হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

মুছে ফেলা হচ্ছে মুসলিম ভারতের সব চিহ্ন

ফিরদৌস সৈয়দ

ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপি ও উগ্র হিন্দুত্ববাদী অন্য সংগঠনগুলো, বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) চলমান ইসলাম ও মুসলিমবিদ্বেষী তৎপরতা দেশটিতে মুসলমানদের হাজার বছরের অস্তিত্বকে বিলুপ্ত করে দেওয়ার প্রক্রিয়া জোরালো করে তুলেছে। ‘মুসলিম’ হলো একটি জনতাত্ত্বিক অস্তিত্ব আর ‘মুসলিমত্ব’ হলো একটি সভ্যতার উপস্থিতি। প্রথমটি এমন মানুষের বোঝায়, যারা একটি নির্দিষ্ট ধর্মবিশ্বাস লালন করেন আর দ্বিতীয়টি তাদের ইতিহাস, স্মৃতি, ভাষা, সাহিত্য, কবিতা, সংগীত, শিল্পকলা, স্থাপত্য, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, অভিব্যক্তি, রীতিনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে, যার মধ্য দিয়ে হাজার বছরের মুসলিম অস্তিত্ব ভারতের বিনির্মাণ প্রক্রিয়ায় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

মুসলিম ও মুসলিমত্বের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টির যে প্রকল্প আরএসএস হাতে নিয়েছে, তা এখন জোরালো হয়েছে। যদিও ভারতের ২০ কোটির বেশি মুসলমানকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা সম্ভব নয়। তবে তাদের রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাহীন, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অদৃশ্য এবং সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বহীন করে তোলা সম্ভব। এই প্রক্রিয়ায় মুসলমানরা ভারতে শুধু একটি জনতাত্ত্বিক উপস্থিতি হিসেবে টিকে থাকবে ঠিকই, কিন্তু দেশটির জাতীয় পরিচয়ের উপাদান হিসেবে ‘মুসলিমত্ব’ ক্রমেই ম্লান হয়ে যাবে।

আর এভাবেই ভারতে মুসলমানদের উচ্ছেদ না করেও একটি ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ অথবা ভারতের ‘হিন্দুকরণ’ করার লক্ষ্য অর্জন করা যেতে পারে। এতে দেশটিতে মুসলমানরা সংখ্যায় লাখ লাখ টিকে থেকেও ক্রমেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। এই প্রেক্ষাপটেই গত ২৯ আগস্ট নিউ ইয়র্কে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের মন্তব্যটি পর্যালোচনার দাবি রাখে। তিনি বলেছেন, ‘যদি কোনো হিন্দু মনে করেন, ভারতে কোনো মুসলিম থাকা উচিত নয়, তবে তিনি আর হিন্দু থাকবেন না।’ তিনি বলেন, একজন হিন্দুকে অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে, ‘সব পথই একই লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যায় এবং প্রতিটি মানুষেরই মর্যাদা রয়েছে।’

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, তার মানসিকতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু বাস্তবে তা নয়। তার আমেরিকায় দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার মিল নেই। বর্তমানে ভারতের মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশেরও বেশি মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও লোকসভার ৫৪৩ জন সদস্যের মধ্যে মাত্র ২৪ জনÑঅর্থাৎ ৪ দশমিক ৪ শতাংশ মুসলমান। কিন্তু এর মধ্যে ক্ষমতাসীন ‘ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েনসের (এনডিএ) কোনো সদস্য নেই। ২০২২ সাল থেকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় কোনো মুসলিম মন্ত্রী নেই। বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভায়ও মুসলিম সদস্যদের সংখ্যা ২০১৩ সালের ৩৩৯ জন থেকে কমে বর্তমানে ২৫৫ জনে নেমে এসেছে। বর্তমানে দেশটিতে রাষ্ট্রপতি বা উপরাষ্ট্রপতি পদে কোনো মুসলিম নেই। অথচ এসব পদে অতীতে পর্যায়ক্রমে মুসলমানরা দায়িত্ব পালন করেছেন।

