হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

গরু রাজনীতিতে ভারতের অর্থনৈতিক বিপর্যয়

এলাহী নেওয়াজ খান

ছবি: সংগৃহীত

ভারতের ২৮টি রাজ্যের মধ্যে ২০টিতে গরু জবাই ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সর্বশেষ নিষিদ্ধ হলো পশ্চিমবঙ্গে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পরপরই এই নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। আর ঠিক কোরবানি ঈদের প্রাক্কালে এই নিষেধাজ্ঞা হওয়ায় গোটা পশ্চিমবঙ্গে যেন হাহাকার পড়ে গেছে। মুসলমানরা নয়, এর প্রতিবাদে খোদ হিন্দু কৃষক পরিবার রাস্তায় নেমেছে, আর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর বিরুদ্ধে দিচ্ছে স্লোগান। কোনো একটি ফুটেজে দেখা গেল, সাধারণ মানুষ শুভেন্দুকে ঘেরাও করে নিন্দা জানাচ্ছে। গরু বেচার অনুমতি না দিলে তারা আত্মহত্যা করবে বলে হুমকি দিচ্ছিল। প্রতিটি হিন্দু কৃষক পরিবার এখন শুভেন্দুর বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে।

ঠিক এই একটি সিদ্ধান্তে বিশাল বিজয় নিয়ে ক্ষমতায় আসা পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি সরকার মুখ থুবড়ে পড়েছে। শপথের পর মাস যেতে না যেতে বিজয়ের প্রবল আনন্দ যেন বিষাদে রূপ নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের হাজার হাজার হিন্দু কৃষক পরিবার মাথায় হাত দিয়ে বসেছে; কারণ সারা বছর তারা যে গরু পালন করে, তা বিক্রি করে ছেলেমেয়ের বিয়ে, মহাজনের দেনা পরিশোধ এবং অতিরিক্ত কিছু শখ মিটিয়ে থাকে। তাই গরু জবাই নিষিদ্ধ হওয়ায় তারা এখন পথে বসে গেছে।

ভারতের গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিশেষজ্ঞদের অভিমতে দেখা যাচ্ছে, যখন ভারতে অর্থনৈতিক সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে, যখন কেন্দ্রীয় সরকার সংকট মোকাবিলায় কৃচ্ছ্রসাধনের পরামর্শ দিচ্ছে, যখন সাধারণ মানুষকে স্বর্ণ ক্রয় করা থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করছে, ঠিক তখন কৃষিভিত্তিক পশ্চিমবঙ্গে কোরবানির আগে গরু জবাই নিষিদ্ধ করায় ভয়ানক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। বলা যায়, মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে।

এখানে উল্লেখ করতে হয়, মুসলমানদের শায়েস্তা করতে গরু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অথচ মুসলমানরা গরু কোরবানি দিতে না পারলেও হালাল যেকোনো পশু কোরবানি দিয়ে তাদের ওয়াজিব কাজটি সারতে পারবে। যেমন ধরুন মহিষ, ছাগল, দুম্বা, ভেড়া কিংবা উটের মতো পশু। কিন্তু এতে গরিব হিন্দু কৃষকরাই বেশি বিপদে পড়েছে। সেইসঙ্গে ভারতের অর্থনীতিতে বহুমুখী বিরূপ প্রভাব পড়েছে। বলা যায়, উগ্র হিন্দুত্ববাদ ও গরুর রাজনীতি ভারতের অর্থনীতিতে বিরাট বিপর্যয় নামিয়ে এনেছে।

সেখানে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও বিশেষজ্ঞদের অভিমত অনুযায়ী গরু জবাই নিষিদ্ধ হওয়ায় ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি অত্যন্ত নেতিবাচক স্নোবল ইফেক্ট বা ক্রমবর্ধমান চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি হয়েছে। একটি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কীভাবে ধাপে ধাপে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের একাধিক শিল্প এবং কোটি কোটি মানুষের জীবিকাকে সংকটে ফেলে দিতে পারে, সেটাই এখন বিশ্ববাসী দেখছে।

গরু জবাই নিষিদ্ধ হওয়ায় বিভিন্ন শিল্প খাতে কীভাবে বিপর্যয় নেমে এসেছে, কিংবা ‘নেতিবাচক স্নোবল ইফেক্ট’ তৈরি হয়েছে, তার একটা চিত্র পাওয়া গেছে ভারতের সেসব গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও বিশেষজ্ঞদের অভিমতে। তাদের পর্যায়ক্রমিক অভিমত হচ্ছে, এক্ষেত্রে প্রথম ধাক্কাটা এসেছে কৃষকদের ওপর। অতীতে ভারতের কৃষকদের জন্য গরু ছিল একটি দ্বিমুখী বিনিয়োগ। দুধ দিতে না পারা বুড়ো গাভীগুলো কৃষকরা কসাইখানায় বিক্রি করত ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার রুপিতে। সেই টাকা দিয়ে তারা বাচ্চা কিংবা উর্বর গাভী কিনত এবং চাষের খরচ মেটাত। অথবা বাচ্চা গরু কিনে লালন-পালন করত। কিন্তু কসাইখানায় গরু বিক্রি নিষিদ্ধ হওয়ায় গরুর দাম কমে গেছে। শুধু তা-ই নয়, উল্টো গরু ও বুড়ো গাভীগুলোর খাদ্য ও চিকিৎসা খরচ বহন করা কৃষকদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এর ফলে কৃষকদের আয় কমে গেছে এবং নতুন করে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে।

