হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

রাষ্ট্র সংস্কারে চিন্তা ও মূল্যবোধের পুনর্গঠন জরুরি

ড. মোজাফফর হোসেন

১.

পাঁচ আগস্টের আগে কে জানত, শেখ হাসিনা পালাবেন! এমনকি শেখ হাসিনা নিজেও জানতেন না, তাকে সেদিন এভাবে পালাতে হবে। কিন্তু তাকে পালাতে হলো। পালাতে হলো এজন্য যে, সরকারপ্রধান হিসেবে তিনি বুঝতে পারতেন না, তার অপরাধটা কী! তিনি মাঝে মাঝেই বিভিন্ন বক্তৃতায় সে কথা গর্ব করে বলতেনও যে, ‘তার অপরাধ কী, তিনি তা বোঝেন না।’ একটা মানুষের চিন্তায় কতটা দৈন্য থাকলে হাজার অপরাধ করেও বুঝতে পারেন না তার অপরাধ কী? যে ব্যক্তি ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য বুঝতে পারেন না, তার ন্যায়ের চেয়ে অন্যায় করার আশঙ্কাই বেশি থাকে। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে এবং তা হয়েছে তার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে।

বিশের দশকে ঢাকা থেকে প্রকাশিত শিখা পত্রিকার স্লোগান ছিল—‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ শিখা পত্রিকার এই স্লোগানের তাৎপর্য হয়তো শেখ হাসিনা কোনোদিনই উপলব্ধি করবার চেষ্টা করেননি জ্ঞানবুদ্ধির সীমাবদ্ধতার কারণে। অন্যদিকে যারা তাকে বুদ্ধি-পরামর্শ দিতেন, তারা কেউই শেখ হাসিনার মঙ্গল চাননি। তারা সবাই ছিলেন ধান্দাবাজ। স্বভাবগত কারণেই ধান্দাবাজদের পরামর্শ হাসিনা পছন্দ করতেন। তাদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞও ছিলেন।

শেখ হাসিনার পরামর্শদাতা ধান্দাবাজদের অন্যতম ছিলেন দিল্লির নীতিনির্ধারকরা। তারাই শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠার সব রসদ জুগিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠার পেছনে দিল্লির স্বার্থ ছিল বহুবিধ। তার মধ্যে ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ অন্যতম। দিল্লি এখনো সে স্বার্থ চরিতার্থ করার ফন্দি অব্যাহত রাখতে চাইছে। সে সুযোগও আছে; কারণ দিল্লির আশীর্বাদে এ দেশের অধিকাংশ রাজনীতিক বাংলাদেশ শাসনের স্বপ্ন দেখেন। এ কারণে বাংলাদেশের মানুষ সতর্ক না হলে হাসিনার অনুপস্থিতিতেও ’২৪-এর নতুন স্বপ্ন বাস্তবায়িত নাও হতে পারে।

২.

হাসিনা ও আওয়ামী লীগের রাজনীতি ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেন্দ্রিক। বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের অধ্যায়টা গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট। এজন্য দেশকে ঘিরে রাজনীতির সব নির্যাস এ অধ্যায়ে প্রবাহ সৃষ্টি করে। সেই রাজনীতির শুরুটা হয়েছিল পলাশী যুদ্ধের পর থেকে। ব্রিটিশরা ঢাকা ও মুর্শিদাবাদ কোনোটাকেই তাদের রাজধানী না রেখে কলকাতাকে (১৭৭২-১৯১১) রাজধানী করল। সেখান থেকে এ দেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রিত হতে থাকল।

ইংরেজরা এসেছিল ভারতবর্ষ থেকে মুনাফা করতে। মুনাফাকে নিরঙ্কুশ করতে গিয়ে তারা হয়ে উঠেছিল মুসলমানদের প্রতিপক্ষ। অন্যদিকে মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের জন্ম (১৯০৬) হয়েছিল। মুসলিম লীগের প্রতিরোধে ব্রিটিশ সরকার ভারতবর্ষ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু ততদিনে তারা ভারতবর্ষকে গড়ে তুলেছিল মুসলমানদের স্বার্থবিরোধী করে। ব্রিটিশদের এই কৌশল আয়ত্তে রাখতে পেরেছিলেন ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কংগ্রেস নেতারাও।

