হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

রাষ্ট্র পরিচালনায় সততা, জবাবদিহিতা ও দেশপ্রেম

লে.ক. মোদাসসের হোসেন খান (অব.)

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস আমাদের একটি কঠিন কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—ক্ষমতা কখনো চিরস্থায়ী নয় আর রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের আস্থা হারালে শুধু বক্তৃতা, প্রতিশ্রুতি কিংবা অতীতের ত্যাগের স্মৃতিচারণ দিয়ে সেই আস্থা পুনরুদ্ধার করা যায় না। জনগণ শেষ পর্যন্ত বিচার করে সরকারের কার্যক্রম, স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় তার দৃশ্যমান সাফল্য দিয়ে।

বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদসহ অনেক মন্ত্রী এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সবাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে, সালাহউদ্দিনের নিখোঁজ হওয়া, পরে ভারতে অবস্থান এবং দীর্ঘ সময় পর দেশে প্রত্যাবর্তনের ঘটনা বহু প্রশ্ন ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সত্য জনগণের সামনে তুলে ধরা শুধু ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার বিষয় নয়; বরং বাংলাদেশের গুম, বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক নিপীড়নের ইতিহাস নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধানের স্বার্থেও তা গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান সরকার গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি দাবি করেছেন যে বর্তমান সরকারের সময়ে এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঘটেনি। একই সঙ্গে তিনি গুম-সংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন। এসব বক্তব্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক; কিন্তু জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য ঘোষণার পাশাপাশি অতীতের প্রতিটি গুরুতর ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের শনাক্তকরণ এবং তদন্তের ফল প্রকাশ করাও সমান জরুরি।

বাংলাদেশের আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক বিতর্ক হলো প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক। ভারত বাংলাদেশের বৃহৎ প্রতিবেশী এবং দুই দেশের মধ্যে ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বাস্তবতা এমন যে সুসম্পর্ক বজায় রাখা উভয় দেশের স্বার্থেই প্রয়োজন। কিন্তু বন্ধুত্ব এবং নির্ভরতা এক বিষয় নয়। সুসম্পর্ক কখনোই এমন পর্যায়ে যাওয়া উচিত নয়, যেখানে বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত, জাতীয় নিরাপত্তা কিংবা জনগণের স্বার্থ কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের সন্তুষ্টির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

বিদেশি শক্তির সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব, কূটনৈতিক চাপ বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট তৎপরতা সম্পর্কে অন্ধ থাকা বিপজ্জনক। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো—বন্ধুত্ব বজায় রেখেও সতর্ক থাকা এবং প্রতিটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে পারস্পরিক সম্মান, সমতা ও স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালনা করা।

এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক একটি বক্তব্য উল্লেখযোগ্য। তিনি ভারত থেকে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচারের সুযোগ দেওয়ার সমালোচনা করে বলেছেন, একদিকে বন্ধুত্বের কথা বলা এবং অন্যদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে এমন কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়া পরস্পরবিরোধী। এ ধরনের অবস্থান জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে ইতিবাচক। এখন প্রয়োজন একই নীতি সরকারের সব ক্ষেত্রে সব সময়ই ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করা।

বর্তমান সরকারের মন্ত্রী ও নীতিনির্ধারকদের তাই মনে রাখতে হবে—দেশপ্রেমের প্রমাণ বক্তৃতায় নয়, সিদ্ধান্তে। ভারতের ক্ষেত্রেই হোক, চীন, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্য কোনো শক্তিশালী দেশের ক্ষেত্রেই হোক, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতির মূল ভিত্তি হতে হবে বাংলাদেশের স্বার্থ।

কোনো বিদেশি রাষ্ট্রকে অকারণে শত্রু হিসেবে দেখা যেমন ক্ষতিকর, তেমনি কোনো রাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট রাখাকেই কূটনৈতিক সাফল্য মনে করাও আত্মঘাতী। প্রয়োজন এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, যেখানে বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু নতজানুতা থাকবে না; সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু সার্বভৌমত্বের বিনিময়ে নয়।

