হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

বিরোধী রাজনীতিতে জামায়াতের নতুন সমীকরণ

সরদার ফরিদ আহমদ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। একসময় সমালোচনা ও নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এখন প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সংসদে দলটির ভূমিকা গতানুগতিক বিরোধী দলের মতো নয়।

শনিবারও আমরা দেখলাম সদ্যসমাপ্ত মালয়েশিয়া ও চীন সফরে ‘অভূতপূর্ব সাফল্যের’ জন্য প্রধানমন্ত্রী ও সংসদনেতা তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করেছে জাতীয় সংসদ। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান প্রস্তাবটি সমর্থন করে বক্তব্য দিয়েছেন।

পরে সর্বসম্মতিক্রমে এই প্রস্তাব গৃহীত হয়। সরকারকে শুধু বিরোধিতা করার রাজনীতি জামায়াত করছে না। আবার অন্ধ সমর্থনের পথেও হাঁটছে না। প্রয়োজন হলে সহযোগিতা করছে। প্রয়োজন হলে কঠোর সমালোচনাও করছে। এই অবস্থানই এখন তাদের রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যগুলো লক্ষ করলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। তিনি সংঘাতের রাজনীতি নয়, নীতিগত বিরোধিতার কথা বলেন। সরকারের ভালো উদ্যোগকে সমর্থন দেন। আবার বিচ্যুতি দেখলে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন। দলটি নিজেদের একটি দায়িত্বশীল বিরোধী শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।

শুক্রবার অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সভার দিকে তাই রাজনৈতিক অঙ্গনের বিশেষ নজর ছিল। অনেকেই মনে করেছিলেন, দলটি হয়তো সরকারের বিরুদ্ধে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। জামায়াত আন্দোলনের বদলে প্রস্তাবের রাজনীতি বেছে নিয়েছে। সাত দফা দাবি দিয়েছে। সরকারকে সতর্ক করেছে। আবার সমাধানের পথও দেখিয়েছে। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক প্রস্তাব নয়, এটি ভবিষ্যৎ রাজনীতিরও একটি বার্তা।

জামায়াতের সাত দফা দাবি বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। দলটি এমন ইস্যু বেছে নিয়েছে, যেগুলো নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ রয়েছে। দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, বিচার, প্রশাসন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন, সীমান্ত নিরাপত্তা, শিক্ষকদের বেতন— এ সবই জনজীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। অর্থাৎ, জামায়াত আদর্শগত রাজনীতির বাইরে এসে এখন জনস্বার্থের রাজনীতি সামনে আনতে চাইছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন। এটি নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য নয়। বরং তারা বলতে চাইছে, রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেটি এখন বাস্তবায়নের সময় এসেছে। এই দাবির মধ্যেই সরকারের প্রতি একটি বার্তা রয়েছে। সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসে যদি সেই সংস্কারই বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে জনগণের আস্থা নষ্ট হবে।

জামায়াতের দ্বিতীয় বড় ইস্যু দ্রব্যমূল্য। এটি এখন দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংকটগুলোর একটি। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের আয় বাড়ছে না। কিন্তু ব্যয় বাড়ছে প্রতিদিন। এই বাস্তবতায় বাজার সিন্ডিকেট ভাঙার দাবি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ মানুষ এখন বক্তৃতা শুনতে চায় না। বাজারে স্বস্তি চায়।

আইনশৃঙ্খলা নিয়ে জামায়াতের বক্তব্যও বাস্তবতার সঙ্গে মিল রয়েছে। চাঁদাবাজি, দখল, হত্যা, ধর্ষণ-এসব নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। দলটি দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে। এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। এটি সরকারকে চপেও ফেলবে। কারণ অপরাধীর পরিচয় রাজনৈতিক হওয়া উচিত নয়। অপরাধীর পরিচয় একটাই-সে অপরাধী।

