হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ঈদুল আজহার অর্থনীতি

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

ঈদুল আজহায় পশু উৎসর্গের মধ্যে রয়েছে বিশেষ আর্থসামাজিক তাৎপর্য। হজরত ইব্রাহিম (আ.) কর্তৃক পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার ইচ্ছা প্রকাশের মহান স্মৃতিকে স্মরণ করে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কোরবানির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে নিজের পাশব প্রবৃত্তি, অসৎ উদ্দেশ্য ও হীনম্মন্যতাকেই কোরবানি করা হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই বিশেষ ঈদ উৎসবে নিজের চরিত্র ও কুপ্রবৃত্তিকে সংশোধন করার সুযোগ আসে। জীবজন্তু উৎসর্গ করাকে নিছক জীবের জীবন-সংহার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আত্মশুদ্ধি ও নিজের পাশব প্রবৃত্তিকে অবদমন প্রয়াস প্রচেষ্টারই প্রতীকী প্রকাশ।

সামাজিক কল্যাণে সংশোধিত মানবচরিত্র বলের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কোরবানির মাংস গরিব আত্মীয়স্বজন পাড়া-প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করার যে বিধান তার মধ্যে নিহিত রয়েছে, তা সামাজিক সমতার মহান আদর্শ।

এই উৎসবকে ভারতীয় উপমহাদেশে ‘বক্রি ঈদ’ এবং ব্যবহারিক অর্থে ‘কোরবানির ঈদ’ও বলা হয়। বক্রি ঈদ বলার কারণ, এই ঈদে খাসি কোরবানি করা হয় আবার ‘বাকারা’ বা গরু কোরবানির ঈদ হিসেবেও ভাবা হয় । আরবি পরিভাষায় এ ঈদকে বলা হয় ‘ঈদুল আজহা’ বা আত্মত্যাগ বা উৎসর্গের উৎসব। সুতরাং ঈদুল আজহার তাৎপর্যগত বৈশিষ্ট্য বিচারে এই উৎসব পালনে গরু বা পালিত পশু খোদার সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ বা কোরবানি করা। আর এই কোরবানির আগে পবিত্র হজ পালনের প্রসঙ্গটিও স্বতঃসিদ্ধভাবে এ উৎসবের সঙ্গে এসে সংযুক্ত হয়। ঈদুল আজহার এই উৎসব হজ পালন ও পশু কোরবানি সূত্রে সমাজ এবং অর্থনীতিতে বিশেষ তাৎপর্যবাহী প্রভাব ও কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি করে ।

হজ পালন ঈদুল আজহা উৎসবের একটি বিশেষ অংশ। পবিত্র হজ অনুষ্ঠান পালনের মাধ্যমে বিশ্বের সব দেশের মুসলমানরা সমবেত হন এক মহাসম্মিলনে। ভাষা ও বর্ণগত, দেশ ও আর্থিক অবস্থানগত সব ভেদাভেদ ভুলে সবার অভিন্ন মিলনক্ষেত্র কাবা শরিফে একই পোশাকে, একই ভাষায় একই রীতি-রেওয়াজের মাধ্যমে যে ঐকতান ধ্বনিত হয়, তার চেয়ে বড় ধরনের কোনো সাম্যমৈত্রীর সম্মেলন বিশ্বের কোথাও হয় না। হজ পালনের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন রঙ ও গোত্রের মানুষের মধ্যে এক অনির্বাচনীয় সখ্য সংস্থাপিত হয়। বৃহত্তর সামাজিক কল্যাণের, যা অনুপম আদর্শ বলে বিবেচিত হয়।

ঈদুল আজহা উদযাপনে অর্থনীতিতে ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ, শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটে। এ উৎসবে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ব্যাপক আর্থিক লেনদেনসহ বহুমুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়, যা পুরো অর্থনীতি, তথা দেশজ উৎপাদ ব্যবস্থাপনায় শনাক্তযোগ্য প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

হজ পালন উপলক্ষে বৈদেশিক মুদ্রাসহ বিপুলসংখ্যক অর্থ লেনদেন হয়ে থাকে। বিগত বছরগুলোয় বাংলাদেশ থেকে হজযাত্রীদের মাধ্যমে বা দ্বারা প্রতিবছর গড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হতো। হাজিদের যাতায়াতসহ সেখানকার ব্যয় বৈদেশিক মুদ্রাতেই নির্বাহ হয়। এর সঙ্গে এই হজের ব্যবস্থাপনা ব্যয়েও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাংলাদেশি টাকা ও বিদেশি মুদ্রাব্যয়ের সংশ্লেষ থাকত। ব্যাংকিং সেক্টরে এ উপলক্ষে লেনদেন ও সেবা সূত্রে ব্যয় বাড়ত । এবার মহাসমরকালে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক কাটছাঁট সংকোচন প্রভাবক কার্যক্রম পরিচালিত হতে হচ্ছে।