ব্রিটিশদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ পলিসি প্রয়োগ করে তারা পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করতে পেরেছিল। এটি সম্ভব হয়েছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। আওয়ামী লীগ পরিপূর্ণভাবে দিল্লির এজেন্ডা বাস্তবায়নের রাজনীতি করে এসেছে। আওয়ামী রাজনীতির এই জায়গাটা জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র-জনতা স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিল বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে। আবরার হত্যাকাণ্ড ছাত্রদের সামনে আওয়ামী রাজনীতির খোলসকে উন্মোচন করেছিল। ফলে আগস্ট বিপ্লবের ভিত্তি শক্ত হতে ও বিপ্লব সংঘটিত হতে খুব বেশি সময় লাগেনি।

এই বিপ্লবের পর জনমনে প্রত্যাশা যেমন সঞ্চারিত হয়েছে, তেমন শঙ্কাও আছে। শঙ্কার জায়গাটা হলো, কোন আদর্শকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে যাবে, তা বিপ্লবে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র-জনতা এখনো পরিষ্কার করতে পারেনি। তারা এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশে বলেছে, ‘বিপ্লবকে ধারণ করার মতো সহনশীল যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।’ এই বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলোর মতাদর্শগত সংস্কার প্রয়োজন। কিন্তু কোন মতাদর্শের ভিত্তিতে সংস্কার হতে হবে, তা স্পষ্ট নয়।

আওয়ামী লীগের রাজনীতির মূল চেতনা ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ। বিএনপির আদর্শ বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। জামায়াতের রাজনীতির লক্ষ্য ও আদর্শ হলো কোরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা পরিচালনা করা। এখন বাংলাদেশ কোন দলের মতাদর্শকে আমলে নিয়ে চলবে, সেটা দ্রুত উত্থাপিত হওয়া জরুরি ছিল; কিন্তু তা হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সহকারী মাহফুজ আলম বলেছিলেন, ‘সংবিধানের চার মূলনীতির সংস্কার হওয়া দরকার।’ কিন্তু চার মূলনীতির পরিবর্তে কী হতে পারে, সেটা তিনি খোলাসা করেননি। এটি খোলাসা করতে পারলে রাজনৈতিক দলগুলো দ্রুত তাদের প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে পারত।

৩.

চিন্তা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে। আর চিন্তা তৈরি হয় শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে। চিন্তার পরিবর্তন মানেই রাষ্ট্রের পরিবর্তন। কাজেই জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের চেতনায় রাষ্ট্রীয় দপ্তরগুলোর ভাবাদর্শগত সংস্কার হতে হবে। তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন, যারা এই দপ্তরগুলো পরিচালনা করবেন, তাদের মনন, চিন্তা ও মূল্যবোধের পুনর্গঠন। রাজনৈতিক দলের নেতা ও আমলারাই রাষ্ট্রের বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন। এজন্য তাদের চিন্তার পুনর্গঠন হতে হবে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু তাদের বুদ্ধি-বিবেচনা ও মন-মেজাজ বিপ্লবের চেতনায় পুনর্গঠিত না হলে দাপ্তরিক পরিকাঠামোর পরিবর্তন খুব একটা কাজে আসবে না।

রাজনৈতিক দলগুলোর সদস্য রিক্রুট প্রক্রিয়ায় আনতে হবে পরিবর্তন। সুনাগরিকতার মূল্যবোধে বিশ্বাসী লোকদের দলের সদস্য নির্বাচন করা যেতে পারে। দলের সদস্য হওয়ার শিক্ষাগত যোগ্যতাও নির্ধারণ করা যেতে পারে। আর সুনাগরিক তৈরির কাজটি করবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেজন্য শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। আমরা যদি বিশ্বাস করি, শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, তাহলে শিক্ষা কমিশন গঠন করা অপরিহার্য। কিন্তু কী কারণে এখনো শিক্ষা কমিশন গঠিত হলো না, তা বোঝা যাচ্ছে না। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা বিরাজমান। নিয়োগবাণিজ্য, পরিচালনা পর্ষদের স্বেচ্ছাচারিতা, শিক্ষক-কর্মচারীদের অবমূল্যায়ন, সরকারি-বেসরকারি বৈষম্যসহ হীন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কারিকুলাম যোগ্য নাগরিক তৈরিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।

শেখ হাসিনার শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দোহাই দিয়ে বিকৃত ইতিহাস গেলানোর মাধ্যমে মানবতার মৌলিক জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাকে পাঠ্যপুস্তক থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ফলে শিক্ষিত মানুষগুলোই হয়ে উঠেছে জাতির সর্বনাশের মূল কারিগর। দেশবিমুখ ও সমাজবিমুখ স্বার্থান্বেষী শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরিতে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে। এজন্যই দিল্লি বাংলাদেশে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থাই সবসময় রাখতে চেয়েছে। আমরা খেয়াল করেছি, বাংলাদেশে একটি ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থা বহাল রাখতে দিল্লিপন্থি একটি শক্তিশালী চক্র কাজ করে যাচ্ছে। এই চক্রকে উচ্ছেদ করতে শিক্ষাকমিশন গঠন করা জরুরি। এই কমিশন করতে না পারলে জাতি ভুল জীবনদর্শনে পড়ে হাবুডুবু খাবে এবং জনগণের প্রত্যাশামাফিক কল্যাণরাষ্ট্র পেতে আরো বিলম্ব হতে পারে।

৪.

রাষ্ট্র সংস্কারের যে সুযোগ এসেছে, এটাকে অবশ্যই কাজে লাগাতে হবে। ‘নিজে বাঁচলে বাপের নাম’—এই পুরোনো চিন্তা ও ধ্যান-ধারণা থেকে বের হয়ে নিজেদেরও পুনর্গঠিত হওয়া দরকার। নতুনের এই পথচলায় ঢাকাকেন্দ্রিক রাষ্ট্রের ধারণা থেকে বেরিয়ে গ্রামগঞ্জের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিয়ে গ্রামীণ জনপদের উৎপাদনমুখী কৃষি এবং কৃষকের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নিতে হবে। কৃষক এবং কৃষকের সন্তান নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে আর যেন বঞ্চিত না হন, তার বন্দোবস্ত থাকতে হবে সংস্কারের তালিকায়।

গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন ও কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে বিনা সুদে ঋণ ও ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার মতো এককালীন অর্থ-সহযোগিতার ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় সংস্কারের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কৃষি ও কৃষক অবহেলিত—এই বক্তব্য যেন আর শুনতে না হয়, সেজন্য বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মপরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন থাকা জরুরি।

বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি কৃষি। কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত প্রান্তিক কৃষকেরা এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের জন্য ফ্রি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকা বাঞ্ছনীয়। কৃষকেরাও স্বপ্ন দেখেন—তাদের সন্তানও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পালন করুক। কৃষকের অর্জিত সম্পদ যেন কেউ নানা ফন্দির মাধ্যমে আত্মসাৎ করতে না পারে এবং তার পণ্যের যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করা হয়—এটি একজন কৃষকের ন্যায্য দাবি । তাদের স্বপ্ন পূরণ ও দাবি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়ে বিপ্লবোত্তর নতুন বাংলাদেশ গড়ে উঠবে, এমন প্রত্যাশা করে দেশের মানুষ। ‘কৃষক হাসলে বাংলাদেশও হাসবে’—এই চিন্তা সবার মাথায় রেখে সামনের পথ পাড়ি দিতে পারলেই কেবল একাত্তর ও চব্বিশ সফল হতে পারে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, হাকিমপুর মহিলা কলেজ, দিনাজপুর

যাত্রাটা অব্যাহত রাখতে হবে

মাতারবাড়ী বন্দর যেন ভারতের স্বার্থে না হয়

ক্ষমতা নয়, প্রয়োজন সুশাসন

শিশু-কিশোররা ডুবছে অন্ধকারে

ইসলামি ব্যাংকিং ও ইসলামি অর্থায়ন এক নয়

বাংলাদেশ-চীন করিডোর: নতুন সম্ভাবনা

সারের বস্তা থেকে ‘গুপ্ত’র সতর্কবার্তা

প্রবাসী মা ও তার সন্তানের সংকট

মোদির ভারতের পরাশক্তি হওয়ার স্বপ্ন ও বাস্তবতা

তরুণদের চাকরির বাজারে এআইয়ের ছায়া