হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ভুল পরামর্শে কৃষকের সর্বনাশ

ড. এম আব্দুল মোমিন

জেমিনি দিয়ে ছবি তৈরি

আমাদের নাগরিক জীবনের অন্যতম উদ্বেগের নাম ‘ভেজাল’। এত দিন খাদ্যে ভেজালের সঙ্গে বর্তমানে যোগ হয়েছে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত ভেজাল বালাইনাশক প্রদানের প্রবণতা। বাংলাদেশের কৃষিতে নতুন এই প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। এই প্রবণতা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা ও নিরাপদতাকে সংকটে ফেলছে। আবার অন্যদিকে দেশের কৃষকদের সর্বস্বান্ত করছে। অথচ আমরা ভুলে গেছি রাসায়নিকের নিয়মতান্ত্রিক ব্যবহার হলো ওষুধ আর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানেই বিষ।

মানুষের বেঁচে থাকার জন্য মৌলিক উপাদান খাদ্য। খাদ্য আমাদের ক্ষুধা নিবারণ ও পুষ্টিসাধন করে। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ প্রাত্যহিক পুষ্টির জন্য যেসব খাদ্য খায়, তা কি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত? বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদনে সর্বোচ্চ পরিমাণে রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক ব্যবহার ব্যবহৃত হয়। প্রায় ৭৫ শতাংশ খাদ্য উৎপাদনের সময় মাত্রাতিরিক্ত বালাইনাশক এবং মাত্র ২৫ শতাংশ খাদ্য সংরক্ষণ, বাজারজাত ও প্রক্রিয়াজাতকরণের বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহৃত হয়। ধান, শাকসবজি, ফলমূল ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনে মাত্রাতিরিক্ত বালাইনাশক ব্যবহৃত হয়। আবার কাঁচা ফল পাকানো ও আকর্ষণীয় কালারের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথেফোন ও রাইপেন। ফলে, অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে অসহায় ভোক্তারা। অথচ আগে বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদন গোবর, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা, ছাই, লতাপাতা, সবুজ সার, কচুরিপানা, ফসলের উচ্ছিষ্টাংশ, রান্নাঘরের আবর্জনা ইত্যাদি পচিয়ে জৈব সার তৈরি করা হতো, যা ফসলের জমিতে ব্যবহারের ফলে উৎপাদিত হতো পুষ্টিকর বিষমুক্ত খাবার। খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে সঠিক রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক এবং ব্যবহার পদ্ধতি অনুসরণ না করার কারণে খাদ্যগ্রহণের আনন্দ এখন আতঙ্কে রূপ নিচ্ছে।

বালাইনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ছাড়াও আমাদের কৃষক ভাইরা প্রতিনিয়ত নানা কৃষি রাসায়নিকের মিশ্রণের সমন্বয়ে ‘টোটকা’ বালাইনাশক তৈরি করছেন, তারা এর নাম দিয়েছেন ককটেল। এই ককটেল বাংলাদেশের কৃষির জন্য এক মরণব্যাধি। অনেক সময় কৃষকদের আগ্রহে, আবার অনেক সময় বালাইনাশক বিক্রেতাদের পরামর্শে তারা জমিতে ককটেল স্প্রে করছেন। তারা সাধারণত কীটনাশক, ছত্রাকনাশক, মাকড়নাশক, হরমোন (ভিটামিন) এবং মাইক্রো নিউট্রিয়েন্ট বা অনুখাদ্যগুলো সম্মিলিতভাবে মিশিয়ে গাছে স্প্রে করেন। অথচ অনেক ক্ষেত্রে এগুলোর কোনো প্রয়োজনীয়তাই নেই। কিন্তু এগুলো প্রতিটিই আলাদা আলাদা রাসায়নিক, যা বিক্রিয়া করে নতুন যৌগ হয়, যা ফসল ও পরিবেশের জন্য অনেক সময় ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের দেশে কৃষি রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত মিশ্রণ ফসলে প্রয়োগ করার এই প্রবণতা ধীরে ধীরে কৃষি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। গবেষণা থেকে জানা যায়, দেশের প্রায় ২৭ শতাংশ কৃষক কীটনাশকজনিত অসুস্থতায় ভুগছে। এর মধ্যে রয়েছে—চোখ জ্বালা, ত্বকে ফোসকা, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, ক্যানসার, জন্মগত ত্রুটি, প্রজননজনিত সমস্যা ও স্নায়ুবিক জটিলতা।

