হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

মর্ম্মময় মহররম

ড. আহমদ আনিসুর রহমান

সব জাতিরই আছে বিবিধ পার্বণ, উদযাপনীয় ও উদযাপিত ।হাজারো বছরে একটি জাতিসত্বা হিসেবে বিবর্তিত হয়ে বর্তমানের রূপ পাওয়া বাঙ্গলা জাতিরও আছে । ১৩৪২ বা তারই আশেপাশের কোন এক সণে সোণারগাঁয়ের হাজী শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ কর্তৃক ইতিহাসে প্রথম ‘বাঙ্গলা’ নামে জাতিরাজ্য ও দেশ প্রতিষ্ঠা করবার পর থেকেই বারো মাসে তের পার্বণের এই বাঙ্গলার পরধান পার্বণগুলোর একটি হিসেবে পালিত হয়ে আসছে, প্রধানত: শোকাবহ রূপেই, মহররম – বিশেষত: তার ‘আশূরা’, অর্থাৎ ‘দশম’ দিবস।

বাহ্যিকভাবে কিছু আচার অনুষ্ঠাণের সমষ্টি মাত্র দেখা গেলেও, প্রতিটি পার্বণই মূলত: হয়ে থাকে গভীর মরমী তাৎপর্য ও সামাজিক অবচেতণার গণশিক্ষামূলক অপরিহার্য বৈজ্ঞাণিক উপযোগ মন্ডিত। আবেগাপ্লুত হৃদয়ে নিয়মিত সামাজিক উদযাপণে, শৈল্পিক ব্যন্জণাময় আচার অনুষ্ঠাণের ভেতর দিয়ে পর্বণটির মূল মর্মবাণীটি সমাজ সমগ্রের সামগ্রিক অবচেতণায় গভীর থেকে গভীরে প্রোথিত করে তা সমাজে ব্যক্তির আচরণের অলক্ষিত কিন্তু অবশ্যম্ভাবী উদ্দীপক ও নিয়মাক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। মহররমের বেলায়ও তা’ই।

পার্বণের এই কাজে পার্বণের মাধ্যমে যে মর্ম সামগ্রিক অবচেতণায় প্রচলিত ও গভীরতর ভাবে প্রোথিত করা হয়- তা সম্পৃক্ত যাতে এমন কোন এক ঐতিহাসিক ঘটণার স্মৃতিকে আবেগসম্পৃক্তভাবে বার বার পুনরুজ্জীবিত করা হয়। মহররমের ক্ষেত্রে, এমন একটি নয়, বরং, অনেকগুলো ঘটণার স্মৃতি জাগরূক করা হয়, মূলত:। আর প্রাগৈতিহাসিক ও প্রাচীন ঐতিহাসিক ঘটণার তথ্যের আকর প্রায় সব সময়ই হয়ে থাকে উপকথা, ঐশীবাণীবার্তাবাহী ও তাঁদের প্রত্যায়িত উত্তরসূরীদের মত অকাট্য সত্যবাদী বলে প্রমাণিত বা প্রতিষ্ঠিত বর্ণনাকারীদের বর্ণনার নিরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে যা হয় ‘ইতিকথা’, অর্থাৎ ‘ইতিহাস’ – আর তা না হলে পর্যবসিত হয় রূপকথায় – যার ক্ষেত্রেও, তার তথ্যগত সত্যতা খর্বিত হলেও, মর্মগত নৈতিক শিক্ষাটুকু অন্তত: প্রণিধাণযোগ্যই থেকে যায়।

কোন একটি পার্বণ যদি তার উৎসমূল ঘটণার স্মৃতি, আর তার মর্মের শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ঐ দু’ই বিষয়ের ব্যন্জণার জন্য তজ্জাত আচার অনুষ্ঠাণেই – বা তা সব ও বাদ দিয়ে শুধু ছুটি ছাটা বা নিছক পালণ-উদযাপণে পর্যবসিত হয় - তা’হলে তা এক অত্যন্ত ক্ষতিকর অপসংস্কৃতি বৈ ছাড়া আর কিছুই থাকে না। মহররমের উদযাপণকেও এ রকম হয়ে রক্ষা করা সকলেরই দয়ীত্ব।

