হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

রিজার্ভ চুরি : আর কত সময়ক্ষেপণ

ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন

এক দশক ধরে বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় ক্ষত হয়ে আছে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঘটে যাওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা। প্রায় ৮১ মিলিয়ন ডলারের এই সাইবার ডাকাতি শুধু আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার তহবিলি আঘাত করেনি, বরং আমাদের আর্থিক নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সততাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সম্প্রতি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের খসড়া চার্জশিট এবং তা নিয়ে তৈরি হওয়া নানামুখী আলোচনা-বিতর্ক এই মামলাটিকে আবার সংবাদপত্রের শিরোনামে নিয়ে এসেছে। ২০২৬ সালের এ সময় দাঁড়িয়ে এই সংকটের একটি চূড়ান্ত, স্বচ্ছ এবং ন্যায়সংগত সমাধান দেশের প্রতিটি নাগরিকের যৌক্তিক দাবি।

একটি স্পর্শকাতর আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধের মামলার ভিত্তি তৈরি হয় নিখুঁত ডিজিটাল ফরেনসিক ও তথ্য-উপাত্তের ওপর। এই চুরির পেছনে যে সুইফট (SWIFT) সিস্টেমের অপব্যবহার এবং আন্তঃদেশীয় হ্যাকার চক্রের সংশ্লিষ্টতা ছিল, তা আজ প্রমাণিত। কিন্তু মামলার আসল জোর থাকবে তখনই, যখন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সব তথ্য-উপাত্তকে সুচারুভাবে বিশ্লেষণ করে একটি অকাট্য চার্জশিট আদালতে পেশ করা যাবে। দুর্বল বা তাড়াহুড়ো করে তৈরি করা কোনো আইনি নথি যেন অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ না করে দেয়, সেদিকে তদন্ত সংস্থাকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রথম শর্তই হলো—অপরাধের গভীরতা মেপে অপরাধীকে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে বিচারের আওতায় আনা।

চুরি হওয়া ১০১ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে শ্রীলঙ্কা থেকে ২০ মিলিয়ন এবং ফিলিপাইন থেকে ১৫ মিলিয়ন ডলার উদ্ধার করা সম্ভব হলেও, বাকি ৬৬ মিলিয়ন ডলার এখনো ফিলিপাইনের আর্থিক ব্যবস্থার গোলকধাঁধায় হারিয়ে আছে। নিউ ইয়র্কের ফেডারেল কোর্ট এবং সিঙ্গাপুরের আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে বর্তমানে যে আইনি লড়াই চলছে, তাতে বাংলাদেশকে আরো বেশি আক্রমণাত্মক ও তৎপর হতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের যে নতুন ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে, তাকে কাজে লাগিয়ে কূটনৈতিক ও আইনি চাপ দ্বিগুণ করা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, এই অর্থ এ দেশের সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা, তাই এর শেষ সেন্টটি উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত তৎপরতা থামানো চলবে না।

এই মামলার সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং বিতর্কিত দিকটি হলো—‘ইনসাইড জব’ বা ভেতরের যোগসাজশের অভিযোগ। চুরির পর ২৪ দিন তথ্য গোপন রাখার ঘটনাটি সাধারণ মানুষের মনে যে গভীর সন্দেহের জন্ম দিয়েছিল, তা দূর করার একমাত্র উপায় হলো একটি সম্পূর্ণ ‘আড়ালমুক্ত ও নিরপেক্ষ তদন্ত’। কোনো ব্যক্তি কত বড় পদে আসীন ছিলেন বা কার রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব কতখানি, তা বিবেচনা না করে অপরাধীকে শুধুই ‘অপরাধী’ হিসেবে দেখতে হবে। ‘প্রশাসনিক গাফিলতি’র আড়ালে কেউ যেন তার আসল ‘ফৌজদারি অপরাধ’ লুকিয়ে পার পেয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করা তদন্তকারীদের নৈতিক দায়িত্ব। প্রভাবশালীদের আড়াল করার পুরোনো সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে, এই তদন্তের কোনো আইনি মূল্য থাকবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের চরম খামখেয়ালিপনা