আমাদের দেশের চাষিরা সাধারণত অনুকরণপ্রিয়, অন্যের দেখাদেখি কৃষিচর্চা করেন। তাদের অনভিজ্ঞতা ও অসচেতনতাকে পুঁজি করে অনেক অসাধু বিক্রেতা চাষিকে ককটেল বানানোর পরামর্শ দেন, কারণ তারা বেশির ভাগ সময়ই ফসলের সমস্যা ও রোগের কারণ (রোগ-পোকা-মাকড়) শনাক্ত করতে পারে না। তাই সবগুলো বিষ একসঙ্গে স্প্রে করতে বলেন। যাতে তাদের ধারণা, একটা না একটা তো কাজ করবেই। অনেক বিক্রেতা আবার আসল-নকল, ভালো-মন্দ—দুই ধরনের বালাইনাশক দিয়ে থাকে, পুশ সেল করেন। বিক্রেতা জানে শুধু ভালোটাই কাজ করবে, অন্যগুলো নয়। অনেক সময় বিষে ভেজাল থাকায় বা সক্রিয় উপাদান কম মাত্রায় থাকায় একক বিষ কাজ করে না, তাই তারা কয়েকটি একত্রে মিশিয়ে স্প্রে করেন।

একটি উদাহরণ দিলে আরো পরিষ্কার হবে। ঈশ্বরদীর কৃষক আমজাদ (ছদ্মনাম) ৪০ বছর ধরে কৃষিকাজ করছেন। এক সপ্তাহ আগে তার কাঁকরোলক্ষেতে অস্বাভাবিক পাতা কোঁকড়ানো লক্ষণ দেখে পরিচিত স্থানীয় সার-কীটনাশক বিক্রেতার কাছে যান, বিক্রেতার পরামর্শে জমিতে প্রথমে সার দেন, কাজ হয় না। পরে একই জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ করেও তেমন কোনো সুফল পাননি। তার অভিযোগ, লাইসেন্সবিহীন কিছু মুদি দোকানি ভেজাল সার ও কীটনাশক বিক্রি করছেন, যা ফসলের ক্ষতি করছে। এতে তার মতো কৃষকরা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অথচ এসব প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না! আমজাদ হোসেনের মতো দেশের লাখো কৃষক ভেজাল সার ও কীটনাশকের কারণে প্রতারিত হচ্ছেন প্রতিদিন।

ভেজাল, টোটকা, অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিতভাবে রাসায়নিক সার এবং বালাইনাশক ব্যবহারের কারণে মাটি, বায়ু, পানি ও খাদ্যদূষণ হচ্ছে। এছাড়া মাটির অভ্যন্তরের অণুজীবের কার্যাবলি ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছে। উপকারী পোকামাকড়, কেঁচো, ব্যাঙ, গুইসাপসহ নানা ধরনের জলজ প্রাণী মারা যাচ্ছে। এতে কৃষির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। মাত্রাতিরিক্ত বালাইনাশক ব্যবহারের কারণে স্বল্পস্থায়ী ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবে মানুষ বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন।

ফসলে ব্যবহারের জন্য স্বল্পস্থায়ী, মধ্যস্থায়ী ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের বিভিন্ন গ্রুপের বালাইনাশক রয়েছে। এগুলো ফসলের ধরন, জীবনকাল ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশের কৃষকদের বালাইনাশকের বিষক্রিয়া প্রভাব সম্পর্কে ভালো ধারণা না থাকার কারণে তারা দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের কীটনাশকগুলো এলোপাতাড়িভাবে শাকসবজি ও ফলে স্প্রে করেন, যা ঠিক নয়। তারা প্রয়োজনের তুলনায় একাধিকবার—অর্থাৎ ১০ থেকে ১৫ বার স্প্রে করেন। অনেক সময় দেখা যায়, স্প্রে করার কয়েক ঘণ্টা পর এসব বাজারে বিক্রি করা হয়। এ কারণে খাদ্য বিষাক্ত হয়। ভোক্তারা না জেনে এসব বিষাক্ত পণ্য কেনেন এবং খাওয়ার পর বিভিন্ন ধরনের অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হন। কৃষকের অসচেতনতা ও অজ্ঞতার খেসারত দিতে হয় ভোক্তাকে।

সরকারি হিসাবে দেশে বালাইনাশক বাজার প্রায় ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা, যার সিংহভাগ আমদানিনির্ভর। প্রতিবছর ফসলে ব্যবহারের জন্য প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টন বালাইনাশক আমদানি করা হয়। অনুমোদিত আমদানিকারক ও উৎপাদনকারী কোম্পানির সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৩০০-এর মতো। এই বিশাল পরিমাণ বালাইনাশক পরিবেশ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। সরকারের নীতিনির্ধারণী ফোরামে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