মুসলমানদের বর্জন করার এই প্রক্রিয়াটি শুধু সামাজিক নয়, বরং অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও ঘটছে। ভারতে মুসলমানদের অবস্থা পর্যালোচনার জন্য ২০০৬ সালে গঠিত ঐতিহাসিক সাচার কমিটি দেখতে পায়, জনসংখ্যার ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক সেবায় মুসলমানদের অংশগ্রহণ ছিল মাত্র ৩ শতাংশ, পুলিশের জ্যেষ্ঠ পদগুলোয় ৪ এবং কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীতে ৩ দশমিক ২ শতাংশ। সেই কমিটির দুই দশক পর বর্তমানে মুসলমানদের প্রান্তিক অবস্থান আরো প্রকট হয়েছে। সুতরাং, মুসলমানরা ভারতে থাকতে পারবেÑমোহন ভাগবতের এই কথার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই।

আরএসএসের সাংগঠনিক শক্তির একটি বিশেষ দিক হলোÑতাদের কৌশলগত ধৈর্য। তারা দীর্ঘমেয়াদি বা দশকব্যাপী পরিকল্পনায় বিশ্বাসী। তারা সম্ভাব্য প্রতিরোধ ও সুযোগের কথা আগে থেকেই বিবেচনা করে এবং অনুকূল পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষায় থাকে। ভারতের মূলধারার বহুত্ববাদী ঐকমত্যের বাইরে অবস্থানকালে আরএসএসকে তিনবার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি প্রান্তিক অবস্থান থেকে ক্রমেই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর দিকে সরে এসেছে।

আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই কীভাবে একজাতীয়করণ বা সমজাতীয়করণের প্রক্রিয়া ঘটতে পারে, তার একটি বড় উদাহরণ হলো উর্দু ভাষার ভাগ্য। এই উপমহাদেশেই বিকশিত উর্দু ভাষা ভারতীয় কবিতা, সাহিত্য ও সংগীতের এক বিশাল ভান্ডারে পরিণত হয়েছিল। এমনকি ভারতে ঔপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের অন্যতম প্রধান স্লোগান ছিল ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’। অথচ দেশভাগের পর উর্দু ভাষা ক্রমেই মুসলমানদের এবং আরো ক্ষতিকরভাবে পাকিস্তানের পরিচয়ের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পড়ে।

ভারতের জনজীবন থেকে উর্দু ভাষার লিপি বা হরফ হারিয়ে গেলেও কবিতা, চলচ্চিত্র ও জনপ্রিয় সংগীতের জগতে এটি চমৎকারভাবে টিকে ছিল। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে দিল্লির ঐতিহাসিক জামা মসজিদ থেকে বেরিয়ে বল্লিমারানের (যেখানে মির্জা গালিব বাস করতেন) দিকে যাওয়ার পথে আমি লক্ষ করেছিলাম, সেখানে নামাজের সময়সূচিও উর্দু লিপির পরিবর্তে দেবনাগরী লিপিতে লেখা ছিল। গালিবের নিজের এলাকাতেই এমন এক প্রজন্মের উদ্ভব হচ্ছিল, যারা ক্রমেই অন্য একটি লিপির মাধ্যমেই তাকে পড়ার অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে উঠছিল।

আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে একবার বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিবের কাছে আমি উর্দু ভাষার ক্রমাবনতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম। তার ব্যাখ্যাটি ছিল সহজÑউর্দু ভাষার ওপর পাকিস্তান সৃষ্টির সহযোগী হওয়ার অভিযোগের বোঝা চেপেছিল। কোনো ভাষা যখন আর শিক্ষাগত বা অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা দিতে পারে না, তখন পরিবারগুলো শেষ পর্যন্ত তাদের সন্তানদের আর সেই ভাষা শেখায় না।

ভারতের মুসলিম অতীতের ক্ষেত্রেও অনেকটা একই ঘটনা ঘটছে। ভারতে প্রায় হাজার বছরের মুসলিম উপস্থিতি মুছে ফেলা সম্ভব নয়, তবে জাতীয় স্মৃতিতে এর স্থান সংকুচিত ও নতুনভাবে বিন্যস্ত করা যেতে পারে। স্কুলের পাঠ্যপুস্তক থেকে দিল্লি সালতানাত ও মোগল আমল-সংক্রান্ত বিষয়বস্তু বাদ দেওয়া বা কমিয়ে ফেলা হয়েছে, ক্রমেই এই ইতিহাসকে ভারতের জটিল ঐতিহাসিক বিবর্তনের অংশ হিসেবে না দেখে ‘আক্রমণকারী’ ও ‘বহিরাগত’-এর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তুলে ধরা হচ্ছে।