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি রিজার্ভ চুরির ঘটনাটি ঘটলেও বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়, বিশেষ করে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে প্রায় ২৪ দিন সম্পূর্ণ গোপন রেখেছিল। মার্চ মাসের শুরুতে ফিলিপাইনের একটি পত্রিকার রিপোর্টের মাধ্যমে বিষয়টি প্রথম জনসমক্ষে আসে। এর পেছনে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার বিষয়টি উঠে আসে। চুরির পরপরই সুইফট কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে এক ধরনের ব্লেম-গেম (একে অন্যকে দোষারোপ) শুরু হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক দাবি করছিল সুইফটের টেকনিশিয়ানদের ভুলের কারণে লুপহোল তৈরি হয়েছে আর সুইফট বলছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি নিরাপত্তা আদিম যুগের। এই ২৪ দিনের তথ্য গোপনের ফলে বাংলাদেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গিয়েছিল। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবুল মুহিত পরে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক এই তথ্য গোপন করে চরম ধৃষ্টতা দেখিয়েছে।’ যদি প্রথম দিনই ফিলিপাইন সরকারকে অফিশিয়ালি জানানো হতো, তবে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরসিবিসির ওই শাখাটির লেনদেন ফ্রিজ করতে পারত। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই গোপনীয়তা ও দ্বিধাদ্বন্দ্বের সুযোগেই হ্যাকাররা এবং আরসিবিসি ব্যাংকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা মাত্র কয়েক দিনে পুরো ৮১ মিলিয়ন ডলার ফিলিপাইনের ক্যাসিনো ও জুয়ার বোর্ডে পাচার করে দিতে সক্ষম হয়, যা পরে উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বিভিন্ন নাগরিক সমাজ এবং ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের অভিযোগ—শুরু থেকেই মামলার তদন্তে একধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ছিল। সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনটি কখনোই প্রকাশ করা হয়নি। সমালোচকদের মতে, ব্যাংক খাতের শীর্ষপর্যায়ের কিছু ব্যক্তিকে আইনি সুরক্ষা দিতে বা প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি রক্ষার স্বার্থেই পর্দার আড়ালে সমঝোতা হয়ে থাকতে পারে, যার প্রতিফলন ঘটেছে খসড়া চার্জশিটে। সিআইডি যেহেতু ১৯ জুনের (২০২৬) বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছে, গণমাধ্যমে আসা নামগুলো তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়, তাই এটি এখনো নিশ্চিত নয় যে চূড়ান্ত চার্জশিটে শেষ পর্যন্ত কারা থাকছেন। তবে আইনি মারপ্যাঁচে ‘প্রশাসনিক গাফিলতি’কে ‘ফৌজদারি অপরাধ’ হিসেবে প্রমাণ করতে না পারাটাই অনেক বড় নামের বাদ পড়ার প্রধান টেকনিক্যাল কারণ।

অন্তর্বর্তী সরকারের আইনি প্রক্রিয়া

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলাটি বিগত প্রায় ১০ বছর ধরে একধরনের স্থবিরতার মধ্যে ছিল। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এই মামলার তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অর্থ উদ্ধারের আইনি প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু দৃশ্যমান গতিশীলতা ও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। অন্তর্বর্তী সরকারের এই প্রক্রিয়ায় প্রধান কৃতিত্ব ও পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়ে—২৪ আগস্ট পূর্ববর্তী সরকারের আমলে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ রেকর্ডসংখ্যক বার পিছিয়েছিল, যা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সিআইডিকে কোনো রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক চাপ ছাড়া স্বাধীনভাবে কাজ করার নির্দেশ দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় সিআইডি দীর্ঘদিনের সংগৃহীত ডিজিটাল ফরেনসিক তথ্য, এফবিআইয়ের দেওয়া রিপোর্ট এবং বিভিন্ন দেশের আইনি নথি পর্যালোচনা করে তদন্তের একদম চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পেরেছে। জুলাই বিপ্লবের পূর্ববর্তী সরকারের সময় ব্যাংক খাতের শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তা বা নীতিনির্ধারকদের দায়বদ্ধতার আওতায় আনার ক্ষেত্রে একধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অনীহা বা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার নীতির কারণে তদন্ত সংস্থাগুলো এখন যেকোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রশাসনিক অবহেলা বা অপরাধমূলক গাফিলতি খতিয়ে দেখার সাহস পাচ্ছে। সম্প্রতি গণমাধ্যমে সিআইডির খসড়া চার্জশিট নিয়ে যে আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, তা মূলত এই স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে পারার পরিবেশেরই একটি বহিঃপ্রকাশ। নিউ ইয়র্কের ফেডারেল কোর্ট এবং সিঙ্গাপুরের আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকের বিরুদ্ধে যে মামলাগুলো ঝুলে ছিল, অন্তর্বর্তী সরকার সেগুলো পুনরুজ্জীবিত করেছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সুখ্যাতি এবং তার সরকারের প্রতি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে আন্তর্জাতিক আইনি সংস্থা ও বিদেশি তদন্ত সংস্থাগুলোর (যেমন এফবিআই) সঙ্গে সমন্বয় জোরদার হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান আইনি দল এখন ফিলিপাইনের ওপর বাকি ৬৬ মিলিয়ন ডলার ফেরত দেওয়ার জন্য আগের চেয়ে অনেক বেশি জোরালো কূটনৈতিক ও আইনি চাপ সৃষ্টি করতে পারছে।

বিএনপির অবস্থান

২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির সময়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ সরকার। স্বাভাবিকভাবেই, বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির ভূমিকা ছিল রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া জানানো, জবাবদিহি দাবি করা এবং জনমত গঠন করা। বিএনপি রিজার্ভ চুরির ঘটনাটিকে সরকারের চরম ব্যর্থতা হিসেবে আখ্যা দিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানিয়েছিল। বিএনপি বরাবরই দাবি করে আসছিল, ভেতরের কোনো যোগসাজশ ছাড়া এত বড় হ্যাকিং বা চুরি সম্ভব নয়, (যুগান্তর, ১৬ মার্চ, ২০১৬)। তৎকালীন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক সংবাদ সম্মেলনে রিজার্ভ চুরির ঘটনা ও তা ২৪ দিন গোপন রাখার তীব্র সমালোচনা করে এটিকে ‘রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন এবং প্রকৃত তথ্য জনগণের সামনে আনতে শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানান (ডেইলি স্টার, ১৬ মার্চ, ২০১৬) । ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর রিজার্ভ চুরির মামলার তদন্তে সিআইডি ও নতুন করে গঠিত কমিটির তৎপরতা বাড়লে বিএনপির সিনিয়র নেতারা গণমাধ্যমে বক্তব্য দেন। তারা বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সাবেক আইজিপি বা বিশেষ ব্যক্তিদের বাঁচাতে তদন্ত প্রতিবেদন দফায় দফায় পিছিয়েছে। এখন নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের মুখোশ উন্মোচিত হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন (প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার, সেপ্টেম্বর/অক্টোবর, ২০২৪) ।

সরকারের করণীয়

যেহেতু বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার ১০ বছর পেরিয়ে গেছে এবং এখন বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় রয়েছে, তাই শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য বা দাবি তোলার সুযোগ আর নেই। এখন সরকারকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও আইনি সদিচ্ছা ব্যবহার করে এ ঘটনার একটি যৌক্তিক এবং চূড়ান্ত পরিণতি টানতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই স্পর্শকাতর বিষয়ে বর্তমান বিএনপি সরকারের জরুরি ভিত্তিতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেওয়া উচিত।

ক. সিআইডির চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনটি অবিলম্বে আলোর মুখে আনা উচিত। বিগত এক দশকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ আদালতে প্রায় ১১১ বারেরও বেশি পিছিয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে একটি রেকর্ড। ঘটনার ২৪ দিন তথ্য গোপন রাখার পেছনে তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের কী ভূমিকা ছিল, তা স্পষ্ট করে একটি বিস্তারিত ‘শ্বেতপত্র’ প্রকাশ করা দরকার।

খ. আন্তর্জাতিক হ্যাকাররা চুরি করলেও, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরের কোনো না কোনো স্তরের অবহেলা বা ‘ভেতরের সহায়তার’ জোরালো ইঙ্গিত বিভিন্ন সময়ে এসেছে। দেশের ভেতরের যেসব কর্মকর্তা, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ বা তৎকালীন নীতিনির্ধারক এই অবহেলা বা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া শেষ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এতে আর্থিক খাতে সুশাসনের একটি বড় বার্তা যাবে।

গ. চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকসহ অন্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি মামলা চলমান রয়েছে। নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল এবং আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে এই মামলার আইনি দলটিকে পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করা উচিত। নিউ ইয়র্ক এফবিআইয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক ও আইনি যোগাযোগ বাড়িয়ে মামলার কার্যক্রম দ্রুত শেষ করার তাগিদ দেওয়া প্রয়োজন।

ঘ. চুরি হওয়া রিজার্ভের সিংহভাগ অর্থই ফিলিপাইনের ক্যাসিনো ও ব্যাংকিং চ্যানেলে চলে গিয়েছিল, যার একটি অংশ উদ্ধার হলেও বাকিটা এখনো উদ্ধার সম্ভব হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ফিলিপাইন সরকারের ওপর দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যেন তারা তাদের দেশের ক্যাসিনো এবং ব্যাংকে আটকে থাকা বা পাচার হওয়া বাকি অর্থ ফেরত দিতে আইনি সহায়তা জোরদার করে।

ঙ. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাইবার নিরাপত্তা ও স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা দরকার। ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের রাষ্ট্রীয় আর্থিক বিপর্যয় আর কখনো না ঘটে, সেজন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার সিকিউরিটি আর্কিটেকচার সম্পূর্ণ আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের করা। সুইফট (SWIFT) ট্রানজেকশন সিস্টেমের ওপর সার্বক্ষণিক কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা।

চ. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলাদেশ ব্যাংককে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে এর পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা, যাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেকোনো আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি কোনো সাধারণ চুরি নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় মর্যাদার লড়াই। ১০ বছরের দীর্ঘসূত্রতা আমাদের অনেক ক্ষতি করেছে। এখন সময় এসেছে সব ধোঁয়াশা কাটিয়ে, নির্ভীক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো এবং খোয়া যাওয়া অর্থ দেশের কোষাগারে ফিরিয়ে আনা। জনগণের প্রত্যাশা—বর্তমান তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া কোনো সমঝোতা ছাড়াই তার যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছাবে। অতীতে বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় বিএনপি এই রিজার্ভ চুরি নিয়ে যে ন্যায়বিচার ও শ্বেতপত্রের দাবি তুলেছিল, এখন ক্ষমতায় এসে তা বাস্তবায়ন করার ঐতিহাসিক সুযোগ এবং দায়িত্ব তাদের ওপরই বর্তায়। দেশের মানুষের হারানো টাকা উদ্ধার এবং অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় অ্যাসিড টেস্ট।

লেখক : সাবেক উপদেষ্টা, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়

অন্তর্বর্তী সরকার

বিরোধী রাজনীতিতে জামায়াতের নতুন সমীকরণ

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা

দুবাইয়ের খাঁচায় এক ‘ফ্রাংকেনস্টাইন’ এবং একটি চিঠির হাহাকার

স্মৃতির পাতায় শিল্পের মহিরুহ মুস্তাফা মনোয়ার

ডিজিটাল পর্দার ফাঁদে শিশু : সংকট ও করণীয়

তিস্তায় বন্ধুত্বের হাত চীনের

অভ্যন্তরীণ অভিবাসন : সংকটে নগর অবকাঠামো

ড. ইউনূস ‘ভিলেন’ নাকি ‘ক্রান্তিকালীন নায়ক’

গণতন্ত্রের ভূত-ভবিষ্যৎ

ঘোষক বিতর্ক এবং ইন্দিরা গান্ধী