ঈদুল আজহায় পশু কোরবানি উপলক্ষে জাতীয় অর্থনীতিতে এক ব্যাপক আর্থিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে থাকে। ২০২৫ সালে ঈদুল আজহার অর্থনীতি ছিল পিআরআইয়ের তথ্যমতে ৫৪ হাজার কোটি টাকা; সেবার ১ দশমিক ১০ কোটি গবাদি পশু জবাই হয়েছিল, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মতে, গবাদি পশু বিক্রি হয়েছিল ২৯ হাজার ৭০০ কোটি টাকার; বাকি ১৫-১৬ হাজার কোটি টাকা ছিল পরিবহন, পর্যটন এবং বিভিন্ন পণ্য বিক্রি থেকে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব মতে, এবার ২০২৬ সালে কোরবানির জন্য তৈরি প্রাণীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১৯ লাখ। মাংস বিক্রেতা সমিতির সূত্রমতে, যুদ্ধে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে আয় কমে যাওয়ার কারণে গবাদি পশুর চাহিদা প্রায় ৩০ শতাংশ কমবে বলে ধরে নেওয়ার পরও পশুর চাহিদা হবে ৮০ লাখেরও বেশি। চাহিদা কমে যাওয়ায়, পশু বিপণন, কোরবানি ও মাংস বিতরণ তিনস্তরেই স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনের আবশ্যকতায় কোরবানির পর প্রায় সমপরিমাণ পশু অবিক্রীত থেকে যাবে । এর ফলে খামারিসহ ক্ষুদ্র ব্যক্তি-উদ্যোগে বিনিয়োগ করা অর্থ উদ্ধার সীমিত হয়ে যাবে। এমন আপদকালীন পরিস্থিতিতে উদ্বৃত্ত পশুসম্পদকে বিকল্প কোনো ব্যবস্থাপনায় মাংস রপ্তানির পথপন্থা অনুসন্ধান উদ্যোগ রহিত হতে পারে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে অনলাইনে পশু কেনাবেচায়, এমনকি মাংস ব্যবস্থাপনার যে উদ্যোগ গৃহীত হচ্ছে, তা স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমাবে। তবে সে ব্যবস্থা পুরোপুরি গড়ে উঠতে সময় লাগছে। আশা করা যায়, আগামী বছরের মধ্যে দেশে এ ধরনের পদ্ধতি প্রক্রিয়াকরণ পরিবেশ গড়ে উঠবে। অনলাইন ব্যবস্থাপনায় যাতে প্রতারণা ও অব্যবস্থাপনা অনুপ্রবেশ না করতে পারে, সেদিকে সবাইকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে ব্যবস্থাপনাটি টেকসইকরণের স্বার্থে।

কোরবানি করা পশুর সরবরাহ ও কেনাবেচার শুমারি এবং পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায় চাঁদা, টোল, বখশিশ, চোরাকারবার, ফড়িয়া, দালাল, হাসিল, পশুর হাট ইজারা, চাঁদিয়া, বাঁশ-খুঁটির ব্যবসা, পশুর খাবার, পশু কোরবানি ও কসাইয়ের খরচ—এমনকি পশুর সাজগোজ বাবদও বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতবদল হয়ে থাকে—অর্থাৎ অর্থনীতিতে ফর্মাল-ইনফর্মাল ওয়েতে আর্থিক লেনদেন বা মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে যায়।

কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, বিক্রয় ও ব্যবহার উপলক্ষে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের এবং প্রতিষ্ঠানের কর্মযোজনা সৃষ্টি হয়। আমাদের অর্থনীতিতে বিশেষ করে, রপ্তানি-বাণিজ্যে, পাদুকাশিল্পে পোশাক, হস্তশিল্পে এক অন্যতম উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এই চামড়া সংগ্রহ সংরক্ষণ প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে ১০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ ও ব্যবসা জড়িত। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো প্রতিবছর প্রায় ৮০০ কোটি এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলো ১০০-১২০ কোটি টাকা বিশেষ ঋণ দিয়ে থাকে। চামড়া ব্যবসাকে উদ্ধারের কোনো বিকল্প নেই। পত্রিকান্তরে প্রতিবেদনে প্রকাশ, প্রতিবেশী দেশ থেকে বাকিতে গরু সরবরাহ করা হতো কম দামে কাঁচা চামড়া পাচারের প্রত্যাশায়। সেই চামড়া প্রক্রিয়াকরণ করে বেশি দামে বিদেশে রপ্তানির মুনাফা অর্জন হতো তাদের । এবার এ খাতে সে সুযোগ বাংলাদেশকে কাজে লাগাতে হবে। দেশে নিজেদের চামড়া প্রক্রিয়াকরণ এবং উপযুক্ত মূল্যে তা রপ্তানির প্রণোদনা সৃষ্টি করেই এ পরিস্থিতি থেকে নিষ্কৃতি লাভ ঘটতে পারে। লবণ চামড়া সংরক্ষণের একটি অন্যতম উপাদান। সরকারকে সাধারণত প্রায় ৪০ হাজার টন লবণ শুল্কমুক্ত আমদানির উদ্যোগ নিতে হয়, যাতে সিন্ডিকেট করে লবণের কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয় ।

