বাংলাদেশ ব্যাংক ১৯৯২ সালে ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) প্রতিষ্ঠা করে। উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিতরণ করা সব ধরনের ব্যক্তিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ-তথ্য একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর ভেতরে নিয়ে আসা, যাতে করে ঋণসংক্রান্ত ঝুঁকি হ্রাস করা সম্ভব হয়। ২০১১ সালে অনলাইন পদ্ধতি প্রবর্তনের পর থেকে ব্যাংকগুলো অনলাইনের মাধ্যমে সিআইবি আবেদন ও তথ্য পেতে শুরু করে, যা একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে। এরপর থেকে বিভিন্ন আঙ্গিকে সিআইবির কার্যক্রম সম্প্রসারিত হওয়ায় বর্তমান কয়েক ঘণ্টায় সিআইবি রিপোর্ট পাওয়া সম্ভব, যা থেকে ব্যাংকগুলো একজন গ্রাহকের সব ধরনের ঋণের তথ্য খুব সহজেই বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী গত মার্চ মাস শেষে দেশে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। অন্যদিকে দেশের ব্যাংক খাতে প্রচুর ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতা রয়েছেন, যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধ করছেন না। একদিকে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের আমানত হিসাবগুলোতে কোটি কোটি টাকা পড়ে আছে, অন্যদিকে তারা খেলাপি ঋণগ্রস্ত। ঋণ প্রদানকারী ব্যাংকগুলো তাদের কাছ থেকে ঋণ আদায় করতে পারছে না। ইনটিগ্রেটেড ক্রেডিট অ্যান্ড ডিপোজিট ইনফরমেশন রিপোর্টিং (আইসিডিআইআর) এই জটিলতার নিরসন করতে পারে।
কীভাবে কাজ করবে আইসিডিআইআর
আইসিডিআইআর হবে প্রচলিত সিআইবির একটি আধুনিক সংস্করণ। এই রিপোর্টিং ব্যবস্থা সিআইবির মতো শুধু ঋণের তথ্যই রিপোর্ট করবে না, বরং ঋণের পাশাপাশি একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় ব্যাংকিং আমানতের তথ্যও রিপোর্ট করবে। বর্তমান ও অতীতের ঋণের ইতিহাসের পাশাপাশি ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের সব ক্যাটাগরির আমানত হিসাবের তথ্য, ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ইউটিলিটি দেনার তথ্য, ট্যাক্স-সংক্রান্ত ব্যয় এবং দেনার তথ্য, ঋণ পরিশোধের ইতিহাস, ঋণ পুনঃতফসিল-সংক্রান্ত তথ্য, যানবাহনের মালিকানা ও স্থাবর সম্পত্তির তথ্যও সন্নিবেশিত থাকবে এনআইডি (--), টিন (---) ও বিনের (---) অধীনে। প্রচলিত সিআইবিতে শুধু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণের তথ্য রিপোর্ট করে।
আইসিডিআইআরের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যেমনÑজাতীয় রাজস্ব রোর্ড, ভূমি অফিস, বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষগুলো, বিআরটিএ, গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিগুলো, বিভিন্ন আঞ্চলিক ওয়াসাগুলো তাদের নিজ নিজ গ্রাহকের বর্তমান অবস্থা নির্দিষ্ট মেয়াদ অন্তর রিপোর্ট করবে। আইসিডিআইআর তার অধীনে রিপোর্টকৃত ডেটা থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ঋণখোলাপিদের একটি রেটিং তৈরি করবে এবং সিদ্ধান্ত প্রস্তাব করতে পারবে। এতে করে কোনো গ্রাহক ব্যাংকঋণ নিয়ে দীর্ঘদিনের জন্য খেলাপি হলে বা ইচ্ছাকৃত খেলাপি হয়ে থাকলে ঋণগ্রহীতার ব্যাংক ওই গ্রাহকের অধীনে থাকা অন্যসব ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট করা গ্রাহকের আমানত হিসাব, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, দায়-দেনা ইত্যাদির তথ্য অনুসন্ধান করতে পারবে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক প্রয়োজনে নিজের অনাদায়ি ঋণ সমন্বয়ের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেমের মাধ্যমে আবেদন করে গ্রাহকের অন্য প্রতিষ্ঠানে রক্ষিত আমানত হিসাব থেকে সংশ্লিষ্ট ঋণের সমুদয় অথবা আংশিক সমন্বয় করে নিতে পারবে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে শুধু সহায়ক জামানতের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ সমন্বয়ের প্রক্রিয়া আইনগতভাবে জটিল, সময়সাপেক্ষ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সফলতার হার সন্তোষজনক নয়। কিন্তু স্বয়ং বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে আইসিডিআইআর প্রবর্তন করা গেলে তা দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হ্রাসকল্পে অত্যন্ত স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।
ফল
যখন একজন খেলাপি ঋণগ্রহীতার (ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান) সামগ্রিক আর্থিক দায়ের পাশাপাশি যাবতীয় আমানত ব্যাংকের কাছে দৃশ্যমান হবে, তখন অতিরিক্ত ঋণগ্রহণ এবং তথ্য গোপনের সুযোগ কমে যাবে। ফলে ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে আসবে।
আইসিডিআইআর ডেটাবেস ব্যবহারের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা প্রণয়ন করে একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঞ্চিত আমানত হিসাব থেকে খেলাপি ঋণের দায় পরিশোধের মতো কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে। ফলে ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণও হ্রাস পাবে।
যেসব গ্রাহক নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেন, তারা দ্রুত ঋণ অনুমোদন পাবেন, তাদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণদান অথবা অধিক পরিমাণে ঋণসুবিধা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আইসিডিআইআরের মাধ্যমে সহজেই আর্থিক প্রতারণা শনাক্তকরণ সম্ভব হবে, কারণ তখন গ্রাহকের ঋণ-তথ্যের পাশাপাশি আমানত পরিস্থিতিও জানা সম্ভব হবে।
লেখক: ব্যাংক কর্মকর্তা, খিলগাঁও, ঢাকা