মহররমের পার্বণে যে সব ঘটণার স্মৃতি জাগরূক করা হয় মূলত:, তা’ অনেক। নিরীক্ষিত উপকথা আর ইতিহাস থেকে যা জানা বা ধারণা হয়, সে মতে, সৃষ্ট জগতের সৃষ্টির পূর্বে শুধু নিজস্ব গুনাগুন সহ স্রষ্টা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। স্রষ্টার গুনাগুনের একটি হলো, সময় – প্রাচীনতম মূল মনুষ্য ভাষা, প্রাচীন আরব্য ভাষায়, “দহর”। সৃষ্টির পর, স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টকে নিজের নানা গুন দ্বারা উপকৃত হবার উপায় করে দেন। এরই অংশ হিসেবে তিনি সৃষ্টদের সময়ের প্রবাহ দ্বারা উপকৃত হবার উপায় হিসেবেই যেন, স্রষ্টা সময়ের হিসাবের জন্য সময়কে ৫ প্রহরের দিন, ৭ দিনের সপ্তাহ, ৪ সপ্তাহে মাস, ১২ মাসে সণ, ১০০ সণের শতাব্দীতে ভাগ করে তার হিসাবে করবার নিয়ম করেন।

স্রষ্টা, সময়ের হিসাবে, প্রথম মাসটিকে বিশেষ তাৎপর্যমণ্ডিত মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে তাকে ‘মহররম’, অর্থাৎ ‘অলংঘণীয়’, ‘পবিত্র’ করে প্রতিষ্ঠা করে এ মাসে অনেকগুলো এমন তাৎপর্যপূর্ণ ঘটণা সংঘটিত করেন যার মর্ম সৃষ্টির জন্য সার্থক সঠিক পথপ্রদর্শণামূলক শিক্ষার বাহন হবে। আর মহররমের পার্বণ এসব ঘটণারই স্মারক, ও সে সবের মর্ম শিক্ষার ব্যন্জনাময় উদযাপণ।

খোদা তা’আলা এ মাসের ১০ তারিখে আকাশ জমিন পাহাড়-পর্বত সব কিছু সৃষ্টি করেন। পৃথিবীর এই জন্মলগ্ন থেকেই নানা ঘটনাপ্রবাহের ঐতিহ্য বহন করে আসছে পবিত্র মহররম মাস।

দীর্ঘ ইতিহাস ধরে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ঘটণা যেই একই মহররম মাসের প্রথম ১০ টি দিন, আর বিশেষ করে ১০ম দিন – প্রাচীন সেমিটিক ভাষায়, ‘আশর’ অর্থাৎ ‘১০’ থেকে ‘আশূরা’ - ঘটেছিল, তা স্বাভাবিক ভাবেই পৃথিবীর বিশালতম জনসংখ্যা – য়াহূদী, খৃষ্টান আর মুসলিম – এদের ভেতর পার্বণ রূপে পালিত হতে শুরু করে । যদিও নানা ঐতিহাসিক কারণে য়াহূদী আর খৃষ্টানেরা পরে কোন এক সময়ে ১০ মহররমের পরিবর্তে বছরের অন্য এক তারিখে পালন করতে শুরু করে, আর পার্বণটিকে অন্য নামে নামান্কিত করে, মূলোৎসগত ঘটণাসমূহের ভিন্ন ভিন্নটিকে গুরুত্ব দেয়।

য়াহূদী ‘আশূরা’?: ‘পেসাক’ বা ‘পাসোভার’

কোরান শরীফের সূরা ইব্রাহীমের ৫ম আয়াতের বর্ণনা মতে, আল্লাহ তাআলা মূসা নবী (আ: )-কে নির্দেশ দেন, লোকদের ‘আল্লাহর দিনগুলো স্মরণ করিয়ে’ দিতে । একই সূরার ৬ষ্ঠ আয়াত মতে, “মূসা তাঁর সম্প্রদায়কে বললেন, ‘তোমাদের ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর, যখন তিনি তোমাদের ফিরআউনের সম্প্রদায়ের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন; তারা তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি দিত, তোমাদের পুত্রদের হত্যা করত এবং তোমাদের কন্যাদের জীবিত রাখত। আর এতে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এক মহান পরীক্ষা ছিল।’

