মোস্তফা সরয়ার ফারুকী একটা ভ্যালিড প্রশ্ন তুলেছেন; বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধোত্তর সরকারের সময় যে অ্যানার্কি হয়েছিল, সেজন্য যদি মুক্তিযুদ্ধের ব্যর্থতার প্রশ্ন না ওঠে, তবে জুলাই-পরবর্তী সরকারের ব্যর্থতার জন্য জুলাইকে কেন ব্যর্থ বলা হবে। ফারুকীকে অনেকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা না হলে হয়তো তার বিরুদ্ধে এত কথা উঠত না। কিন্তু যে যত কথাই বলুন না কেন, জুলাই নিয়ে তিনি যতটা কাজ করেছেন, সে অনুযায়ী জুলাইকে প্রামাণ্য করার ক্ষেত্রে ফারুকীকে অস্বীকার করা যাবে না। জুলাই-রিলেটেড অনেক কাজই তার হাতে করা। সংস্কৃতি উপদেষ্টা হিসেবে ব্যর্থতার চেয়ে সফলতার ভাগই তার বেশি। কাউকে সমালোচনার ক্ষেত্রে খড়্গহস্ত, কিন্তু ক্রেডিট দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘স্পিকটি নট’ কোনো কাজের কথা নয়। জুলাই জাদুঘর চোখের সমুখেই দৃশ্যমান। তিনি যখন সংস্কৃতি উপদেষ্টা ছিলেন, তখন জুলাই জাদুঘরে বর্ডার কিলিংবিষয়ক অনুষঙ্গ এবং ফেলানীর ভাস্কর্য ছিল এবং এখন তা নেই। কেন নেই, সে প্রশ্ন উঠছে এবং উঠবে; না ওঠার কোনো সংগত কারণ নেই।
এখন আসি বর্তমান সরকারের ভারত প্রসঙ্গে অবস্থান নিয়ে। দৃশ্যমান যা, তা নিয়েই কথা বলি। দৃশ্যমানতা বলে, বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতি আধিপত্যবাদবিরোধী। নইলে ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং শহীদ হাদির খুনিদের হস্তান্তরের কথা সরাসরি বলতেন না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রেস ব্রিফিংয়ে বলতেন না, চব্বিশের ৫ আগস্টই নির্ধারণ করে দিয়েছে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিষয়টি। এটা নিয়ে খুব বেশি প্যাঁচানোর চেষ্টা করে লাভ নেই, যদিও কেউ ইনিয়ে-বিনিয়ে নানা ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে বলতে চাইবেন, ভারত ছাড়া বাংলাদেশ চলতে পারবে না। এর সোজা উত্তর হলো, ভারত থেকে কেনাকাটা নিম্নমানের বলে ফিরিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। এতে বাংলাদেশে চালের অভাব হয়নি। বিপরীতে সমস্যা হয়েছে ভারতের। ভারতের একটি চ্যানেলে দেখলাম বাংলাদেশের চাল ফিরিয়ে দেওয়া নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছে—কেন গুণগত মান পরীক্ষা না করে নিম্নমানের চাল দেওয়া হলো। তাদের কথামতেই এতে ভারত অপমানিত হয়েছে। আর এই অপমানের দায় ভারতের দুর্নীতিবাজদের। হ্যাঁ, এরকমই ভারতের সেই টেলিভিশন চ্যানেলের ভাষ্য। ভারতের সেই দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে আমাদের দুর্নীতিবাজদের গড়ে ওঠা গত ২০ বছরের সিন্ডিকেট এভাবেই পচা চাল, আলু, পেঁয়াজ, ডাল ও মসলা দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা করেছে। সেই সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয়।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক যে বিগত রেজিমের স্বামী-স্ত্রীর পর্যায়ে নেই, তা এখন বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে এখনই নিশ্চিত করে বলার সময় আসেনি। দুদেশের সম্পর্ক আপাতত তিক্ত, এটুকু শুধু বলা যায়। আর এটুকু যোগ করা যায়, এখন দরকষাকষির মৌসুম চলছে। এই মৌসুম শেষ হলে প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হবে। যেহেতু আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা রয়েছে, তাই আবার বলছি, এখনো সময় আসেনি উপসংহারে আসার। অনেকে শেখ হাসিনার প্রেস কনফারেন্স নিয়ে কথা বলছেন; তুলনা করছেন, তৎকালে বেগম খালেদা জিয়ার ব্রিটিশ আইনজীবী লর্ড কার্লাইলকে কেন প্রেস কনফারেন্স তো দূরে থাক দিল্লিতেই ঢুকতে দেওয়া হয়নি সে বিষয়ে। এই আলাপগুলো খুবই হালকা। ভারতের প্রভাবশালী কূটনীতিক রিভা গাঙ্গুলি ডয়চে ভেলের সঙ্গে তার সাক্ষাৎকারে পরিষ্কার করে দিয়েছেন শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের কথা। ভারত শেখ হাসিনাকে বন্ধু মেনেছে, বেগম খালেদা জিয়াকে শত্রু—সমীকরণ এটাই। এটা বেগম খালেদা জিয়ার কাল থেকেই পরিষ্কার। তিনি তো বলেছিলেনই, ‘ওদের হাতে গোলামির জিঞ্জির, আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা।’ ভারত চিরকালই গোলাম চেয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে আমি আমার এক অনুজের প্রশ্নের জবাবে লিখেছিলাম—‘India is probably looking for another Hasina. You could say, a replacement for Hasina. Until that is found, relations will not be good.’ এটাই দুদেশের সম্পর্কের মূলকথা।
যাকগে, আবার ফিরি জুলাইয়ে। এক আঁকিয়ে গ্রাফিতি এঁকেছেন একাত্তর এবং চব্বিশকে দাঁড়িপাল্লায় তুলে; বলতে পারেন, তুলনা করে। এতে একাত্তরের চেয়ে চব্বিশকে ভারী দেখানো হয়েছে। কিন্তু রঙের ক্ষেত্রে আবার চিহ্নিত করা হয়েছে একাত্তরকে লাল রঙে এঁকে এবং চব্বিশকে করা হয়েছে কালচে। অর্থাৎ সোজা ভাষায় চব্বিশকে ব্যঙ্গ করা হয়েছে এর মাধ্যমে। অর্থাৎ চব্বিশকে একাত্তরের চেয়ে যারা ওজনদার বলতে চাচ্ছেন, তারা আসলে কালো, অর্থাৎ খারাপ মানুষ। এই যে কেউ না বললেও কল্পিত শত্রু সৃষ্টি করে একাত্তর আর চব্বিশকে মুখোমুখি করে দেওয়ার প্রবণতা, এটাই বর্তমান ট্রাম্পকার্ড আধিপত্যবাদী ও তাদের দোসরদের। তারা একাত্তর আর চব্বিশকে মুখোমুখি করে আবার জাতিকে বিভক্ত করতে চাইছে। যারা একাত্তর ও চব্বিশের তুলনা করছে, মুখোমুখি করছে, বুঝবেন তারা জুলাইয়ের বিরুদ্ধশক্তি এবং গণতন্ত্রের মুখোশে থাকা ফ্যাসিস্ট। তবে তাদের জন্য মুশকিল হলো, চব্বিশের পক্ষে জেনারেশন জেড আর আলফা। জেন-জি’রা এরই মধ্যে দেশের হাল ধরতে শুরু করেছে; তারপর রয়েছে আলফা এবং আগামী দিনগুলোয় তারাই নেতৃত্ব দেবে। সুতরাং যারা ভাবছেন, বিভাজন দিয়ে দেশের মানুষকে দীর্ঘদিন বিভক্ত রেখে হালুয়া-রুটি খাবেন, তারা ভুল চিন্তায় আছেন।
মূলত ভুল চিন্তাই আমাদের বিভাজিত করছে বারবার। তার সঙ্গে রয়েছে লোভের যোগসাজশ; অর্থ আর ক্ষমতার লোভ, যা ভুল চিন্তার ক্ষেত্র তৈরি করে। আমরা ভুলে যাই, একাত্তর আমাদের ভিত এবং চব্বিশ আমাদের নিজস্বতা ও অস্তিত্ব।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট