রাষ্ট্র এবং রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে বাংলাদেশে অনেক আলোচনা চলছে। রাষ্ট্র এবং রাজনীতি যথাযথভাবে সংস্কার না হলে কর্তৃত্ববাদী সরকার প্রক্রিয়াকে ঠেকানো সম্ভব নয়। অর্থাৎ কর্তৃত্ববাদী সরকার বর্তমান শাসনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে সৃষ্টি হয়। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তারিখে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ এবং গণভোট নির্বাচনে জুলাই সনদ ব্যাপকভাবে জনমত লাভ করে। কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে না যে দেশে গণভোট হয়েছিল এবং দেশের মানুষ সংস্কারের জন্য কোনো আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিল। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার রাষ্ট্র সংস্কার ও মানবাধিকার সুরক্ষার সঙ্গে জড়িত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো অনুমোদন করেনি।
১৯৯১ সালে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকে সংস্কারের এজেন্ডা নিয়ে নানা প্রচেষ্টা চলমান থাকার পরও কেন রাজনৈতিক বা রাষ্ট্র সংস্কার হয় না, সেটি বুঝতে গেলে রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বের ভূমিকা বোঝা আবশ্যক। সংস্কার একটি রাজনৈতিক প্রপঞ্চ এবং সংস্কার বাস্তবায়নে মূল অনুঘটক হচ্ছে রাজনৈতিক দল। কারণ রাজনৈতিক দল দিন শেষে সরকার পরিচালনা করে। আমরা বিগত ৫০ বছর ধরে একটি দ্বিদলীয় ব্যবস্থার মধ্যে ছিলাম। দুটি প্রধান দল পালাক্রমে শাসন ক্ষমতায় ছিল। মাঝে কিছু সময় সামরিক সরকার কর্তৃক গঠিত একটি রাজনৈতিক দল এককভাবে (১৯৮২-৯০) দেশ শাসন করেছে। প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল জনপরিসরে এবং নির্বাচনি অঙ্গীকারে সবসময় সংস্কারের পক্ষে জোরালো কথা বলে; কিন্তু বাস্তবে এসব দল যখন ক্ষমতায় আসে, তখন সুশাসন বা সংস্কারকে বাক্সবন্দি করে দেশ পরিচালনা করে। এই বৈপরীত্যের মধ্যে সংস্কারের সংকট লুকিয়ে আছে। তাই আমাদের এসব রাজনৈতিক দলের ইকো-সিস্টেম এবং সংস্কৃতি বোঝা জরুরি। আমরা রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি অবজ্ঞা করে বাস্তবমুখী সংস্কার কখনো বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হব না। ৩৫-৪০ বছরে যার প্রমাণ আমরা পেয়েছি।
রাজনৈতিক সংস্কারে রাজনৈতিক দলের ভূমিকা বুঝতে হলে আমাদের কিছু সফল দেশের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। এসব উদাহরণ আমাদের জানা। তারপরও ইতিহাস বোঝার স্বার্থে মাঝেমধ্যে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। হংকং ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত খুব দুর্নীতিগ্রস্ত ছিল। কিন্তু গডবার কেলেঙ্কারির পর গভর্নর মুরে ম্যাকলেহোস ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে Independent Commission against Anti-Commission (ICAC) প্রতিষ্ঠা করেন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। হংকং বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম একটি পরিচ্ছন্ন টেরিটরি। জেনারেল পার্ক দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে চায়েবলের (বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, যেমন স্যামসাং, হুন্দাই, এলজি এবং এসকে) ওপর নির্ভর করেছিলেন। কিন্তু এটি তোষণবাদী নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না। যেসব কোম্পানি ইতিবাচক ভূমিকা দেখাতে পেরেছিল, শুধু সেসব কোম্পানি রাষ্ট্রীয় সহায়তা পেয়েছিল। ফলে মেরিটভিত্তিক রাষ্ট্রীয় সহায়তা পদ্ধতি গড়ে ওঠে এবং জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত হয়। রুয়ান্ডার শাসকশ্রেণি কঠোরভাবে গণহত্যার আলোচনা বা বিতর্ককে নিরুৎসাহিত করেছে। যার কারণে ১৯৯০-পরবর্তী রুয়ান্ডায় জাতিগত বিদ্বেষ অনেকটা নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে আছে। পাশাপাশি রুয়ান্ডা অর্থনৈতিক এবং শাসনব্যবস্থায় বেশ অগ্রগতি করেছে। ২০২০ সালে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিকভাবে রুয়ান্ডা উন্নয়নশীল দেশ হলেও শাসন বিবেচনায় এটি OECD-দেশগুলোর সমতুল্য। বিশ্বব্যাংক ২০২০-এর রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯০টি দেশের মধ্যে রুয়ান্ডার অবস্থান ছিল ৩৮তম। সিঙ্গাপুরের সুশাসন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রেও লি কুয়ান ইউ এবং পিপলস অ্যাকশন পার্টি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, যেসব দেশে সুশাসনে এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উন্নয়ন করেছে, সেসব দেশে শাসক দল এবং প্রধান নেতৃত্ব বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু আমাদের দেশের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। দুই প্রধান রাজনৈতিক দলে এমন কোনো মূল্যবোধ চর্চা করা হয় না, যেখানে কর্মী বাহিনী ও সমর্থক গোষ্ঠী নৈতিকতা এবং সুশাসন শিক্ষা লাভ করতে পারে। নেতৃত্বের অধিকাংশের আয়ের উৎস সম্পর্কে জনগণের স্পষ্ট ধারণা নেই। পাশাপাশি এসব দলের নেতৃত্ব প্রিন্সিপাল এজেন্ট পদ্ধতির মাধ্যমে শাসনবলয় রক্ষা করে। ফলে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে patronage distribution মূল ভূমিকা পালন করে। যার কারণে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর, সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি মেরিট পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়, সেখানে বাংলাদেশে প্রবল দলীয় কিন্তু একাডেমিকভাবে দুর্বল অধ্যাপককে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান করা হয়। অন্যদিকে চায়েবল দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়ক শক্তি হলেও আমাদের বিজনেস মাফিয়ারা রাজনৈতিক প্রভাব এবং শাসক শ্রেণির আনুকূল্য ব্যবহার করে ব্যাংক দখল করে এবং লুণ্ঠন ও বিদেশে অর্থ পাচার করে। বিগত সময়ে এসব দখল ও লুণ্ঠনে মূল ভূমিকা পালন করেছেন দল ও সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা নিজে।
তাহলে এটি স্পষ্ট, প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বা শাসক দল এবং নেতৃত্ব যদি সংস্কার অভিমুখী না হয় বা জবাবদিহি ও নৈতিকতাকে উৎসাহিত না করে, তাহলে রাজনৈতিক সংস্কার বা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা শুধু কঠিন নয়, অবাস্তবও। সুশাসনের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তি বা দল যদি শক্ত অবস্থান গড়ে তোলে, তাহলে একটি নতুন সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে।
লেখক : গভর্ন্যান্স ও পাবলিক পলিসি এক্সপার্ট
ইউরোপের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক