সেনাবাহিনীর ত্রিশ বছরের চাকরি জীবনের প্রতিটি দিন একটি নীতিকে আঁকড়ে ধরে চলেছি—পেশাদারিত্ব, সততা এবং নিষ্ঠা। ২০০৯ সালে আমি রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্টে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পার্লামেন্টারি স্টাডিজের (বিআইপিএসওটি) কমান্ড্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম। ঠিক তখন সেই সময়ে, নির্বাচন শেষে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে। এরপর থেকেই আমি এক ধরনের অস্বাভাবিক পরিবেশ অনুভব করতে শুরু করি।
একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবে অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছিল—কিছু বিষয় চোখে দেখা যায় না; কিন্তু অনুভব করা যায়। আমি ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিলাম, আমাকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। স্থানীয় ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্সের (ডিজিএফআই) একটি ইউনিট, যার নেতৃত্বে ছিলেন মেজর (পরে কর্নেল) মোজাম্মেল, আমাকে প্রায় সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রেখেছিল—অফিসে, মসজিদে, জগিংয়ের সময়, এমনকি ব্যক্তিগত সময়েও। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন কারো অদৃশ্য নজরে ছিল। এটি কোনো কল্পনা ছিল না; এটি ছিল একজন পেশাদার গোয়েন্দা কর্মকর্তার অনুভূত বাস্তবতা।
আমি বুঝতে পারছিলাম, আমার বিরুদ্ধে একটি গল্প তৈরি করা হচ্ছে—একটি সাজানো বয়ান, যার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু যার ভার আমাকে বহন করতে হবে। আমি অপেক্ষা করছিলাম—কখন সেই দিনটি আসবে, যখন আমাকে কোনো ভিত্তিহীন অভিযোগের ভিত্তিতে সরিয়ে দেওয়া হবে। অবশেষে সেই দিনটি এলো—নভেম্বর ২০০৯। আমাকে হঠাৎ করেই বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হলো। কোনো স্পষ্ট কারণ জানানো হয়নি। কোনো স্বচ্ছ ব্যাখ্যা ছিল না। তিন দশকের নিষ্ঠা যেন এক মুহূর্তে অস্বীকার করা হলো। আমি তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মুবিনের কাছে কারণ জানতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তিনিও সন্তোষজনক কোনো উত্তর দিতে পারেননি। সেই নীরবতা ছিল যেকোনো অভিযোগের চেয়েও ভারী—এটি ছিল অবিচারের এক গভীর প্রতিফলন।
সেই সময় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রক্রিয়াধীন ছিল, যা পুরো ঘটনাটিকে আরো বেদনাদায়ক ও দুর্বোধ্য করে তোলে। কমান্ড্যান্টের পদোন্নয়ন (আপগ্রেডিং অব দ্য পজিশন) এবং সেই অনুযায়ী আমাকে প্রমোশনের মাধ্যমে ওই পদে সমন্বয় (অ্যাজাস্টমেন্ট অন প্রমোশন) করার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছিল। এটি কোনো প্রাথমিক আলোচনা পর্যায়ে ছিল না; বরং আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি অগ্রসর হচ্ছিল এবং স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছিল যে আমার পেশাগত দক্ষতা ও কর্মজীবনের মূল্যায়ন ইতিবাচক হয়েছে। এটি অপ্রত্যাশিত কিছু ছিল না। দীর্ঘ তিন দশকের নিষ্ঠাবান ও পরিচ্ছন্ন কর্মজীবনের পর এ ধরনের অগ্রগতি স্বাভাবিকই ছিল। আমার দায়িত্ব পালন, অভিজ্ঞতা এবং পেশাগত সক্ষমতা আমাকে পরবর্তী ধাপের জন্য প্রস্তুত করে তুলেছিল। সহকর্মী এবং সহযোদ্ধারাও বিষয়টি জানতেন এবং মনে করেছিলেন যে আমার ক্যারিয়ার একটি উচ্চতর দায়িত্বের দিকে এগোচ্ছে।
কিন্তু জীবন সবসময় যুক্তির পথে চলে না। যে সময়ে আমার পদোন্নতির প্রক্রিয়া চলছিল, ঠিক সে সময়েই হঠাৎ করে সবকিছু থেমে গেল। প্রমোশনের পরিবর্তে আমাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হলো। স্বীকৃতির পরিবর্তে পেলাম নীরবতা, যা হওয়ার কথা ছিল এবং যা বাস্তবে ঘটল—তার মধ্যে পার্থক্য ছিল আকাশ-পাতাল। এটি শুধু একটি পেশাগত ধাক্কা ছিল না; এটি ছিল একটি স্বাভাবিক ও অর্জিত অগ্রগতির সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী পরিণতি। এ ঘটনাটি আরো কষ্টদায়ক, কারণ এটি কোনো স্বাভাবিক অবসরের ঘটনা ছিল না। এটি ছিল একটি চলমান ক্যারিয়ারের হঠাৎ থেমে যাওয়া—একটি অগ্রসরমান প্রক্রিয়ার জোরপূর্বক সমাপ্তি। একদিকে যেখানে আমাকে উচ্চতর দায়িত্বের জন্য উপযুক্ত বিবেচনা করা হচ্ছিল, অন্যদিকে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই আমাকে সরিয়ে দেওয়া হলো।
এ ধরনের বৈপরীত্য শুধু ব্যক্তিগত অবিচারের প্রশ্নই তোলে না; এটি প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। যখন একজন কর্মকর্তাকে একদিকে প্রমোশনের জন্য যোগ্য বলা হয় এবং অন্যদিকে হঠাৎ করে অপসারণ করা হয়, তখন বোঝা যায় যে সবসময় মেধা ও যোগ্যতাই সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে না। আমার জীবনের সেই মুহূর্তটি আমাকে একটি গভীর শিক্ষা দিয়েছে—কখনো কখনো মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হয় এমন কিছু শক্তির দ্বারা, যা তার কর্মদক্ষতা, সততা বা নিষ্ঠার বাইরেও অবস্থান করে। তবু আমি আমার মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত হইনি এবং আল্লাহর ন্যায়বিচারের ওপর আস্থা হারাইনি। কারণ শেষ পর্যন্ত, কোনো সিদ্ধান্তই একটি সৎ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের সত্যকে মুছে দিতে পারে না।
কয়েক মাস পর জানতে পারি, এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিলেন লে. জে. (অব.) মামুন খালেদ, যিনি তখন ডিজিএফআইয়ের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর পরিচালক ছিলেন। তিনি বিভিন্ন কল্পিত, মিথ্যা ও বানোয়াট বয়ানে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে আমার চাকরিচ্যুতির সব ব্যবস্থা করেছিলেন। আরো পরে জানতে পারি, আমি একা নই; আমার মতো আরো অনেক কর্মকর্তা—যারা নিজেদের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছিলেন—তারাও একই ধরনের প্রক্রিয়ার শিকার হয়েছেন। এ বিষয়টি আমাকে ব্যক্তিগতভাবে যতটা কষ্ট দিয়েছে, তার চেয়েও বেশি উদ্বিগ্ন করেছে একটি বড় বাস্তবতা—একটি সিস্টেমের ভেতরে এমন একটি প্রবণতা তৈরি হতে পারে, যেখানে পেশাদারিত্বের চেয়ে প্রভাব, সততার চেয়ে বয়ান এবং সত্যের চেয়ে সুবিধাজনক গল্প বেশি গুরুত্ব পায়।
কখনোই বস্তুবাদী মানুষ ছিলাম না। কোনো সঞ্চিত সম্পদ বা ধন-সম্পদ ছিল না। আমি ছিলাম একেবারেই সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত। তাই হঠাৎ করে চাকরি হারিয়ে আমি এবং আমার পরিবার এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হই। এটি ছিল সংগ্রাম, অনিশ্চয়তা এবং নীরব কষ্টে ভরা একটি অধ্যায়। অনেক সময় মনে হয়েছে—কেন? আমার অপরাধ কী ছিল? কিন্তু সেই মুহূর্তগুলোয় আমি আমার বাবার কথা মনে করেছি, তার জীবনদর্শন মনে করেছি। আর সবচেয়ে বড় কথা, আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করেছি। মানুষের দরজা যখন বন্ধ হয়ে যায়, আল্লাহর দরজা তখনো খোলা থাকে। আমি হাত তুলেছি আল্লাহর দরবারে—প্রতিশোধের জন্য নয়, ন্যায়বিচারের জন্য। আমি বিশ্বাস করি, কোনো অবিচারই তার দৃষ্টির বাইরে নয়। এই দুনিয়ায় না হোক, পরকালে অবশ্যই প্রতিটি কাজের হিসাব হবে।
জীবন আমাকে একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে—ক্ষমতা এবং পদ কখনো স্থায়ী নয়। আজ যারা ক্ষমতার আসনে, কাল তারা নাও থাকতে পারেন। যারা কর্তৃত্বের অবস্থানে থাকেন, তাদের মনে রাখা উচিত—তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত কারো না কারো জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। ক্ষমতার অপব্যবহার শুধু প্রশাসনিক ভুল নয়, এটি একটি নৈতিক অপরাধ। এর ফল একদিন না একদিন আসবেই—এই দুনিয়ায় কিংবা আখিরাতে। আমার জীবনপথে আমি তিক্ততা নয়, শিক্ষা বহন করি—সততা, ধৈর্য এবং আল্লাহর ন্যায়বিচারের প্রতি অটল বিশ্বাসের শিক্ষা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেদায়েত দান করুন, যেন আমরা সবসময় সৎপথে থাকতে পারি, অন্যায় থেকে দূরে থাকতে পারি এবং তার বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে পারি। কারণ শেষ পর্যন্ত যা থাকবে, তা আমাদের পদ বা ক্ষমতা নয়—থাকবে আমাদের আমল।
আজও কখনো কখনো নিরিবিলি মুহূর্তে আমি নিজেকে একটি প্রশ্ন করি—কীভাবে একজন সহকর্মী, একজন সহযোদ্ধা, একজন ‘ভাই’ অফিসার এতটা কঠোর, অন্যায়পরায়ণ এবং নির্মম হতে পারে, শুধু কিছু সাময়িক ব্যক্তিগত লাভের জন্য? সামরিক জীবন আমাদের অনেক কিছু শেখায়, কিন্তু সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো ভ্রাতৃত্ববোধ। আমরা একসঙ্গে প্রশিক্ষণ নিই, একসঙ্গে দায়িত্ব পালন করি, প্রয়োজনে একে অপরের জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত থাকি। এই সম্পর্ক কোনো সাধারণ সম্পর্ক নয়; এটি বিশ্বাস, সম্মান এবং পারস্পরিক আস্থার ওপর দাঁড়ানো একটি বন্ধন। আর যখন সেই বন্ধন ভেঙে যায়—বাইরের শত্রুর হাতে নয়, বরং নিজের ভেতরের কারো দ্বারা—তখন সেই আঘাত সবচেয়ে গভীর হয়। সাময়িক লাভ—পদোন্নতি, প্রভাব বা সুবিধা—কখনোই স্থায়ী অন্যায়ের যুক্তি হতে পারে না। বাস্তবতা হলো, এ ধরনের লাভ খুবই ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু অন্যায়ের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। কিছু সময়ের জন্য কেউ হয়তো এগিয়ে যেতে পারে, কিন্তু অন্যায়ের দাগ সহজে মুছে যায় না। আর এই দুনিয়ার বাইরে রয়েছে আরেকটি জবাবদিহি—যেখান থেকে কেউ রেহাই পাবে না। অপরাধীদের বিচার অবশ্যই হওয়া উচিত।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক, গবেষক ও লেখক