কোরবানির পশুর মাংস আমিষজাতীয় খাদ্যের উপাদান এবং এই মাংসের বিলি বণ্টন প্রক্রিয়ায় রয়েছে আর্থসামাজিক তাৎপর্য-ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে বছরের একটি সময়ে সবাই আমিষপ্রধান এই খাদ্যের সন্ধান/সরবরাহ লাভ করে থাকে। মাংস রান্নার কাজে ব্যবহৃত মসলা বাবদ প্রায় ৩০০০ কোটি টাকার ব্যবসা হয়ে থাকে এ সময়ে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের সব লেনদেনে দেশের ব্যাংক খাতে ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য বাড়ত, তারল্য সংকটে পড়ে যেত আর্থিক খাত, কল মানি মার্কেট থেকে চড়া সুদে ধার-কর্জে নামত ব্যাংকগুলো । চামড়াঋণ থেকে শুরু করে ঈদের বোনাস বাবদ বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে যেত । এ সময় অবধারিতভাবে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পায়। ঈদ উপলক্ষে পরিবহন ব্যবস্থায় বা ব্যবসায় ব্যাপক কর্মতৎপরতা বেড়ে যায়। শহরের মানুষ আপনজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের জন্য গ্রামে ছুটে। এক মাস আগে থেকে ট্রেন-বাস-লঞ্চের টিকিট বিক্রির তোড়জোড় দেখে বোঝা যায় এর প্রসার ও প্রকৃতি। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ দামে ফর্মাল টিকিট আর ইনফর্মাল টাউট দালাল ও বিবিধ উপায়ে টিকিট বিক্রির সার্বিক ব্যবস্থা বোঝা যায়। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পরিবহন খাতে সাকল্যে ২০০০ কোটি টাকার বাড়তি ব্যবসা বা লেনদেন হয়েছিল । এটিও অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। কিন্তু হায়, এবার পরিস্থিতি ও পরিবেশ ভিন্ন হওয়ায় ঈদের অর্থনীতিতে এ খাতের অবদান কমে যাবে। তবে করোনার কারণে যে বিধিনিষেধ, তা পরিপালনে সবার স্বার্থেই সাশ্রয় ঘটবে অনেক বাড়াবাড়ি অপচয়-অপব্যয়ের ।

এটি মূলত অর্থনীতিতে মুদ্রা সরবরাহ, মুদ্রা লেনদেন ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের প্রসার, যা অর্থনীতির জন্য আয় সৃষ্টি করে। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং মুদ্রা সরবরাহে গতিশীলতা আসে। ঘূর্ণায়মান অর্থনীতির গতিপ্রবাহে যেকোনো ব্যয়ই অর্থনীতির জন্য আয় হিসেবে কাজ করে। দেশজ উৎপাদনেও এর অনিবার্য অবদান থাকে।

যেকোনো উৎসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনে। মানুষ নানা কর্মকাণ্ডে জেগে ওঠে এবং সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থায় একটি স্বতঃপ্রণোদিত পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এই পরিবেশকে স্বাভাবিক গতিতে চলতে দিতে পারলে এবং সামষ্টিক ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও পারঙ্গমতা দেখাতে পারলে মুদ্রা সরবরাহ, ব্যাংকের তারল্যের তারতম্য ও পরিবহন খাতের ব্যয়প্রবাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে। আর তা অর্থনীতির জন্য অর্থবহ অবদান রাখার সুযোগ সৃষ্টি করবে।

লেখক : সরকারের সাবেক সচিব এবং এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

প্রতিশ্রুতি ভাঙার রাজনীতি

কেন উত্থান হচ্ছে ককরোচ জনতা পার্টির

বরকতময় আরাফার দিন

সংকটে টেকনাফের সীমান্ত সুরক্ষা

ভারতের গোয়েন্দা উচ্চাকাঙ্ক্ষায় বিপর্যয়

শুধু দোষারোপ নয়, জানতে হবে করণীয়

জুলাইয়ের ব্যর্থতা মানে বাংলাদেশের ব্যর্থতা

ক্ষমতার অন্ধকূপে তারুণ্যের আগুন

ঈদুল আজহার সেকাল ও একাল

হজের অর্থনীতি : হজ তহবিল কেন প্রয়োজন