হামের প্রাদুর্ভাব
অঘটনের পৃথিবীতে হামে আক্রান্ত হয়ে একের পর এক অবুঝ শিশুদের অকালমৃত্যু এখন বাংলাদেশের মানুষের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। তিন মাস ধরে অক্সিজেনস্বল্পতায় ভোগা শিশু কোলে নিয়ে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটোছুটি দেখতে দেখতে সবাই ক্লান্ত। প্রকৃতির নিয়মে একেক সময় একেক রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে; মানুষকে তা মেনে নিতে হয়, মেনেও নেয়। কিন্তু সুরক্ষা উদ্যোগ নিতে রাষ্ট্র কিংবা দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের গাফিলতি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত করে তোলে। দোষীরা হয়তো একদিন কাঠগড়ায় দাঁড়াবে। কিন্তু যেসব বাবা-মায়ের কোলে পাঁচ বছরের কম বা কাছাকাছি বয়সি শিশু আছে, তাদের বসে থাকার সুযোগ নেই।
হাসপাতাল, চিকিৎসাব্যবস্থা, সরকারি উদ্যোগের হালচাল ইতোমধ্যে দেখা হয়ে গেছে। তাই অভিভাবকদের আগাম ও বাড়তি সতর্কতার বিকল্প নেই। ইতোমধ্যে গত তিন মাসে ৪৫০ জনের অধিক শিশু মৃত্যু বরণ করেছে। আক্রান্ত শিশুদের হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই তারা অনেকটা কাবু হয়ে পড়ছে। হাসপাতালে এলেও সময়মতো অক্সিজেন, আইসিইউ সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না।
আমার দুটো সন্তানই বয়স ১০ বছর অতিক্রম করেছে, কিন্তু পরিস্থিতির ভয়াবহতার কারণে প্রতিনিয়তই হাম পরিস্থিতির দিকে নতুন কিছু জানতে আগ্রহী থাকি। বিষয় নিয়ে রেডিও, টেলিভিশন, পত্রপত্রিকায় বেশি বেশি সচেতনতামূলক লেখালেখি ও অনুষ্ঠান হওয়া উচিত বলে মনে করি।
এই রোগ শুধু টিকার ঘাটতি নয়, এর সঙ্গে জড়িত ভিটামিন-এর অভাব, শিশুর ইমিউনিটি, মায়ের স্বাস্থ্য এবং শেষ পর্যন্ত শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি।
হাম কেন এত ভয়ংকর হয়ে উঠেছে
হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে ৯০%+ অরক্ষিত শিশু আক্রান্ত হতে পারে। ২০২৬ সালের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত দেশের প্রায় সব জেলায় ছড়িয়েছে—সন্দেহজনক আক্রান্ত ৫৬,০০০+ এবং মৃত্যু ৪৭৫-এর কাছাকাছি। আক্রান্তদের ৭৯%+ পাঁচ বছরের নিচের শিশু।
অভিভাবক হিসেবে আমাদের করণীয়
ভিটামিন-এ : শিশুর প্রাকৃতিক ঢাল
ভিটামিন-এ শিশুর চোখ, ত্বক ও শ্বাসনালির রক্ষা করে। এর অভাবে হামের জটিলতা বহুগুণ বেড়ে যায় এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে।
২০২৫ সালে ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইন পুরোপুরি হয়নি, যার ফলে শিশুদের মধ্যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। হামে আক্রান্ত শিশুকে অবশ্যই ভিটামিন-এ দিতে হবে—এটি মৃত্যু ৩৪-৫০ শতাংশ কমাতে পারে।
অভিভাবক হিসেবে আমরা কী করব
ইমিউনিটি গড়ে তোলা
শক্তিশালী ইমিউনিটির জন্য তিনটি জিনিস লাগে—
১. টিকা (হামসহ সব টিকা সময়মতো)
২. পুষ্টি (ভিটামিন-এ, জিংক, প্রোটিনসহ সুষম খাবার)
৩. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা (হাত ধোয়া, ভিড় এড়ানো)
অপুষ্টি ও ভিটামিন ঘাটতি ইমিউনিটি দুর্বল করে। তাই শুধু টিকা নয়, প্রতিদিনের খাবার ও যত্নও গুরুত্বপূর্ণ।
মাতৃস্বাস্থ্য : শিশুর প্রথম ঢাল
সুস্থ মা মানে সুস্থ শিশু।
বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে; কিন্তু এখনো অনেক ক্ষেত্রে প্রতিরোধযোগ্য কারণে মৃত্যু ঘটে। অভিভাবক হিসেবে স্ত্রীর স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া আমাদের দায়িত্ব।
শিশুমৃত্যু রোধে আমাদের ভূমিকা
হামের কারণে শিশুমৃত্যু বেড়েছে। অপুষ্টি ও ভিটামিন-এ ঘাটতি এই মৃত্যু বাড়িয়ে দেয়। আমরা অভিভাবকরা যদি সচেতন হই—
এই প্রাদুর্ভাব আমাদের শিখিয়েছে, প্রতিরোধ সবসময় চিকিৎসার চেয়ে ভালো। আমরা অভিভাবকরা যদি একসঙ্গে সচেতন হই, তাহলে আমাদের সন্তানদের এই ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা সম্ভব।