হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

নিষেধাজ্ঞার পরও প্লাস্টিক ব্যাগের বিরুদ্ধে লড়াই

ড. শাহরিয়ার হোসেন

বাংলাদেশে ২০০২ সালে প্লাস্টিক ব্যাগ নিষিদ্ধ করা হয়। তখন এটি শুধু একটি নীতিগত পদক্ষেপ ছিল না; এটি ছিল এক ধরনের বাঁচার চেষ্টা। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ড্রেন ভরে যাওয়া, সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়া, নদী-খাল দখল ও দূষণে দমবন্ধ অবস্থা সৃষ্টি হয়।

সে সময় মানুষ বিশ্বাস করেছিল—এই নিষেধাজ্ঞা বদলে দেবে বাস্তবতা। কাগজের ব্যাগ, কাপড়ের ব্যাগ, কিংবা পুরোনো ব্যাগ পুনর্ব্যবহার—এসব ধারণা নতুন করে আলোচনায় আসে। পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নটি তখন এক ধরনের সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিচ্ছিল। কিন্তু দুই দশক পর বাস্তবতা ভিন্ন গল্প বলে। প্লাস্টিক এখনো আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্ষার সময় এই বাস্তবতা সবচেয়ে নির্মমভাবে ধরা পড়ে। সামান্য বৃষ্টিতেই যখন রাস্তা ডুবে যায়, তখন আমরা বুঝতে পারি—এই প্লাস্টিকগুলো শুধু ময়লা নয়, এগুলো আমাদের নগর ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কাজ করছে। ড্রেন বন্ধ হয়ে যায়, পানি নামতে পারে না, শহর থমকে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশে প্লাস্টিক ব্যাগ নিষিদ্ধ হলেও, এর উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধ হয়নি। আইন আছে, কিন্তু যথাযথ প্রয়োগ নেই। একদিকে প্লাস্টিক ব্যাগের সহজলভ্যতা অন্যদিকে ভাল বিকল্প ব্যবস্থার অভাবের কারনে বন্ধ হচ্ছে না প্লাস্টিক ব্যাগের ব্যবহার।

প্লাস্টিক উৎপাদন এখন একটি বড় শিল্প। এটি সস্তা, দ্রুত উৎপাদনযোগ্য এবং ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত। ফলে বাজারে এর বিকল্প তৈরি করাও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরি করতে চান, তারা প্রায়ই প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেন না—কারণ তাদের পণ্য তুলনামূলক বেশি দামি।

একজন স্থানীয় দরজি হয়তো কাপড়ের ব্যাগ তৈরি করতে চান; কিন্তু তার কাছে পর্যাপ্ত কাঁচামাল নেই, কিংবা বাজার নেই। আবার একজন উদ্যোক্তা নতুন কোনো পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবন নিয়ে আসতে চান, কিন্তু সেটি বাজারে প্রতিষ্ঠা করার মতো সহায়তা পান না।

এই বাস্তবতায়, দোকানের তাক ভরে থাকে প্লাস্টিক পণ্যে আর বিকল্পগুলো পড়ে থাকে অবহেলায়।

কোন একক দেশের পক্ষে প্লাস্টিক রোধ করাও এখন অনেকটা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্লাস্টিকের উৎপাদন, বাণিজ্য এবং ব্যবহার একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ। একটি দেশে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলেও, পাশের দেশ বা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সস্তা প্লাস্টিক সহজেই সেই শূন্যতা পূরণ করে ফেলে।

বঙ্গোপসাগরে ভেসে আসা প্লাস্টিকের বড় একটি অংশ আসে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক উৎস থেকে। এ কারণেই এ সমস্যার সমাধানও হতে হবে সমন্বিত এবং বৈশ্বিক।

প্রথমত, প্রয়োজন শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, বাধ্যতামূলক বৈশ্বিক চুক্তি দরকারÑযেখানে প্লাস্টিক উৎপাদন কমানো, একবার ব্যবহারযোগ্য পণ্যের সীমা নির্ধারণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মানদণ্ড নির্ধারণ করা হবে। উন্নত দেশগুলোকে তাদের উৎপাদিত প্লাস্টিক বর্জ্যের দায় নিতে হবে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোকে প্রযুক্তি ও আর্থিক সহায়তা দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, অর্থায়ন ও বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশবান্ধব বিকল্প তখনই কার্যকর হবে, যখন তা সাশ্রয়ী এবং সহজলভ্য হবে। আজ প্লাস্টিক জনপ্রিয় কারণ এটি সস্তা। যদি বায়োডিগ্রেডেবল বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য একই দামে বা কাছাকাছি দামে পাওয়া যায়, তবে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই তা গ্রহণ করবে। এর জন্য প্রয়োজন গবেষণা, উদ্ভাবন এবং বাজারে প্রবেশের জন্য প্রণোদনা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই লড়াই শুধু সরকারের নয়, এটি সমাজের প্রতিটি মানুষের। নীতি প্রণয়ন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা কার্যকর হয় মানুষের আচরণের মাধ্যমে।

একটি ছোট সিদ্ধান্তÑযেমন বাজারে নিজের ব্যাগ নিয়ে যাওয়া—শুনতে খুব সাধারণ, কিন্তু এর প্রভাব গভীর। এটি শুধু একটি ব্যাগের ব্যবহার কমায় না; এটি একটি বার্তা দেয়, একটি সংস্কৃতি তৈরি করে।

তবু বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এই পথ সহজ নয়। শহরের অন্য প্রান্তে প্লাস্টিক বর্জ্যের স্তূপ জমে থাকে, যা দেখায় সমস্যাটি এখনো গভীরে প্রোথিত।

নিষেধাজ্ঞা একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা ছিল, কিন্তু এটি কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়। বরং এটি একটি দীর্ঘ এবং জটিল যাত্রার প্রথম ধাপ। এখন সময় এসেছে সেই যাত্রাকে নতুনভাবে ভাবারÑযেখানে বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি, স্থানীয় বাস্তবতা এবং মানুষের আচরণ—এই তিনটি স্তম্ভ একসঙ্গে কাজ করবে। তখনই আমরা প্লাস্টিক দূষণের এই জটিল সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একটি বাস্তবসম্মত পথ খুঁজে পেতে পারি।

প্লাস্টিক দূষণের বিরুদ্ধে এই লড়াই কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। যদি আমরা একসঙ্গে কাজ করি, যদি আমরা আমাদের অভ্যাস বদলাই, যদি আমরা টেকসই বিকল্পকে গ্রহণ করি—তাহলে পরিবর্তন সম্ভব।

সময় এসেছে এ সমস্যাকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার—কারণ এটি শুধু পরিবেশের নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যতের প্রশ্ন।

লেখক : পরিবেশবিজ্ঞানী, সাংবাদিক

বাজেট নিয়ে যে জরুরি প্রশ্নটি কেউ করে না

বাংলা ভাগের আড়ালে নৌ-অফিসার

‘পুশইন’ কূটনীতির অনিষ্টেও নির্বিকার?

ডিপ স্টেটের গভীরে বাংলাদেশ

ড. এম উমর চাপরার সতর্কবার্তা ও বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের বাস্তবতা

ভারত-বাংলাদেশ স্বামী-স্ত্রীর যুগ ও অনিচ্ছাকৃত পুশইন

বলকানের মুসলমানদের নিয়ে পশ্চিমা-ইসরাইলি নয়া চক্রান্ত

সাইবার আইন ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষা

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে অবিশ্বাসের দেয়াল

রাজনৈতিক মতবিরোধ থেকে ইসলামবিদ্বেষ