এ থেকেই জানা যায়, ‘আল্লাহর দিনসমূহ’ বলতে সেইসব দিনকে বোঝায়, যেদিন খোদার প্রতি প্রেম ও আনুগত্যের পরীক্ষার ধর্মত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়, অথবা যেদিন এমন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করে, আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ করেন। যেহেতু য়াহূদীদের সেই মুক্তির সেই দিনটি ছিল আশুরার দিন— অর্থাৎ মুহাররম মাসের ১০ তারিখ, বুখারী শরীফে সংরক্ষিত, সাইয়্যিদুনা আবু মূসা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীস মতে, য়াহূদীরা আশুরার দিনকে ‘ঈদ’, অর্থাৎ, মূল শব্দার্থ মতে, ‘বার্ষিক পালনীয় দিন’ হিসেবে গণ্য করত, তাই নবী করীম (দ: ) এই দিনে রোযা রাখার পরামর্শ দেন, যেমনটি য়াহূদীরা রাখত ঐ খুশীর মুক্তি দিবস রূপ বার্ষিক পার্বণে তার শুকুর আদায়ের জন্য।

কালে, ঐতিহাসিক কারণে য়াহূদীরা তাদের সময় গণনার নিয়ম বদলে ফেলার কারণে তা আর মহররমের ১০ তারিখে হয় না। এখন তারা তা ‘পাশাতা’ – ইংরেজীতে, ‘পাস-ওভার’, বা ‘পাসোভার’ নামে পালন করেন, ফেরাউন ১ম ‘রাম-সস’ – বা ১ম ‘রাম’ – এর অত্যাচার থেকে মূসা (আ: )-এর নেতৃত্বে আলে য়াক্বূবের উদ্ধারের জন্য খোদার শুকরিয়া আদায়ের জন্য ।

প্রাচীন মিশরে রাম-সস নামে এক ষড়যন্তরে ক্ষমতা দখলকারী স্হানীয় ‘হামিটিক’ ‘ক্বিব্তী’ বর্ণোদ্ভূত ‘শাসক’ – প্রাচীনমূল মনুষ্যভাষা, ‘আরব্যে’ ‘ফেরাউন’-এর বর্ণবাদী স্বৈরাচারী শাসনে অভিবাসী সম্মাণিত ‘সেমিটিক’ বর্ণোদ্ভূত আলে য়াকূবদের দাস বানিয়ে চরম নির্যাতণ করে । তারই পালকপুত্র রাজকুমার হিসেবে বেড়ে ওঠা, তারই অজ্ঞাতে মূলত: য়াকূববংশীয় মূসা (আ: )-এর ঐশী নির্দেশণাধীন দু:সাহসী নেতৃত্বে চালিত অভিযানে পুরো জাতিটিই অলৌকিকভাবে, খোদার বিশেষ অনুগ্রহে, সরকারের যাদুকরী সব প্রযুক্তিগত ক্ষমতার ব্যূহ ভেদ করে কারাগারে পরিণত করা মিশরের নীল নদ উপত্যকা থেকে,মুক্ত হয়ে আসে ১০ মহররম। খোদার এই অনুগ্রহের শোকরানা আদায়ে, সেমিটিক ধর্ম সংস্কৃতি মতে খোদার জন্য আত্মত্যাগমূলক ধর্মাচারমূলক উপবাসব্রত পালন করেন মূসা (আ: )-এর জাতি, যারা পরে কোন এক সময় থেকে ‘য়াহূদ’ বলে পরিচিত হন।