একই নীতি দেশের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থাতেও প্রযোজ্য।

বর্তমান সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। অতীতের স্বৈরশাসন, দুর্নীতি, গুম, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং প্রশাসনের দলীয়করণের অভিযোগ থেকে দেশকে বের করে আনার প্রতিশ্রুতি যদি দেওয়া হয়ে থাকে, তবে সরকারকে প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রমাণ করতে হবে যে রাষ্ট্র আর কোনো ব্যক্তি, পরিবার, দল কিংবা বিদেশি শক্তির স্বার্থ রক্ষার যন্ত্র নয়।

পুলিশ ও প্রশাসনকে নিরপেক্ষ রাখা, দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করা, বিরোধী মতের অধিকার নিশ্চিত করা, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়া—এসবই হবে সেই প্রতিশ্রুতির প্রকৃত পরীক্ষা।

অতীতের সরকারের পতন থেকেও শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। কোনো সরকার যখন নিজের সমালোচনাকে শত্রুতা মনে করতে শুরু করে, জনগণের প্রশ্নকে অবজ্ঞা করে এবং ক্ষমতাকে স্থায়ী বলে ধরে নেয়, তখন তার সঙ্গে জনগণের দূরত্ব দ্রুত বাড়তে থাকে। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—রাষ্ট্রীয় শক্তি দিয়ে সাময়িকভাবে বিরোধিতা দমন করা সম্ভব হলেও জনমতের বিচারের হাত থেকে কোনো সরকারই শেষ পর্যন্ত রেহাই পায় না।

এ কারণেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বর্তমান সরকারের প্রত্যেক মন্ত্রীর নিজের কাছে একটি সহজ প্রশ্ন রাখা উচিত।

ক্ষমতায় আসার পর আমরা কি এমন দৃশ্যমান দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পেরেছি, যা প্রমাণ করে যে আমাদের প্রথম আনুগত্য দল বা বিদেশি শক্তির প্রতি নয়—বাংলাদেশ ও তার জনগণের প্রতি?

এর উত্তর বক্তৃতায় দেওয়ার প্রয়োজন নেই। উত্তর দিতে হবে কাজে।

সততা, স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা, আইনের শাসন এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থানই একটি সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পুঁজি। বর্তমান সরকার যদি সত্যিকার অর্থে অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে চায়, তবে আত্মপ্রশংসা কিংবা অস্বস্তিকর প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার পরিবর্তে সমালোচনাকে গ্রহণ করতে হবে এবং ভুল হলে তা সংশোধনের সাহস দেখাতে হবে।

কারণ ক্ষমতার সবচেয়ে বড় শক্তি এবং উৎস নিরাপত্তা বাহিনী নয়—জনগণের বিশ্বাস।

আর ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সত্য হলোÑকোনো ক্ষমতাই চিরস্থায়ী নয় এবং কোনো শাসকই জনগণের বিচারের ঊর্ধ্বে নন।

ক্লাসে এসে ঘুমে অচেতন ৭ ছাত্রী, ইয়াবা সেবনের গুজব

আওয়ামীপন্থিদের বাইরে প্রার্থী হলে নেমে আসত অত্যাচারের খড়গ

ইয়েমেনে কারাগারে সৌদি হামলার অভিযোগ, নিহত ৭

বিশ্ববাজারে আবারও বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম

বিশ্বমঞ্চে নতুন বাংলাদেশ

হুথিদের হটিয়ে সানা পুনরুদ্ধারের সিদ্ধান্ত ইয়েমেনের

আলাউদ্দিন নাসিমের বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগও আগের মামলায় তদন্তের নির্দেশ দুদকের

রাষ্ট্রীয় সংস্থার আইটি সেবায় এখনো জয়ের বন্ধুর কোম্পানি

পূর্বধলায় অটোরিকশার সঙ্গে সংঘর্ষে মোটরসাইকেল চালক নিহত

ইরান যুদ্ধে জড়ালে বিপদে পড়বে দক্ষিণ কোরিয়া