এখানে একটি স্পষ্ট স্ববিরোধিতা রয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী ভারতীয় বয়ানে ব্রিটিশ-পূর্ব ভারতকে ‘সোনার পাখি’ বা ঔপনিবেশিক শোষণের আগের বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে স্মরণ করা হয়। অথচ সেই প্রশংসিত সমৃদ্ধির বড় অংশটিই ছিল সালতানাত ও মোগল আমলের ভারতকেন্দ্রিক। ঔপনিবেশিকতা কী ধ্বংস করেছিল, তা বোঝাতে গিয়ে আপনি যেমন সেই অতীতের সম্পদের কথা উল্লেখ করবেন, তেমনি আবার সেই সম্পদ যে সভ্যতার অধীনে গড়ে উঠেছিল, তাকে ‘বহিরাগত হস্তক্ষেপ’ হিসেবে গণ্য করবেন, তা হতে পারে না।

ভারতীয় ইতিহাস থেকে মুসলিম শাসনকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললে ‘মুসলিম সত্তা’ আর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য হয় না, বরং তা ভারতের ওপর ঘটে যাওয়া একটি ‘ঘটনা’য় পর্যবসিত হয়। ইতিহাসকে মুছে ফেলার প্রয়োজন নেই, শুধু তার শ্রেণিবিন্যাস বদলে দিলেই চলে। অতীতকে যখন ‘বিদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তখন তার উত্তরসূরিরা নাগরিক হিসেবে টিকে থাকলেও তাদের উত্তরাধিকার বা ঐতিহ্যও জাতির কাছে ‘বিদেশি’ হয়ে পড়ে।

কিন্তু সমজাতীয়করণের প্রক্রিয়াটি যাদের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছিল, তা সাধারণত সেই সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। কারণ, গ্রহণযোগ্য পরিচয়ের গণ্ডি যখন সংকুচিত হয়ে আসে, তখন গ্রহণযোগ্য চিন্তাভাবনার গণ্ডিও সংকুচিত হতে শুরু করে।

আহমেদাবাদের সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজাইয়ের ‘আই অ্যাম মালালা’ এবং অ্যান ফ্রাঙ্কের ‘দ্য ডায়েরি অব অ্যা ইয়াং গার্ল’ পাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কারণে একটি স্কুল কর্তৃপক্ষ চাপের মুখে পড়েছিল। পরে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও নাগরিকরা যখন এই বইগুলো নিয়ে একটি গণপাঠের আয়োজন করলে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কর্মীরা তাদের বাধা দেন।

সমজাতীয়করণের এই ধারা এখন অন্তর্মুখী হয়ে পড়েছে এবং এর চূড়ান্ত শিকার হচ্ছে ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক বহুত্ববাদ। অসংখ্য দর্শন, বিশ্বাস ও ব্যাখ্যার সহাবস্থান এবং পারস্পরিক বিতর্কের মধ্য দিয়ে যে সভ্যতা তার স্বকীয়তা গড়ে তুলেছিল, তা এখন শুধু একটি নির্দিষ্ট ও নির্ধারিতÑঅর্থাৎ হিন্দুত্ববাদী ধারণার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। একমুখী অভিন্নতা শুধু সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অবস্থানকেই সংকুচিত করে না, শেষ পর্যন্ত তা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকেও বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিকভাবে নিঃস্ব করে তোলে। ভারতের ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটছে। আরএসএস ভারতের মুসলিম সংস্কৃতি, ইতিহাস ও রাজনৈতিক প্রভাবকে প্রান্তিক করে তোলার মাধ্যমে কার্যত দেশটির বহুত্ববাদকেও হুমকির মুখে ফেলছে।

ডেইলি সাবাহ অবলম্বনে মোতালেব জামালী

অর্থবছর বদলালেই কি সমস্যার সমাধান

বাঙালির অবিস্মরণীয় গৌরবময় অধ্যায়

এসআরবি কি বিলুপ্ত র‍্যাবের মতোই হবে

অনৈক্যের সুযোগ নিচ্ছে অগ্নিসন্ত্রাসীরা

তথ্যের অবাধ প্রবাহ নাকি বিভ্রান্তির কারখানা

মিয়ানমার কি গণহত্যার জন্য দোষী সাব্যস্ত হবে

ভারতের মুসলিম ও সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতার সংকট

অপ্রতিমদের প্রতি নির্মমতা থামবে কীভাবে

পরাশক্তির প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ

মেধা না বিশেষ সুবিধা