সীমান্ত ইস্যুতে জামায়াতের অবস্থানও লক্ষণীয়। বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। কথিত 'পুশ ইন' নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধও রয়েছে। এসব বিষয়ে সরকারকে আরও সক্রিয় কূটনীতি পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছে দলটি। এটি এমন একটি বিষয়, যেখানে প্রায় সব রাজনৈতিক দলের অবস্থান কাছাকাছি। জাতীয় স্বার্থে শক্ত অবস্থান জনগণ সবসময়ই প্রত্যাশা করে।

সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সংক্রান্ত প্রস্তাবে। এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, জামায়াতের এখন মূল লক্ষ্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এর পেছনে বাস্তব কারণও রয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেবল জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের বিষয় নয়। এটি রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্র। তৃণমূলে নেতৃত্ব তৈরির সুযোগ। ভোটব্যাংক শক্তিশালী করার উপায়। জামায়াত সম্ভবত সেই বাস্তবতা খুব ভালোভাবেই বুঝেছে।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলটির সাংগঠনিক শক্তি আগের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান। বিশেষ করে তরুণদের একটি অংশের মধ্যে দলটির গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে আসছে। শিক্ষাঙ্গনেও ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপির প্রতি তরুণদের আগ্রহ আগের মতো নেই-এমন বিশ্লেষণও বিভিন্ন মহলে করা হচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের বিএনপি টানতে পারছে না বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আর এটা সবার জানা যেকোনো নির্বাচনে তরুণরাই মাঠে মূল ভূমিকা রাখে।এই বাস্তবতায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন জামায়াতের জন্য রাজনৈতিক শক্তি পরীক্ষার সবচেয়ে বড় মঞ্চ হতে পারে।

স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে জামায়তে ইসলামীর ভোটের একটি নিজস্ব হিসাবও রয়েছে। দলটি মনে করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যারা তাদেরকে ভোট দিয়েছেন সেই ভোটাররা তাদের সঙ্গেই রয়েছেন। ছেড়ে যাননি এবং যাবেনও না। স্থানীয় নির্বাচনে তাদের ভোটের সংখ্যার আরো বাড়তে পারে এমনও আশা করছে দলটি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও সংখ্যালঘুদের যে একচেটিয়া ভোট পেয়েছিল বিএনপি - সেটি স্থানীয় নির্বাচনে ভাগাভাগি হয়ে যাবে। এতে তারা সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে বলে মনে করছে জামায়াত।

এসব কারণেই দলটি দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন চাচ্ছে। এটি কেবল একটি নির্বাচন নয়। এটি ভবিষ্যৎ জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতিও।

প্রশাসনের দলীয়করণ নিয়ে জামায়াতের বক্তব্যও গুরুত্বের দাবিদার। বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নতুন নয়। প্রায় প্রতিটি সরকারই একই অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছে। ফলে প্রশাসন, বিচার বিভাগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার দাবি নিঃসন্দেহে একটি যৌক্তিক দাবি। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী না হলে গণতন্ত্রও শক্তিশালী হয় না।

বেসরকারি স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের বিষয়ে দলটির অবস্থানও উল্লেখযোগ্য। এটি হয়তো বড় রাজনৈতিক ইস্যু নয়। কিন্তু এটি একটি বড় সামাজিক বাস্তবতা। দীর্ঘদিন ধরে বেতন-বৈষম্য, অবসর সুবিধা এবং আর্থিক অনিশ্চয়তায় ভুগছেন হাজার হাজার শিক্ষক। তাদের দাবিকে রাজনৈতিক আলোচনায় নিয়ে আসাও গুরুত্বপূর্ণ।

সবশেষে এসেছে জুলাইয়ের গণহত্যার বিচার। জামায়াত বলেছে, বিচার দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হতে হবে। বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতি জনমনে উদ্বেগ তৈরি করছে। এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রয়েছে। বিচার বিলম্বিত হলে বিচার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। আবার তাড়াহুড়ো করে বিচার করলেও ন্যায়বিচার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে দ্রুততার সঙ্গে আইনের শাসন নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