দ্বিতীয়ত, ভারতের দুগ্ধশিল্পে বিরাট বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। কারণ কৃষকরা যখন দেখল, দুধ দিতে পারে না এমন বুড়ো গাভীগুলো আর বিক্রি করা যাচ্ছে না এবং উল্টো অর্থনৈতিক দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন তারা নতুন গাভী পালন করা বন্ধ করে দিয়েছে। তাই গাভী পালন কমে যাওয়ায় ভারতের অন্যতম চালিকাশক্তি দুগ্ধ উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়েছে এবং বাজারে দুধের দাম সাধারণ মানুষদের নাগালের বাইরে চলে গেছে।

তৃতীয়ত, গোশত ও চামড়াশিল্পে ধস নেমেছে। কেননা ভারতের গোশত ও চামড়াশিল্প দেশীয় গবাদি পশুর ওপর নির্ভরশীল। ভারতে প্রায় দুই কোটি মানুষ চামড়াশিল্পের সঙ্গে জড়িত এবং এটা থেকে বছরে বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়।

ফলে গরু জবাই বন্ধ হওয়ায় কাঁচামাল তথা হাইড চামড়া সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানিতে ধস নেমেছে। যেমন কর্নাটকে ৫০০ কোটি রুপি থেকে ১৬০ কোটিতে নেমে এসেছে। এর ফলে কসাইখানা ও ট্যানারিগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। সেইসঙ্গে মুসলিম ও দলিত জনগোষ্ঠীর লাখ লাখ মানুষ রাতারাতি বেকার হয়ে গেছে।

চতুর্থত, বেওয়ারিশ কিংবা ভবঘুরে গরুগুলোকে সামাল দেওয়া এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এই গরুগুলো একদিকে যেমন সব ফসল নষ্ট করছে, অন্যদিকে তেমনি তারা শহর-নগর-বন্দরে চরে বেড়াচ্ছে অবাধে। উত্তরপ্রদেশে এ দৃশ্য এখন অতি স্বাভাবিক হয়ে পড়েছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, কৃষকরা রক্ষণাবেক্ষণের খরচ না মেটাতে পেরে রাতের অন্ধকারে রাস্তায় কিংবা বন-জঙ্গলে গরু ছেড়ে দিয়ে আসছে। বর্তমানে ভারতে লাখ লাখ বেওয়ারিশ গরু সর্বত্র চরে বেড়াচ্ছে। আর ক্ষুধার্ত গরুগুলো দলবদ্ধ হয়ে কৃষকদের জমিতে হানা দিয়ে ক্ষেতের ফসল ধ্বংস করে দিচ্ছে। এতে একদিকে যেমন কৃষকরা ফসল হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে সামগ্রিকভাবে ভারতের কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

পঞ্চমত, লাখ লাখ ছাড়া গরুর জন্য সরকারি খরচায় গোশালা কিংবা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে সরকারের জাতীয় বাজেটের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। কারণ এ খাতে খরচের পরিমাণ ভারতের প্রতিরক্ষা বাজেটকেও ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রায় দেড় গুণ বেশি। এর ফলে সরকারের ওপর প্রচণ্ড অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ষষ্ঠত, কম আয়ের মানুষের জন্য গরুর গোশত ছিল প্রোটিনের সবচেয়ে সস্তা উৎস। এটি বন্ধ হওয়ায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিশেষ করে নারী ও শিশু রক্তশূন্যতা ও পুষ্টিহীনতায় ভুগছে।

পরিশেষে বলা যায়, গরু জবাইয়ে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে যা শুরু হয়েছিল, তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৃষক, ডেইরি, গোশত ব্যবসায়ী, চামড়াশিল্প, ফসল উৎপাদন এবং সবশেষে সরকারি বাজেটের ওপর আঘাত হেনে ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি বিশাল নেতিবাচক স্নোবল ইফেক্ট তৈরি করেছে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

সব ধরণের ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্থগিত করল যুক্তরাষ্ট্র

ঝিনাইদহে বাসচাপায় স্ত্রীর মৃত্যু, স্বামী আহত

হরমুজ প্রণালি থেকে সব মাইন সরানো হয়েছে: দাবি ট্রাম্পের

১০ বছর বয়স কমিয়ে চাকরি নিয়েছেন কলেজের অফিস সহায়ক

টিকটককে ৩০ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করল ব্রাজিল

মিলাদুন্নবী উপলক্ষে রাজধানীতে বর্ণাঢ্য জশনে জুলুস র‍্যালি

ঘাস কাটার মেশিনে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যু

এএমআই স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণার্থীর মাঝে সনদ বিতরণ

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে ইবিতে মোবারক র‍্যালি

৬ মাসের সব ঘটনার অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে