হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

হাওরের হাহাকার

গোলাম মর্তুজা সেলিম

সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের নির্মম আঘাতে বিপর্যস্ত। যে সময়টায় বোরো ধানের মৌসুম কৃষকের ঘরে স্বস্তি ও প্রাচুর্যের বার্তা নিয়ে আসার কথা, ঠিক সে সময়েই অকালবন্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় মাঠভরা সোনালি ধান আজ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। দিনরাত পরিশ্রমে ফলানো ফসল চোখের সামনে নষ্ট হয়ে যেতে দেখে কৃষকের বুকফাটা কান্না শুধু ব্যক্তিগত বেদনা নয়, এটি আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। প্রশ্ন উঠছে, প্রতিবছর একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটলেও কেন আমরা টেকসই সমাধান গড়ে তুলতে পারছি না?

হাওরাঞ্চল একটি স্বতন্ত্র ভৌগোলিক ও জলবৈচিত্র্যময় অঞ্চল, যেখানে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় পানি থাকে এবং শুকনো মৌসুমে চাষাবাদ হয়। এই অঞ্চলের কৃষি সম্পূর্ণরূপে প্রকৃতিনির্ভর আর এটাই এর শক্তি, আবার একই সঙ্গে বড় দুর্বলতাও। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উজানের ঢল, অকালবৃষ্টি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এতটাই তীব্র হয়েছে যে, কৃষক আর আগের মতো নিশ্চিন্তে ফসল তুলতে পারছেন না। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বোরো ধান কাটার আগেই আকস্মিক পানির স্রোত ঢুকে পড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করেছে; ফলে ধান পানিতে পচে যাচ্ছে এবং কৃষকের বছরের একমাত্র আয়ের উৎস মুহূর্তেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই বিপর্যয় কি শুধু প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার ফল? নাকি এতে আমাদেরও পরিকল্পনার ঘাটতি, অব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতাও সমানভাবে দায়ী—এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

এই পরিস্থিতি শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; বাস্তবতা হলো এটি পুরো দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও সরাসরি আঘাত। বোরো ধান বাংলাদেশের মোট ধান উৎপাদনের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে, ফলে এই ফসলের ক্ষতি মানে শুধু মাঠের ক্ষতি নয়, বাজারব্যবস্থার অস্থিরতা, চালের দামের ঊর্ধ্বগতি এবং সম্ভাব্য খাদ্যসংকটের ঝুঁকি। এর সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর, যাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য ব্যয়ে চলে যায়। এ সংকট ধীরে ধীরে গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি শুধু কৃষকের ক্ষতিপূরণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাষ্ট্র কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে একটি খাদ্যসংকট প্রতিরোধে সক্ষম—সেটিই মূল পরীক্ষা।

এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ হলো ক্ষতিগ্রস্ত হাওরাঞ্চলকে দ্রুত ‘দুর্যোগপূর্ণ এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা। এই ঘোষণার মাধ্যমে সরকারিভাবে জরুরি সহায়তা কার্যক্রম দ্রুত চালু করা সম্ভব হবে এবং প্রশাসনিক জটিলতা অনেকটাই কমে আসবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বিনামূল্যে খাদ্য সহায়তা, কৃষিঋণ মওকুফ বা পুনঃতফসিল এবং আবার চাষাবাদের জন্য উন্নতমানের বীজ ও সার সরবরাহ এসব পদক্ষেপ বিলম্ব না করে বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত নগদ সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে তারা অন্তত ন্যূনতম জীবনযাত্রা বজায় রাখতে পারেন এবং ঋণের ফাঁদে আরো গভীরভাবে বিপর্যস্ত না হয়ে পড়েন।

উজান থেকে আসা পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং অপরিহার্যতা। হাওরাঞ্চলের পানি সমস্যা শুধু স্থানীয় বাস্তবতায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি আন্তঃসীমান্ত ইস্যু, যার সমাধান এককভাবে সম্ভব নয়। তাই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা, তথ্যবিনিময় এবং পূর্বাভাস ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। একই সঙ্গে দেশের ভেতরেও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা না থাকলে কোনো প্রকল্পই দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর হবে না। বাস্তবতা হলো পরিকল্পনার ঘাটতির চেয়ে বাস্তবায়নের দুর্বলতাই আমাদের বড় সংকট।

হাওরাঞ্চলের জন্য একটি স্বতন্ত্র ও প্রেক্ষিতভিত্তিক কৃষিনীতি প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। এই অঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতা বিবেচনায় এমন ধানের জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করতে হবে, যা স্বল্প সময়ে ফলন দেয় এবং বন্যার আগেই ঘরে তোলা সম্ভব হয়। পাশাপাশি কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় আনা এবং একটি কার্যকর আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি, যাতে তারা সম্ভাব্য দুর্যোগ সম্পর্কে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে পারেন।

কৃষিকে শুধু উৎপাদনের প্রশ্ন হিসেবে না দেখে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিকোণ থেকেও বিবেচনা করা—এটাই এখন সময়ের দাবি। তবে এসব উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে যাবে, যদি দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার চক্র ভাঙা না যায়। বাস্তবতা হলো, হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য বরাদ্দ করা অর্থ প্রায়ই যথাযথভাবে ব্যবহার হয় না। এর ফলে দুর্বল ও নিম্নমানের বাঁধ সহজেই ভেঙে পড়ে আর এর খেসারত দিতে হয় কৃষকদের, ডুবে যায় বছরের একমাত্র ফসল। এই পুনরাবৃত্তি ব্যর্থতা প্রশাসনিক দুর্বলতা ও জবাবদিহির ঘাটতির স্পষ্ট প্রমাণ। তাই কঠোর নজরদারি, স্বচ্ছতা এবং দায় নির্ধারণ ছাড়া এই চক্র থেকে বের হওয়ার কোনো বাস্তবসম্মত পথ নেই।

সবশেষে বলতে হয়, হাওরের কৃষকরা কোনো প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নয়; তারা আমাদের দেশের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। সুতরাং আমাদের বুঝতে হবে তাদের এই দুর্দশা উপেক্ষা করা মানে শুধু একটি অঞ্চলকে অবহেলা করাই নয়; বরং আমাদের সম্মিলিত ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া। তাই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বা সাময়িক সহানুভূতি দিয়ে দায় এড়ানোর সময় এখন আর নেই; প্রয়োজন বাস্তবসম্মত, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং কার্যকর পদক্ষেপ। আজ আমরা যদি দ্রুত ও দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হই, তবে আগামী বছরগুলোয় এ সংকট আরো গভীর ও বিস্তৃত আকার ধারণ করবে। হাওরের বুকভরা পানি তখন শুধু ফসল নয়, আমাদের পরিকল্পনাহীনতা, অব্যবস্থাপনা এবং উদাসীনতার ইতিহাসও আমাদের ডুবিয়ে দেবে। তাই এখনই সময় ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলকে ‘দুর্যোগপূর্ণ এলাকা’ ঘোষণা, জরুরি সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করা এবং একটি টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা ‘মেগা প্রকল্প’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে হাওরবাসীর পাশে দাঁড়ানোর। এতে শুধু কৃষকই রক্ষা পাবে না; বরং সংরক্ষিত হবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনীতির স্থিতিশীলতা এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা।

লেখক : কৃষিবিদ, এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক

kbd.salim.ncp@gmail.com

ভাইরাল ‘ভারচুয়াল’ সংস্কৃতির পথপরিক্রমা

ইরান যুদ্ধ : যুক্তরাষ্ট্রের হাত ছেড়ে দিচ্ছে ইউরোপ

সীমানায় শত্রু এবং আমাদের প্রস্তুতি

হিন্দুত্ববাদ বেষ্টিত বাংলাদেশ

পাহাড়ি জনপদে বিশুদ্ধ পানির সংকট ও সমাধান

বাঙালির ‘অ-যোদ্ধা’ ও ‘নারীসুলভ’ তকমা

বিভাজনের রাজনীতির আবর্তে বাংলাদেশ

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক : কূটনৈতিক বাস্তবতা ও সীমাবদ্ধতা

আওয়ামী মার্কা আলাপ সংসদে কেন!

দুই যুদ্ধের ছায়া : ইউক্রেন থেকে ইরান