হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

১৯৭৩-২০২৬ : তেল অস্ত্র এখনো কার্যকর

আহমেদ আসমার

১৯৭৩ সালের অক্টোবরে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সময় আরব তেলমন্ত্রীরা ইসরাইল-সমর্থক দেশগুলোর বিরুদ্ধে জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তারা এমন এক এক অস্ত্রের ব্যবহার করেন, যা বিশ্বব্যবস্থাকে এক নতুন রূপ দিয়েছিল। কারণ আরব মন্ত্রীদের ওই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম চারগুণ বেড়ে যায়। এর বিরূপ প্রভাবে পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনীতি পতনের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়ায়। যুক্তরাষ্ট্র কয়েক মাসের মধ্যেই নিজেকে এমন এক দুর্বল অবস্থানে দেখতে পায়, যা তারা আগে কখনো দেখেনি বা অনুভব করেনি।

তেলকে একটি কার্যকর অস্ত্র হিসেবে আরব দেশগুলোর ব্যবহারের ৫৩ বছর পর আবার বিশ্বে ফিরে এসেছে তেল অস্ত্র। তবে এবার আরব দেশগুলোর জোট নয়, বরং এই অস্ত্রটি ব্যবহার করছে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অব্যাহত বোমা হামলার শিকার ইরান। তারাই এবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়ে তেল নিষেধাজ্ঞা আরোপের নিজস্ব সংস্করণ প্রয়োগ করেছে। ইরানের এই নিষেধাজ্ঞা ভালোভাবেই যে কাজ করছে, তা বিশ্বব্যাপী তেলের সংকট ও দাম বৃদ্ধি থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এই পরিস্থিতি সামলাতে গত ২০ মার্চ ট্রাম্প প্রশাসন ইরানি তেল কেনার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ৩০ দিনের জন্য শিথিল করার ঘোষণা দেয়। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তেলের দাম কমাতে ‘বিশ্ববাজারে ১৪ কোটি ব্যারেল তেল’ পাঠানো হবে। এ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের একজন জ্বালানিবিশ্লেষক বলেছেন, ‘যে দেশের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ চলছে, সেই দেশের তেল বিক্রির ওপর থেকে যদি নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়, তাহলে বুঝতে হবে আমাদের হাতে আর কোনো বিকল্পই অবশিষ্ট নেই।’

১৯৭৩ সালের তেল নিষেধাজ্ঞা

আরব দেশগুলোর তেল নিষেধাজ্ঞা ১৯৭৩ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৭৪ সালের মার্চ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল, যা আধুনিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ১৯৭৩ সালের অক্টোবর যুদ্ধের সময় ইসরাইলি সেনাবাহিনীকে আবার রসদ সরবরাহের মার্কিন সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠনের (ওপেক) আরব সদস্য দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল-সমর্থক দেশগুলোর বিরুদ্ধে এই নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। তারা নির্দিষ্ট দেশগুলোয় পেট্রোলিয়াম রপ্তানি নিষিদ্ধ করে এবং উৎপাদনও কমিয়ে দেয়।

এর প্রভাব ছিল তাৎক্ষণিক এবং ভয়াবহ। তেলের দাম প্রথমে দ্বিগুণ এবং এরপর চারগুণ হয়ে যায়। এর ফলে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা দেখা দেয়। যুক্তরাষ্ট্র আগের চেয়ে আমদানি করা তেলের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং একটি দুর্বল আন্তর্জাতিক অবস্থান থেকে আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলো এবং জাপান তাদের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে মরিয়া হয়ে ওঠে এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিল।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই নিষেধাজ্ঞা তার রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করেছিল। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৭৪ সালের জানুয়ারির মধ্যে সিনাইয়ের কিছু অংশ থেকে সৈন্য প্রত্যাহারে ইসরাইলকে রাজি করান এবং ইসরাইল ও সিরিয়ার মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমাধানে পৌঁছান, যা আরব তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোকে ১৯৭৪ সালের মার্চে তাদের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে রাজি করায়। অস্ত্র হিসেবে জ্বালানি তেলের এই ব্যবহার বিশ্বের পরাশক্তিগুলোকে তাদের নীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছিল।

২০২৬ : যুদ্ধকৌশল হিসেবে প্রণালির ব্যবহার

তেল অস্ত্রের নিজস্ব সংস্করণ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালিকে ব্যবহার করেছে এবং এটি ১৯৭৩ সালে আরবদের নিষেধাজ্ঞার চেয়েও বেশি কার্যকর হতে পারে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে শান্তিপূর্ণ সময়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়। ইরান এখন এই প্রণালি দিয়ে নৌযান চলাচল কার্যকরভাবে ব্যাহত করছে। ফলে এই সংকীর্ণ নৌপথের ওপর নির্ভরশীল উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো তাদের সীমিত মজুত ক্ষমতার কারণে উৎপাদন কমাতে শুরু করেছে।

বিশ্ববাজারে এর প্রভাব নাটকীয় হয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে এবং ব্রেন্ট ক্রুড ধারাবাহিকভাবে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে লেনদেন হচ্ছে। মার্চের শেষের দিকে এবং চলতি সপ্তাহেও দাম ১১০ ডলার ছাড়িয়েছে। জ্বালানি বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তবে দাম ১৪০ ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে দুর্বল করবে।

ট্রাম্প প্রশাসন উভয়সংকটে পড়েছে। কারণ কারণ জ্বালানি তেলের আকাশছোঁয়া দামের প্রভাব মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের দলের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এ কারণেই দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর এখন ইরানের তেল বিক্রির অনুমতি দেওয়া তাদের সংকটের গভীরতাই প্রকাশ করে।

মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ গত ২০ মার্চ সাগরে থাকা ইরানি তেল বিক্রির অনুমতি দিয়ে ৩০ দিনের একটি ছাড়পত্র দেয়। দুই সপ্তাহের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে এটি এ ধরনের তৃতীয় নিষেধাজ্ঞা ছাড়। যুক্তরাষ্ট্র ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে বোমা হামলা করছে আবার একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরানি তেল বিক্রির সুবিধাও দিচ্ছে।

তেল অস্ত্র এখনো কাজ করে

যারা যুক্তি দেন, তেল আর যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে কাজ করবে না, হরমুজ প্রণালি ব্যবহারে ইরানের কৌশলের কার্যকারিতা তাদের জন্য একটি শক্তিশালী জবাব। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখলে ইসরাইলি সম্প্রসারণবাদী পরিকল্পনার মোকাবিলায় জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা ব্যবহারের কথা বলা হলে কিছু আরব কর্মকর্তা বলেছিলেন, এটি অতীতের বিষয়। কিন্তু হরমুজ প্রণালি ইরান বন্ধ করার পর বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের জন্য হাহাকার এটাই প্রমাণ করে যে, ১৯৭৩ সালের পর ৫৩ বছর অতিবাহিত হলেও তেল অস্ত্র এখনো আগের মতোই সমানভাবে কার্যকর। ইরান দেখিয়েছে, তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সংস্থা ওপেকের সম্মিলিত শক্তি ছাড়াও একটি কৌশলগত সংকীর্ণ সমুদ্রপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তির কাছ থেকে অসাধারণ সুবিধা আদায় করতে পারে। সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার যুদ্ধাভিযান এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে।

তবে, ১৯৭৩ সালের তুলনায় বিশ্ব এখন অনেক বেশি প্রস্তুত। কারণ অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) সদস্য দেশগুলো এখন তিন মাসের আমদানির সমপরিমাণ কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত বজায় রাখে। কিন্তু এই সুরক্ষাব্যবস্থা দুর্বলতা দূর করতে পারেনি। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের এই মজুত ‘শুধু তখনই কার্যকর হবে, যদি সংঘাত খুব বেশিদিন স্থায়ী না হয়।’

ইরানের কৌশল মার্কিন সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতাকেও সামনে এনেছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং পারমাণবিক অবকাঠামো ধ্বংস করতে সামরিক অভিযান চালানো সত্ত্বেও উপসাগরীয় এ দেশটিকে তার সংকল্প থেকে সরাতে পারেনি ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো হামলার লক্ষ্যবস্তু করলে হরমুজ প্রণালি ‘সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার’ হুমকিও দিয়েছে তেহরান।

বর্তমানের জন্য একটি শিক্ষা

১৯৭৩ এবং ২০২৬ সালের মধ্যকার সাদৃশ্য অনস্বীকার্য। উভয় ক্ষেত্রেই পশ্চিমা-সমর্থিত ইসরাইলি সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সম্পদে সমৃদ্ধ দেশগুলো তেলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পথ দেখিয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই এর ফলে একটি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রকে তার নীতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করে এবং উভয় ক্ষেত্রেই তেল অস্ত্র কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

ইরানের জন্য হিসাবটা স্পষ্ট। যদি তারা আমেরিকান ভোক্তাদের জন্য যুদ্ধের ব্যয় অসহনীয় করে তুলতে পারে, তবে তারা হয়তো ওয়াশিংটনকে ইসরাইলের সম্প্রসারণবাদী কর্মসূচির প্রতি তাদের সমর্থন পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করবে। ট্রাম্প প্রশাসন যে ইতোমধ্যেই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা শুরু করেছে, তা থেকে বোঝা যায়, ইরানের এই চাপ কাজ করছে।

ইরানের সাফল্য এটাও মনে করিয়ে দেয়, জ্বালানি শক্তি অপ্রচলিত তো নয়ই, বরং সামরিক আগ্রাসনের সম্মুখীন দেশগুলোর জন্য এটি অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবেই রয়ে গেছে। তেল অস্ত্র মৃত নয়, এটি এখনো আগের মতোই কার্যকর। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের দাবির একটি ন্যায্য নিষ্পত্তির জন্য এবং এই অঞ্চলজুড়ে ইসরাইলের সম্প্রসারণবাদী কর্মসূচির অবসান ঘটাতে এই অস্ত্র আগামীতেও ব্যবহার করার পথ খোলা থাকছে।

ডেইলি সাবাহ অবলম্বনে মোতালেব জামালী

সরকার ও বিরোধী দলে যুদ্ধ কেন

পাঠ্যবইয়ে যেভাবে ফিরলেন শহীদ জিয়াউর রহমান

সিভিল সোসাইটি ও আমলাতন্ত্রের দ্বন্দ্ব

ভেনেজুয়েলাকে ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার ইঙ্গিতের অর্থ কী

সংস্কার ইস্যুতে তালগোল ও রাবণ হওয়ার ঝুঁকি

প্লাস্টিকদূষণের কবলে বাংলাদেশ

ইরান যুদ্ধ তুরস্কের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ

গণভোট ও নৈতিক সংকট

ব্যাংক খাতে কেন নারী কর্মী কমছে

কেন এত যুদ্ধব্যয়