‘য়ীস খৃষ্টের নেতৃত্বে মুক্তি সংগ্রাম

মিশর থেকে মুক্তি পেয়ে য়াকূব বংশীয়, তথা য়াহূদীরা পবিত্র ভূমিতে পুনর্বাসিত হলে সেখানকার বিভিন্ন পর্যায়ের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটণার ভেতর দিয়ে আলে য়াক্বূব নিপতিত হন এক দ্বিমুখী অসহনীয় অবস্থায়। এক দিকে বহির্দেশীয় গ্রীক-রোমক সাম্রাজ্যের ঔপনিবেশিক দাসত্ব - অন্যদিকে এক সময়ের বাবিলনীয় বন্দীত্বের সময় বিপদমুক্তির আশায় শেখা শয়তান-উপাসণামূলক যাদুবিদ্যা স্বধর্মে অন্তর্ভুক্তিমূলক, আভ্যন্তরীন ধর্মবিকৃতি। এ দু’মুখী অবক্ষয় থেকে মুক্তির দিশারী ভবিষ্যতের ঐশী নির্দেশে নিযুক্ত এক বিশ্বারাজ, তথা ‘মসীহ’ বা ‘খৃষ্ট’-এর অপেক্ষায় থাকেন তাঁরা অসহায় ভাবে। এই ভূমিকায় আবির্ভূত হবেন যিনি - সেই য়ীস, বা ‘যীশু’ জন্মগ্রহণ করেন অবশেষে। ৪ খৃষ্টপূর্ব সণ বা তার কিছু পূর্বে বা পরে, কোন এক বছরের ১০ মহররমে। পিতৃহীন ভাবে অলৌকিক ভাবে কুমারী মরিয়ম (আ: )-এর গর্ভে ।

কিন্তু আলে-য়াক্বূবের বিজাতীয় বিধর্মীয় প্রকৃতিপূজারী, পৌত্তলিক সাম্রাজ্যবাদী-ঔপনিবেশবাদীদের দোসর য়াহূদী আলেমগণ সহ আলে-য়াক্বূবের উচ্চতর শ্রেণীরা এই পিতৃহীন দরিদ্র তরুন নবীকে ‘মসীহ’ বা ‘খৃষ্ট’ ত’ দূর, নবী, এমন কি প্রণিধাণযোগ্য কেউ বলেই স্বীকার করতে রাজী হয় নি । শুধু নিম্নশ্রেণীর দরিদ্ররাই তাকে গ্রহণ করে, য়ীস খৃষ্ট নসরত শরের ছিলেন বলে যে ‘নসরী’ বলে পরিচিত হন কখনো কখনো – সেই মতে , নিজেরাও “নসরী” বলে পরিচিত হন কখনো কখনো সম্ভবত:।

উচ্চশ্রেণীর ষড়যন্ত্রে য়ীস ‘মসীহ’ বা ‘খৃষ্ট’কে শূলবিদ্ধ করে হত্যা করবার অপচেষ্টা অলৌকিক ভাবে ব্যর্থ করে খোদা তা’আালা তঁকে জীবন্ত অবস্হায়ই আকাশে তুলে নেন, ভবিষ্যতে তাঁর দ্বিতীয় বার ফিরে বিশ্বব্যাপী হজরত মূসা (আ: ) সহ তাঁর পূর্বের, তাঁর পরের হজরত মোহাম্মদ (দ: ) ও অন্যান্য সকল নবীর (আ:) শেখানো একই মূল ধর্ম সম্মত শান্তি ও সমৃদ্ধির রাজ্য শাসনের সময় পর্যন্তের জন্য। তাঁর এই উর্দ্ধারোহনও সংঘটিত হয় ১০ মহররম।

খৃষ্টানরা শুরুতে মহররমের ১০ তারিখে আশূরা পালন করে, য়ীস, অর্থাৎ ঈসা (আ:), অর্থাৎ খৃষ্টের জন্ম ও উর্দ্ধারোহনের খুশীর বার্ষিক পালিত পার্বণ হিসেবে। কিন্তু পরে এক সময়, দখলদার সূর্যপূজারী গ্রীক সংস্কৃতির বাহক রোমান সম্রাজ্য ও তাদের স্হানীয় দোসর, উচ্চশ্রেণীর অনেকের ষড়যন্ত্রে খৃষ্টধর্মের নেতৃত্ব চলে যায় গ্রীক-রোমকদের হাতে। তাদের সূর্য-পূজারীদের সৌর বর্ষীয় হিসাবে দিন গণনার ফলে, সেমিটিক ধর্মীয় বর্ষ গণনার প্রথম মাস, মহররমের ১০ তারিখে পালিত সে পার্বণ পালিত হতে শুরু করে সেকালের ১০ মাসে এক বছর ধরা সৌরবর্ষের প্রথম মাস, যা বছরের দীর্ঘতম সৌর দিন, ২১ মার্চে শুরু হয়ে ২০ এপ্রিলে শেষ হত – তার ১০ দিন, অর্থাৎ এপ্রিলের শুরুতে পালন করতে শুরু হয়। আর এক পর্যায়ে সে পার্বণও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে, য়ীসুর জন্মের আনন্দের উৎসব করা হয় রোমকদের পূর্বপ্রচলিত অন্য এক উৎসবের দিনে, সৌরবর্ষীয় ডিসেম্বর মাসে, ‘বড় দিন’ নামে।আর তাঁর উর্দ্ধারোহনের পার্বণটি রেখে দেয়া হয় এপ্রিলে, গ্রীক-রোমকদের পৌত্তলিক ধর্মের এক ‘দেবী’, ‘ঈশ্তার’-এর নামে, ‘ঈস্টার’ নামে নামায়িত করে। য়ীস’র জন্মের খুশীর “বড় দিন” পার্বণ, এক পর্যায়ে সৌর বর্ষকে দশের জায়গায় বারোতে উন্নীত করে জানুয়ারী নামে নতুন এক বর্ষশুরু মাস চালু করা হলে – মূল সেমিটিক ধর্মসংস্কৃতির প্রথম মাস, মহররমের ১০ তারিখের পরিবর্তে এখ য়ূরোপের আর্য সংস্কৃতির এই নতুন প্রথম মাস, জানুয়ারীর ১০ তারিখে পালিত হতে শুরু করে – এখনও যূরোপের বহু দেশ সহ বহু খৃষ্টান সমাজেই ‘বড় দিন’ পালিত হয় এই ১০ জানুয়ারী। পরে অন্যান্য, মূলত: অর্থনৈতিক কারণে য়ূরোপের পশ্চিম প্রান্তের দেশগুলোতে তা একটু আগিয়ে এনে সেখানে ১৭ ডিসেম্বর থেকে শুরু করে পালিত মদ ও যৌনতার কল্পিত দেবতা “বাকুস”-এর ব্যয়বহুল উৎসবের নিকটতর এনে দু’ উৎসবকে এক সঙ্গে দু’ তারিখের মাঝামাঝি ২৫ ডিসেম্বর, তার আশেপাশের দিনগুলো সহ গননা করে, তাতে পালণ শুরু হয়।

মুসলিম ‘মহররম’ ও ‘আশূরা’

য়াহূদীরা আশূরা পালন করেন “পাসেক” বা “পাসোভার” নামে – ফেরাঊনের অত্যাচার থেক আলে-য়াক্বূবের মুক্তির শোকরানায়। খৃষ্টানেরা পালন করে যা ছিল মূলত: আশূরা, তাকে সৌরবর্ষীয় বছরের ভিন্ন দু’দিনে – ‘বড় দিন’ আর ঈস্টার হিসেবে, মূলত: ১০ মহররমে য়ীস’র জন্ম ও উর্দ্ধারোহনের শোকরানা হিসেবে।

