরাজনীতিতে কূটনৈতিক সৌজন্যের পাশাপাশি প্রয়োজন কৌশলগত দৃঢ়তা। বাংলাদেশের উচিত আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোয় বিষয়টি আরো জোরালোভাবে উত্থাপন করা এবং আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক নীতিমালার পক্ষে বৈশ্বিক সমর্থন গড়ে তোলা।

বাংলাদেশসহ গোটা অঞ্চলের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, পানি এখন ভবিষ্যৎ কৌশলগত স্বার্থ ও নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদীর প্রবাহ, বর্ষা ও খরার ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। হিমালয়ের হিমবাহের দ্রুত গলন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং নদীর পানি ধরে রাখা বা প্রবাহ পরিবর্তনে অতিরিক্ত বাঁধ নির্মাণ ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়াকে এক ভয়াবহ পানি সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় পারস্পরিক সহযোগিতার বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় রয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশের পানি কূটনীতিকে পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, নদী গবেষণা, তথ্য সংগ্রহ ও পানি ব্যবস্থাপনায় নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, জাতিসংঘ, সার্ক এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ফোরামে বৈজ্ঞানিক তথ্য ও মানবিক প্রভাব তুলে ধরে আন্তর্জাতিক জনমত তৈরি করতে হবে। কেবল ভারতের সমালোচনা করলেই হবে না; নদী দখল, দূষণ এবং অব্যবস্থাপনার মতো অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোও সমাধান করতে হবে। কারণ, দুর্বল অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিক আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থানকে দুর্বল করে।

বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আন্তঃসীমান্ত নদীর ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা আজ সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রকৃত পরীক্ষার জায়গা হলো আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা। কারণ বন্ধুত্বের প্রকৃত মূল্য বোঝা যায় তখনই, যখন শক্তিশালী পক্ষ দুর্বল পক্ষের ন্যায্য অধিকারকে সম্মান করে। পানি কোনো একক অবস্থানের সম্পত্তি নয়; এটি যৌথ প্রাকৃতিক উত্তরাধিকার। সেই বাস্তবতা যতদিন পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার জলরাজনীতিতে প্রতিফলিত না হবে, ততদিন অভিন্ন নদীগুলো সহযোগিতার সেতু না হয়ে বিরোধের উৎস হিসেবেই থেকে যাবে।

লেখক : এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ অ্যান্ড থটস (কাস্ট)

নিঃসঙ্গ ইসরাইল

শহীদ জিয়ার আদর্শ : ইসলামি দৃষ্টিকোণ

হাসিনাকে নিয়ে দিল্লির পুতুলখেলা

শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় অমর জিয়া

জিয়াউর রহমানকে যে কারণে দক্ষিণ এশিয়া মনে রাখে

লে. কর্নেল (অব.) হামিদের স্মৃতিচারণে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান

সংবাদমাধ্যমকে সুশাসনের সহায়ক শক্তি মানতেন শহীদ জিয়া

শহীদ জিয়াউর রহমান ও সার্বভৌমত্বের আদর্শ

শহীদ জিয়ার আদর্শ: ইসলামী দৃষ্টিকোণ

জিয়াউর রহমান: সৈনিক থেকে রাষ্ট্রনায়ক