আরেকটি বিষয় হলো জৈব কৃষিকে অবহেলা করে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক কৃষির ওপর নির্ভরতার কারণে খাদ্যের বিষাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত বালাইনাশক ব্যবহারের ফলে কৃষকের অজ্ঞতার কারণে খাদ্যের মধ্যে কিছু বিষাক্ত পদার্থ থেকে যায়, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আবার সবজি-ফল মাঠে থাকা অবস্থায় পোকা-রোগ দমনে মাত্রাতিরিক্ত বালাইনাশক, সংগ্রহোত্তর পাকার জন্য কার্বাইড এবং পচনরোধের জন্য ফরমালিন ব্যবহারের কারণে এসব ফসল বিষটোপে পরিণত হয়। আমরা অধিকাংশ ফল টাটকা এবং কিছু সবজি কাঁচা অবস্থায় সালাদ হিসেবে ও সব ধরনের শাকসবজি অল্প আঁচে রান্না করে খাই। এগুলো খাওয়ার সঙ্গে কিছু পরিমাণ বিষ খাওয়া হয়। এ কারণে বালাইনাশক প্রভাবের ঝুঁকি অনেক বেশি।

কিন্তু ফসলে অপ্রয়োজনীয় ও মাত্রাতিরিক্ত বালাইনাশক ব্যবহার প্রতিরোধের উপায় কী? মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার ও ভেজাল প্রতিরোধে বাংলাদেশে আইন থাকলেও এগুলোর যথাযথ প্রয়োগ নেই। কিন্তু আইনগুলোর অধীনে সামান্য কিছু জরিমানা ও দু-এক মাসের কারাদণ্ড ছাড়া বড় কোনো শাস্তি দেওয়া হয় না। ভেজাল পণ্য উৎপাদন রোধে বিশুদ্ধ খাদ্য আইনে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তির বিধান আছে। এ আইন করা হয় ২০০৫ সালে। এর আগে একই নামে একটি অধ্যাদেশ ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে এ আইনে এখন পর্যন্ত কোনো অপরাধীকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়নি। এছাড়া খাদ্যে ভেজাল ও রাসায়নিক মেশানো নিয়ে দণ্ডবিধি ১৮৬০, বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ ১৯৫৯, বিশুদ্ধ খাদ্য নীতিমালা ১৯৬৭, বিশুদ্ধ খাদ্য আইন (সংশোধিত) ২০০৫, ভ্রাম্যমাণ আদালত অধ্যাদেশ ২০০৯, পয়জনস অ্যাক্ট ১৯১৯, ভোক্তা অধিকার আইন-২০০৯-সহ বাংলাদেশে ভেজাল প্রতিরোধে বহু আইন আছে। কিন্তু এসব আইনের তেমন প্রয়োগ নেই। আইন প্রয়োগের মাধ্যমে যদি শাস্তি নিশ্চিত করা হয়, তাহলে ভেজাল রোধ করা সম্ভব হবে। ‘বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪’-এর ২৫(গ) ধারায় খাদ্যে ভেজালের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এসব অব্যবহৃত আইন ব্যবহার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

ভেজাল বালাইনাশক ও ভুল পরামর্শে ফসল নষ্ট না করতে চাইলে কৃষক ভাইদের ডিলারের পরামর্শে বালাইনাশক ব্যবহার না করে অবশ্যই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পরামর্শ নিতে হবে। সঠিকভাবে রোগ, পোকামাকড় আক্রমণ নিশ্চিত হয়ে অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে। এ ব্যাপারে কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদেরও কাজ করতে হবে।

লেখক : কৃষিবিদ ও কৃষি সাংবাদিক, ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)

ই-মেইল : smmomin80@gmail.com

চব্বিশ, নব্বই, উনসত্তর

ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার

স্কুলে বিকালে ক্লাস নয়, খেলাধুলার সুযোগ দিন

রাষ্ট্রহীন সীমান্ত ও আরাকান আর্মি

শত্রুর সন্ধানে ইসরাইলের নিরন্তর যাত্রা

ওরা জাতির কলিজায় আঘাত দিয়েছে

মেডিকেল খাতে অস্থিরতা কেন

লুক ইস্ট পলিসি করিডোর ও সম্ভাবনার দুয়ার

‘মেড ইন ইন্ডিয়া’র আসল অর্থ যখন ‘মেড ইন চায়না’

রাজনীতিতে ব্যক্তি-বন্দনার অসুস্থ সংস্কৃতি