মুসলমানদের সংস্কৃতিতে ১০ মহররমের পার্বণ পালনীয় – য়াহূদী ও খৃষ্টানেরা মূলত: ১০ মহররমে সংঘটিত যে সব ঘটণার স্মারক হিসেবে, তা সহ, ১০ মহররমের আরো অন্যান্য সবগুলো স্মর্তব্য ঘটণা ও সেসবেরই মর্ম শিক্ষার স্মারক হিসেবে। পূর্ব থেকেই য়াহূদী ও খৃষ্টানদের স্মারকরূপে পালিত মূলত: আশূরা, তথা মহররম মাসের ১০ তারিখে সংঘটিত উপরোক্ত তিনটি ঘটণা ছাড়াও ইতিহাসের স্মর্তব্য যে অনেক শিক্ষাপ্রদ ঘটণার স্মারক হিসেবে পালনীয় মহররম, তার ভেতর উল্লেখ্য, এ দিনেই প্রথম মানুষ ও ঐশীজ্ঞানের জ্ঞানী রাজর্ষি নবী, আদম (আ.)-এর সৃষ্টি হয়; হজরত ইদ্রিস (আ.)-কে আসমানে উত্তোলন করা হয়; হজরত নূহ (আ.) তুফান ও প্লাবন থেকে পরিত্রাণ লাভ করে, মহাপ্লাবন শেষে জুদি পাহাড়ে অবতরণ করেন; হজরত ইবরাহিম (আ.) নমরুদের প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ড থেকে মুক্তিলাভ করেন; হজরত ইয়াকুব (আ.) কর্তৃক হারানো পুত্র হজরত ইউসুফ (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভ করেন; দীর্ঘ ১৮ বছর রোগ ভোগের পর হজরত আইয়ুব (আ.)-এর দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তিলাভ করেন; হজরত সুলাইমান (আ.)কে পৃথিবীর রাজত্ব লাভ করেন; হজরত ইউনুস (আ.) ৪০ দিন পর দজলা নদীতে মাছের পেট থেকে উদ্ধার প্রাপ্ত হন; হজরত মূসা (আ.) ফেরাউনের কবল থেকে রক্ষা ও উদ্ধার হন; হজরত দাউদ (আ.) বিশেষ সম্মানে ভূষিত হন; হজরত সোলায়মান (আ.) বিশ্ব-রাজ্য পান; হজরত ঈসা (আ.) জন্মলাভ করেন,এবং জীবিতাবস্থায় আসমানে উত্তোলিত হন; এ মাসেরই ১ম তারিখে ৩ দিন পূর্বে হজ্জ্বের ২৬ তারিখ পারস্য নিবাসী অগ্নি উপাসক সন্ত্রাসী আবু লু’লু ফিরোজের ছুরিকাঘাতে,হজরত ওমর (রা:)– ও এমাসেরই ১০ তারিখ, হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) এবং তার ৭১ থেকে ৮৭-এর ভেতর কোন এক সংখ্যক পরিবার সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনকে য়াজিদের বিতর্কিত অযোগ্য সরকারের অধীন সেকালের বৃহত্তর পারস্যের - নিজেকে এক সময় হজরত ‘আলীর “দল”-ভুক্ত, তথা তাঁর বংশ, আার তার নয়নমণি, হজরত হোসাইনের সমর্থক ‘শিয়া’ দাবী করা, ও তাদের নেতা - শাসককে কূফায় এনে নিয়োগ দেয়া গভর্নর ইবনে জিয়াদের সৈন্যদের হাতে কারবালা প্রান্তরে নির্মম হত্যার মাধ্যমে শাহাদত বরণ করেন ।

সে সব অনেক ঘটণার শিক্ষামূলক স্মারক হিসেবে পালনীয় হলেও, তাঁদের ভেতর এখন তা পালিত হয় প্রধানত:ই মূসা (আ: )-এর নেতৃত্বে ফেরাউন ১ম রাম-সসের স্বৈরশাসনের অত্যাচার থেকে উদ্ধার, আর কারবালা শরীফে হজরত হুসেনের নেতৃত্বে নবী বংশ ও তাদের নিকটজন ৭২ বা সেরকম সংখ্যক বীরপুরুষের আত্মদান – এ দু’য়ের স্মারক রূপে। মহররমের পার্বণ যথার্থভাবে পালন করতে হলে, উপরোক্ত সব ঘটণারই মর্ম ও তাৎপর্য জেনে, মনে রেখে, আত্মস্হ করা দরকার। এসবের ভেতর সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী, প্রধানটি ছিল কারবালার শাহাদতের মর্মন্তুদ ঘটণা ।