জামায়াতের সাত দফা বিশ্লেষণ করলে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার হয়। দলটি এখন নিজেদের কেবল একটি ইসলামপন্থী দল হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না। তারা রাষ্ট্র পরিচালনার বিকল্প নীতিমালা উপস্থাপন করতে চাইছে। অর্থনীতি নিয়ে বলছে। প্রশাসন নিয়ে বলছে। কূটনীতি নিয়ে বলছে। শিক্ষা নিয়ে বলছে। বিচার নিয়ে বলছে। এটি একটি কৌশলগত পরিবর্তন।

রাজনীতিতে শুধু প্রতিবাদ করে দীর্ঘদিন টিকে থাকা যায় না। বিকল্পও দেখাতে হয়। জামায়াত এখন সেই বিকল্পের ভাষা তৈরি করার চেষ্টা করছে।

তবে শুধু প্রস্তাব দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। যে দল অন্যদের জবাবদিহির আওতায় আনতে চায়, সেই দলকেও জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। তাদের প্রস্তাব বাস্তবায়নের রূপরেখা কী? অর্থায়নের উৎস কী? প্রশাসনিক সংস্কারের পদ্ধতি কী? এসব প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর দিতে হবে। কারণ জনগণ এখন শুধু স্লোগানে বিশ্বাস করে না। তারা পরিকল্পনা দেখতে চায়।

সরকারের জন্যও এই সাত দফা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ এগুলোর বেশির ভাগই জনজীবনের বাস্তব সমস্যা। সরকার যদি এসব বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে না পারে, তাহলে বিরোধী দলের রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

গণতন্ত্রে একটি কার্যকর বিরোধী দল সরকারের জন্য যেমন চাপ সৃষ্টি করে, তেমনি রাষ্ট্রের জন্যও ভারসাম্য তৈরি করে। সেই দায়িত্ব পালন করতে হলে বিরোধী দলকে যেমন দায়িত্বশীল হতে হয়, তেমনি সরকারকেও সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতা রাখতে হয়।

বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে মুখোমুখি সংঘাতের রাজনীতি দেখেছে। সেই রাজনীতি রাষ্ট্রকে খুব বেশি লাভ দেয়নি। এখন প্রয়োজন নীতি, যুক্তি এবং কর্মপরিকল্পনার প্রতিযোগিতা। জামায়াতের সাত দফা সেই প্রতিযোগিতার একটি সূচনা হতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত জনগণ বিচার করবে কথায় নয়, কাজে। সরকার যেমন তার কর্মদক্ষতা দিয়ে মূল্যায়িত হবে, তেমনি বিরোধী দলও মূল্যায়িত হবে তাদের দায়িত্বশীলতা, বাস্তবসম্মত প্রস্তাব এবং জনগণের আস্থা অর্জনের সক্ষমতার ভিত্তিতে।বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য সেটিই হবে সবচেয়ে ইতিবাচক পথ।

লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা

দুবাইয়ের খাঁচায় এক ‘ফ্রাংকেনস্টাইন’ এবং একটি চিঠির হাহাকার

রিজার্ভ চুরি : আর কত সময়ক্ষেপণ

স্মৃতির পাতায় শিল্পের মহিরুহ মুস্তাফা মনোয়ার

ডিজিটাল পর্দার ফাঁদে শিশু : সংকট ও করণীয়

তিস্তায় বন্ধুত্বের হাত চীনের

অভ্যন্তরীণ অভিবাসন : সংকটে নগর অবকাঠামো

ড. ইউনূস ‘ভিলেন’ নাকি ‘ক্রান্তিকালীন নায়ক’

গণতন্ত্রের ভূত-ভবিষ্যৎ

ঘোষক বিতর্ক এবং ইন্দিরা গান্ধী