কারবালার আত্মদান

অনেক বিষয়ের এক জটিল মিশ্রণের ফলে নবীজ্বীর (দ: ) দৌহিত্র হজরত হোসাইন (আ:)-কে, নবী বংশের ও তাঁদের ঘনিষ্ঠ কমবেশী ৭২ জন পুরুষ সদস্য সহ বীরোচিতভাবে সঙ্গী ও আত্মরক্ষায় সম্মুখ সমরে নৃশংসভাবে শহীদ করা হয়, ৬৮০ খৃষ্টাব্দে। এসব বিষয়ে ছিল ইয়েমেনী আরব হিময়ার গোত্রের কোন এ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির ঔরসে সম্ভবত: কৃষ্ঞাঙ্গিনী য়াহূদী দাসীর গর্ভে জন্মানো ইবনু সওদা (কাল নারীর ছেলে) বলে পরিচিত এক যাহূদী ধর্ম বিকৃতিকারী পন্ডিত মুসলমান সেজে ‘আব্দুল্লাহ ইবন সাবা’ নাম নিয়ে মুসলিম শাসিত বিশালএলাকার প্রত্যান্তান্চলে গিয়ে ষড়যন্ত্রমূলক নানা গোপন কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট ধোঁয়াশা ; তার কারণে উদ্ভূত ভুল বোঝাবুঝির অপব্যবহার করে তার হজরত উসমানকে হত্যা ও ততপরবর্তী একই ষড়যন্তরী চক্রের সৃষ্ট একই রূপ ধোঁয়াশা; তাতে “খলীফা” হজরত আলীর শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ প্রতিপন্ন করে আমীর মু’য়াবিয়া সহ সাহাবীর সঙ্গে বাঁধিয়ে দেয়া তাঁর দ্বন্দের মাধ্যমে মুসলিম সমাজকে ত্রিধা বিভক্ত করে তজ্জনিত পরিস্হিতিতে নিজেদের হজরত ‘আলীর দল’ বলে দাবী করাদের একাংশের নিজেদের নিয়ে সৃষ্ট ‘খারেজী’ উপদল কর্তৃক হজরত আলীকে ‘কাফের’ ঘোষণা করে শহীদ করার ফলে উদ্ভূত পরিস্হিতিতে তাঁর পরের খলীফা হজরত হাসানের শরত সাপেক্ষে আমীর মু’য়াবিয়াকে ‘খলীফা’ হিসেবে বরণ করে নিয়ে তাঁকে বস্তুত: সে পদে নিয়োগ দানের পর – আমীর মু’য়াবিয়া, মুগ্বীরা ও হজরত ‘আলীর সময়ের কাজী শুরায়হর মত কিছু সাহাবীর ও তাবেয়ীর ধর্মীয় নির্দেশণার মূল উৎস - কোরান ও সুন্নাহর বাস্তব পরিস্হিতিতে প্রয়োগে ভুল বোঝা ভিত্তিক ব্যাখ্যা; অবৈধ নিয়োগ মাধ্যমে নিযুক্ত বলে মনে করে, অস্বীকৃত অযোগ্য য়াজীদের কেন্দ্রীয় সরকারের নিযুক্ত কূটিল স্বার্থান্বেষী স্হানীয় শাসক ইবন যিয়াদ আর তার শিমারের মত সামরিক কর্মচারীদের কর্মকান্ড আর বিবেকহীন নিষ্ঠুরতা; নিজেদের হজরত আলীর দল আর সেকারণে হোসাইন (আ: )-এর ভক্ত বলে দাবী করাদের ইবন জিয়াদের মত কোন কোন নেতৃস্হানীয়দের পরশ্রীকাতরতা বা তাদের কূফাবাসী শত শত সদস্যদের ভীরুতা-জাত বিশ্বাসভঙ্গ ও বিশ্বাসঘাতকতা ।

মর্মন্তুদ এই ঘটণা ঘটে, নব-বিজিত পারস্যের হজরত উমরের নির্দেশে নবনির্মিত কূফা ও রোমক সাম্রাজ্যের নববিজিত বৃহত্তর সিরিয়ার সীমান্তবর্তী বাবিলের নিনভা, তথা জায়গাটি দেখে হজরত হোসাইনের (আ:) বলা, ‘কারব ও বালা’ (বেদনা ও বিপদ) থেকে সংক্ষেপিত হয়ে ‘কারব্বালা’ নামে পরিচিত হয়ে পড়া জায়গাটিতে।

এত সব পটভূমিকাগত ঘটণা, আর খোদ কারব্বালায় হজরত হোসাইন (আ:) ও তাঁর পরিবার সহ সঙ্গীদের ধর্মের নিয়মে যা সঠিক, সত্য, ন্যায় ও করনীয়, তাতে বীরোচিত দৃঢ়চিত্তে অবস্হান, ও আমৃত্যু আপোষহীন প্রতিরোধ থেকে জগতের সকলের শিক্ষণীয় আছে বহু। তাতে সমাজের জন্য বহু সম্ভাবয ভুলের তার ঘটার আগেই প্রতিষেধের ব্যবস্হা নেয়ার শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে ধর্মত: যা সঠিক, ন্যয় ও সত্যের ওপর যে কোন পার্থিব মূল্যেও দৃঢ়চিত্তে অবস্হানের শিক্ষা সর্বোচ্চ।

আশূরার মহাত্ম্য

সৃষ্ট জগত, আর সৃষ্টজগতে তার অভিভাক রূপে মানুষের সৃষ্টি থেকে বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার স্মারক আশূরা । বিশ্বের মোট জনসংখ্যার বিশালতর অংশই, জেনে হোক আর না জেনে হোক, সে সব ঘটণা কথা ও শিক্ষা মনে করে হোক আর না হোক, নানা নামে – এমন কি কোন কোন ক্ষেত্রে এখন পরিবর্তিত কোন তারিখে, তা পালন করে থাকেন।

আশূরা সংক্রান্ত সকল ঘটণার কথা জেনে, তার মর্ম অনুধাবন করে - নবীবংশের ভালবাসা ও অনুসরণে প্রয়োজন জীবন পর্যন্ত উৎসর্গের চেতনা ও বাসনা সহ - তার শিক্ষামত জীবন যাপন ও সমাজ গঠনই হবে তার পালনের যথার্থ উপযোগ। এর পালনের, ঐশী জ্ঞান নির্দেশিত বা অনুমোদিত নানা আচার অনুষ্ঠান – যথা, উদাহরণস্বরূপ, আত্মত্যগ-মূলক উপবাস ব্রত (“রোজা”) – অবচেতণাকে সে সব শিক্ষার কিছু মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু সচেতনেও সে সব শিখে জীবণে তার প্রতিফলন দরকার। আর এই মহান দিনটিকে ঘিরে গড়ে ওঠা নানা রূপ অপসংস্কৃতিমূলক চর্চা – ঐশীজ্ঞান নির্ভর নির্দেশণায় যা নিষিদ্ধ বা অনানুমোদিত নিজের পছন্দ হলেও, তার পরিহারও একই আত্মত্যাগের চেতণায় পরিত্যাগও প্রয়োজন।

প্রেমময় পদ্য বনাম জাতীয় প্রতিরক্ষার গদ্য

ফারাক্কা থেকে ফেনী : নদী আগ্রাসন ও সমাধান

আখতার-উল-আলম : জাতীয় চেতনার অগ্রসেনানী

পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতির উত্তরাধিকার

ভারতীয় আধিপত্যবাদী নীতি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে প্রধান বাধা

সান ফ্রান্সিসকোর চালকবিহীন গাড়ি

রাজনৈতিক সাংবাদিকতার নামে যা হচ্ছে

ইসরাইলকে পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ উপহার দিয়েছে ইরান

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নতুন বর্বরতা ও করণীয়

আত্মমর্যাদার পররাষ্ট্রনীতিতে ফিরছে বাংলাদেশ